Author Picture

ইথিওপিয়ার শরণার্থী শিবির ও বিভ্রান্ত নারী

মঈনুস সুলতান

দিন কয়েক হলো আমি ইথিওপিয়ার দানাকিল ডেজার্টে ভ্রমণ করছি। বেজায় রুকুসুকু এ মরুভূমির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০২ ফুট নিচে, তাপমাত্রাও পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। আমি উঠেছি গালগামোশ সরাই নামে একটি গেস্টহাউজে। এ যাত্রায় আমার পরিকল্পনা হচ্ছে, অ্যারতা অ্যালে নামে একটি আগুনের লেলিহান শিখা বিচ্ছুরিত আগ্নেয়গিরিতে যাওয়া। ওখানে যেতে হলে বিশেষ রকমের প্রস্তুতি নিতে হয়, পার্মিশন নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে। এসব সম্পন্ন করতে আরো দিন চারেক লেগে যাবে। তাই আজ আমি ডেজার্টে বিপন্ন হালতে বসবাস করা আফার সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের দুটি শিবির দেখার উদ্যোগ নিয়েছি। আমার সঙ্গে চলেছেন জিব্রাল্টার থেকে আগত একজন ব্রিটিশ অ্যানথ্রোপলিস্ট ডারোথি ও আমেরিকার যুগল-পর্যটক, অসম বয়সি দম্পতি জিম ও ক্যারোল। এলাকাটিতে সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রচুর, মরুভূমিতে আফার সম্প্রদায়ে সশস্ত্র গেরিলাদের উপস্থিতি আছে। তাইআমাদের পর্যটন গাইড মুলাগেটা নাগাসি এ মুহূর্তে সেনা শিবিরে গেছেনÑ ভ্রমণের অনুমতি নিতে, তিনি ভাড়া করে চারজন সুরক্ষা সৈনিকও নিয়ে আসবেন বলে কথা দিয়েছেন। আমি ভোর-বিহানে সরাইখানার উঠানে কাঁটা গাছের তলায় একটি চারপাইয়ে বসে- সহযাত্রীদের সঙ্গে গাইড নাগাসির অপেক্ষা করছি।

ঘণ্টা খানেক অপেক্ষার পর গাইড নাগাসি অনুমতি নিয়ে ফিরে আসেন। তারপর গালগামোশ সরাই থেকে বেরিয়ে পড়তে ঝুটঝামেলা কিছু হয় না। নাগাসি দু’খানা গাড়ির বন্দোবস্ত করেছেন। তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক ল্যান্ড ক্রুজারে চলেছি আমরা চার পর্যটক, পেছনের পিকআপ ট্রাকে কালাশনিকভ রাইফেল কাঁধে বসেছেন সমসংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী। নাগাসি এদের দিনওয়ারি রাহাখরচের কড়ারে সেনাছাউনি থেকে ধরে নিয়ে এসেছেন। শরণার্থী শিবির দুটি গেস্টহাউজ থেকে খুব একটা দূরে না, তবে বিরান মরুভূমিতে নাকি আফার গোত্রের গুপ্ত গেরিলারা আওয়ারা ঘুরপাক করে, এদের বেপরোয়া ক্রসফায়ারে কোনো পর্যটক আজ অব্দি খুনজখম হননি বটে, তবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন অনেকেই। এ ঝুঁকির প্রতিষেধক হিসেবে সৈনিকরা আমাদের সফরসঙ্গী হয়েছেন।

গলি পেরিয়ে বাজারে এসেই গাড়ি দুটি ব্রেক কষে। জানতে পারি, আমাদের যাত্রাসঙ্গী হওয়ার কারণে চার সৈনিক সেনাছাউনিতে পরিবেশিত লাঞ্চ খাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন, তাই তারা বাজার থেকে শুকনো খাবার ও ওয়াটার বটল কিনে নিতে চান। ততক্ষণে আমরা সবাই নেমে পড়েছি গাড়ি থেকে। আমাদের সহযাত্রী ডারোথি এগিয়ে গিয়ে হাবিলদারের হাতে তুলে দেন কয়েকখানাইথিওপিয়ান কারেন্সি বির, তারা বুটজুতায় খটাখট শব্দ তুলে তাকে স্যালুট জানিয়ে খাবার কিনতে যায়।

মুরব্বি গোছের রাখাল ও ছাগলের পাল

ফুটপাতে দাঁড়িয়ে জটলা করতে গিয়ে একটা বিষয় খেয়াল করি, শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার অসিলায় আমার সফরসঙ্গীরা সবাই মনে হয় বেশ জাঁক করে পোশাক-আশাক পরেছেন। গাইড নাগাসি গতরে জড়িয়েছেন সফেদ চাদর। শক্তপোক্ত লাঠি হাতে মানুষটির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তিনি যেন মহররমের মেলায় প্রদর্শন করবেন লাঠিখেলার কসরৎ। সাজসজ্জায় জিম ও তার বয়োজ্যেষ্ঠ পত্নী ক্যারোল অবস্থান করছেন পরস্পরের বিপরীত মার্গে। অনেকগুলো জিপারওয়ালা পকেটের ওয়ান-পিস অভারঅলজাতীয় লেবাস পরায় জিমকে দেখাচ্ছে হেলিকপ্টার পাইলটের মতো। তার স্ত্রী ক্যারোল মুখমাখা হেজাবের মতো করে পেঁচিয়েছেন স্কার্ফে। আফার সম্প্রদায়ের মানুষজন ধর্মে মুসলমান, তবে তাদের সংস্কৃতিতে আফ্রিকান অ্যানিমিস্ট ধারার প্রকৃতি-নিবিড় আচার-আচরণ খুবই প্রকট। আফার পুরুষরা সুযোগ পেলে একাধিক বিবাহ করে বটে, কিন্তু নারীদের পর্দানশীন কোনো উদ্যোগ নেয় না। হিজাবের প্রচলন তাদের মধ্যে বিরল, মরুভূমির উষর প্রতিবেশে তারা বক্ষেও বিশেষ কোনো বস্ত্র পরিধান করে না।

