Author Picture

আইন প্রয়োগের রকমফের

একেএম শামসুদ্দিন

এখন থেকে প্রায় দু’মাস আগে গত ৫ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট এলাকায় অজ্ঞাত এক কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে গিয়ে ৩৪ জন মানুষের সলিল সমাধি হয়েছিল। সময় তখন পড়ন্ত বেলা, সূর্য পশ্চিম আকাশে প্রায় ডুবু ডুবু। লঞ্চ ডুবির সে মুহূর্তটি ঘটনাস্থলের নিকটস্থ একটি লবন কারখানার সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সে দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও’র সেই দৃশ্যে দেখা যায়, কার্গো জাহাজটি যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে আনুমানিক একশত থেকে ১৫০ মিটার পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় এবং নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা তৃতীয় সেতুর ১৬ নম্বর পিলারের কাছে গিয়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এতগুলো মানুষ পানিতে ডুবে গেলেও কার্গো জাহাজটি তাদের উদ্ধারের চেষ্টা না করেই নির্বিকারভাবে সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়। পালিয়ে যাবার তিন দিন পরও জাহাজটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ সময়ের মধ্যে জাহাজটিকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, গত ৮ এপ্রিল সারাদিন বন্দর থানায় ঘুরেও মামলা করতে পারেনি ডুবে যাওয়া লঞ্চের মালিক পক্ষ। আগের দিনও মামলা করতে গেলে থানা পুলিশ বেশ কয়েক ঘন্টা তাদের বসিয়ে রেখে ফিরিয়ে দেয়। পরেরদিন বুধবার পুনরায় বন্দর থানায় গেলে, পুলিশ তাদের নৌথানায় গিয়ে মামলা করার জন্য পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে। অতঃপর লঞ্চের মালিকপক্ষ নৌথানায় মামলা করতে যায়।কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। জানা যায়, লঞ্চের মালিক পক্ষকে ফিরিয়ে দিলেও বন্দরথানা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) স্ব-প্রণোদিত হয়ে দেওয়া মামলাটি গ্রহণ করে। মামলায় জাহাজের নাম নেই কেন জিজ্ঞেস করলে বিআইডব্লটির এক কর্মকর্তা খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বলেন, জাহাজের বডিতে কোনো নাম লেখা ছিল না বলে অজ্ঞাতনামা জাহাজের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অথচ ঘটনার পর থেকেই লঞ্চ মালিক সমিতি ও প্রত্যক্ষদর্শীরা কার্গো জাহাজটির প্রকৃত নাম ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ পূর্বক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করেন।

২০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এতগুলো মানুষ পানিতে ডুবে গেলেও কার্গো জাহাজটি তাদের উদ্ধারের চেষ্টা না করেই নির্বিকারভাবে সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়

মামলা হওয়ার পরও জাহাজটিকে জব্দ করা হচ্ছে না কেন জিজ্ঞেস করলে পুলিশ জানায়, হাজার টন ওজনের বিশাল এই কার্গো জাহাজটিকে নাকি তারা খুঁজে পাচ্ছেন না! খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্গো জাহাজটির মালিকানার সঙ্গে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। অনেকের ধারণা, এজন্যই হয়তো পুলিশ লঞ্চ মালিক পক্ষের মামলাটি নেয়নি এবং জাহাজটি খুঁজে বের করতেও তাদের তৎপর হতে দেখা যায়নি। লঞ্চ মালিক পক্ষ মামলা রুজু করতে গেলে থানার পুলিশ জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ যেহেতু ইতিমধ্যে মামলা করে ফেলেছে কাজেই একই ঘটনায় দুটো মামলা নেওয়ার নিয়ম নেই। পুলিশের এমন কথার প্রেক্ষিতে ধারণা করা হচ্ছে, দোষীদের বাঁচানোর জন্যই বিআইডব্লিউটিএ অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে আগেভাগেই মামলাটি করে ফেলেছে যাতে লঞ্চ মালিকপক্ষ বা অন্য কেউ জাহাজসহ জাহাজের মালিকের বিরুদ্ধে পুনরায় আর মামলা করতে না পারে। জানা গেছে, চলতি বছরের ১৮ মার্চ এই কার্গো জাহাজটিকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। তবে জাহাজটিকে নৌপথে চলাচলের জন্য সার্ভে অনুমোদন দেয়নি। কথা ছিল, সার্ভে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজটি ডকইয়ার্ডেই থাকবে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে অনুমোদন ছাড়া জাহাজ চালিয়ে তারা যে অপরাধ করেছে তাতে,তাদের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতার দাপটের কাছে বিআইডব্লিউটিএ কি মাথা নত করে থাকবে; না দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? তবে ভাল খবর এই যে,পুলিশ জাহাজটির কোনো হদিস না পেলেও কোস্টগার্ড গত ৮ এপ্রিল জাহাজসহ জাহাজের চালক ও অন্য ১৪ জনকে আটক করে। উল্লেখ্য,যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে ডুবিয়ে কার্গো জাহাজটি দ্রুত মুন্সিগন্জের গজারিয়ায় চলে যায় এবং সেখানে জাহাজের রং বদল করে গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের কাছাকাছি নোঙড় করে রাখে ।

