Author Picture

প্রেমের বুলি

খন্দকার রেজাউল করিম

একজন তরুণ প্রেমিক। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোর দল বানের জলের মতো রক্তে ঢেলে দিচ্ছে ডোপামিন, সিরোটোনিন, অক্সিটোসিন, টেসটোস্টেরন জাতীয় প্রেমের হরমোন। কপালগুণে জুটেছে ভালোবাসার জন- তাকে জানাতে হবে তোলপাড় হৃদয়ের কথা। কিন্তু কেমন করে? প্রেমের হরমন সবাইকে অল্প সময়ের জন্য লাইলী বা মজনু বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মুখে প্রেমের বুলি জোটাতে পারে না। মনভোলানো প্রেমের বুলিতে নজরুল-রবীন্দ্রনাথের জুড়ি নেই, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোপায় তারার ফুল’, ‘তব অধর এঁকেছি সুধাবিষে মিশে মম সুখদুখ ভাঙিয়া।’ সবাইকে যে এমন শান্তিনিকেতনী ঢঙে প্রেম নিবেদন করতে হবে এমন নয়। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘শবনম’ উপন্যাসের নায়ক কথা খুঁজে না পেয়ে পকেট থেকে একটি লেবু বের করে প্রেমিকার হাতে গছিয়ে দিয়েছিলেন। তাতেই কাজ হয়েছিল !
‘Thou art to me a delicious torment’- ভালোবাসার জনকে বলেছিলেন কবি রালফ এমার্সন- ইরানের প্রেমিক কবি হাফেজের প্রভাব পড়েছিল এই মার্কিন কবি এবং রবীন্দ্রনাথের উপরে। তবে বেশীর ভাগ কবি শুদ্ধ বিমূর্ত ভাষায় প্রেমের বুলি লেখেন। সাধারনজনের উপায় কি?
অনেক বছর আগে বাংলাদেশ টিভিতে কলকাতার দুই সাহিত্যিকের সাথে আহমদ শরীফের তর্ক-যুদ্ধ উপভোগ করেছিলাম। শুদ্ধ ভাষায় প্রেমের বুলির প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছিলেন এই দুই প্রেম-বিশেষজ্ঞ অতিথি। তাঁদের মতে ‘অশুদ্ধ ভাষা রস-গ্রহনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।’ আমাদের- বাঙালদের- প্রতি সামান্য কটাক্ষ ছিল বোধহয়। এতে প্রায় ক্ষিপ্ত আহমদ শরীফ ‘বাঙাল’ ভাষায় কথা বলা শুরু করেছিলেন। আমিও এ বিষয়ে অতিথীদ্বয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করি।

আরেক বন্ধু কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতো। ও প কে ফ বলতো আর ফ কে প। যেমন ফলিত পদার্থবিদ্যা ওর ভাষায় হয়ে গেল পলিত ফদার্থবিদ্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে ক্রমাগত প্রেমে পড়তো, এই প-ফ বিভ্রাট তার প্রেমিক হৃদয়ের বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি

