Author Picture

ভিয়েতনামের প্রকৃতি ও জীবন হ্যা লং বে ভাসমান ফিশিং ভিলেজ

তাসনুভা রাইসা

Although I can see him still—
The freckled man who goes
To a gray place on a hill
In gray connemara clothes
At dawn to cast his flies—
It’s long since I began
To call up to the eyes
This wise and simple man.
W.B Yeats

বলা হয়ে থাকে ভিয়েতনামে গিয়েও যদি হ্যা লং বে না দেখা হয় তবে ভিয়েতনাম যাওয়াটাই বৃথা। আর আমার মতো একজন ক্ষুদ্র ব্যক্তির মনে হয়েছে যদি কেউ হ্যা লং বে না দেখে থাকে সে এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা দেখা থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছে।
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের দক্ষিণপূর্বে ১৮০ কিমি দূরে অবস্থিত ‘হ্যা লং বে। ৫০০ মিলিয়ন বছর ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০ থেকে ৩৩০ ফুট উচ্চতায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন আকার ও আকৃতির সামুদ্রিক লাইমস্টোনের প্রায় ২০০০টি দ্বীপ এবং প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত স্বচ্ছ এমারেল্ড সবুজ পানির এই হ্যা লং বে। এই অতি মনোরম স্থান ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এবং প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল।
হ্যা লং বে এর জগদ্বিখ্যাত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর লাখো পর্যটকদের সমাগম ঘটে। গত বছর ঈদের ছুটিতে এই লাখো পর্যটকদের কাতারে আমিও শামিল হয়েছিলাম।
পর্যটকদের মাঝে প্রমোদ তরীতে করে হ্যা লং বে ভ্রমণ সবচেয়ে জনপ্রিয়। পালতোলা ছোট এই প্রমোদতরীগুলো জাংক বোট নামে পরিচিত। প্রতিটি জাংকবোটের সাথে বাঁধা থাকে একটি করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বিভিন্ন দ্বীপ এবং গুহার কাছাকাছি মধ্যবর্তী চলাচলের জন্য এই নৌকা ব্যবহার করা হয়। হারবার থেকে মূল জাহাজে এই ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করেই পৌঁছাতে হয়। প্রতিটি যাত্রীর জন্য আলাদা লাইফ জ্যাকেট এর ব্যবস্থা রয়েছে এবং লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। দুপুর ১২টার দিকে এই প্রমোদতরীগুলো তার যাত্রীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে, এসব প্রমোদতরীতে থাকার আয়োজন আরামপ্রদ- শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ২৪ ঘন্টা ওয়াই-ফাই সংযোগ, লাঞ্চ, ডিনার এবং ব্রেকফাস্টে স্থানীয় সী ফুড এবং এশিয়ান কুইজিন এর বেশ সুন্দর আয়োজন। প্রতিটি জাহাজে একজন গাইড থাকে। আমাদের ছিল ‘হ্যা লং বে-ওভার নাইট ক্রুজ’। আগের দিন দুপুর ১২টায় জাংক বোটে উঠে রাত কাটিয়ে পরের দিন সাড়ে ১১টায় শহরে হারবারে প্রস্থান। এই সাড়ে ১১টার আগে ‘আরলি লাঞ্চ’ এর ব্যবস্থা থাকে।

ফ্লোটিং ফিশিং ভিলেজ

আমাদের লাঞ্চের নির্ধারিত সময় ছিল দুপুর ১টা, অতিথিরা ডাইনিং কক্ষে জড়ো হলে গাইড মিস থাম আমাদের জাহাজের আইটিনারি নিয়ে একটি দিক নির্দেশনা দেয়। দুপুরে খাওয়ার পর ২টা বেজে ৪০মিনিটে আমাদের প্রোগ্রাম নির্ধারিত হয় ‘ হ্যা লং বে’ এর অন্যতম পুরনো গ্রাম ‘ভাসমান ফিশিং ভিলেজ দর্শন’। ঠিক ঠিক ২টা ৪০ মিনিটে দুপুরে আমার ছোট্ট কন্যা এবং মাকে নিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের সাথে ইঞ্জিন চালিত ছোট নৌকায় চড়ে বসলাম। আমার ছোট মেয়ের বয়সের সাথে সাথে তার অভিজ্ঞতা বাড়ছে, চঞ্চলতাও পাচ্ছে ভিন্নমাত্রা। তবে পুরো ভিয়েতনাম ট্যুরে সে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছে হা লং বে ক্রুজ এবং ইঞ্চিন চালিত নৌকা আর মাঝি চালিত নৌকায় (rowing boat) চলাচল।