জানা গেছে, কার্গো জাহাজটির মালিকানার সঙ্গে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। অনেকের ধারণা, এজন্যই হয়তো পুলিশ লঞ্চ মালিক পক্ষের মামলাটি নেয়নি এবং জাহাজটি খুঁজে বের করতেও তাদের তৎপর হতে দেখা যায়নি

একটি বিষয় লক্ষণীয়, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দেশের কিছু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইদানীং এমন স্বেচ্চাচারি আচরণ করছেন, যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা অসহায় হয়ে পড়েন। এসব কারণে,দেশের সাধারণ মানুষের ভেতর এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, ক্ষমতার উচ্চ পর্যায় থেকে এক ধরনের অন্যায্য আশকারা পাচ্ছেন বলেই সমাজের এসব চিহ্নিত ব্যক্তিরা এমন অমার্জিনীয় অপরাধ করেও ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। নিকট অতীতের দু’একটা ঘটনাই এর যথার্থতা প্রমাণ করে। এসব ঘটনা পর্যালাচনা করে দেখা গেছে, কথিত হেভিওয়েট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাই বিপদে পড়ে যান। যে কারণে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে তারা বেশ সতর্ক থাকেন। গত বছর ৭ মে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে সময়মতো না পাওয়ায় দেশের এক প্রথিতযশা ব্যবসায়ীর বনানীর ১১ নম্বর সড়কের বাসায় প্রায় সাড়ে ৭ ঘন্টা আটক রেখে একটি বেসরকারি ব্যাংকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে যে টর্চার করা হয়েছিল, তা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর দুই পুত্র ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গুলি করে হত্যারও চেষ্টা করেছিলেন। ঘটনার পর ১৯ মে বেসরকারি ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ কথিত দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় হত্যা চেষ্টার মামলা করে। মামলার পর অভিযুক্ত ভ্রাতৃদ্বয় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও যেভাবে দেশ ত্যাগ করেছিলেন তা যেন ভারতীয় হিন্দি এ্যাকশন মুভিকেও হার মানিয়েছে। দেশ ত্যাগের এই ঘটনা নিয়ে তখন দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। তাদের পালাবার সুযোগ করে দিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে তখন নানা রকম প্রশ্নও উঠেছিল। ঘটনার পর অভিযুক্তদের গ্রেফতারে পুলিশের গাফিলতি এবং অনীহা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিমানবন্দরের পুলিশ জানিয়েছিল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ না থাকায় আসামীরা পালিয়ে যাবার সময় তাদের গ্রেফতার করা হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যাচেষ্টার এমন চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের গ্রেফতারে কিংবা দেশত্যাগে বাঁধা দিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশ ছিল না কেন? আজ অবধি এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সকলের ধারণা, খুব বড় শক্ত পৃষ্টপোষকতা না পেলে হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিযুক্ত ভ্রাতৃদ্বয় এত সহজে দেশত্যাগ করতে পারেন না।

বিমানবন্দরের পুলিশ জানিয়েছিল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ না থাকায় আসামীরা পালিয়ে যাবার সময় তাদের গ্রেফতার করা হয়নি