গ্রামে-গঞ্জে ছেলেমেয়েরা আঞ্চলিক ভাষায় প্রেম নিবেদন করছে, শান্তিনিকেতনের মতন সেখানেও প্রেমের বন্যা কিছু কম বইছে না। বাংলার লোক-গীতির কন্যারা সব গাঙ্গে ডুইব্যা মরলো কোন জ্বালায়? তবে খাঁচার পাখি আর বনের পাখির মতো দুজনে দুই ভাষায় কথা বললে বিপদ হতে পারে।
‘মন দুপুক দুপুক করে রে, তর লাগি উতলা রে,
তর সংগ-লই ঘূর ঘূর করুম এই বাসনা প্রানে।…
সাধের পিরতিমা গইড়া রাখুম চোখের তারাটায়,
রানী হইয়া রইবি মোর এই হু-হু পরানটায়।’
অথবা
‘আমি নারী পাগলিনী বন্ধুরে তুমি গলার মালা।
তিলেক মাত্র না দেখিলে হইরে পাগলিনী
পিঞ্জরায় বাইন্ধ্যা রাখছে পাগলা পক্ষিণী।
ফুল যদি হইতারে বন্ধু ফুল হইতে তুমি
কেশেতে ছাপাই রাখতাম ঝইড়িয়া বানাতাম বেণী।’
(মৈয়মনসিংহ গীতিকা, মহুয়া সুন্দরী)
এসব শুদ্ধ বাংলায় লেখা নয়। আঞ্চলিক ভাষায় সাধারণ মানুষের মুখে সাধারণ মানুষের প্রেমের বুলি- অবদমিত বাসনার সহজ সংকোচহীন প্রকাশ। ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’, নিরক্ষর মুনশী মিয়ার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে হতে পারে, কিন্তু আঞ্চলিক ভাষায় মেশানো এইসব ছড়া-গান থেকে একজন মহাপন্ডিত রস-গ্রহণ করতে পারবেন না- সেটা দেমাগের কথা- গ্রহনযোগ্য নয়।
আমার ছোটবেলার এক সহপাঠি রাজশাহীর শহুরে ভাষায় কথা বলে। বহুদিন পরে হঠাৎ দেখা ঢাকার রাস্তায়। ধরে নিয়ে এলাম। গভীর রাতে পূর্নিমার চাঁদ যখন ছাত্রাবাসের পুকুরের জলে ভাসছে, সে শোনালো তার ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী : অনেক দিন দেখা হয় নি। প্রেমিকার বাড়িতে গেছে কি এক ছুঁতায়। বাসায় কেউ নেই। বন্ধু জানালো তার হৃদয়ের আকুতি, ‘তুকে দেখে মুনে হছে ঈদের চান্দ দেখছি। একটু চ্যাঁড়া দেখিতো, মুটা হইছিস কি না!’ প্রেমিকাকে একেবারে মাটি থেকে উত্তোলন করে তার ওজন বোঝার প্রয়াস ঠিক প্রেমের বুলির মধ্যে পড়ে কি না জানিনা। তবে রবীন্দ্রনাথের কাছেই শুনেছি, ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর।’ মেয়েটি এই প্রস্তাবে রাজী হয় নি, তাদের প্রেমও আর বেশিদূর গড়ায় নি।
আমার আরেক বন্ধু কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতো। ও প কে ফ বলতো আর ফ কে প। যেমন ফলিত পদার্থবিদ্যা ওর ভাষায় হয়ে গেল পলিত ফদার্থবিদ্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে ক্রমাগত প্রেমে পড়তো, এই প-ফ বিভ্রাট তার প্রেমিক হৃদয়ের বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। মনে পড়ে একটা গান সে মাঝে মাঝেই গাইতো:
ফ্রেমবতী রে আর ফ্রেম কইরো না,
ফ্রেমে তোমার রুই কাতলা আর ধরা ফড়বো না।
কোয়ান্টাম জগতে প্রেমের খেলা আরো জটিল। প্রেমিককে যদি কাছে পেতে চাও তবে তার মনের কথা জানতে চেও না, নিজের মনের কথা বলতে যেও না, কোনো প্রশ্ন করো না, দুজনে চুপটি করে বসে থাকো। ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়। যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে।’ না, তাকে সে কথা আর বলে কাজ নেই। একটি শব্দ করলেই প্রেমিক একহাত দূরে যেয়ে বসবে, বেশী কথা বললে তাকে আর খুঁজেই পাবে না। মেয়েদের হয়তোবা বেশী অসুবিধে হবে!
কোয়ান্টাম জগতে জানার একটা সীমা আছে। আছে অনিশ্চয়তার দ্বন্দ্ব। অবস্থান জানতে গেলে মনের কথা আর জানা হবে না, মনের কথা জানতে চাইলে সে যাবে হারিয়ে। ‘তোমার কাছে আসলে আমি নিশ্বাস নিতে ভুলে যাই। যা বলার ছিল তার ভাষা পাই নে খুঁজে। চুপ করে বসে থাকি। মনে আশা, চোখ দুটি আমার মনের কথা বলবে।’ এই প্রেমিককে হয়তোবা মরণ দশায় ধরেছে- তবে সে কোয়ান্টাম রাজ্যের যোগ্য প্রেমিক!

আরো পড়তে পারেন

ত্রিভুজ প্রেমের মামলা

সাদা মানুষ, কালো মানুষ আমেরিকায় সাদা মানুষ এবং কালো মানুষ কখন সবচেয়ে বেশি আলাদা হয়ে পড়ে? রবিবার সকাল নয়টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত। আমেরিকার প্রাপ্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সাদা-কালো সম্প্রীতির আলোচনা করতে গিয়ে এই মর্মান্তিক সত্যটা ফাঁস করে দিয়েছিলেন, ‘most segregated hour of American life occurs on Sunday morning!’ কি হয় তখন? প্রার্থনা। প্রতিটি গির্জায়….

ত্রিভুজ প্রেমের মামলা

কালো ধোঁয়া   ‘আর যদি দ্যাখোম, আর যদি শুনম, অন্য জনের সাথে কথা, এ হেন যৌবন সাগরে ভাসাবো, পাষাণে ভাঙিব মাথা।’ সেই ‘হটাৎ দেখার’ পর প্রতি রবিবার বিকালে বেসবল ক্যাম্পে সুজানের সাথে কেভিনের দেখা হয়। আর সব মায়ের মতো সুজান দর্শকের গ্যালারিতে বসে থাকে। জেসি একটা রান করলে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়, হাততালি দেয়। রবিবারের….

ত্রিভুজ প্রেমের মামলা

যে ছিল আমার স্বপনচারিনী   ‘I had a dream the other night, when everything was still; I thought I saw Susanna dear, coming down the hill.’ সুজান ছিল তার স্বপনচারিনী। সে যে কারো জায়া বা জননী, এমন সম্ভবনার কথা কেভিন স্বপ্নেও ভাবে নি। সুজানকে দেখে অল্পবয়েসী তরুণী মনে হয়েছিল। একটু আগে কেভিনের ফ্যাকাসে মুখের দিকে….

error: Content is protected !!