খ্রীষ্টান পাদ্রীর দল (৪৫০-১৫০০): গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস যীশুর জন্মের চার’শ বছর আগে পরমাণুর যে সব গালগল্প শুনিয়েছে সেগুলো সব মিথ্যে। নিশ্ছিদ্র, কঠিন, গোলাকার পরমাণু; দেখা যায় না, ভাঙা যায় না, পরিবর্তন করা যায় না! তাই যদি হবে তবে রুটি এবং মদ থেকে যীশুর রক্ত তৈরী (Eucharist) হলো কেমন করে? নাস্তিক কবি এপিকিউরাস এবং লুক্রেটিয়াস পরমাণু নিয়ে কবিতা-গান লিখেছে, মূর্খরা তাই নিয়ে মাতামাতি করছে। নরকের অধিবাসী সব, ওদেরকে পুড়িয়ে মারা উচিত।

লেখক : প্লেটো-এরিস্টটল-সক্রেটিসের আমলে ধরা হতো যে বস্তু চার ধরণের উপাদান দিয়ে তৈরী; পাথর, বায়ু, পানি, এবং আগুন। সেই সময়ে আরেক গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস পরমাণুর কথা বলেন, যা দিয়ে সব পদার্থ তৈরী, যা গোলাকার, কঠিন, নিশ্ছিদ্র, যাকে আর ভাঙা যায় না। পরমাণুকে খালি চোখে, এমন কি মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না। এমন না দেখা জিনিসে বিশ্বাস রাখাই কঠিন, গবেষণা করা তো আরো কঠিন। গ্যালিলিও, নিউটন, ম্যাক্সওয়েল সবাই পরমাণুতে বিশ্বাস করতেন। তবে একটা পরমাণুর ওজন বা আয়তন কত, পরমাণু কি দিয়ে তৈরী তা সবই ছিল কল্পনার বিষয়। রসায়নবিদরা বস্তুর রাসায়নিক বিক্রিয়া (chemical reaction) থেকে পরমাণুর কথা জানার চেষ্টা করেছে; হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, এবং কার্বন জাতীয় পদার্থের সাথে লবন, পানি, এবং চিনির যে একটা পার্থক্য আছে তা বুঝে ফেলেছে। রসায়নবিদ ডালটন এই দুই ধরণের পদার্থের নাম দিলেন, যথাক্রমে, মৌলিক (element) এবং যৌগিক (compound) পদার্থ। ডালটন মৌলিক পদার্থের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে পরমাণু (atom) বলে চিহ্নিত করলেন, এবং যৌগিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশের নাম দিলেন অনু (molecule)।

ডালটন (John Dalton, ১৭৭৬-১৮৪৪): আমি একজন ব্রিটিশ রসায়নবিদ। আমাকে অনেকে পরমাণুর পিতা বলে ডাকে। আমি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে না দেখা পরমাণুর খবর জানতে চেয়েছিলাম। সোডিয়াম এবং ক্লোরিন একসাথে মিলে লবন (সোডিয়াম ক্লোরাইড, NaCl) তৈরী করে। এই মিশ্রনে ক্লোরিন এবং সোডিয়ামের ওজনের অনুপাত হয় ৩৫/২৩। তেমনি আমি দেখেছি যে ১২ গ্রাম কার্বন এবং ১৬ গ্রাম অক্সিজেন মিলে কার্বন মনোক্সাইড তৈরী করে এবং ১২ গ্রাম কার্বন এবং ৩২ গ্রাম অক্সিজেন মিলে তৈরী করে কার্বন ডাই অক্সাইড। এই অনুপাত গুলো ১২/১৬ এবং ১২/৩২। সবই কেন পূর্ণসংখ্যার অনুপাত? তা ছাড়া কার্বন এবং অক্সিজেনের দুটি মিশ্রনে অক্সিজেনের অনুপাত ৩২/১৬=২/১। কেন? অক্সিজেন পরমাণু কি কার্বন পরমাণুর চেয়ে ১৬/১২ গুন ভারি? কার্বন ডাই অক্সাইডে কি দুটো অক্সিজেন পরমাণু আছে? এই সব ধাঁধা সহজেই সমাধান করা যায় যদি পরমাণু তৈরী হয় আরো ক্ষুদ্র কণা দিয়ে। যদি কার্বন পরমাণুতে ১২ টি, অক্সিজেন পরমাণুতে ১৬ টি, ক্লোরিন পরমাণুতে ৩৫ টি, এবং সোডিয়াম পরমাণুতে ২৩ টি এমন কণা থাকে তবে ধাঁধার উত্তরটা সহজেই মিলে যায়!

