Author Picture

এক রূপসী মেয়ের সুখদুঃখ

খন্দকার রেজাউল করিম

‘চোখ যে ওদের ছুটে চলে গো…
ধনের বাটে, মানের বাটে, রূপের হাটে গো।’

মেয়েটি গ্রিক দেবী এফ্রোডাইটের মতোই রূপসী। দুধে-আলতায় মেশানো গায়ের রং, মাথায় ঢেউ খেলানো সোনালী চুল, হাতে বই আর খাতা। ঘাড় নাড়িয়ে, কানের দুল দুলিয়ে হেসে হেসে কথা বলছিলো। মেয়েটির স্বামী পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো কথা নেই, একবার আমার দিকে একবার স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছে। আমি তাকাচ্ছি একবার ছেলেটির দিকে, আরেকবার মেয়েটির দিকে। এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায় দ্যাখ। স্বপ্নের দম্পতি, পথভ্রষ্ট দেব-দেবী। ‘‘বঁধু, তোমার গরবে গরবিনী আমি, রূপসী তোমারি রূপে।’’ কে যেন বলেছিলো? রাধা না শ্যাম? এদের দুজনের যে কেউ কথাটা বলতে পারে।
মেয়েটি যদি দেবী এফ্রোডাইট হয়, তবে ছেলেটিকে দেবতা অ্যাপোলো বলা চলে। আমি মেয়ে হলে নির্ঘাত ছেলেটির প্রেমে পড়ে যেতাম। কোরআন শরীফে অপূর্ব ভাষায় নবী ইউসুফ এবং জুলেখা বিবির প্রেম-কাহিনীর বর্ননা করা হয়েছে। বিবি জুলেখা কি ফাঁদটাই না পেতেছিলেন! নবী ইউসুফের বদন মোবারক দেখে সন্মোহিত হয়ে মিশরের সম্ভ্রান্ত মহিলারা ফল-সবজি না কেটে নিজেদের আঙ্গুল কেটে রক্তারক্তি কান্ড বাধালো। ইউসুফ নবী সব ছলনার জাল ছিন্ন করে বাইরে বেরিয়ে এলেন, জুলেখা বিবির নখের আঁচড়ে শুধু তাঁর জামার পেছনটা রইলো ছেঁড়া। তবে আমার হাতে আছে কলম আর কাগজ, চাকু নয়, আঙ্গুল কাটার ভয় নেই।

‘আমরা প্লাসের জায়গায় মাইনাস পাচ্ছি আর মাইনাসের জায়গায় প্লাস,’ মেয়েটি বললো, ‘আমরা দুজনে মিলে অংকের যুক্তিগুলো অনেকবার উল্টেপাল্টে দেখেছি, কম্পিউটার প্রোগামটা বারেবারে পরীক্ষা করেছি, কিন্তু কোনো ভুল পাই নি।’
‘তোমার কি মনে হয়, আর্থার?’ আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘আমি আর জুলিয়া দুজনেই তিন মাস ধরে এই নিয়ে ঘোল খাচ্ছি। গলদটা নিশ্চয় অন্য কোথায়, কোনো সমাধান চোখে পড়ছে না।’
যেখানে চাকরি করি সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। পড়াতে হবে না, শুধুই গবেষণার কাজ। আমেরিকায় এটা হরহামেশা হয়। গবেষণার আদানপ্রদান বলা যেতে পারে। এখানে কি হচ্ছে তার কিছুটা জানতে পারবো, আর আমি কি করি তার খবর এরা টের পাবে। আর্থার এবং জুলিয়া চার বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এইচ ডি করছে। ওদের তত্ত্ববধায়ক প্রফেসর এককালে আমার গুরু ছিলেন। পুরানো গুরুর নবীন ছাত্রছাত্রী-দম্পতির পি এইচ ডি বৈতরণী পার করাবার দায়িত্ব আমার উপরে গছিয়ে দেয়া হয়েছে।

নিজের দুপায়ের উপরে ভর দিয়েই তোমার যুক্তি সবাইকে বোঝাতে হবে, বিরুদ্ধ মতবাদ দ্বিখণ্ডিত করতে হবে

