অস্ট্রলিয়ার আদিবাসীরা এখনো আটকে আছে প্রস্তর যুগ আর লৌহ যুগের মাঝামাঝি। নৃতত্ববিদ লুইস মরগ্যান ওদের বিবাহ সংক্রান্ত আইনকানুন এইভাবে ব্যক্ত করেছেন :

ইপ্পাই বিয়ে করবে কাপোটা, আর কাউকে নয়।
কুমবো বিয়ে করবে মাটা, আর কাউকে নয়।
মুরী বিয়ে করবে বুটা, আর কাউকে নয়।
কুব্বী বিয়ে করবে ইপ্পাটা, আর কাউকে নয়।

গোটা পুরুষ জাতিকে ইপ্পাই, কুমবো, মুরী, এবং কুব্বী; এই চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তেমনি মেয়েদের গোত্রগুলি হলো: কাপোটা, মাটা, বুটা, এবং ইপ্পাটা। কোনো মহেন্দ্রক্ষণে যদি একজন ইপ্পাই পুরুষের সাথে কাপোটা মেয়ের দেখা হয়, তবে অপরিচিত হলেও ওরা একজন আরেকজনকে স্বামী-স্ত্রী বলেই মেনে নিবে।

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। উত্তপ্ত পৃথিবী ঠান্ডা হতেই লেগে গেল ১০০ কোটি বছর। তারপরে ২৫০ কোটি বছর ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিলো ব্যাকটেরিয়ার মত এক কোষী প্রাণী। এদের মধ্যে স্ত্রী পুরুষের তফাৎ নেই। আজ থেকে ১০০ কোটি বছর আগে প্রথম স্ত্রী পুরুষে বিভক্ত প্রাণী eukaryote এর জন্ম হলো। এর আগে একটা কোষ দুটুকরা হয়ে দুটি এককোষী প্রাণী হয়ে যেত। এবার দুটি কোষ এক হয়ে দুজনের নিউক্লিয়াসের গোপন সংবাদ ভাগ করে নুতন প্রাণী তৈরি করার পালা। এক কোটি বছর আগে স্তন্যপায়ী জীবের আবির্ভাব হোলো; সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব মা বাবা দুজনের ঘাড়ে এসে পড়লো। খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য একটি প্রানীকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলতে হয়। নিজের খাদ্য অন্য প্রাণী ছিনিয়ে নেয়, বাসস্থান দখল করে নেয়, এ নিয়ে নিরন্তর মারামারি, রক্তক্ষয়। মেয়েদের ভাগে পড়লো সন্তানকে পেটের মধ্যে ধারণ করা, জন্মের পরে কিছুদিন দুধ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখা, বন বাদাড় ঘুরে খাবার সংগ্রহ করা। ছেলেদের ভাগে পড়ল প্রতিরক্ষা, মারামারি, এবং শিকার করার দায়িত্ব। বিবর্তনের তাসের খেলায় মেয়েদের কপালে টেক্কা, রাজা, গোলাম কিছুই জুটলো না।

একটি মেয়েকে ইতিহাসে কখন থেকে সতী বলে চিহ্নিত করা শুরু হলো? যখন থেকে মানুষের বাক্তিগত সম্পত্তির প্রচলন হয়েছে, তখন থেকে! প্রস্তর যুগে মেয়েদের সারাদিন কেটে যেত গাছের ফল, শিকড় সংগ্রহ করে, আর ছেলেরা দিন কাটাতো শিকার করে। দিনের শেষে যা জুটতো তা সবাই মিলে কাড়াকাড়ি ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলতো, কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না। নিজের সম্পত্তি বলতে হাড় আর পাথরের তৈরী অস্ত্র অথবা মালা। সতী-অসতীর বিভেদ তখন জানা ছিল না। নৃতত্ববিদের মতে এ যুগের পরিবার ছিল প্রধানত মাতৃতান্ত্রিক, অনেকগুলো মেয়ে একসাথে সংসারের হাল ধরে থাকতো, অন্য গোত্রের ছেলেরা এসে এই পরিবারে যোগ দিতে এলে মেয়েদের মন জয় করতে হতো। অলস বা বখাটে ছেলেদেরকে মেয়েরা দিতো তাড়িয়ে। একটি মেয়ের গায়ের জোর গড়ে ছেলেদের চেয়ে কম, কিন্তু এতগুলি মেয়ের একতা ও কৌশলের কাছে ছেলেদের গায়ের জোর তেমন কাজে আসত না।