লেখক : এই না দেখা কণাদের নাম প্রোটন এবং নিউট্রন। সেই সাথে আছে ইলেক্ট্রন বলে খুব হালকা একধরণের কণা। এই তিন ধরণের কণা একসাথে মিলেই পরমাণু তৈরী হয়। ইলেক্ট্রনে আছে নেগেটিভ বৈদ্যুতিক চার্জ, প্রোটনে আছে সমপরিমাণ পজিটিভ বৈদ্যুতিক চার্জ এবং নিউট্রনে কোনো চার্জ নেই।

মেনডেলেয়েভ (Dmitri Mendeleev, ১৮৩৪-১৯০৭): আমাকে ‘পিরিয়ডিক টেবিলের’ পিতা বলে ডাকা হয়। স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে, কলেজে-পড়ুয়া ছেলেদের টি-শার্ট, কফি কাপ, এবং আরো অনেক কিছুর গায়ে হয়তো এই টেবিলটি আঁকা দেখেছেন। মহাবিশ্বের সব পরমাণুর ফিরিস্তি এবং গুণাবলীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা খুঁজে পাবেন এখানে। ১৯৫৫ সালে আমেরিকার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ১০১ নম্বর পরমাণু আবিষ্কার হলো তখন আমার সম্মানে তার নাম দেয়া হলো মেনডেলেভেয়াম।

আমার এই সম্মানের পুরোটাই হয়তো আমার মায়ের পাওনা। আর কোনো মা তার ছেলের শিক্ষার জন্যে এতো কষ্ট করেছেন কি না তা আমার জানা নেই। ছেলেবেলায় বিভিন্ন পদার্থের টুকরো ঘরে নিয়ে এসে জমিয়ে রাখতাম। ওদের ওজন মাপতাম, গন্ধ নিতাম, এমন কি মুখে দিয়ে চেখে দেখতাম। মা ধরে নিয়েছিলেন যে তার ছেলে একদিন মস্ত বিজ্ঞানী হবে। কিন্তু কিশোর বয়েসেই বাবাকে হারাতে হলো। মা একটি পুরানো কারখানা চালু করে সংসারের হাল ধরেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটিও আগুনে পুড়ে গেল। সাইবেরিয়ার ছোট্ট একটি শহরে ছিল আমাদের বাড়ি। ‘আমাকে নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে, আমাকে বড় বিজ্ঞানী হতে হবে’, এই ছিল আমার মায়ের সর্বক্ষণের চিন্তা। একদিন ভোরে সামান্য কিছু সম্বল এবং আমাকে নিয়ে মা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন! তিনি মস্কো যেতে চান, ওখানে আছে এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক কষ্টে দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মস্কো পৌঁছাই। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলাম না। এবার মা আমাকে নিয়ে চললেন পিটার্সবার্গের উদ্দেশ্যে। আবার ঘোড়ার পিঠে ছয়’শ কিলোমিটার পথ! এবারে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ ঘটলো। এতো ধকলের পরে মা আর বেশিদিন বাঁচেন নি।

আমাকে নিয়ে মা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন! তিনি মস্কো যেতে চান, ওখানে আছে এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক কষ্টে দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মস্কো পৌঁছাই। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলাম না। এবার মা আমাকে নিয়ে চললেন পিটার্সবার্গের উদ্দেশ্যে। আবার ঘোড়ার পিঠে ছয়’শ কিলোমিটার পথ! এবারে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ ঘটলো। এতো ধকলের পরে মা আর বেশিদিন বাঁচেন নি। মায়ের কষ্ট আমি কোনোদিন ভুলি নি। মায়ের দুঃখের মর্যদা দিতে আমি সারাজীবন পরিশ্রম করেছি