‘তোমরা বের করবে একটা ইলেক্ট্রনের সাথে একটি পরমাণুর ধাক্কাধাক্কির সম্ভবনা, ওটা হবে এম্পলিচিউডের বর্গ। তোমাদের উত্তর প্লাস বা মাইনাস যাই হোক ওকে বর্গ করলে তো একই ফল পাওয়া যাবে।’ আমি বললাম।
‘সে তো সবাই জানে। কিন্তু প্লাস-মাইনাসের ব্যাপারটার সুরাহা না হয় পর্যন্ত গবেষণা কাজটা পাব্লিকেশানের জন্য কোন জার্নালে পেশ করতে পারছি না। আর গোটা তিনেক পেপার পাবলিশ না করা পর্যন্ত আমাদের পি এইচ ডি হচ্ছে না।’
‘টেনসোর ক্যালকুলাসের তিনটে বইয়ের নাম লিখে দিচ্ছি, ওগুলো পড়ে দেখো। আমি তো আরো ছয় মাস এখানে আছি, যাবার আগে কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
আর্থার আলসে, কম কথা বলে, অংক নিয়ে কদাচিৎ আমার কাছে আসে। খাতা আর জার্নাল হাতে জুলিয়া হাজির হয় প্রতি সপ্তাহে। ও যে প্রচন্ড পরিশ্রম করছে তার প্রমান ওর হাতের কাছেই মজুদ।
‘এই দেখুন, কত ভাবে চেষ্টা করছি, প্রতিবারেই শেষে যাচ্ছি ঠেকে।’
‘যতবার ঠেকবে ততবার শিখবে।’
‘আমার ধারণা উত্তরটা আপনার জানা আছে, অকারণে আমাকে ঘোরাচ্ছেন।’
‘নিজের ভুল নিজে ধরতে পারার আনন্দটাই আলাদা।’
‘আমি শুধু ডিগ্রি চাই।’
‘তোমাকে সাবলম্বী হতে হবে। নিজের দুপায়ের উপরে ভর দিয়েই তোমার যুক্তি সবাইকে বোঝাতে হবে, বিরুদ্ধ মতবাদ দ্বিখণ্ডিত করতে হবে।’
‘আমার আর আর্থারের চাকরি হয়ে বসে আছে, শুধু ডিগ্রীটার জন্যে বসে আছি। দুজনেই ক্যালিফোর্নিয়ার এক কোম্পানিতে ইন্টার্নি করেছিলাম। সেখান থেকে আমন্ত্রণ এসেছে, অনেক বেতনের চাকরি।’
‘একদিন বুঝবে ছাত্রজীবনের আনন্দটা কত দুর্লভ।’
‘আমার বুঝে কাজ নেই। চাকরি শুরুর সাথে সাথে আমাদের বেতন দশগুন্ বাড়বে, বাড়ি, গাড়ি, বিলাস, আয়েশ সব হাতের মুঠোয় এসে যাবে।’
‘ইদানিং আমেরিকায় সুখ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। শুরুতে বেতন বাড়ার সাথে সাথে সুখ ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে মাসে ছয় হাজার ডলারের পরে সুখ আর প্রায় বাড়ে না বললেই চলে। পদার্থবিদ হয়ে আপনি এসব গবেষণার দাম দেন? সুখ মাপার কোনো উপায় নেই, তাই এই সব গবেষণার কোনো মূল্য নেই।’
পাঁচ বছর পরের কথা। জুলিয়া এবং আর্থার দুজনেই পি এইচ ডি ডিগ্রি পেয়েছে, চাকরি নিয়ে দুজনেই ক্যালিফর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে চলে গেছে। স্বপ্নের দম্পতির অনেক বেতনের সেই স্বপ্নের চাকরি! গবেষণা বাদ দিয়ে ওরা সেলসম্যান হয়েছে। ওদের কোম্পানি গবেষণা কাজের যন্ত্রপাতি বানিয়ে বিক্রি করে। শুনেছি জুলিয়া এই কাজে খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। দ্রুত প্রমোশন পেয়ে সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের পদে পৌঁছে গেছে। আর্থার তেমন সুবিধা করতে পারে নি। আরো একটা কথা। ওদের বিয়েটা টেকে নি।