সৈনিকরা শুকনো খাবার কিনতে বিস্তর সময় নিচ্ছে। ক্যারোল অধৈর্য হয়ে কাপড়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে বলেন,‘আই অ্যাম গোয়িং টু সি ইফ আই কুড বাই আ পিস অব কালচারেলি অ্যাপ্রোপ্রিয়েট ক্লথ, আই লাইক টু কাভার দ্য আপার পার্ট অব মাই বডি।’ তিনি দোকানের কাছাকাছি পৌঁছে ঝুলন্ত কাপড়ের দিকে যে রকম আকুল হয়ে তাকান, মনে হয়, মহিলা মওকা পেলে বোরকা কিনে নিজের তাবৎ গতরকে অন্তরীণ করবেন পর্দান্তরে। আমারও বেচইন লাগে। চারদিকে তাকিয়ে ফুটপাতসংলগ্ন একটি চাটের দোকান দেখতে পেয়ে আমি ইশারায় ডারোথিকে কাছে ডাকি। উনি খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ফকফকে সাদা গেঞ্জির সঙ্গে লুঙ্গি পরা এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে বাতচিত করছেন। আমাকে ইশারায় ডারোথি অপেক্ষা করতে বলেন।

জিব্রাল্টার থেকে আসা এ অ্যানথ্রোপলজিস্ট নারী ইথিওপিয়ার মেনস্ট্রিমের ভাষা আহমারিক ভালোই বলতে পারেন। আফার সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা আছে, তবে ইথিওপিয়ায় বাসরত আফার গোত্রের অনেকেই আহরামিক জানে কম-বেশি। উপরন্তু ডারোথি আফারদের ভাষার কিছু শব্দ জানেন, কতগুলো স্ট্যান্ডার্ড বাক্যও তিনি জবানি করে নিয়েছেন। চাটের দোকানে পণ্য কিনতে গিয়ে লেনদেন জটিল হতে পারে, তাই আমি ডারোথির ওপর ভরসা করছি। চাট হচ্ছে আমাদের খাসিয়া পানের মতো এক ধরনের পাতা। এগুলো মুখে পুরে কিছুক্ষণ চিবালে ভাজা মৌরির সঙ্গে বাবা জর্দা মিশিয়ে পান খাওয়ার মতো মৌতাত হয়। আফার সম্প্রদায়ের অনেকে পছন্দ করে- চুইংগামের কায়দায় ক্রমাগত চাট চিবানো। গ্রামের গোত্রপতিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতে চাট উপহার দেয়ার রেওয়াজ আছে।

ট্যুর গাইড নাগাসি (বায়ে), আফার তরুণের কোমরে গোঁজা সনাতনী ছুরিকা

আফার যুবকটিকে সঙ্গে করে কাছে এসে ডারোথি বলেন,‘বাইং সাম চাট ইজ আ কুল আইডিয়া, লেটস গো অ্যান্ড হিট দ্য শপ।’ আমি দোকানে ঢুকতে ঢুকতে তরুণটিকে আড়চোখে নজর করে দেখি। তার আফ্রো কেতার বাবরি চুল চেয়ে দেখার মতো। কোমরবন্ধেও সে ঝুলিয়েছে ছোটখাটো তলোয়ারের মতো দেখতে জাইল বা বাঁকানো ছুরিকা। দোকানের মেঝেতে বসে জনা তিনেক দোকানদার আঁটি আঁটি চাট-পাতা পয়পরিষ্কার করছেন। ডারোথি আহমারিক জবানে তাদের ‘সুহলাম’ বা ‘হ্যালো’ আওয়াজ দিয়ে মিঠে করে হেসে বলে ওঠেন,‘ইন ডেত নহ হি’ বা ‘হাউ আর ইউ?’ তার ভাষাজ্ঞানে ইমপ্রেসড হয়ে এক দোকানি দাঁতপড়া মুখে হে হে করে তার হাতে স্যাম্পল হিসেবে তুলে দেন একগুচ্ছ তাজা চাট। ডারোথি একটি পাতা মুখে ফেলে বাকিটুকু ছেলেটির হাতে তুলে দিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন,‘ফো টো লা নুহ সাহ’ বা ‘ক্যান আই টেক ইয়োর পিকচার?’ যুবক এমন মুগ্ধ হয়ে ডারোথির দিকে তাকায় যে, মনে হয়, তিনি বিবাহের প্রস্তাব করলে তরুণটি তৎক্ষণাৎ এজিন দিয়ে বলবে কবুল। ডারোথি তাকে দোকানের কাদামাটির দেয়ালে দাঁড় করিয়ে ফটাফট ক্যামেরার শাটার টেপেন। আমার যেখানে বিদেশ-বিভুঁইয়ে উটের ছবি তুলতে হাঁটু কাঁপে, সে তুলনায় পরদেশি পরিবেশে ডারোথির আলট্রা স্মার্টনেস ঈর্ষার বিষয় হয়ে ওঠে। একটু বেখেয়াল হয়েছিলাম, দেখি চাটের তিন দোকানি তাদের চোখ বোলতার মতো ঘুরিয়ে একবার আমার ও অন্যবার ডারোথির আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। আমি দুটি শরণার্থী শিবিরের দুজন মুরব্বির জন্য চাটের জোড়া আঁটি কিনি। ডারোথি ছবি তুলে ছেলেটির মুঠোয় টিপসের কড়ি ধরিয়ে দিয়ে বসে পড়েন মেঝেতে। তিনি গুনে-বেছে বড়সড় এক আঁটি চাট কিনে নেন চার সৈনিকের জন্য। ভাবি- এ যাত্রায় চাট চিবানোর নেশায় ব্যাটারা ঝিমিয়ে পড়লে খারাপ হয় না, এতে গুপ্ত গেরিলাদের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ রূপে তিরোহিত হয়।