হ্যা লং বে এর প্রকৃতি ও পরিবেশ অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষিত। এর সাথে জুড়ে থাকা জলজ জীবন, প্রাণি ও উদ্ভিদকুল এবং জেলেদের ভাসমান গ্রামের ইকোসিস্টেম বিরক্ত হয় এমন কোন কাজ পর্যটকদের করতে দেওয়া হয় না। ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে ফিশিং ভিলেজ যাওয়া যায় না, তাই আরেকটি ছোট হারবার থেকে রোয়িং বোটে করে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। যাত্রার আগে মিস থামের আবারও কিছু নির্দেশনা ছিল- জেলেদের ভাসমান গ্রামে কারো বাড়িতে যাওয়া যাবে না, ওরা যেসব কুকুর পালে তাদের কাছে যাওয়া যাবে না। কুকুরগুলো দেখতে কিউট হলেও এরা আগন্তুকদের জন্য হিংস্র আকার ধারণ করতে পারে।
ফিশিং ভিলেজ যাওয়ার পুরো পথজুড়ে দুই পাশ সম্মুখে নানা মনোরম দৃশ্য। একটা নামকরা গুহা চোখে পড়বে নাম ‘লুওন কেভ’ যার ঐ প্রান্তে যাওয়া নিষেধ, কারণ পানিতে শার্কের উপস্থিতি এবং বিপজ্জনক স্রোত।
মাথায় ভিয়েতনামীজ হ্যাট পরে মাঝি আমাদের আর আমাদের সাথে আরেক বাঙালি পরিবার নিয়ে ধীরে ধীরে বৈঠা চালিয়ে রওনা দিল। মেয়ের জন্য আমি গেয়ে উঠলাম তার প্রিয় সেই শিশু ছড়া…
‘Row row your boat
Gently down the strem
Marrily Marriy…life is but a dream’
মেয়ে খুশিতে হেসে উঠলো, আসলেও হা লং এর অপার সৌন্দর্য, সুনীল আকাশ, তাজা বাতাসে জীবনটা সত্যিই শিশুদের রাইমস এর বর্ণিল ভিডিওর মতই আনন্দময় হয়ে উঠছিল।
দুপুরবেলা আমাদের জাংক বোটের ছাদে মিস থাম আমার ছবি তুলে দিয়ে মোবাইল ফেরত দেয়ার সময় বলেছিল, মোবাইলের ব্যাটারিতে পূর্ণ চার্জ দিয়ে রাখতে কারণ ফিশিং ভিলেজ এবং এর চারপাশটা নাকি ভীষণ মনোহর, অনেক ছবি তুলতে ইচ্ছে করবে, যথাযথ চার্জ থাকা লাগবে। নৌকা স্বচ্ছ সবুজ জল কেটে যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, থামের কথার সত্যতা ততই যাচাই করতে পারছিলাম।
হাজার বছর আগের কথা, হা লং বে স্থানীয় ছোট জনপদ বসবাস করতো ভাসমান গ্রামে যার অবস্থান ছিল এসব নিমজ্জিত পর্বতের আড়ালে। ২০,০০০ বছর আগে ‘সই-নু’ সম্প্রদায়ের লোকেদের আগমন ঘটে এবং তারা টিকেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ সাল পর্যন্ত। তারপর আসে ‘সাই বিউ’ সম্প্রদায় যারা প্রায় ২০০০ বছর ঘুরে বেড়ায়। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ সালে হালং এর সংস্কৃতি ধরে রাখা হয়েছিল এবং এরা প্রায় ১৫০০ বছর শাসন করে।

ফ্লোটিং ফিশিং ভিলেজ

ঊনিশ শতকের প্রথম দিকের এখন মাত্র ৪টি ভাসমান গ্রামই টিকে আছে এবং ৪ গ্রাম মিলে লোকের সংখ্যা মাত্র ১৬০০; যারা হ্যা লং বে এর মূল অঞ্চলগুলোতে র‍্যাফট সম্বলিত নৌকা এবং ভাসমান কাঠের ঘরগুলোতে বাস করে। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ৪টি গ্রাম হলো কুয়া ভ্যান, ভুং ভিয়েং, কং ড্যাম এবং বা হ্যাং।