এপ্রিলের শেষভাগে দেশের আরও একজন প্রচুর অর্থের মালিক বিখ্যাত আবাসন ব্যবসায়ীর পুত্রের কীর্তিকলাপ নিয়ে খবর হয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ীর চল্লিশ বছর বয়সী সেই পুত্রের বিরুদ্ধে তাঁর প্রায় অর্ধেক বয়সের এক কলেজ ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর পর কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির সঙ্গে ব্যবসায়ী পুত্রের সেল ফোন আলাপের রেকর্ড যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের আলাপনে আলোচিত সেই পুত্রের মুখের ভাষা শুনেছেন? এই ব্যক্তি একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ীর পুত্র, তিনি নিজেও ওই বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তাঁর মুখের নোংরা, কুৎসিত এবং এমন অরুচিকর ভাষা শুনে সভ্য সমাজের মানুষ নিশ্চয়ই মর্মাহত হয়েছেন। তাদের এই আবাসন ব্যবসা নিয়েও সমাজে অনেক গল্প চালু আছে। কথিত আবাসিক এলাকাটি যে জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেই জায়গার আদি মালিকদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার মেইন গেইটে যাওয়ার জন্য যে রাস্তাটি আছে, সেই রাস্তাটির দখল ঠেকাতে কথিত ব্যবসায়ীর লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে নাকি ওই এলাকার ২২ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের ভাষায়, মাটিতে একটু কান পাতলে তাঁরা আজও হাজার হাজার আদি জমির মালিকের আহাজারি শুনতে পান। আত্মহত্যার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী পুত্রের বিষয়ে মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে রাখঢাকের চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে সমাজের অনেক মানুষই মনে করেন, কলেজ পড়ুয়া নিহত সেই মেয়েটির হাহাকার হয়তো, কথিত আবাসিক এলাকার আদি জমির মালিকদের হাহাকারের মতোই একদিন শূন্যে মিলিয়ে যাবে। অভিযুক্ত এই ব্যক্তির আরেক ভাই ২০০৬ সালে প্রেম ঘটিত অন্য একটি ঘটনায় তাদেরই প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন্সের একজন পরিচালক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশ ছাড়া হন। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর উল্লিখিত হত্যামামলায় খালাস পেলে দীর্ঘদিন পর ২০১১ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন বলে জানা যায়।

মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে রাখঢাকের চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে সমাজের অনেক মানুষই মনে করেন, কলেজ পড়ুয়া নিহত সেই মেয়েটির হাহাকার হয়তো, কথিত আবাসিক এলাকার আদি জমির মালিকদের হাহাকারের মতোই একদিন শূন্যে মিলিয়ে যাবে

প্রভাবশালী মহলের এসব কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া কেন এত সহজ নয় তা বুঝতে মাথা খাটানোর প্রয়োজন নেই।। মানুষ মনে করেন, প্রভাবশালী লোকেরা ক্ষমতার উচ্চ পর্যায় থেকে এক ধরনের দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন। এ কারণেই বড় বড় অন্যায় কাজ করেও তারা পার পেয়ে যান। আমরা যতই বলি না কেন দেশে আইনের শাসন চালু আছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে অথবা আইন সবার জন্য সমান; কথাগুলো বোধ হয় সবার জন্য খাটে না। শুনতে ভাল না লাগলেও বাস্তব সত্য হলো, আইনের চোখে এখন আর সবাই সমান নয়। তা না হলে ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় হলমার্কের চেয়ারম্যান ও এমডি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেও বেসিক ব্যাংকের শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালেই বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলেও তিনি দেশ ত্যাগ করার সুযোগ পান কি করে? ‘দূর্নীতি দমন’ করা যাদের কাজ, সেই সংস্থাই বা কেন চার বছর অনুসন্ধানের পর ব্যাংকের ২৬ জন কর্মকর্তাসহ ১৫৬ জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করলেও বাচ্চুর বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত (সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাল) ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পায় না কেন? এ বিষয় নিয়ে যখন তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন সংস্থাটি নড়েচড়ে বসে এবং ব্যবস্থা নেবো- নিচ্ছি বলে মুখ রক্ষার চেষ্টা করে। আইন সবার জন্য সমভাবে প্রয়োগ হয় না বলেই মুখ চেনা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার খবর আমরা পাই না। এসব নিয়ে যখন সমালোচনা হয়, মিডিয়ায় বা সরাসরি কোনো প্রশ্নের যখন জবাব দিতে হয়, তখন লক্ষ করে দেখেছি সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিংবা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যরা কতটা চাপের মধ্যে থাকেন। মনে হয়, উত্তর জানা থাকলেও সরাসরি সে উত্তর দেওয়ার তাদের সুযোগ নেই। তাদের হাত এক অদৃশ্য শক্তি বলয়ের কাছে বাঁধা তা তাদের মুখের এবং শারীরের ভাষাই বলে দেয়।