একটি সম্মেলনে যোগ দিতে লস এঞ্জেলসে এসেছি। জুলিয়া এবং আর্থারের সাথে দেখা হলো। মিলনায়তনের বাইরে ওদের কোম্পানির স্টলে কাগজপত্র এবং যন্ত্রপাতির নমুনা নিয়ে বসে আছে, জুলিয়া হাসি মুখে আর আর্থার গুমসো মুখে। দুজনের কাছেই রাত্রের খাবারের নিমন্ত্রণ পেলাম। ইচ্ছে ছিল তিনজনে এক সাথে সেই আগের মতো খেতে যাবো, হাবেভাবে বুঝলাম সেটা সম্ভব নয়। প্রথম রাত্রে আর্থার এসে কাছের এক রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো। খাওয়ার পরে ও ঢকঢক করে মদ গিলতে শুরু করলো। রাত নয়টায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেলে আর্থার ওখান থেকে আমাকে নিয়ে গেলো এক শুঁড়িখানায়। সেখানে চুকচুক করে সবাই মদ খাচ্ছে। নেশার ঘোরে আর্থার অনেক কথা বলা শুরু করলো।
‘পি এইচ ডি করে আমি প্রথমে এখানে এসে ঘর সাজালাম, দামি গাড়ি কিনলাম। তিন মাস পরে পি এইচ ডি শেষ করে জুলিয়া আমার ঘরে আসলো, ছয় মাসের মধ্যে আমি ঘর ছাড়লাম।’
‘কিন্তু কেন? রূপ, যৌবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টাকা – কিসের অভাব ছিল তোমাদের?’
‘সেটাই তো ছিল বিপদ, এগুলোর সাথে যে অহংকার আসে তাকে ঠেকাবে কে? কেউ কারো সামান্য অনাদর সইতে পারিনি।’
‘বেশ, এবার বসে বসে আরো মদ গেলো।’
পরের রাত্রে জুলিয়া আমাকে নিতে এসেছে। গাড়ি নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই, তবুও জুলিয়া যে গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে বসে আছে সেটা যে একটা দামি স্পোর্টসকার, তা বুঝতে অসুবিধা হলোনা। গাড়িটিতে জুলিয়াকে চমৎকার মানিয়েছে, জুলিয়ার পাশে আমাকে লাগছে বেমানান। জুলিয়া আমাকে যে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এলো সেখানেও নিজেকে বেমানান মনে হলো। খেতে খেতে কথা বলছিলাম,
‘কাল রাতে অর্থারকে অনেক মদ গিলতে দেখলাম। ওকে এমন শাস্তি দিলে কেন? ওর কি নেই যা তুমি আরেকটি ছেলের মাঝে পেতে পারো?’
‘ও আলসে এবং বোকা, কোনো উচ্চাশা নেই। প্রেমে, ভোজনে উৎসাহী, আর সব কাজে ফাঁকি। আমাকে পেয়েই নাকি ওর জীবনের সব চাওয়া পূর্ণ হয়ে গেছে। বিয়ের পরে এসব ফালতু কথা শুনতে কোন মেয়ের ভালোলাগে?’