গ্রামের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা, অন্যান্য সামুদ্রিক জীব যেমন ঝিনুক প্রক্রিয়াকরণ, জাল বোনা কাজের সাথেও তারা জড়িত। ঐতিহ্যগতভাবে, ভাসমান গ্রামের প্রতিটি নৌকা একটি পৃথক পরিবার, যদিও ছাদের রয়েছে একাধিক ব্যবহার। এটি একই সাথে একটি বাড়ি, একটি পরিবহন, একটি উপায় এবং আয় এর একটি উৎস।
৪টি ভাসমান ফিশিং ভিলেজের ভেতর ‘ভুং ভিয়েং’ গ্রামটি সারাবিশ্বে এক অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এটি আমাদের জাংক বোট থেকে বেশ কাছের এবং আমারও কাছ দিয়ে দেখার সুযোগ হয়েছে। সাগরের ওপর ভাসমান সবগুলো রঙিন ঘর বিভিন্ন আকৃতির নৌকা এবং রাফট দ্বারা ঘেরা।

মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের মতোই এখানে স্থানীয়দের প্রায় সমস্ত কার্যক্রম সাগর এবং দর্শণীয় লাইমস্টোন দ্বীপগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পার্থক্য শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত জীবনযাত্রা যেটাই কিনা এই ‘ভুং ভিয়েং ফিশিং’ গ্রামের সংস্কৃতির অনন্য উপাদান।
হ্যা লং বে ক্রুজে আমাদের জাংক বোট যেদিক দিয়ে গিয়েছে, যেখানেই তাকিয়েছি বা রাতে যেখানেই স্থির ছিল , চারপাশ ঘিরে সেই কোটি বছরের বিস্ময়কর পর্বতমালা এবং অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি।
ভুং ভিয়েং গ্রামটিও তুলির আঁচড়ে আঁকা ছবির মতো পর্বতবেষ্টিত বিশাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঘূর্ণায়মান পাথর, স্বচ্ছ সবুজ জলরাশি দ্বারা সুরক্ষিত। বিশাল ঢেউগুলোতে ভাসমান ঘরগুলো একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে লেগে থাকে, একসাথে মাছ ধরার নৌকাগুলো নোঙ্গর করে আর তখন গ্রামটির যে অনন্য সৌন্দর্য ধরা যায় তা লিখে বা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
ভাসমান ভেলার ওপর কাঠের বাড়ি, ছোট নৌকা, ঘরে বাঁশের জাল, নির্মল আনন্দে হাস্যোজ্জ্বল তামাটে গায়ের শিশুদের দেখে ইউরোপ বা অন্য ভিনদেশি ট্যুরিস্টদের দারুণ বিমোহিত হতে দেখেছি ।
এসব ফিশিং ভিলেজ মূলত তৈরি হয়েছিল আগের দিন রাতে মাছ ধরে ফিরে আসা জেলেদের মাছ বিক্রির জন্য। কিন্তু শুধু এখানেই তারা থেমে থাকেনি। এই ভাসমান গ্রাম খুব দ্রুত এসব জেলেদের আবাস স্থলে পরিণত হয়। তারা এখানে থাকতো, খেতো, ঘুমাতো, কাজ করতো, উৎসব করতো, এমনকি স্কুলও ছিল এই ছোট্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামে।

