Author Picture

কোয়ান্টাম সত্য

খন্দকার রেজাউল করিম

রবীন্দ্রনাথ: “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম “সুন্দর’,
সুন্দর হল সে।”

আইনস্টাইন: তোমার কবিতাটি সুন্দর, তবে তোমার সাথে আমি একমত নই। পান্না এবং চুনি কয়েকটি বিশেষ তরঙ্গদৈর্র্ঘের আলো প্রতিফলন করে, তোমার চেতনার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কাঁচের গ্লাসভর্তি পানিতে একটি লোহার রড রেখে পাশ থেকে দেখলে রডটি বাঁকা মনে হবে। তোমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং তোমার চেতনা তোমাকে মিথ্যে খবর দিচ্ছে। তোমার চেতনার উপরে আস্থা না রাখাই ভালো। তুমি তো জানো আমি তোমার মতোই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। তোমার মতোই বিশ্বাস করি যে তিনি সত্য ও সুন্দর। তুমি এবং আমি না জন্মালেও ঈশ্বর সত্য ও সুন্দর হতেন।

নিউটন: সত্য এবং সুন্দর! দুটি অর্থহীন শব্দ। যা মাপা যায় না তার কোনো অর্থ নেই। এখানে আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের কারণেই সোজা রডটিকে বাঁকা লাগছে। সব কিছু মেপে বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে রডটি বাঁকে নি। আমাদের চেতনা ভুল করতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের যন্ত্রপাতি থেকে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। সত্য বলতে আমি বুঝি বাস্তবতা (রিয়ালিজম)। তোমাদের দুজনের মতো আমিও ঈশ্বর বিশ্বাসীর দলে, তবে বিজ্ঞানের জগতে বিশ্বাস শব্দটিকে টেনে না আনাই ভালো। আমার প্রিন্সিপিয়া বইটিতে ঈশ্বর শব্দটি ব্যবহার করার প্রয়োজন একবারও হয় নি।

বোর Neils Bohr): চিরন্তন সত্য এবং সুন্দর বলতে কিছুই নেই, প্রতি মুহূর্তে সব বদলে যায়। বস্তুর একটা তাৎক্ষণিক রূপ আছে তবে বারেবারে মেপে দেখতে হবে সেই রূপ বজায় আছে কি না! যতবার মাপবে ততবার নতুন রূপের সন্ধান পাবে। কোয়ান্টাম রিয়ালিজম সে কথা-ই বলে।

প্লেটো: ধরা যাক এক গুহার ভিতরে এক ধরণের প্রাণী বাস করে। জন্ম থেকে ওরা ওখানেই বন্দী হয়ে আছে। সূর্যের আলোয় গুহার গায়ে ওদের ছায়া পড়ে। গুহার বাইরে তাকানো বারণ। ওই ছায়া দেখেই ওরা সূর্যের সত্যটা জানতে চায়। এই অভিশপ্ত প্রাণীদের নাম মানুষ। বিজ্ঞানীদের দল এবং ওদের যন্ত্রপাতির সাধ্য নেই গুহার বাইরের সত্য খবর সংগ্রহ করার।

আইনস্টাইন: আমি অতো হতাশাবাদী নই। “যে মহাসত্তা আমার অস্পষ্ট, ভঙ্গুর চেতনায় নিজেকে প্রকাশ করেন, তাঁকে আমি প্রণতি জানাই। সেটাই আমার ধর্ম।” মানুষের চৈতন্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটা সত্য আছে। এটা প্রমান করার ক্ষমতা আমার নেই, এ শুধুই বিশ্বাস। প্লেটোর গুহায় বসে আমি সেই সত্যকেই খুঁজেছি। এই সন্ধানে আমি ব্যবহার করেছি কল্পনা, অল্প কিছু যুক্তি এবং অংক। ছেলেবেলায় অনেক রূপকথার গল্প পড়েছি। শেকল দিয়ে আমাকে গুহায় আটকে রাখতে পারো, কিন্তু আমার কল্পনাকে ঠেকাবে কে?

লেখক : তোমাদের লেখা পড়ে জীবনের সিংহভাগ পার করেছি। মূর্খ লোকেরও চেঁচানোর অধিকার আছে। সেই অধিকারে এ যুগের হালচাল কিছু শোনাই। ১৯৬০ সালের দিকে লেসার আলো আবিষ্কারের পরে আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম বাস্তবতার এক্সপেরিমেন্টগুলো সহজেই করা গেছে। কোয়ান্টাম জড়াজড়ি quantum entanglement) একেবারে সত্যি ঘটনা। প্লেটোর গুহায় বন্দী হয়েও আমি বাইরের জগতের সাথে যুক্ত। গুহার ভিতরের সংবাদ মুহূর্তে পৌঁছে যায় মহাবিশ্বের আরেক প্রান্তে। আলোর চেয়ে বেগে। কেমন করে তা বোঝার সাধ্য আমার নেই।