মায়ের কষ্ট আমি কোনোদিন ভুলি নি। মায়ের দুঃখের মর্যদা দিতে আমি সারাজীবন পরিশ্রম করেছি।
আমাদের সময়ে প্রায় ষাটটি মৌলিক পদার্থের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিলো। আমি ভালোবাসতাম এসব পদার্থের নামকরণ করতে, তাদের গুণাবলী সংগ্রহ করে গুণাবলী অনুসারে ছক কেটে কাগজে লিখে ফেলতে। অনেক পদার্থের তখনো আবিষ্কার হয়নি! এই ছক কাটা কাগজটাকেই এখন পিরিয়ডিক টেবিল বলা হয়। রসায়ন শাস্ত্রের প্রতিটি ছাত্রের পড়ার টেবিলের সামনে এই টেবিল টাঙানো থাকে। এই টেবিলের অনেক ঘর আমি শূন্য রেখেছিলাম। এই শূন্য ঘরে যে পরমাণুটি বসবে তাকে আমি কল্পনায় আবিষ্কার করে তার একটা নামও দিয়ে দিতাম। ওদের গুণাবলীও বলে দিতাম। যেমন আমি বলেছিলাম এমন পরমাণুর খোঁজ করো যার ওজন হবে হাইড্রোজেন পরমাণুর ৬৮গুন, ও ৩৪ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলে যাবে, ইত্যাদি। ফরাসি এক বিজ্ঞানী এই পরমাণুটি আবিষ্কার করে তার নাম দিয়েছিলো গ্যালিয়াম! আমার মৃত্যুর ৩০বছর পরে টেকনেটিয়াম বলে একটি দুষ্প্রাপ্য পরমাণুর খোঁজ পাওয়া যায় যার ভবিষ্যৎবাণী আমি বেঁচে থাকতেই করেছিলাম। গানের সুরে ‘সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি’র পরে আবার ‘সা’ ফিরে আসে। পদার্থের গুণাবলীও তেমনি এক ‘পিরিয়ডিক’ ছন্দে সাজানো। কতগুলো বস্তুর রাসায়নিক গুণাবলী একই রকম, যেমন হাইড্রোজেন, লিথিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ইত্যাদি। এই পরমাণুগুলো ক্লোরিন জাতীয় পরমাণুর সাথে মিশে যৌগিক পদার্থ তৈরী করে। কিছু পরমাণু বিশেষ কিছু পরমাণুর সাথে মিলিত হয়ে অনু সৃষ্টি করতে চায়। পরমাণুর এই ভালোবাসাবাসির কারণটা আমি কখনো বুঝি নি!

থমসন (J.J. Thomson, ১৮৫৬-১৯৪০): আমি ১৮৯৭ সালে ইলেক্ট্রন আবিষ্কার করি, ১৯০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাই। মেনডেলেয়েভ, তুমি যেটা বোঝোনি তার কারণ এই ইলেক্ট্রনদের মতিগতি। পরমাণুরদের এই ‘রাগ-অনুরাগের’ কারণ হলো ইলেক্ট্রনের দল! সোডিয়ামের একটা ইলেক্ট্রন ভীষণ দরকার, ক্লোরিনে সেটা দিতে পারে, তাই এই দুই পরমাণু একসাথে ঘর বেঁধে সোডিয়াম ক্লোরাইড তৈরী করে যা লবন হিসেবে আমরা খাই। এই রাসায়নিক ভালোবাসা না থাকলে রান্না হতো কেমন করে?

আরো পড়তে পারেন

তুমি ঢেউ, আমি কণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ‘তোমরা দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও, সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও, বসন-আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে, হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে। তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি, কোনো সুলগনে হবো না কি কাছাকাছি।’ লেখক : মেয়ে যদি হয় ঢেউ, পুরুষ হবে কণা! রবি ঠাকুর, তুমি কোয়ান্টাম রাজ্যে চলে এসো। এখানে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটে।….

ঘটনায় আসলে কি ঘটে; মহামারির কালে সাহিত্য ও সত্যের সম্পর্ক বিচার

করোনা শেষ না হলেও। মহামারীর প্রথম ধাক্কাটা এক রকম শেষ। শোকের আয়ু যেখানে হাতের আঙুলে গোনা যায় সেখানে মহামারীরও লম্বা সময় ধরে চলার সুযোগ নাই। নানান কারণে মৃত্যুর মিছিল সরবে বা নীরবে জারি আছে। সারা দুনিয়াতে একই কারণে মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে উত্তরাধুনিককালে প্যানিক বা আতঙ্ক করোনাকে বিশ্ব মহামারির মর্যাদা দিয়েছে। দুনিয়ার কিছু প্রান্তে এখনও….

কবিতার হেঁয়ালি, রূপক, শব্দ-সঙ্গীত: বোর্হেসের অভিভাষণ

‘আমার সবসময়ই মনে হয়েছে স্বর্গ বোধ হয় গ্রন্থাগারের মত কিছু একটা’— কবি ও সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস এর এ উক্তিটি প্রমাণ করে, সারাজীবন ধরে জ্ঞানের জগতকে তিনি কোন চোখে দেখেছেন। তাই মৃত্যুর ওপারেও স্বর্গকে তিনি আর কিছু নয়, কেবল গ্রন্থাগার বলেই কল্পনা করেছেন। বোর্হেসের জন্ম (১৮৯৯), বেড়ে ওঠা সবই আর্জেন্টিনায়। তাঁর রচনাকর্ম দর্শন ও কল্পকাহিনী….

error: Content is protected !!