ফ্লোটিং ফিশিং ভিলেজ

জল ও স্থলের সাথে ঐক্য রেখে প্রতিটি গ্রামেই সম্পূর্ণরূপে নিজস্ব ধারার একটি সমাজব্যবস্থা ছিল। সকলে মিলেই প্রতিদিনের নানা উত্থান-পতন একত্রে সামলে নিতো।
এসব স্থানীয় জেলেরা প্রাণচঞ্চল, দুর্যোগ মোকাবেলা করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে খুব দ্রুতই। আধুনিক জীবনের যাবতীয় সমস্যার বেড়াজালমুক্ত জীবনের অধিকারী এসব জেলেদের জীবনযাত্রা সময়ের সাথে খুব একটা বদলায় নি।
একটা সময় হ্যা লং বে-এর এই ভাসমান গ্রামগুলো ছিল সবচেয়ে অনন্য এবং নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ এক কমিউনিটি। কিন্তু এখন সেই বড় জনপদে বসবাস করে না। কয়েক বছর আগে ভিয়েতনাম সরকার এখানকার অধিবাসীদের ভাসমান জীবন ছেড়ে মূল ভূখন্ডে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
প্রথম প্রথম গ্রামবাসীরা খুব রুষ্ট ছিল সরকারি এই সিদ্ধান্তে, যে আদি নিবাস গড়তে কয়েক প্রজন্ম লেগেছে, সেটি ছেড়ে আসা ভীষণ কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল তাদের জন্য। কিন্তু সরকারের যুক্তি ছিল খুব স্পষ্ট ও জোরালো- মানুষের জীবনযাত্রার মান, বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত হবে যদি তারা মূল ভূখণ্ডে ফিরে যায়। দূষণ এবং পরিবেশ রক্ষাও ছিল বড় একটা বিবেচ্য বিষয়।
কিন্তু সবাইকে ফিরিয়ে আনা হয়নি। হা লং বে এর সেই ৪টি ভাসমান গ্রাম অবিকলভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, ঠিক আগের মতোই। এখন আর এখানে সব সময়ের জন্য কেউ থাকে না, কিন্তু স্থানীয়রা এখনও মাছ ধরা, জাল বোনা, ঝিনুক ছেঁচে মুক্তা সংগ্রহের কাজগুলো এখানেই করে।

ট্যুরিস্টদের কাছে হ্যা লং বে ‘ফিশিং ভিলেজ’ দর্শন খুবই জনপ্রিয়। আমার যদিও গ্রামে তাদের ঘরে ঢোকার সুযোগ হয়নি তবুও ভীষণভাবে মনোরম প্রকৃতির মাঝ দিয়ে এসব রঙিন ভাসমান গ্রামগুলো দেখে হ্যা লং বে এর স্বতন্ত্র ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির শিকড়ের সন্ধান টের পেয়েছি। এসব গ্রামের স্থানীয়রা কখনোই মূল ভূখণ্ডের জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে চায় না এবং এই গ্রাম তাদের কাছে ভীষণ গৌরবের বিষয়।

জাংক বোট এর আইটিনারিতে ‘রোয়িং বোট’ ভ্রমণে ফ্লোটিং ফিশিং ভিলেজ দেখার পথেই চোখে পড়ে ট্যুরিস্ট আকর্ষণ ‘লুওন গুহা’। এটি দেখার জন্য ‘হ্যা লং বে ক্রুজ’ হচ্ছে সর্বোত্তম পন্থা।
বো হ্যান দ্বীপে অবস্থিত এই গুহাটি বন্ধ খিলান আকৃতির (Arch Shape) পাহাড়ের মত মনে হয়। লুওন গুহার দৈর্ঘ্যে ৬০ মিটার এবং চওড়া ৪মিটার। আর জোয়ারের উচ্চতার ওপর নির্ভর করে সিলিং এর উচ্চতা ২ থেকে ৪ মিটারের মধ্যে থাকে। স্থানীয় ভাষায় লুওন গুহার নামকরণ হয়েছে এর সুড়ংগ আকৃতির বৈশিষ্ট্যের জন্য। দূর থেকে আমার কাছে নদী বা লেকের ওপর যে সেতু থাকে তার নিচে যে খিলান আকৃতি থাকে, এর নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল করে এমনটি মনে হয়েছে।

