Author Picture

কবিতার হেঁয়ালি, রূপক, শব্দ-সঙ্গীত: বোর্হেসের অভিভাষণ

লীনা দিলরুবা

‘আমার সবসময়ই মনে হয়েছে স্বর্গ বোধ হয় গ্রন্থাগারের মত কিছু একটা’— কবি ও সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস এর এ উক্তিটি প্রমাণ করে, সারাজীবন ধরে জ্ঞানের জগতকে তিনি কোন চোখে দেখেছেন। তাই মৃত্যুর ওপারেও স্বর্গকে তিনি আর কিছু নয়, কেবল গ্রন্থাগার বলেই কল্পনা করেছেন।
বোর্হেসের জন্ম (১৮৯৯), বেড়ে ওঠা সবই আর্জেন্টিনায়। তাঁর রচনাকর্ম দর্শন ও কল্পকাহিনী ঘরানায় প্রভূত অবদান রেখেছে। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, বিশ শতকের লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার সূচনা বোর্হেসের মাধ্যমেই। তাঁর পরবর্তী পর্যায়ের কবিতাগুলোতে স্পিনোজা, ক্যামেওস ও ভার্জিলের মত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বোর্হেসের অভিভাষণ (১৯৬৭-৬৮, হার্ভার্ড) নিয়ে লেখা গ্রন্থ ‘দিস ক্রাফট অব ভার্স’ ‘দ্য চার্লস এলিয়ট নর্টন লেকচারস’ এর অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। বক্তৃতাটির ছিল ছয়টি ভাগ। ‘দিস ক্রাফট অব ভার্স’-এ বোর্হেসের মন ও মননকে অধিকার করে রাখা প্রশ্ন ও ধাঁধাগুলো সম্বন্ধে ঘনিষ্ঠ ধারণা পাওয়া যায়। কবিতা বিষয়ক নানা বিষয়ের আলোচনার প্রয়োজনে বোর্হেস কীটস, বোদলেয়ার, প্লেটো, সার্ভান্তেস থেকে শুরু করে রাফায়েল ক্যানসিনোস -আসেন্স, ওমার খৈয়াম, চুয়ান জু-র রচনা এবং নর্স মিথলজি, কাবালা, ভারতীয় দর্শনের মতো জ্ঞানের বিচিত্র সাহিত্যিক ধারায় বিচরণ করেছেন।

শিল্প-সাহিত্যে বিধৃত উপলব্ধি, কলানৈপুণ্য ইত্যাদি নিয়ে এর আগে হার্ভার্ডের এ চেয়ার আলোকিত করেছেন গিলবার্ট মারি, টি এস এলিয়ট, ইগর স্ট্রাভিনস্কি, লিওনার্ড বার্নস্টাইন, পল হিন্ডেমিথ, ফ্রাঙ্ক স্টেলা ও জন কেইজ-এর মতো ব্যক্তিত্বরা। বোর্হেস যে বক্তৃতামালাটি প্রদান করেন, তার টেপগুলো একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী কালে হার্ভার্ড প্রফেসর ক্যালিন-আন্দ্রেই মিহিলেস্কুর সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। বোর্হেস-এর এই অভিভাষণটি অপূর্ব জামানের অনুবাদে ‘কবিতার কারখানা’ শিরোনামে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতার প্রথম পাঠই হলো আসল পাঠ। এর পরে আসলে যা হয়, পাঠক এমন এক বিশ্বাসে নিজেকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন মনে হয়, পাঠকের অনুভূতি, উপলব্ধির পুনরাবৃত্তি ঘটছে

বইটিতে আমরা দেখতে পাই অসাধারণ বিনয় ও স্পষ্টতার সাথে সাধারণ মানুষেরও বোধগম্য করে তিনি তাঁর বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন। এই ধারাবাহিক অভিভাষণটি দিতে গিয়ে বোর্হেস কাব্যের হেঁয়ালি, রূপক, শব্দ-সংগীত, কবিতা অনুবাদের সম্ভাব্যতা বা অসাম্ভব্যতা, গল্পের বয়ান, মহাকাব্য নিয়ে ইতিপূর্বের অননুভূত এবং অগোচর বিষয়কে মানুষের অনুভূতি এবং গোচরের মধ্যে নিয়ে আসেন। শেষ অংশে তিনি বলেছেন ‘কবির ধর্ম’ নিয়ে। এই অংশটি তাঁর লেখালেখি এবং উদ্ভাবনকে স্পষ্টতা দান করেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন অপরিচিত এবং অশ্রুত বিষয়কে, যা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল, তিনি বলতে চেয়েছেন তাঁর কল্পনা এবং নতুন উদ্ভাবনকে নিয়ে, যা তাঁর দুর্বোধ্যতা, রহস্যময়তাকে দূর করতে সাহায্য করেছে। আমরা দেখেছি, ‘দিস ক্রাফট অব ভার্স’ এর প্রায় সব কথাই ছিল কবিতাকে ঘিরে, অন্যদিকে যাবতীয় লেখালেখিই ছিল এর উপজীব্য। কবিতা কীভাবে কবিতা হয়ে ওঠে তা থেকে শুরু করে রূপক ও অনুবাদ সংক্রান্ত বিবিধ প্রসঙ্গ, এবং নিজের লেখালেখি— এ সবই অকপট ভাষাভঙ্গিতে অভিভাষণে আলোচিত হয়েছে।