সুখ অতি সস্তা জিনিস। সুখের জন্যে অর্থ, খ্যাতি, রূপ, শিক্ষা কিছুই দরকার নেই। নিজের বর্তমান অবস্থানকে নিঃশর্তে মেনে নেওয়াই তো সুখ

‘ছেলেরা প্রকৃতগত ভাবেই অলস। ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্ব একটু পড়ে দেখো। মেয়েরা মাল্টিটাস্কিংএ ওস্তাদ, এক সাথে অনেক কাজ করতে পারে, ছেলেরা দুটো কাজ একসাথে ভালোভাবে করতে পারেনা। দশ হাজার বছর আগে একটি মেয়ে পাঁচটি বাচ্চাকে সামলাতো, সেই সাথে ফলমূল সংগ্রহ করতো। পুরুষ যখন বল্লম হাতে শিকারের পিছনে ছুটতো তখন আর কিছু করার অবকাশ ছিলনা। পুরুষের নজর শুধুই একদিকে, তাই ওদেরকে বোকা বলে মনে হয়। কিন্তু তার জন্যে বিবাহ বিচ্ছেদ?’
‘আমাকে হারালেও আর্থার সহজেই আরেকটি মেয়ে জোগাড় করতে পারবে। আমিও চোখের ইশারায় যেকোনো ছেলেকে ঘায়েল করতে পারি। বিয়ে ভেঙে গেলে যাদের বউ বা বর খুঁজতে একটুও সময় লাগেনা এমন দম্পতির বিয়ে কি টেকে?’
‘ভাগ্যিস আমি দেখতে ভালো না।’
‘টাকার জন্যে আমি বাড়তি কাজ করলে আর্থার গাল ফুলিয়ে বসে থাকতো। পাঁচ বছরে আমি তিনটে প্রমোশন পেয়েছি, ও সেই আগের স্থানেই আছে। আর্থার ভেবেছিলো বিয়ে করা বৌকে আর হারাবার ভয় নেই। আমাদের বাড়তি টাকা নিয়ে কি করা যায় তাই নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়া হচ্ছিলো।’
‘অনেকদিন আগে সুখ নিয়ে এক গবেষণার কথা তোমাকে বলেছিলাম। মাসে ছয় হাজার ডলার নাকি সুখের সীমা, আরো বেশি আয়ে সুখ আর বাড়েনা। তোমার বেতন নিশ্চয় অনেক বেশি হবে, সুখের সীমার ওপারে কি আছে?’
‘মানুষ কেন যে সুখ, সুখ করে? সুখ অতি সস্তা জিনিস। সুখের জন্যে অর্থ, খ্যাতি, রূপ, শিক্ষা কিছুই দরকার নেই। নিজের বর্তমান অবস্থানকে নিঃশর্তে মেনে নেওয়াই তো সুখ। একজন ক্রীতদাসও সুখী হয়ে হাসতে পারে। এতো পড়াশুনা, চাকরি, পরিশ্রম কি শুধুই সুখের জন্য? কোনো ধনী ছেলের ভালোবাসার কারাগারে বন্দি হয়ে অলস জীবন কাটাতে পারতাম। শুধু খাওয়া, ঘুমানো, মোটা হওয়া। কর্মহীন, গর্বহীন, উদ্দেশ্যবিহীন জীবন। ওকেই কি সুখ বলে? ওতে কি সন্মান আছে? অমন সুখ আমার সয় না। সুখী ছাগলের চেয়ে অসুখী সক্রেটিসের জীবন অনেক ভালো।’
‘ক্ষুদ্র সুখে ভরেনাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা।’ জুলিয়া হলো এযুগের ক্ষত্রিয়। যুদ্ধটা টাকার সাথে। টাকার কোনো শেষ নেই। এই যুদ্ধেরও শেষ নেই।

আরো পড়তে পারেন

প্রেমের বুলি

একজন তরুণ প্রেমিক। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোর দল বানের জলের মতো রক্তে ঢেলে দিচ্ছে ডোপামিন, সিরোটোনিন, অক্সিটোসিন, টেসটোস্টেরন জাতীয় প্রেমের হরমোন। কপালগুণে জুটেছে ভালোবাসার জন- তাকে জানাতে হবে তোলপাড় হৃদয়ের কথা। কিন্তু কেমন করে? প্রেমের হরমন সবাইকে অল্প সময়ের জন্য লাইলী বা মজনু বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মুখে প্রেমের বুলি জোটাতে পারে না। মনভোলানো….

রোমান্টিক প্রেমের চিঠি

রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পে মৃন্ময়ী তার স্বামীকে লিখেছিলো, ‘তুমি কেমন আছ, আর তুমি বাড়ি এসো। এইবার তুমি আমাকে চিঠি লিখো, আর কেমন আছ লিখো, আর বাড়ি এসো, মা ভালো আছেন, বিশু পুঁটি ভালো আছে, কাল আমাদের কালো গোরুর বাছুর হয়েছে।’ ছেলেবেলায় একটি বইয়ে, লেখকের নাম ভুলে গেছি, আরেকটি প্রেমের চিঠি পড়েছিলাম, যেখানে স্বামী তাঁর স্ত্রীকে লিখছেন,….

ভীরু প্রেম

কি ভেবে পাঠালে চিঠিখানি, কি কথা ছিল যে মনে। তুমি সে কি লিখে গেলে, আমি বসে বসে পড়ি নিয়ে কম্পিত হৃদয়খানি, তুমি আছো দূর ভুবনে। আমি তখন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে চাকরি শুরু করেছি। রঙিন খামে একটা চিঠি পেলাম। খামের উপরে মেয়েলি হাতে আমার নাম-ঠিকানা লেখা। খামের ভিতরে আরেকটি রঙিন কাগজের চিঠি, সাথে গোলাপ ফুলের….

error: Content is protected !!