Author Picture

আমেরিকার ফুটবল মা

খন্দকার রেজাউল করিম

‘দারুন সে, সুন্দর সে,
নহে সে ভোগীর লোচনলোভা।’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ওরা অনেকেই মা। ওদের মাথায় ঘোমটা নেই। লজ্জা ওদেরকে দেখে লজ্জা পায়! ওরা রুক্ষকেশী, অলক্ষ্মী। খেলার মাঠে ওরা ঝড়ের বেগে ছুটে চলে। ওদের পায়ে মল নয়, বল জড়িয়ে থাকে। মার্কিন মহিলা ফুটবল খেলোয়াড় এলেক্স মরগ্যান, জেসিকা ম্যাকডোনাল্ড, কার্লি লয়েড, মিয়া হ্যাম, এবং ক্রিস্টিন লিলির কথা বলছি। পুরুষের লোচনলোভা নন, বরং ওদের পায়ের এক লাথিতে যে কোনো পুরুষের ভোগলিপ্সা চিরদিনের জন্যে ঘুঁচে যাবে। লজ্জা, সজ্জা, আবরণ, ভীরুতা, ক্রন্দন নারীর ভূষণ? ওতেই নারীর গৌরব? ‘শেখায় এ হীন তথ্য কে রে?’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতাটি আরেকবার পড়ুন।

১৮৯৫ সালে অস্কার ওয়াইল্ড ‘The importance of being earnest’ নাটকটির নায়িকার মুখে শুনিয়েছিলেন, ‘I like to be looked at,’ মেয়েটি চায় ছেলেরা তার দিকে তাকিয়ে থাকুক, পুরুষের কামনার ধন হয়ে বেঁচে থাকাই মেয়েটির কামনা। ফ্রান্সিস স্কট ফিডজেরাল্ড ১৯২৫ সালে ‘The great Gatsby’ উপন্যাসে একটি মেয়ের জন্মলগ্নে তার বাবার মুখ দিয়ে বলেছিলেন , ‘I am glad it is a girl. And I hope she will be a fool – that is the best thing a girl can be in this world, a beautiful little fool.’ দিনকাল কি কিছু বদলেছে? সুন্দরী এবং বোকা মেয়ে কি এখনো পুরুষের কামনার ধন? সেজেগুজে থাকো, এবং বোকা না হলেও বোকার অভিনয় করে যাও, ছেলেরা তোমাকে ভালোবাসার গল্প শোনাবে! তোমার মাথায় বুদ্ধিমত্তার চিহ্ন খুঁজে পেলে ওরা পালিয়ে যাবে। পুরুষেরা কি বুদ্ধিমতী মেয়েদের ভয় পায়? যাকে চারদেয়ালের কারাগারে চিরদিন আটকে রাখতে হবে তার বুদ্ধিশুদ্ধি কম থাকাই ভালো! সুন্দরী, বোকা, এবং পুরুষের কাঙ্ক্ষিতা হয়ে বেঁচে থাকাই কি এখনো মেয়েদের কামনা? ছেলেরা ফুটবল খেলবে আর মেয়েরা বরণডালা সাজিয়ে বসে থাকবে? ফুটবল কি শুধুই ছেলেদের খেলা, আর পুতুল মেয়েদের? ইবসেনের নাটক ‘A doll’s house’ এ নোরার বাবা এবং স্বামী নোরাকে নিয়ে পুতুল খেলেছিলো, মানিক বন্দোপধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ তে সেই একই গল্প। মেয়ে তুমি পুতুল খেলো, তুমি হও ছেলেদের কামনার পুতুল, ওরা তোমাকে বেবি ডল বলে আদর করবে!

দিনকাল কি কিছু বদলেছে? সুন্দরী এবং বোকা মেয়ে কি এখনো পুরুষের কামনার ধন? সেজেগুজে থাকো, এবং বোকা না হলেও বোকার অভিনয় করে যাও, ছেলেরা তোমাকে ভালোবাসার গল্প শোনাবে! তোমার মাথায় বুদ্ধিমত্তার চিহ্ন খুঁজে পেলে ওরা পালিয়ে যাবে

আমেরিকায় ফুটবল মা (soccer mom) বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। এই মা’রা সাধারণত শহুরে, বিশ্ববিদ্যালয়-পাস করা চাকুরে, উচ্চমধ্যবিত্ত, এবং কোনো পরিবারের কর্ণধার। এঁরা মোটরগাড়ি নিয়ে তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলের ঘর থেকে খেলার মাঠে অহরহ ফেরি করে বেড়ান। সন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কুলের পাঠ এবং পাঠক্রম বহির্ভূত সর্বকাজে এঁরা নিবেদিতপ্রাণ। ফুটবল মা ছেলে এবং মেয়ে সন্তানের মাঝে কোনো তফাৎ করেন না। আমাদের দেশে একজন মায়ের ভালোবাসা তাঁর ছেলে এবং মেয়ের জন্যে সমান হতে পারে, কিন্তু খাবারের সময় সাধারণত মাছের মুড়ো ছেলের পাতেই পড়ে; সংসারে পয়সার টানাটানি থাকলে শিক্ষা এবং চিকিৎসায় ছেলেরা প্রাধান্য পায়; সম্পত্তির ভাগাভাগিতে মেয়ের কপালে সমান ভাগ জোটে না। ফুটবল মা এমন বৈষম্য করেন না, এবং কেউ করলে গায়েপড়ে তাকে দু’কথা শুনিয়ে দিতে একটুও সংকোচ বোধ করেন না। ফুটবল মায়ের দল সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তহস্ত; তবে সন্তানের স্বার্থে এঁরা হরহামেশা কলহ করেন, খেলার মাঠে রেফারির সাথে অকারণে ঠোকাঠুকি করেন, সংসদ ভবনে কংগ্রেসম্যানদের সাথে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে বসেন।