আমাদের গাড়ি দুটি ফের স্টার্ট নেয় শরণার্থী শিবিরের গন্তব্যে। পয়লাবারের মতো পরদেশ সফরে আসা জিম ও ক্যারোল দম্পতি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন হরেক রকমের যন্ত্রপাতি। এ আত্রাফে সেলফোনের সিগন্যাল পাওয়া যাবে না, এটা জানতে পেরে তারা একজোড়া ওয়াকিটকি ব্যাকপ্যাকে নিয়ে ঘুরছেন। পেছনের পিকআপে সৈনিকদের সঙ্গে বসা গাইড নাগাসি যাতে বিচ্ছিন্ন না হন, সে কারণেক্যারোল তার হাতে একটি ওয়াকিটকি তুলে দিয়েছেন। গাড়ি ট্রেডিং পোস্ট ছাড়িয়ে পাথর ছড়ানো মরুভূমিতে বালুকা ছিটিয়ে আগ বাড়ছে। সিঁটিয়ে বসে থাকা ক্যারোলের হাতে ওয়াকিটকি বিচিত্র শব্দে সরগরম হয়ে ওঠে। ভেসে আসে নাগাসির কণ্ঠস্বর। ক্যারোল জানতে চান, এর আগে কোনো পর্যটক গ্রুপ এ পথে পরিভ্রমণ করতে গিয়ে কিডন্যাপ হয়েছে কিনা? হবে না কেন, মাস ছয়েক আগে ইতালিয়ান পর্যটকদের একটি ছোট্ট দল মরুভূমিতে স্রেফে গায়েব হয়ে যায়। মরুপাহাড়ের একটি জলপ্রপাতে তারা মেলা দিয়েছিল, কিন্তু পৌঁছতে পারেনি। পথে নাকি গুপ্ত গেরিলারা তাদের অ্যামবুশ করেছিল। ক্যারোল জানতে চান,‘পর্যটকরা নিহত হয়েছিল কী?’ জবাব আসে, ‘না, গেরিলারা তাদের সঙ্গে খুব ভালো সলুক করেছে। দুম্বার ঝলসানো গোশত ও উটনীর দধি দিয়ে আপ্যায়ন করেছে।’ পরবর্তী প্রশ্ন হয়,‘তাদের রিলিজ হলো কীভাবে?’ নাগাসি আশ্বস্ত করে জানান, ‘তেমন কোনো সমস্যা হয়নি, সামান্য টাকা-পয়সার বিনিময়ে গেরিলারা পর্যটকদের গার্ড অব অনার দিয়ে বাজার অব্দি পৌঁছে দেয়।’ ওয়াকিটকিতে বিকট আওয়াজে ক্র্যাকলিং সাউন্ড হতে থাকে। ক্যারোল বিরক্ত হয়ে তা অফ করে দিয়ে টিপে ধরেন তার কপালের দু-পাশে দপদপানো শিরা।

রক-ওয়ালে বসা মোড়ল হুরমুশ

খয়েরি পাথরের এক খটখটে প্রান্তরে এসে আমাদের ল্যান্ড ক্রুজারটি ব্রেক কষে। বয়স্ক রাখালরা তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছাগলের পাল। সংখ্যায় তারা বেশুমার। গাড়ির আওয়াজে নাকি ছাগলরা নার্ভাস হয়ে দিগি¦দিকে ছোটে। আমাদের ড্রাইভার দুজন এ সমস্যাটি অ্যাভয়েড করার জন্য ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করেন। হাত-পায়ের খিল ছোটাতে আমরাও নেমে পড়ি। পেছন থেকে তূলনামূলকভাবে ছোট্ট একটি ছাগলের পাল নিয়ে এগিয়ে আসেন মুরব্বি গোছের দুই রাখাল। সালাম-আলেক দিয়ে হাত নাড়ি। তারাও থেমে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে চাট-পাতা চিবিয়ে ঝিমানো সৈনিকরা ধড়মড় করে যেন জেগে উঠে রাইফেল কাঁধে নিয়ে তাক করে। আমরা সবাই হাত তুলে তাদের শান্ত থাকতে ইশারা দেই। মনে মনে বলি, বাপুরা, আরেক গুচ্ছ চাট চিবিয়ে তোমরা বরং ঝিমাও। খামোকা বন্দুকবাজি করে ঝামেলা পাকাবে না। জিম এগিয়ে গিয়ে বয়স্ক রাখালদের ছাগলসুদ্ধ ছবি তোলেন। তারা কপালে হাত দিয়ে হেলিকপ্টার পাইলটদের মতো ওয়ান-পিস অভারঅল পরা জিমকে দেখে। একজন রাখাল ইশারায় পানি পান করতে চান। ক্যারোল তাদের হাতে দুটি ওয়াটার বোটল তুলে দেন। মাত্র কয়েকটি চাট-পাতা চিবিয়েছেন ডারোথি। তাকেও ঢুলু ঢুলু দেখায়। তিনি কাছে এসে জিমকে দেখিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন,‘বেশভূষা দেখে ছাগলওয়ালা তাকে আগল কিংবা পাগল ভাবতে পারে, তবে অপহরণের যোগ্য বিবেচনা করবে না।’ অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাঠখোট্টা গবেষক ডারোথির মন যে আদতে পরিহাসপ্রবণ, তা বুঝতে পেরে আমি খুশি হয়ে ওঠি।

শরণার্থী শিবিরের প্রান্তিকে সাদা রঙের একটি ওয়াটার ট্যাংক দেখতে পেয়ে আমি গাড়ি থামানোর অনুরোধ করি। এ শিবিরের মানুষজন নাকি বাস্তুচ্যুত হয়ে বছর বিশেক ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এক পর্যায়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের শিবিরে স্থাপন করেছিল সাদা রঙের ট্যাংকটি। তবে অন্য কোন ধরনের ত্রাণ সহায়তা তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয়নি, কারণ এ ক্যাম্পের আফাররা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে গিয়ে পৌঁছেনি, সুতরাং টেকনিক্যালি তাদের রিফিউজি স্ট্যাটাস নেই, স্বদেশে ভিটাবাড়ি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের বলা হয়ে থাকে আইডিপি বা ইন্টারন্যালি ডিসপ্লেসড পিপুল। তাদের সংজ্ঞানুযায়ী এরা উল্লেখযোগ্য রকমের রিলিফ সামগ্রীর দাবিদার হতে পারে না।