আমরা যতই বলি না কেন দেশে আইনের শাসন চালু আছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে অথবা আইন সবার জন্য সমান; কথাগুলো বোধ হয় সবার জন্য খাটে না

হেভিওয়েট ব্যক্তিদের এসব কার্যকলাপ নিয়ে কথা বলাও এখন মুশকিল। বিবেকের তাড়নায় যদি কেউ কিছু বলার চেষ্টা করেন তাহলেও বিপদ। তারা এমনই নক্ষত্র দূরত্বের লোক যে তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছু বলতে গেলে সাত-পাঁচ ভেবে তারপর বলতে হয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, অপরাধীকে অপরাধী বলা যাবে; তবে সব অপরাধীকে নয়। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল, দেশের প্রথম কুমির চাষি মোস্তাক অথবা সাংবাদিক রোজিনারা এটা আত্মস্থ করতে পারেননি বলেই হয়তো প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে দেশের এমন অনেক সত্যান্বেষী কাজল ও রোজিনারা এমনই দুর্ভোগ্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আইন সবার জন্য সমান’ বলা থাকলেও বর্তমানে এর প্রয়োগের রকমফের দেখে দেশের মানুষ দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। আইন কার ওপর কতটুকু প্রয়োগ হবে তা অনেকটা নির্ভর করে রাজনৈতিক আনুগত্য ও কার কত অর্থশক্তি আছে তার ওপর। কার্গো জাহাজের মালিক পক্ষ অথবা কথিত ব্যবসায়ী পুত্রদের যে পরিচয় আমরা পেয়েছি তাতে আইন প্রয়োগের যে হেরফের হবে তা অনুমান করাই যায়। এই অনুমান যে মিথ্যা নয় তাঁর কিছু ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই আমরা পেয়েছি। এই বিষয়টি নিয়ে হয়তো খুব বেশি উচ্চবাচ্যও হবে না। আগামীতে হয়তো দেখবো, শীতলক্ষ্যায় যে ৩৪ জন হতভাগ্যের সলিল সমাধি হয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্য অথবা কুমিল্লার সেই কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির ভাই-বোনেরা আইনের দরজায় ঘুরে ঘুরে কড়া নেড়ে যাচ্ছেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে হয়তো সে দরজা খুলবে। তা না হলে, এসব মর্মান্তিক ঘটনা কিছুদিন হয়তো আলোচনায় থাকবে এবং তারপর ধীরে ধীরে অন্য আরও পাঁচটি ঘটনার মতোই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাবে।

আরো পড়তে পারেন

আপনি কীভাবে আছেন?

অস্তিত্বের প্রকৃত/সত্য বোধ বা উপলব্ধি ছাড়াও এই যে আমাদের থাকা এই বিষয়টাকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা দরকার। Being/ সত্তা বা অস্তিত্বের প্রশ্নটি চিন্তার জগতে কিভাবে এড্রেস করা হয়েছে সেই দিকটির হদিস করলেই আমরা খুব সহজে এই আলাপে প্রবেশ করতে পারবো। অস্তিত্ববাদী দর্শনের ইতিহাস ধরে আলাপ করলে লম্বা আলাপে প্রবেশ করতে হবে। সংক্ষেপে এই আলাপটি আমরা….

আপনি আছেন তো?

কোন কোন কালে ব্যক্তি মানুষ বা গোটা জাতির জীবনে এমন সময় আসে যখন সে বা তারা আর বুঝতে পারে না প্রকৃতই তার অস্তিত্ব বিরাজমান আছে কি না? আমাদের গোটা জাতির জীবনে এখন যেরকম সময় বিরাজ করছে তাতে আমাদের দেশের মানুষ আদৌ অস্তিত্ববান কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে। আমরা কি বিরাজ করি? আমাদের কি কোন অস্তিত্ব আছে?….

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি – পর্ব-২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই করেনি। বিরোধিতাকারীদের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গও ছিলেন। এই বিরোধিতায় চার ধরনের মতবাদ পরিলক্ষিত হয়: এক। পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমান–তারা মনে করেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কোনো লাভ হবে না। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদেরই লাভ হবে। দুই। পূর্ববঙ্গের কিছু মুসলমান মনে করেছিলেন, এই অঞ্চলের খুব অল্প সংখ্যক ছাত্রই স্কুল….

error: Content is protected !!