Author Picture

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান এর একগুচ্ছ কবিতা

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

আমাকে যে নিতে এলে

ঘোরের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নেমে যাচ্ছি কোথাও
ঠিকানা জানি না, কোনো পরিচয় নেই আমার
পকেট হাতড়ে কবে থেকে খুঁজছি তেল জবজবে চুল,
লাঙ্গল, হালচাষের দুখানি গরু আর পোড় খাওয়া মাথাল…

আমাকে যে নিতে এলে, তোমার হাতখানা দেখি-
তোমার হাতে কি আছে পাটের গন্ধ, কাস্তের দাগ
তোমার গায়ে কি লেগে আছে কাদা, ধান আর
বৃষ্টি পড়ার শাব্দিক আখ্যান?

আমাকে যে নিতে এলে, তোমার মুখখানি দেখি-
তোমার চোখে কি আছে পূর্ণিমার চাঁদ
জোয়ার, ভাটা, গহীন গাঙের স্রোত…
তোমার ঠোঁটে কি আছে ডাল-ভাত, কাচামরিচের ক্ষেত
আছে কি মায়ের আঁচল, আদর, রোদ-মেঘের হাসি?

আমাকে যে নিতে এলে, তোমার হাত, মুখ আর চোখ দেখি
একবার মিলিয়ে নেবো রক্তের গন্ধ, কম্পন…
তবে এসো, বাড়িয়ে দাও হাত-
ফেরারী হবো আজন্ম, ফেনিল স্রোতে…


মিথ্যুক আবশ্যক

বিধিমোতাবেক একজন মিথ্যুক নিয়োগ করা হবে
বেজন্মার মতো যার কথা হবে জন্মপরিচয়হীন
যে নিয়ম করে অসংখ্য মিথ্যা বলবে রোজ রোজ
ছাই দেবে বিনম্র লোকের মুখে মুখে
মিথ্যের ভেলকিতে পাড়া মাৎ হবে
কুপোকাৎ হবে ভদ্র-সুধিজন,
শুয়োরের বাচ্চাতুল্য এমন একজন
খাঁটি মিথ্যুক জরুরি ভিত্তিতে আবশ্যক।

আগ্রহী মিথ্যুকগণ আবেদন করুন কুৎসিত ছবিসহ
খুব দ্রুত করুন, সময় যে খুব কম
বেতন নিয়ে ভাববেন না একদম
বিশ-ত্রিশ-চল্লিশ, হীরে-মুক্তো-মানিক যা প্রয়োজন
বাড়ি-গাড়ি মদ-বেশ্যা যার যা প্রয়োজন অকাতরে দেবো
বিনিময়ে আমি কেবল একজন জাতমিথ্যুক চাই
বেজন্মার মতো যার কথা হবে জন্মপরিচয়হীন…


বিলুপ্ত পুরুষ

একটি পাতার ওপর দাঁড়ালেই
ঘোর বৃষ্টি নামে সুঠাম শরীরে
ঝুম শব্দে কাঁপে নদী
দিগন্ত গিলে নেয় শ্বাস
জেগে ওঠে হন্তারক চোখ
হাঁটে লক্ষ্যহীন, উন্মত্ত ক্ষীপ্রতায়-
চারদিকে জমে আমারই মৃতদেহ!

যুগান্তর ডাক দিলে
একটি পাতার ওপর দাঁড়াতেই
প্রতিটি যুদ্ধ থামে
প্রতিটি নারী তখন ফলবতী
সংসারে- প্রতিটি সন্তান দুধে ও ভাতে!

আমি এক বিলুপ্ত পুরুষ
খুন করি নিজেরই শরীর
যুগান্তর-প্রতীক্ষায়…


কাছের বাঁশি

সমুদ্র কাছে এলে
আঁচল কেন দূরে রাখো মেয়ে
কি অত ভয়
কি বিস্ময়
ফেরি করে ফেরো অচেনা বন্দরে?

আমি তো প্রাচীন রাখাল
বাঁশি ফেলে দূরে
বেজে যাই তীব্র একা
প্রতিরাতে না-ফেরা ঘরে!

আমাকে কাছে রাখো চুড়ি, কপালের টিপ
অলসদুপুর রাখো, জলেভাসা দীপ
রাখো স্পর্শ-অনন্ত মদিরায়
রাখো আকণ্ঠ ডুবে যেতে যেতে
অতল গহীনে…

সমুদ্র কাছে এলে
ফিরে এসো মেয়ে, অনন্ত দহন রেখে…


সত্তার রঙ

বৃক্ষ থেকে উজ্জ্বল সবুজ
আর আসমান থেকে মেঘ মেখে
তোমার দুটি ঠোঁটের লজ্জা
অব্যর্থ কিছু দৃষ্টি নিয়ে
আঁকা হবে আজ অনন্ত চুমুক।

মানুষ এনেছে মাতাল রাত্রি
উৎসুক চোখে জ্যোৎস্নার সাজ
যেন ফিরেছে পিকাসোর তুলি
ফিরেছে ভিঞ্চি… এবং
আবার আঁকা হবে মোনালিসা!