আইনস্টাইন: “মানুষের জীবন সময় এবং স্থান দিয়ে ঘেরা, মহাবিশ্বের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ। আমি আর সব কিছু থেকে নিজেকে যে আলাদা বলে ভাবি তা শুধুই আমার চেতনার ভ্রান্তি। এই ভ্রান্তি একটি কারাগারের মতো, আমরা শুধুই আমাদের আশেপাশের কয়েকজনকে ভালোবাসতে শিখি। আমাদের কাজ হবে এই কারাগার ভেঙে বেরিয়ে এসে সবাইকে ভালোবাসতে শেখা, প্রকৃতির সকল সৌন্দর্যকে দুহাতে জড়িয়ে ধরা।”

রবীন্দ্রনাথ: আমি তো সেই কথাটাই সারা জীবন বলে এসেছি! তুমি, আমি, ঈশ্বর একসাথে বেশ আছি, আলাদা হলেই বিপদ !
“সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব নিয়ে।
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই–
“তুমি সুন্দর’,
“আমি ভালোবাসি’।”

বোর: ঈশ্বর এবং ধর্ম নিয়ে জীবনে মাথা ঘামাই নি। তবে বিজ্ঞানের জগতে একটা সত্য খেয়াল করেছি, “দুই ধরণের সত্য আছে। কিছু সত্য অতি তুচ্ছ, যার উল্টোটা অবশ্যই মিথ্যা। আবার এমন কিছু সত্য আছে যা অসম্ভব গভীর, যার উল্টোটাও সত্য।” অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব মন্দ লাগে না! রবীন্দ্রনাথের ভয়ের কোনো কারণ নেই, “ভালোবাসি” কথাটা জীবনে অনেক বার বলেছি।

লেখক : শুনেছি হাইস্কুলের ফুটবল খেলায় তুমি গোলি হতে, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় যখন বল নিয়ে হানা দিচ্ছে, তুমি তখন গোলপোস্টে সমীকরণ লিখছো। তোমার গণিততত্ত্ব দিয়ে কি আর গোল ঠেকানো যায়? গোল বাস্তব, তোমার সমীকরন কল্পনা।

আইনস্টাইন: তবুও ভালো যে বোর গোলপোস্টে সমীকরণ লিখেছে! কোনোরকম লেখালেখিতে ওর ছিল ভীষণ আলসেমি, শুনেছি হাইড্রোজেন পরমাণু নিয়ে বোর-তত্ত্ব ও ওর প্রেমিকা মার্গারেথকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলো। নারীর প্রেমের এমন অপব্যবহার আর কেউ কখনো করেছে কি? আমার আবার ছিল লেখার বাতিক। বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে ওদের খাওয়ার টেবিলের কাপড়ে সমীকরণ লিখতাম। বন্ধুপতœীরা আমাকে একঘরে করে দেয়ার কথা ভাবতো।

লেখক : আবার কাজের কথায় আসা যাক। কোনো কিছু মাপা গেলেই তাকে জানা যায় কি? তোমরা এতগুলো পন্ডিত এখানে জড়ো হয়েছ। কেউ কি আমাকে বোঝাতে পারো ইলেক্ট্রনের চক্কর (spin) কি?

ডিরাক Paul Dirac): আমার সমীকরণে এই চক্কর কোথা থেকে এসে জুড়ে বসেছে, ল্যাবে ওটাকে মাপা গেছে। দেখো হে ছোকরা, বেশি প্রশ্ন করো না। মুখ বন্ধ রেখে অংক করতে থাকো!

আরো পড়তে পারেন

বোধ

জীবনানন্দ দাস : আলো – অন্ধকারে যাই – মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে! উপেক্ষা করিতে চাই তারে: মড়ার খুলির মতো ধরে আছাড় মারিতে চাই। তবু সে মাথার চারিপাশে! তবু সে চোখের চারিপাশে! তবু সে বুকের চারিপাশে! রবীন্দ্রনাথ: আরো বেদনা আরো বেদনা, প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা। লেখক : হে প্রভু, কবিদের….

আলো আমার আলো

ভ্যান গ (Vincent Van Gogh, ১৮৫৩-১৮৯০): আমি একজন পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট (post-impressionist) শিল্পী। আমার আঁকা ‘নক্ষত্র-খচিত রাত্রি (Starry Night)’ পৃথিবীর শিল্পানুরাগীদের ঘরে ঘরে টাঙানো থাকে। আমার তোলপাড় মনের দশা প্রকাশ করেছি রঙের বেহিসেবি ছড়াছড়িতে।  আমার সবচেয়ে প্রিয় রং ছিল হলুদ। আমি এঁকেছি ‘ফুলদানিতে হলুদ সূর্যমুখী ফুল,’ কখনো বারোটা ফুল, কখনো বা চোদ্দটা। আমার তুলিতে ভোরের এবং সাঁঝের….

সাহিত্য পুরস্কার

বাংলাদেশে সম্প্রতি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও করপোরেট হাউজগুলোর আলাদা বা যৌথভাবে সাহিত্যের নামে পুরস্কার দেয়ার হিড়িক পড়েছে। এত ঢাকঢোল বাজিয়ে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেন সাহিত্যের নামে পুরস্কার দিচ্ছে, ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো। প্রথমে ব্যাংকের কথাই ভাবি, ব্যাংকের কাজ সম্পর্কে মোটামুটি সবাই জ্ঞাত। এটা এমন এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যার সবই সুদের ফাটকা ব্যবসা। ব্যাংক সঞ্চয়মুখী জনগণের….

error: Content is protected !!