ঘটনা যা-ই হোক, ঊষর মরুতে দর্শনীয় বস্তুর বড় আক্রা, তাই আমরা পর্যটককুল পানির ট্যাংক ঘিরে ক্যামেরা হাতে ওত পাতি। জানতে পারি, শিবিরের নারীরা সুবেহ সাদেকের সময় দূরবর্তী একটি ওয়াটার হৌলে গিয়ে গাধার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে আসে পানি। ট্যাংকের পানি দিয়ে চলে সংসারের রান্নাবান্না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্যাংকের পাশে নিচুমতো কিছু জায়গা সিমেন্ট দিয়ে লেপে দিয়েছে। তাতে পোষা মেষ, ছাগল, গাধা ও উটের জন্য পানি রাখা হয় । কিছু সময় আমরা ঘোলা জলের কাছে নীরবে দাঁড়াই। সারা চরাচর কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। বাতাসের দেবতাও বোধ করি তার হাওয়া-কল অফ করে দিয়ে মেডিটেশনে বসেছেন। ছবি তুলতে গিয়ে ওয়ান-পিস অভারঅল পরা জিম উসখুস করে নিজের গতর চুলকান। লু হাওয়া প্রতিরোধ করার জন্য তিনি এহেন লেবাস পরেছেন। কিন্তু কোথাও হাওয়া-বাতাসের লিমলেশ নেই,তাই তিনি টেকো তালু চুলকান। তার দিকে তাকিয়ে একটি কিশোর-বয়সি উট আতঙ্কে ব্যাম ব্যাম করে বেম্বরে ওঠে।

কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ডান হাতে তা বুকে ঠেকিয়ে গুনে গুনে আমাকে তিনটি পাতা অফার করেন। আমি নীরবে তা চিবিয়ে কষাবিসা রস পিক হিসেবে ফেলতে চাই। আলী আহমদ হুরমুশ হা হা করে ওঠে আমাকে নিবৃত করেন। তার ইশারায় বুঝতে পারি, চাটের চিবানো পাতার রস গিলে ফেলে তা দাঁতের গোড়ায় ধরে রাখতে পারলে মৌতাত ঠিকমতো জমবে

রিফিউজি ক্যাম্পের লাগোয়া জনহীন প্রান্তরে গাড়ি দুটি থেমে পড়ে। সুরমা রঙের বোল্ডার জড়ো করে ওখানে তৈরি করা হয়েছে রক-ওয়াল। তাতে বসে শিবিরের মোড়ল আলী আহমদ হরমুশ। গোল-টুপি মাথায় লুঙ্গি পরা মানুষটির থুতনিতে মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি। রাজ্যের দুশ্চিন্তায় যেন তিনি অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছেন সামনের গাছপালাহীন চরাচরের দিকে। গাইড নাগাসি এগিয়ে গিয়ে তাকে সালাম-আলেক দিয়ে শিবির পরিদর্শনের পারমিশন চান। তিনি আপত্তি করেন না। আমরা যে বাস্তুহারা মানুষজনদের জন্য দুই বস্তা টেফ নামক শস্যবীজ নিয়ে এসেছি, তা জানতে পেরেও তেমন কোনো উৎসাহ দেখান না। শুধু মিনমিনিয়ে বলেন, একটু পর ক্যাম্পের ছেলেরা এসে গাড়ি থেকে তা তুলে নেবে। আমি এগিয়ে তার সঙ্গে মোসাফা করে বলি,‘হুজুর, আমার আদি নিবাস বাংলাদেশ।’ তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না- আমার স্বদেশের অবস্থান ঠিক কোথায়? আমি এ বাবদে কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে উপহার হিসেবে অর্পণ করি এক আঁটি তাজা চাট। তিনি কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ডান হাতে তা বুকে ঠেকিয়ে গুনে গুনে আমাকে তিনটি পাতা অফার করেন। আমি নীরবে তা চিবিয়ে কষাবিসা রস পিক হিসেবে ফেলতে চাই। আলী আহমদ হুরমুশ হা হা করে ওঠে আমাকে নিবৃত করেন। তার ইশারায় বুঝতে পারি, চাটের চিবানো পাতার রস গিলে ফেলে তা দাঁতের গোড়ায় ধরে রাখতে পারলে মৌতাত ঠিকমতো জমবে। ডারোথি আহমারিক জবান ভালো বলতে পারেন, আফার গোত্রের ভাষার বেশকিছু শব্দ ও বাক্য তার জানা আছে, তাই তার তত্ত্বাবধানে জিম ও ক্যারোল শিবির দেখতে আগ বাড়েন। চার সৈনিক বন্দুক বাগিয়ে তাদের পেছন পেছন হাঁটে। গাইড নাগাসিকে দোভাষী করে আমি চাট-পাতা চিবাতে চিবাতে মোড়ল হরমুশের সঙ্গে বাতচিত করি।

আমি জানতে চাই- এ ক্যাম্পে বাসরত আফার কৌমের মানুষজনদের শরণার্থী হওয়ার প্রেক্ষাপট। তারা কীভাবে গৃহহারা হলেন, ফিরে যাচ্ছেন না কেন পূর্বপুরুষদের আদি বাস্তুভিটায়? জানতে পারি, ইথিওপিয়ার স¤্রাট হাইলে সালাসির জামানায় তারা নিজস্ব ভিটেবাড়িতে মোটমির্জা সুখেশান্তিতেই ছিলেন। সামাজিক দ্বন্দ্বের শুরুয়াত হয় সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক পরপর- মিলিটারি শাসকরা যুবকদের জন্য দুই বছরের মিলিটারি সার্ভিস বাধ্যতামূলক করলে। তাদের গোত্রের বেশ কতজন যুবককে জোর করে ধরে নিয়ে মিলিটারিতে ঢোকানো হলো। তাদের অনেকে সার্ভিস সমাপনের পর গ্রামে না ফিরলে গোলোযোগ শুরু হয়। অতঃপর অনেক খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের কাছে গুম হওয়া যুবকদের লাশ আবিষ্কৃত হলো। তখন গ্রামের অন্য ছেলেপিলেরা বিদ্রোহী হয়ে হাতে তুলে নেয় হাতিয়ার। প্রতিক্রিয়ায় মিলিটারিরা গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে মেয়েদের ধর্ষণ করে। তারপর থেকে আফাররা ঘুরপাক করছে ডানাকিল ডিপ্রেশন অঞ্চলের মরুভূমিতে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিনকাল। এ শিবিরে আফাররা বাস করছে গেল চার বছর ধরে।