লুওন গুহা

হ্যা লং বে এর সব গুহা চমকপ্রদ আকৃতির জন্য পরিচিত। আমি এর বুকে সব শক্ত লাইম স্টোন পর্বত দেখেছি। কিন্তু নরম অংশগুলো কোটি বছরে সামুদ্রিক জোয়ার, তীব্র বাতাস, ঝড় বৃষ্টিতে তলিয়ে গিয়েছে…আর শক্ত লাইমস্টোনগুলোও এই সব সহ্য করে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কোনটা দেখতে কচ্ছপের মত (Tortoise Island) কোনটা দেখতে মানুষের মাথার মত (Man’s Head Island)…আবার ছোট বড় বিস্ময়কর আকৃতি ও বর্ণের গুহা গঠন হয়েছে। হা লং বে এর অন্যান্য গুহার মতো লুওন গুহারও আছে নানা বিচিত্র সৌন্দর্য্য। গুহার ভিতর পানির কিছু অংশ বাষ্পীভূত হয়ে গুহার সিলিং এ আটকা পড়ে শত শত বছর ধরে রাসায়নিক ক্রিয়ায় শিলায় রূপান্তরিত হয়। প্রকৃতির নিজস্ব চিত্রকলার গ্যালারি ঘুরে দেখা যায় ছাদ ফুঁড়ে বের হওয়া শ্বাসমূলের মত ঝুলন্ত দণ্ড, একইভাবে গুহার মেঝেতেও বাষ্পীভূত জল আটকা পড়ে শিলায় রূপান্তরিত হয়। লুওন গুহার কাছে সারা বছর ধরেই স্বচ্ছ আয়নার মত এমারেল্ড সবুজ রঙ এর পানি হাজার হাজার ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করে। ক্যায়াকিং এর জন্য এই গুহা আদর্শ স্থান। গাইড আমাদের নিষেধ করেছিল লুওন গুহার ওই পাড়ে না যেতে; স্রোতের তীব্রতা এবং শার্কের উপস্থিতির জন্য এই সতর্কতা। ভেতরে প্রবেশ করতে হলে কায়াকিং বা ছোট রোয়িং বোট এর সাহায্য নিতে হয়।

আমি বাংলাদেশের মেয়ে, গ্রামীণ অখণ্ডিত সৌন্দর্য্য, জেলেদের, জেলে শিশুদের তামাটে ত্বকের সাথে পরিচিত, কিন্তু মূল ভূখণ্ডের বাইরে সম্পূর্ণ এক জনপদ- শান্ত প্রকৃতিকে বিরক্ত করে কোথাও কোন কোলাহল নেই, মানুষের এমন জীবন যাপন আমাকে মুগ্ধ করেছে।
অনেক দিন হয়ে গেলো, দেশে আসার পরে বিখ্যাত কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের ‘দি ফিশারম্যান ‘ কবিতার মতো ভিয়েতনামের সেসব চিতাপরা মুখের ‘সিম্পল এন্ড ওয়াইজ’ জেলেদের চেহারা প্রায়ই আমার মনে ভাসে।

আরো পড়তে পারেন

হবিগঞ্জের ‘সাতছড়ি ইকোপার্ক’

কে বলে জীবন সুন্দর নয়? দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেটে পা ফেলে ফেলে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের জন্য কথাটা সত্য নয়। প্রকৃতি সেখানে নিপুন হাতে সাজিয়েছে নিজের সংসার। শুধু চোখ থাকা চাই আর চাই নূর কামরুন নাহার আর আল্পনা ভাবীর মত বন্ধুত্বের রসায়ন। বিষয়টি হবিগঞ্জ যাবার আগেও বার কয়েক বুঝেছিলাম মেঘনায়, মুন্সিগঞ্জে, সেন্টমর্টিনে এবং….

নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী

সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে বিরিশিরি যাওয়া এক মহা যজ্ঞ। সে কেবল পারা যায় সুসং দুর্গাপুর আর বিরিশিরি যদি আকুল হয়ে ডাকে। সে ডাক শুনতে পায় মুষ্টিমেয় কিছু পাগল পর্যটক। আমি শুনতে পেয়েছিলাম অনেক আগে, জানতাম একদিন না একদিন সাড়া দিবই। সুযোগ হচ্ছিল না। এখন অপার অবসর-বাঁধা বন্ধনহীন। ফয়সালকে ফোন দিলাম- আমাদের নেত্রকোনার সহকারি কর কমিশনার,….

ইথিওপিয়ার শরণার্থী শিবির ও বিভ্রান্ত নারী

দিন কয়েক হলো আমি ইথিওপিয়ার দানাকিল ডেজার্টে ভ্রমণ করছি। বেজায় রুকুসুকু এ মরুভূমির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০২ ফুট নিচে, তাপমাত্রাও পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। আমি উঠেছি গালগামোশ সরাই নামে একটি গেস্টহাউজে। এ যাত্রায় আমার পরিকল্পনা হচ্ছে, অ্যারতা অ্যালে নামে একটি আগুনের লেলিহান শিখা বিচ্ছুরিত আগ্নেয়গিরিতে যাওয়া। ওখানে যেতে হলে বিশেষ রকমের প্রস্তুতি নিতে হয়, পার্মিশন….

error: Content is protected !!