অলস বা বখাটে ছেলেদেরকে মেয়েরা দিতো তাড়িয়ে। একটি মেয়ের গায়ের জোর গড়ে ছেলেদের চেয়ে কম, কিন্তু এতগুলি মেয়ের একতা ও কৌশলের কাছে ছেলেদের গায়ের জোর তেমন কাজে আসত না

তারপরে আসলো লৌহ যুগ। তৈরী হলো তলোয়ার, বল্লম, কুঠার জাতীয় মারনাস্ত্র। শুরু হলো বীর-পূজা: এলো বীর-ভোগ্যা বসুন্ধরার যুগ, ওয়ার লর্ড, রাজা, বর্গী, লুটেরা, আর বর্বরতার যুগ। লাঙ্গলের আগায় লোহার ফলা বসানো হলো। লাঙ্গল পৌঁছে গেলো মাটির আরো গভীরে, কৃষিকাজ থেকে আসলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফসল। তা থেকে শুরু হলো বাক্তিগত সম্পত্তির প্রচলন। খাটুনি করে যেমন সম্পত্তি বাড়ানো যায়, তেমনি যায় অন্যের সম্পত্তি লুট করে। ছোটখাটো লুটেরা থেকে বাঁচতে হলে ধরতে হবে আরো বড় লুটেরা, ওয়ার লর্ড এবং রাজা। শুরু হলো খাজনা ও ভূমিদাস প্রথা। মুদ্রার প্রচলন হলো, আসলো মহাজন, চড়া সুদ, মিডল ম্যান, ব্যবসায়ী, আড়তদার।

মেয়েরা ধীরে ধীরে তাদের কতৃত্ব হারাতে শুরু করলো। পরিবার প্রথার বিবর্তন হলো। তলোয়ারের জোরটাই প্রধান হয়ে উঠলো। মেয়েরা বঞ্চিত হলো সম্পতির অধিকার থেকে। মানুষ প্রেমে পড়ে গেল টাকা আর সম্পত্তির। টাকা হয়ে গেল ইশ্বর। পুরুষ টাকা দিয়ে সব কিনতে চায়; জমি, গবাদি পশু, অলংকার, ক্রীতদাস, ভালবাসা, উপপত্নী। শুধু ক্রীতদাসের হাসি নাকি টাকা দিয়ে কেনা যায় না! নিজের সম্পত্তি অন্যের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে, অন্যের সম্পত্তি দখল করতে হবে। রাজাকে করতে হবে অন্যের রাজ্য গ্রাস। যুদ্ধে যারা হারবে তাদের মেয়েরা হয়ে যাবে বিজয়ীদের ক্রীতদাসী। আরো অনেক কিছুর মতো মেয়েরাও হয়ে গেল পণ্য। রক্ত আর ঘামে ভেজা সম্পত্তি! ছেলেরা চাইলো মৃত্যুর পরে এই সম্পত্তির ভাগ যেন শুধু সেই পায় যার শরীরে বইছে তার রক্ত। এর জন্য প্রয়োজন এক-স্বামী-নিষ্ট নারীর। শুরু হলো সতী-সাবিত্রীর যুগ। ছেলেবালায় পায়রা পোষার ঝোঁক চেপেছিলো একবার। ঝড়ের ঝাপটায় এক পায়রা এসে পড়েছিল আমাদের উঠানে। পাখায়, পায়ে চোট পেয়েছিলো বেচারা। কয়েকদিনের আদর যত্নে আবার ডানা মেলতে শিখলো, কিন্তু আমাকে আর ছাড়ে না। দূর আকাশে পাক দিয়ে আবার জানলায় এসে বসে, সেখান থেকে পড়ার টেবিলে, তারপরে ঘাড়ে, মাথায়, হাতে।