আলী আহমদ হুরমুশ কথা বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক পর্যায়ে চুপ হয়ে যান। তখন খেয়াল হয়, জায়গাটি বালুকাপূর্ণ মরুভূমি বটে, তবে খানিক দূরে জাপানি ওয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা চিত্রের মতো ভাসা ভাসা ভাবে ফুটে উঠছে হালকা কাঁটাঝোপের সবুজাভ আউটলাইন। মোড়ল হরমুশ আরো কয়েকটি চাট-পাতা এগিয়ে দেন। এবারকার চিবানোতে অনুভব করি ভালো লাগার নেশাতুর আমেজ। গায়ে অনেকটা শাড়ির মতো দেখতে বস্ত্র জড়িয়ে একহারা গড়নের একটি তরুণী পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায় গাড়ির কাছে। সে দারুণ কৌতূহল নিয়ে ঘুরে-ফিরে বাহন দুটির জানালায় উঁকি দিয়ে দেখে। তারপর ফিরে তাকায় আমাদের দিকে। ঘোরতর কালো গাত্রবর্ণের কোনো এক অজানা দ্রাবিড় নারীর প্রতিকৃতি আমার মনে ভেসে ওঠে। মেয়েটি এগিয়ে এসে দিশা ধরে আমাকে অবলোকন করে। আমি অস্বস্তিতে পড়ি, মোড়ল হরমুশ বিরক্ত হয়ে মাছি তাড়ানোর মতো তাকে চলে যেতে ইশারা দেন। নারীটি দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ। আমি জানতে চাই,‘হুজুর, মেয়েটি কিছু চাচ্ছে কী, কী ঘটনা?’ মোড়ল একটি পাথর তুলে নিয়ে দেঁতো হাসি হেসে বলেন,‘আমার ভাতিজি মারজানি মারিমাজা, মাথায় গোলমাল আছে।’ তিনি উঠে দাঁড়িয়ে পাথর ছুড়ে তাকে তাড়া করেন। মারজানি কী যেন চেঁচিয়ে- বোধ করি গালিগালাজ করতে করতে ছুটে যায় প্রান্তরে। ছোটাছুটিতে অনাবৃত হয় তার তলপেট ও ভরাট বুকের কিয়দংশ। তীব্র শাসনে আমি চোখ ফেরাই, কিন্তু তন্বী নারীর ফিগারটি মনে আঁকা হয়ে যায়।

মোড়ল হুরমুশের সঙ্গে হেঁটে চলি রিফিউজি ক্যাম্পের ঘরদুয়ার দেখতে। ঊষর বালুকায় গাছের শুকনো ডালপালা দিয়ে তৈরি ছাপড়া কুঁড়েগুলোর কোনো কোনোটির দেয়ালে টেফ বীজের বস্তা বা আধছেঁড়া কাপড় ঝুলিয়ে আব্রুর বন্দোবস্ত। একটি কুঁড়েঘরের ছত্রছায়ায় দেখি- চুপচাপ দাঁড়িয়ে ক্যারোল ও জিম। খানিক দূরে ডারোথি- তিনি ক্লিপবোর্ডে স্ক্যাচখাতাটি রেখে নীরবে এঁকে নিচ্ছেন ঝুপড়িগুলোর রেখাচিত্র। আচরণটি বিচিত্র, এ ছবিগুলো আপাতত কী কাজে লাগবে- তা অজ্ঞাত থেকে যায়। জিম গরমে এমন কাহিল হয়েছেন যে, তিনি বোতল খুলে তার বিস্তৃত টাকে ছিটাচ্ছেন জল। ক্যারোল মুখখানা মস্ত করে আমার দিকে কটমটিয়ে তাকান। জানতে চাই,‘হোয়াটস আপ?’ খেপে গিয়ে তিনি জবাব দেন,‘ডিড ইউ সি দ্য কন্ডিশন অব দিস রিফিউজি ক্যাম্প?’ জিন্দেগিতে পয়লাবার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আসা মহিলাকে বলতে চাই, দুনিয়াজুড়ে রিফিউজি ক্যাম্পগুলোর হালত তো হরে-দরে এ রকমই। কিন্তু মুখ দিয়ে রা কাড়ার কোনো সুযোগ পাই না। তিনি করুণ কণ্ঠে বলেন,‘ইথিওপিয়াতে এসে আমরা যে কয়েকদিন শহরের ত্রি-ফোর স্টার হোটেলগুলোতে থেকেছি, এখানকার ছাপড়া ঘরগুলোর হালত দেখে নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে। ডু ইউ নট ফিল দ্যাট ওয়ে?’ তার প্রশ্ন শুনে আমি নীরবে প্রতিফলন করি,ঘটনা সত্য, বিদেশি সংস্থার কড়িতে আমি তো হামেশা তারকা চিহ্নিত হোটেলে বসবাস করি, সমুদ্রসৈকতে সূর্যস্নার কিংবা আপস্কেইল রেস্তোরাঁয় ভোজন আমার জীবনে বিরল কিছু না। যেসব দেশে ঘুরে বেড়াই, প্রতিটি দেশেই আছে শরণার্থী সমস্যা, প্রতিটি জনপদে যক্ষ্মারোগের জীবাণুর মতো বিস্তৃত হচ্ছে দারিদ্র্য। এ বিষয়গুলো তো পর্যবেক্ষণ করছি দশকের পর দশকজুড়ে। মানুষের সাফারিংস দেখে আমার মধ্যেও সহমর্মিতা জাগে, কিন্তু এটা সত্য, আমার বিলাসঋদ্ধলাইফস্টাইল এখনো আমি বদলাইনি।

খনই স্পট করি, মারজানি মারিমাজাকে, তরুণীটি ছাপড়া ঘরগুলোর আড়ালে আড়ালে যেন সাবধানে আমাদের অনুসরণ করে চলছে। যেতে যেতে চকিতে একবার তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। বোবা দৃষ্টিতে মেয়েটি কী যেন বলতে চাচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারি না