বিভ্রম জগৎজুড়ে রঙের জলসা
আঁকি বছর, শতাব্দি, মহাকাল
আঁকি নিজের মুখ অকপটে
আঁকি মুখোশ, সেতার বাজনা…

অন্ধ যেমন চেনে না রঙ
চেনে না প্রভেদ, জ্যোৎস্নার তীর
অবুঝ মানুষ তেমনি ফেরে ঘরে
পড়ে থাকে রঙ এবং জীবন

তারপর সবুজ ফিরে বৃক্ষে, পাতায়
আসমানে ফেরে মেঘ
তোমার দুটি ঠোঁট তোমারই থাকে
উষ্ণতাবিহীন…।

শিল্পী নিহত হলে রঙ মুছে যায়
মুছে যায় জীবন, তীব্র চুমুক…।


পরিভ্রম

অফুরান অবসরে এক এক করে পাতা ঝরে যাচ্ছে
হাওয়ায় দুলছে অলস গল্প, আঙুল থেকে মুছে যাচ্ছে পিয়ানোর পরশ
আমি বসে আছি উদোম, কোনো এক গানে-
শুনে যাচ্ছি ঝাউবন, মায়া বন বিহারিণী…

চোখ পেতে দেখি উচ্ছল এক নদী ফিরছে বাড়ি
বৃক্ষের গায়ে লেগে আছে প্রগাঢ় চুম্বন
আলাদীন গোপন রাখে ইচ্ছের দৈত্য, সমস্ত জাদুবল
আমিও রই গোপনে…

পার হয়ে সিন্ধুনদী, হেঁটে যাই নগরীর কোণে
জনারণ্যের প্রাচীর ভেঙে একলা দাঁড়াই- একা!
কেউ নেই, চারপাশে চৈত্রের মলিন হাহাকার
একটু দূরে এক এক করে অবসরে পাতা ঝরে যায়
আর আঙুলে লেপ্টে থাকে পিয়ানোর পরশ…


আলাদিনের দুঃখ

ধীর-পায়ে যে রাত নেমে গেছে অনন্তে
তার পিছু হাঁটি সর্বত্র

আমি আর সেই গল্পের আলাদিন
প্রদীপ নিয়ে ঘুরি জলে-জঙ্গলে
মানুষ হৃদয়ে-
কাছে থাকি প্রতিটি মন্ত্রে
শুনি জাদুধ্বনি- ‘আদেশ করুন জাঁহাপনা!’

আমি আদেশ করতে পারি না
অগনিত শকুন খেয়ে নেয় চোখ
কুকুর স্বভাবে বাড়ে দাঁতাল মানুষ,
আর যান্ত্রিক চিৎকার…

ক্ষয়িষ্ণু মানুষ ছায়াশরীর হলে
আমি নীরব-নক্ষত্রে হারাই
আলাদিন ফেরে না গ্রামে!

আরো পড়তে পারেন

আদিত্য নজরুল-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রাচীর ~ পাশাপাশি দুটি বাড়ি; হিন্দু-মুসলমানের মাঝে গাঢ় মৌনতায় দাঁড়িয়ে একটি প্রাচীর তবু দুই বাড়ির বন্ধুত্ব বেশ। এ’বেলা, ও’বেলায় এ বাড়ির রান্না ও বাড়িতে যায়… মুসলিমের ছেলেরা খেলতে হিন্দুর বাড়িতে আসে। ধুলোবালি খেলতে খেলতে এ’বাড়ির ছেলেটির ও’বাড়ির মেয়েটির সাথে ভালোবাসা হয়ে গেলে দু’বাড়ির মাঝে পুনরায় ধর্মের প্রাচীর ওঠে। দু’বাড়ির ছেলে মেয়েরা এখন মিলেমিশে শত্রু শত্রু….

স্বয়ম্ভু, রাত্রিময়ূর অথবা নৈঃশব্দ্য…

স্বয়ম্ভু নারায়ণ তো সত্য। আবার সত্যনারায়ণ ! এই-ই বুঝি শব্দের শ্রী ৷ সন্ধ্যায় চলেছি দ্বিচক্রযানে, জানমান একাকার। পুজোর সওদা না করলেই নয় অথচ স্বয়ম্ভু, তুমি জান সত্যনারায়ণ। গৃহে ফিরে মুখপুথি— সে এক বিষম নেশা, শান দিলে তুমিও অগাধ। সেই যে অপেক্ষমাণ— একটি মূর্ধন্যের দিকে চিরায়ত হরিণ, হরিণ… কেন যে নিয়মবিধি, বানান গড়িয়ে যায় দিকচক্রবালে অথচ….

আবদুল্লাহ শুভ্র’র একগুচ্ছ কবিতা

কেউ দেখতে পায় না বহুদূর থেকে আমি একটু বিন্দু দেখতে পাই, বিন্দুটি একটু বড় হয়, হাঁটতে শুরু করে- বহুদূর থেকে আমি ‘হাঁটা’ দেখতে পাই! দেখতে পাই ‘হাঁটা’সহ কেউ একটি অবয়বে পরিণত হয়, বহুদূর থেকে আমি একটি অবয়ব দেখতে পাই, ক্রমেই আমার দিকে এগিয়ে আসে! বহুদূর থেকে আমি আমাকেই দেখতে পাই- দেখতে পাই অবয়বটি আমার ভেতর….

error: Content is protected !!