মার বকুনি উপেক্ষা করে বাজার থেকে একটি খাঁচা এবং একটি মেয়ে কপোত কিনে আনলাম। কয়েকদিন ওদের পূর্বরাগ চললো, পুরুষ কপোত বাকবাকুম করে ঘাড় ঘুরিয়ে, পাখা ঝাপটিয়ে বোঝাতে চাইলো যে সে মস্ত এক বীর। তারপরে জুটি বাঁধা, ডিম পাড়া, সেখান থেকে বাচ্চা। ওদের সংসার বেড়েই চললো। খাঁচা ফেলে দিয়ে আম গাছের ধারে ওদের জন্য বানালাম অনেকগুলি ছোট ছোট ঘর। কপোত-কপোতীর জুটি-বাঁধা, ঘর-সংসার, প্রণয়লীলা খুব কাছে থেকে দেখেছি আমি। সাথীর প্রতি ওদের যে একনিষ্ঠ ভালোবাসা, তাকে সম্মান করতে শিখেছি। শুনেছি চখাচখীরাও নাকি সারা জীবনের জন্য এরকম জুটি বাঁধে। ওদের সতীত্ব মেয়ে পুরুষ দুজনের জন্যই সমান ভাবে প্রযোজ্য, আর এর সাথে সম্পতির যে কোনো সম্পর্ক নেই সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সত্যিকারের সতী; অপবাদের আশঙ্কায় নয়, স্বর্গের লোভে নয়, নরকের ভয়ে নয়, সম্পত্তির বাহক হিসেবে নয়, শুধুই ভালোবেসে।

আরো পড়তে পারেন

আঁচল-ভরা বই

বই-মেলা থেকে আঁচলভর্তি বই নিয়ে এক কিশোরী হাসি মুখে বাড়ি ফিরছে। দৈনিক পত্রিকায় এই ছবিটি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। নয়ন ভরা জল, আঁচল ভরা ফুল, এ সব আমার চেনা। কিন্তু আঁচল ভরা বই ? কিশোরীর ভীরু মনে প্রেমের মুকুলের পাশাপাশি এবার জ্ঞানের মুকুলও ফুটবে নাকি? এ মেয়ের বর জুটবে তো? রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের নায়ক….

জনৈক নিরামিষ-ভোজী বন্ধুর প্রতি

‘‘নিরামিষ খেয়ে জীবন কাটালে কোনো ক্ষতি নেই। তবে শুধু নিরামিষ ভোজন মানুষের বায়ু-পথে প্রচুর গ্যাস, এবং হৃদয়ে অকারণ অহংকার সৃষ্টি করে।’’ (Sir Robert Hutchinson, in an address to the British Medical Association.) ব্যাঙ্ খায় পোকা, সাপ খায় ব্যাঙ্, সাপকে খায় আরো বড় সাপ, বড় সাপকে খায় নেকড়ের দল, নেকড়েকে মারতে পারে বনের রাজা সিংহ। সিংহকে….

সেলিম আল দীন

‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে… তাই তো বসে আছি, এ হার তোমায় পরাই যদি তবেই আমি বাঁচি।’ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে এক শিক্ষকের বাসায় শান্তিনিকেতন ফেরত এক নবীন গায়ক ‘এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’ গানটি গাইছিলেন। সবাই চোখ বুঁজে গান শুনছে, শুধু একজন শ্রোতা ক্রমাগত তার পিঠ চুলকাচ্ছে। আমি তখন নবীন যুবক, এমন কাঁচা বয়েসে এ….

error: Content is protected !!