ভাবতে ভাবতে যেন চলে গিয়েছিলাম অন্য এক ভুবনে। করোটিতে শরতের শুভ্র মেঘমালার মতো ছড়াচ্ছে নেশাতুর আচ্ছন্নতা। চোখের কোণ দিয়ে দেখি- একটি ছাপড়া ঘরের আবডাল থেকে আমাকে নীরবে অবলোকন করছে মারজানি মারিমাজা। তার চোখ-মুখ থেকে ছড়াচ্ছে কৌতূহল। নীরব উচ্চারণে সে যেন কী বলতে চাচ্ছে। তার চোখের তারায়আমার চোখ লক হতেই অনুভব করি, একটি নক্ষত্র যেন সবুজে সোনালি রঙের বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে ঝরে গেল মহাকাশ থেকে।

ক্যারোল এগিয়ে এসে রূঢ় কণ্ঠে জানতে চান,‘ইউ ডিডন্ট আনসার মাই কোয়েশ্চন…।’থতমত খেয়ে আমি জবাব দেই,‘আই ডোন্ট নো হোয়াট টু সে ক্যারোল।’ তিনি ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,‘কামঅন … ম্যান। সিয়িং অল দিজ… ডু ইউ নট ফিল গিল্টি?’ জবাবে এবারো আমি নীরব থাকি। বিরক্ত হয়ে তিনি কমেন্ট করেন,‘আমাদের গ্রুপের মধ্যে তুমি আর ডারোথি অনেকগুলো দেশ ভ্রমণ করেছো। আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড মি সেইং দিস…তোমাদের অনুভূতি স্রেফে ভোঁতা হয়ে গেছে।’ গাইড নাগাসি ও মোড়ল হুরমুশ এগিয়ে এসে আমাকে এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন। তারা আমাদের আগ বাড়তে ইশারা দেন। হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করি, ঝুপড়িগুলোর আড়ালে আমাদের অনুসরণ করে চলছে মারজানি মারিমাজা। পাশে হাঁটতে হাঁটতে ক্যারোল মিনমিনিয়ে অনুযোগ করেন,‘ম্যান… আই ফিল সো গিল্টি, এই যে হাজার-কে-হাজার ডলার ব্যয় করে ট্র্যাভেল করছি, আই অ্যাম ফিলিং লাইক আ ক্রিমিনাল।’ আমার মধ্যে অপরাধবোধ তেমন তীব্র নয়Ñ তা অনুভব করতে পেরে ভাবি, তবে কী দেশের পর দেশ সফর করে, ক্রমাগত দারিদ্র্য ও তৎজনিত সাফারিংস দেখতে দেখতে দাগি ক্রিমিনালদের মতো আমার মধ্যে লোপ পেয়েছে তাবৎ সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ?

ছাপড়া ঘরদুয়ারগুলোর ভেতর দিয়ে পথ করে আমরা হাঁটি। ক্যারোল জানতে চান, এ রকম গাছপালা ঘাসপাতাহীন বিরান মরুতে মানুষ বাস করে কীভাবে? তাকে ঠিক বোঝানো যায় না, মরুচারীরা তো যুগ যুগ ধরে এরকম পরিবেশে বসবাস করে আসছে, আর এরা চাইলেও তো পার্কে গিয়ে মৌসুমি ফুলের বিরল বর্ণে বিমুগ্ধ হতে পারে না। তার ঘ্যানঘ্যানানি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমি ঘাড় বাঁকিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটি। তখনই স্পট করি, মারজানি মারিমাজাকে, তরুণীটি ছাপড়া ঘরগুলোর আড়ালে আড়ালে যেন সাবধানে আমাদের অনুসরণ করে চলছে। যেতে যেতে চকিতে একবার তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। বোবা দৃষ্টিতে মেয়েটি কী যেন বলতে চাচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারি না… হোয়াট দিস ইয়াং উইম্যান রিয়েলি ওয়ান্টস? ক্যারোল এবার জানতে চান- শরণার্থীদের পোষা ছাগল, উট ও গাধা কী খেয়ে বেঁচে থাকে? উত্তর দিতে গিয়ে গাইড নাগাসি উত্ত্যক্ত হন। মোড়ল ভরসা দিয়ে বলেন, একটু জোরে হাঁটতে হবে কিন্তু, চারণভূমির কাছে গেলেই দেখতে পাবে, পোষা জীবজন্তু কী খেয়ে বেঁচে থাকে।

মোড়লের সঙ্গে রিফিউজি জনপদের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার সময় খেয়াল করেছিলাম, দূরে জাপানি ওয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা ল্যান্ডস্কেপের মতো ভাসা ভাসা সবুজাভ ভেজিটেশন। চারণভূমির প্রান্তিকে এসে দেখি- ওয়াশ-পেইন্টিংটি বিবর্তিত হয়েছে ঘাসপাতার স্বচ্ছ-সবুজ কালার ফটোগ্রাফে। অনুমান করি, একটি মরুঝরণা বয়ে যাচ্ছে মাটির তলদেশ দিয়ে। তার উপরে গজাচ্ছে হালকা-হালকা ঘাস, কিছু দুম্বাছাগল চিবাচ্ছে তাজা তৃণ, তিনটি উট ও কয়েকটি গাধা চিবাচিবিতে স্রেফে আগ্রহ হারিয়ে চুপচাপ বসে জাবর কাটছে। এক জায়গায় পাথর দিয়ে চৌখুপ্পি করে ফলানো হচ্ছে সামান্য সবজি। মোড়ল কথা বলেন, নাগাসির তর্জমায় বুঝতে পারি, পোষা জীব-জানোয়ারের পাল সাধারণত মরুভূমিতে চরে-ফিরে জীবন ধারণ করে থাকে। তবে কোনো জন্তু অসুস্থ বা কমজোর হয়ে পড়লে- তাকে ফের তাজাতনা করার জন্য নিয়ে আসা হয় এ চারণভূমিতে। বিষয় বুঝতে পেরে জিম বেবাটের মতো হে হে করে হেসে বলেন,‘ওয়াও, নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড, দিস গ্রিন প্লেস ইজ লাইক আ রিকুপারেশন রিসোর্ট ফর দি অ্যানিম্যালস, কুল।’ তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাঁধ থেকে ক্যামেরা বের করে তাক করেন। মোড়ল ছুটে এসে করতল দিয়ে ক্যামেরার লেন্স চেপে ধরে হই হই করে ওঠেন। নাগাসি বিষয়টা বুঝিয়ে বলে, আমরা যাতে একটি-দুটি ছবি তুলতে পারি, এজন্য সে আমাদের হয়ে সামান্য পারিতোষিক দিয়ে পারমিশন নিয়ে রেখেছে। আমরা চাইলে শরণার্থী শিবিরের ঘরদুয়ার বা দু-একজন মানুষের ছবি তুলতে পারি, নো প্রবলেম। কিন্তু খবরদার, অসুস্থ হওয়া জীব-জানোয়ারের ছবি তুলতে যাবে না। এতে মড়ক আসবে। সবজি খেতের ছবি তোলাও…‘নো, টোট্যালি নট ও-কে। প্লিজ ডোন্ট টেক পিকচার অব দ্য ভেজিটেবলস।’ হতাশায় উত্ত্যক্ত হয়ে জিম জিপার টেনে তার অভারঅলের উপরিভাগ খুলে ফেলেন। ঘাসে বসে জিরানো জানোয়ারগুলো তার ক্যামেরাবাজির হাত থেকে নিস্তার পায়।