২০২০ সালে ছয় জন মহিলা প্রার্থী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন। এঁরা নিজেরা অনেকেই ফুটবল মা, এবং এই প্রতিযোগিতায় পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরাশয়ী করতে হলে আর সব ফুটবল মা’দের সমর্থন ভীষণ জরুরী। এলিজাবেথ ওয়ারেন এমন একজন মহিলা পদপ্রার্থী। রাস্তায় কোনো কিশোরীর সাথে দেখা হলে এলিজাবেথ তার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে হাতে হাত এবং চোখে চোখ রেখে বলেন, ‘হাই, আমি সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, এবারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছি, কারণ প্রেসিডেন্ট হওয়া মেয়েদের কাজ।’ আমেরিকায় আজ পর্যন্ত কোনো মহিলা প্রেসিডেন্ট হতে পারেন নি। অথচ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে মহিলারা রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন। তবে এঁরা সবাই এই কাজটি পেয়েছেন মৃত পিতা বা স্বামীর কল্যানে। আমেরিকায় এমন হওয়ার সম্ভবনা নেই, নিজের যোগ্যতা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে অবশ্য গুটিকয়েক নারী ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

মেয়ে পুরুষের বৈষম্য শেষ হওয়ার আর কতদিন বাঁকি? ফুটবল এবং পুতুল খেলা থেকে তার একটা ধারণা করা যেতে পারে। ছেলে বা মেয়ে যে যার ইচ্ছেমতো পুতুল বা ফুটবল খেলতে পারে। কোনো মেয়ে যদি পুতুল খেলতে চায় এবং পুতুল হয়ে সুখে জীবন কাটাতে চায়, সেটা তার ইচ্ছে। কোনো মেয়ে যদি দুঃখ-কষ্টের সাথে লড়াই করে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চায়, নিজের দুই পায়ের উপরে ভর দিয়ে দাঁড়াতে চায়, নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিতে চায়, সেটা তার ইচ্ছে। কোনো মেয়ে যদি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সেনাপতি হতে চায়; বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, আইনজীবী, খেলোয়াড় বা সৈনিক হতে চায়, সেটাও তার ইচ্ছা। ধর্মগ্রন্থের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কেন ওদেরকে গৃহবন্দী করে রাখতে হবে?

একজন ফুটবল মা সংসার, সন্তান, চাকরি, প্রতিবাদ-সভা নিয়ে সদাই ব্যস্ত। তবুও এই ক্লান্ত মা মেয়েদের জন্যে সবসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ যদি ফুটবল খেলতে চায় এবং ঘোমটা পরে ফুটবল খেলা যদি সম্ভব না হয় তবে ঘোমটা ছাড়তে হবে, ফুটবল নয়। ফুটবল খেলার সমান অধিকারের মাঝে ফুটবল মা জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।

আরো পড়তে পারেন

মুনশী ভাইয়ের হজ

মুনশী ভাই কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন একজন শিশু শ্রমিক হিসেবে, দশ বছর বয়েসে বাবাকে হারিয়ে হয়ে গেলেন পাড়ার হাজী সাহেবের বাসার চাকর। যখন পাড়ার ছেলেরা রাস্তার ধারে ক্রিকেট খেলতো, দেখতো ছক্কা মারার স্বপ্ন, তখন মুনশী ভাই স্বপ্ন দেখতেন মক্কা যাওয়ার। মনিব আর মনিবের বউ দুজনেই হাজী, তাঁদের কাছে মক্কার অনেক গল্প শুনেছেন তিনি I জমজমের….

পৃথিবী থেকে পলায়ন

‘‘নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে…” ‘পৃথিবী থেকে পালাতে চাই। যেতে চাই ল্যানিয়াকিয়া মহাপুঞ্জের কেন্দ্রে। ওখানে কোটি কোটি গ্যালাক্সির মেলা বসেছে। এর জন্যে দায়ী নাকি দ্য গ্রেট এট্ট্রাক্টর। ব্যাপারটা রীতিমতো রহস্যময়। ইচ্ছে করলে তুই আমার সঙ্গী হতে পারিস। এখন অংক কষে দেখতে হবে পৃথিবী থেকে পলায়ন সম্ভব কি না! মানে, খরচপাতি, যন্ত্রপাতি….

রুক্মিনী, বিন্দু, নোরা

‘‘জাতে হয়তো মেথর হবে, কিংবা নেহাত ওঁচা, যাত্রীঘরের করে ঝাড়ামোছা, পঁচিশ টাকা দিতেই হবে তাকে! এমন হলে দেউলে হতে কদিন বাকি থাকে।’’ বিলাসপুর ইস্টেশনে ট্রেন বদল করতে হবে, ছয় ঘন্টার বিরতি। ধরে নিচ্ছি যাত্রীটি রবীন্দ্রনাথ নিজেই, সাথের বিনু নামের মেয়েটি তাঁর অসুস্থ স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। বিনু গল্প জুড়ে দিয়েছে যাত্রীঘরের মেথর রুক্মিনীর সাথে। সব কিছুতেই….

error: Content is protected !!