পানির ট্যাংকের পাশে উট

হেঁটে হেঁটে আমরা চলে আসি চারণভূমির প্রান্তিকে। একটি নিঃসঙ্গ কুঁড়েঘর দেখতে পেয়ে কেমন যেন অবাক লাগে। তার লাগোয়া মাচার নিচে গামলার জলে পা চুবিয়ে বসে এক নারী। পাশে দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট ন্যাংটাপুটো ছেলে। এদের দেখতে পেয়ে ক্যারোল যেন স্কুলজীবনে হারিয়ে যাওয়া সেহেলির সন্ধান পেয়েছেন, এমন ভঙ্গিতে তার পাশে বসে পড়ে বলেন,‘হোয়াট আ লাভলি চাইল্ড ইউ হ্যাভ।’ জিমও ধুয়া তোলেন,‘ দ্য লিটিল বয় ইজ সো কিউট…।’ মহিলার পায়ে কী একটা ক্ষত হয়েছে, জলের সঙ্গে উটের মূত্র মিশিয়ে তাতে পা ডুবিয়ে তিনি চিকিৎসা করছেন। ক্যারোল এ টোটকা পদ্ধতি অ্যাপ্রুভ করেন না। তিনি পার্স থেকে পনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিকের টিউব বের করে নাগাসির মাধ্যমে তাকে তা অফার করেন। মহিলা বিভ্রান্ত হয়ে দু’হাত ঝাঁকিয়ে তীব্রভাবে অসম্মতি জানায়। কিন্তু ক্যারোল সহজে তাকে ছাড়েন না, তিনি তাকে পেনিসিলিন অয়েন্টমেন্ট মাখার জন্য ইনসিস্ট করেন। নাগাসি হেল্পলেস হয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি বিরক্ত হয়ে ক্যারোলকে বলি, ‘ফর হ্যাভেনস সেক ক্যারোল, প্লিজ লিভ দিস পুওর লেডি অ্যালোন।’ তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমার ওপর উত্ত্যক্ত হয়ে উষ্মা ঝাড়েন,‘লেট মি টেল ইউ সামথিং সুলতান… ইউ আর আ ওয়ান ইনসেনসেটিভ গাই।’

শিবিরের বস্তির দিকে ফেরার পথে নাগাসির মাধ্যমে মোড়লের মুখ থেকে শুনি- কুঁড়েঘরের লাগোয়া মাচাতলে বসে থাকা মহিলার কাহিনী। তার নাম পানহাইয়া পাহি। বস্তুহারা মানুষজনের তাবৎ কৌম রাতের অন্ধকারে পাড়ি দিচ্ছিল বালুকাময় উপত্যকা। পথে অজানা কোনো গোত্রের ঘোড়সওয়াররা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর, লুটমারের সময় কিডন্যাপ হয়েছিল কিশোরী পানহাইয়া পাহি। বছর কয়েক পর কোলে বাচ্চা নিয়ে কীভাবে সে যেন ফিরে আসে স্বগোত্রে। সঙ্গে বোবা স্বামী। পাহির বেশভূষায়ও পরিবর্তন হয়েছে, সে ভিন্ন গোত্রের সাংস্কৃতিক রেওয়াজ অনুযায়ী পরতে শুরু করেছে হিজাব। মেয়েটি একবার কিডন্যাপ হয়েছিল, তার শরীর অশুচি হয়ে আছে, তাই তাকে আর শরণার্থী বস্তিতে জায়গা দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে কৌম তাকে চারণভূমির সীমান্তে কুঁড়েঘর তৈরির অনুমতি দেয়। পাহির বস্তিতে ফেরা নিষেধ। তার বোবা স্বামী উটের শুকনো চামড়া দিয়ে তৈরি করে স্যাডেলব্যাগ। তা বিক্রি করে কোনো না কোনোভাবে গোজরান হয় তাদের দিন।

মারিমাজা উবু হয়ে একটি কুঁড়েঘরের দাওয়ায় পেতে দেয় উটের চামড়া। এবার বিষয়টা স্পষ্ট হয়, সে আমাদের কিছু খেয়ে যেতে অনুরোধ করছে

আমরা ফিরে আসি ছাপড়া ঘরদুয়ারের বস্তিতে। মোড়লের পাশে পাশে হাঁটছিলাম। দেখি মারজানি মারিমাজা হাতে রোল করা উটের চামড়া নিয়ে এগিয়ে আসছে। চোখাচোখি হয়, সে কী যেন বলতে চায়, এবার ইঙ্গিতটি পরিষ্কার হয়, সে যেন কিছু খাবার ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি মোড়লেরও নজরে পড়ে, কিন্তু তিনি মারিমাজাকে এবার আর তাড়া করেন না, বরং দাঁড়িয়ে পড়ে নাগাসিকে কিছু বলেন। মারিমাজা উবু হয়ে একটি কুঁড়েঘরের দাওয়ায় পেতে দেয় উটের চামড়া। এবার বিষয়টা স্পষ্ট হয়, সে আমাদের কিছু খেয়ে যেতে অনুরোধ করছে। আমি- নাগাসি ও মোড়লের সঙ্গে বসে পড়ি পেতে দেয়া লোমশ ছালে। আমার অন্য সফরসঙ্গীরা বসতে চায় না। তারা বস্তির তাবৎ কিছু খুঁটিয়ে দেখতে অগ্রসর হন। মারজানি ঝুপড়ি ঘর থেকে নিয়ে আসে আগ্নেয়শীলায় কুঁদে তৈরি একটি বাটি। তাতে রাখা দুম্বাছাগলের দুধে তৈরি ঘন দধি। মোড়লের সঙ্গে আমি ও নাগাসি বিসমিল্লাহ বলে আঙুল দিয়ে তুলে তা মুখে দিই। বস্তুটি বেজায় টক, বিস্বাদে বোধ করি আমার মুখ ব্যাকাত্যাড়া হয়ে যায়। মারজানি ফিক করে হেসে আঁচলের তলা থেকে বের করে একটি শিশি। সে ফের উবু হয়ে দধির বাটির ওপর বোতল থেকে ফোটায় ফোটায় ঢালে মধু।

খেতে খেতে আমার শরীরে যেন অনুভব করি তার দৃষ্টিপাত। অপ্রস্তুত হয়ে নাগাসির মাধ্যমে মোড়ল হুরমুশের কাছে জানতে চাই, আমি যদি মারিমাজাকে যৎসামান্য কিছু টাকা দেই, তাতে তাঁর আপত্তি আছে কী? বিষণœ হেসে মোড়ল জবাব দেন, মেয়েটা তো গড়পড়তা রিফিউজিদের তুলনায় তেমন দরিদ্র না, তার স্বামী লবণহ্রদে মালবাহী উটের কাফেলায় কাজ করে। মারিমাজার সমস্যা অন্যত্র। তার ছেলেটি গাধায় চড়া পছন্দ করত। বছর কয়েক আগে গোত্র যখন ভিন্ন এক মরুভূমিতে শিবির গড়ে বাস করছিল, তখন একদিন সন্ধ্যাবেলা দুষ্ট ছেলেটি গাধায় চড়ে ধু-ধু বালুকায় হাওয়া হয়ে যায়। পরদিন গোত্রের সবাই চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে বাচ্চাটির তালাশ করে, কিন্তু ফল কিছু হয় না। তারপরদিন পোষা গাধাটি বাচ্চার রক্তাক্ত জামা মুখে করে ফিরে আসে শিবিরে। ফের মরুভূমিতে অনুসন্ধান চালানো হয়, কিন্তু বাচ্চাটির লাশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে থেকে মারজানির মন একটু এলোমেলো হয়ে আছে।

মারজানির অস্বাভাবিক আচরণের জন্য মনে হয় মোড়ল হুরমুশ অপ্রস্তুত হয়ে আছেন, তিনি কাঁচুমাচু হয়ে আমাকে কিছু মনে না করার জন্য অনুরোধ করেন। বেলা পড়ে আসছে, আরেকটি শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার কথা আছে। তাই তাঁর সঙ্গে মোসাফা করে বিদায় নেই। গাড়ি অব্দি তিনি হেঁটে আসেন। খানিক দূর থেকে আমাদের অনুসরণ করে মারজানি। আমার সহযাত্রীরা ল্যান্ডক্রুজারে বসে আছেন অধৈর্য হয়ে। তো আমি গাড়িতে উঠি। ড্রাইভার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। তীব্র শাসনে আমি পেছন ফিরে তাকানো থেকে বিরত থাকি। মরু বালুকায় আমাদের গাড়িখানি পাথর ছিটিয়ে আগ বাড়ে। আরো আমার নিভৃত গহনে ঝরে পড়ে একটি নক্ষত্র।

আরো পড়তে পারেন

সিলেটের সুন্দরবন

রাতারগুল নামটা কেমন অদ্ভুত, সিলেটের অন্য নামগুলোর সাথে যেন ঠিক মেলে না । সেখানে ‘ছড়া- ছড়ির’ ছড়াছড়ি, যেমন মালনিছড়া, সাতছড়ি, লোভাছড়া। মেঘালয় বেষ্টিত সিলেট হাজার ঝরা বা ছড়ার দেশ তাই ‘ছড়ার’ ছড়াছড়ি কিন্তু রাতারগুল? এ কেমন নাম অর্থই বা কি? সিলেট শহর থেকে মাত্র ছাব্বিশ মাইল উত্তরে পাঁচশ চার একরের এক জায়গা, জায়গাটা একেবারেই অন্যরকম।….

ভোলাগঞ্জ: বাংলাদেশের কাশ্মির

অনেকগুলো সুন্দরের মধ্য একটাকে বেছে নেয়া যে কি কঠিন কনে দেখা সম্ভাব্য পাত্রই কেবল তা জানে, আমাদেরও তখন সেই অবস্থায়। আমাদের হাতে মাত্র এক দিন, একগাদা সৌন্দর্যের মধ্যে বাছতে হবে মাত্র দুটো। কোনটা? বিছানাকান্দি, মাধবকুন্ড, ভোলাগঞ্জ না রাতারগুল? বিছানাকান্দি আর মাধবকুন্ড প্রচুর জনপ্রিয়, অলরেডি ব্যান্ড, এর-ওর-তার প্রায় সবারই দেখা, আনকোরার মধ্যে কেবল দুটো- ভেলাগঞ্জ আর….

হবিগঞ্জের ‘সাতছড়ি ইকোপার্ক’

কে বলে জীবন সুন্দর নয়? দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেটে পা ফেলে ফেলে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের জন্য কথাটা সত্য নয়। প্রকৃতি সেখানে নিপুন হাতে সাজিয়েছে নিজের সংসার। শুধু চোখ থাকা চাই আর চাই নূর কামরুন নাহার আর আল্পনা ভাবীর মত বন্ধুত্বের রসায়ন। বিষয়টি হবিগঞ্জ যাবার আগেও বার কয়েক বুঝেছিলাম মেঘনায়, মুন্সিগঞ্জে, সেন্টমর্টিনে এবং….

error: Content is protected !!