কবিতার হেঁয়ালি দিয়ে বোর্হেস তাঁর বক্তৃতা আরম্ভ করেছিলেন। বোর্হেস জানান, তাঁর পুরো জীবন জুড়ে তিনি যা করেছেন তা হচ্ছে পড়া, বিশ্লেষণ করা, লেখা এবং উপভোগ করা। তিনি উল্লেখ করেন, শেষের কাজটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিয়েছে। বোর্হেস সৃষ্টির রূপানুশীলনের পশ্চাতে অজ্ঞাত যে বিষয়টিকে চিহ্নিত করেন, সেটি কবিতা। তিনি বলেন ‘আমি নিশ্চিত যে জীবন কবিতা দিয়ে তৈরি।’ তাঁর মনে পড়ে যায় সেই কথা, যে গভীর ও বিস্তৃততর আবেগ মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয় কবিতা আকারে। তিনি বলেন, কবিতা কোনো আগন্তুক নয়, কবিতা ঘাপটি মেরে থাকে কোনো এক কোণায়, সেটি যে-কোনো মুহূর্তে মানুষের উপর লাফিয়ে পড়তে পারে। তিনি স্মরণ করেন বিশপ বার্কলে কে। যিনি বলেছিলেন, ‘আপেলের স্বাদ বলতে আমরা যা বুঝি তা আপেলের মধ্যে থাকে না— আপেল নিজে তার স্বাদ নিতে পারে না—আবার খাদকের মুখের মধ্যেও এই স্বাদ থাকে না। এর জন্য এই দুয়ের সংযোগ ঘটানোর প্রয়োজন পড়ে। একই জিনিস ঘটে বইয়ের ক্ষেত্রে কিংবা বইয়ের সংগ্রহ, গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে।’ জন কীটস এর একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কবিতাটি যে অদ্ভুত সেটি পাঠকরা হয়ত লক্ষ করেনি, কারণ, কবিতায় কোনো কিছু নিখুঁত ভাবে থাকলে সেই অদ্ভুত রূপটি পাঠকের কাছে ধরা পড়ে না। এটিকে বেশ অনিবার্য মনে হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখকের মর্মযাতনা যে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না সেটির জন্য হতাশা প্রকাশ করেছেন। এর পরই তাঁর আলোচনা মোড় ঘুরে যায় কবিতা পাঠ বিষয়ে। বোর্হেস বলতে চান কবিতার প্রথম পাঠই হলো আসল পাঠ। এর পরে আসলে যা হয়, পাঠক এমন এক বিশ্বাসে নিজেকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন মনে হয়, পাঠকের অনুভূতি, উপলব্ধির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তবে কবিতার হেঁয়ালির আলোচনায় সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ছিল ক্লাসিকের ধারণাকে পাল্টে দেয়া। বোর্হেস অসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে মার্কিন চিত্রকর উইস্টলার এর উক্তি— ‘শিল্প সৃষ্টি হয়’ এই কথাটিকে যথার্থতা দিয়ে মূলত ক্লাসিক শব্দটিকেই বাতিল করে দিতে চান। এটি এমন, যেন ক্লাসিক বলতে কিছু নেই, শিল্প প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে, যা ভেঙে দিতে পারে ক্লাসিকের চিরন্তন ধারণা।

অনেকে কবিতা বুঝতে চান। সম্ভবত তাদের জানার আগ্রহ তাঁকে উসকে দিয়েছিল কবিতা বিষয়ে একটি সংজ্ঞা প্রদান করতে। তিনি স্মরণ করেন সেইন্ট অগাস্টিনকে, যিনি ‘সিটি অব গড’ রচনা করেছিলেন। এই মহাগ্রন্থ তিনি তের বছর ধরে লিখে তাতে সর্বপ্রকার সমস্যাকে গ্রন্থভুক্ত করেন। অগাস্টিন বলেছিলেন, ‘সময় কী? মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস না করলে আমি ঠিকই জানি সময় কী। যদি তারা আমার কাছে প্রশ্ন রাখে সময় কী, তাহলে আমি আর জানি না সময় কী।’ সময় নিয়ে অগাস্টিনের এই ভাবগত অর্থকে বোর্হেস আত্মীকরণ করেন কবিতার সংজ্ঞা নির্ধারণে, তিনি বলেন, ‘কবিতার ব্যাপারেও আমার একই ধরনের অনুভূতি হয়।’ অর্থাৎ, কবিতা কি তিনি জানেন কিন্তু কেউ যদি তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখে কবিতা কী, তাহলে বলতে হবে, তিনি জানেন না, কবিতা আসলে কি। তার মানে, কবিতা কী, তা কেবল উপলব্ধির বিষয়, বর্ণনার নয়। এবার তাঁর প্রথম কথাগুলোকে আবার স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি বলেছেন, তিনি সারাজীবন পড়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, লিখেছেন, আর উপভোগ করেছেন। শেষের বিষয়টিই, উপভোগ করা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত অগাস্টিনকে উদ্ধৃত করলেও, কবিতার সংজ্ঞা নির্ধারণে উপভোগকেই তিনি যেন টেনে আনলেন। অর্থাৎ, কবিতাকে সংজ্ঞায় ফেলো না, কেবল উপভোগ করো।

বইকেনা বিষয়ে বোর্হেস চমৎকারভাবে বিবৃত করেছেন বই সংগ্রহ এবং বইকেনার অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার কথা। এই উপলব্ধি নিঃসন্দেহে তাঁর মনের দিগন্তকে এবং তাঁর সৃষ্টিপ্রবাহের সাধারণ উৎস সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবে। তিনি বলেন, ‘‘মাঝে মাঝে আমি বাড়িতে আমার বইয়ের সংগ্রহের দিকে তাকিয়ে অনুভব করি যে হয়তো এগুলো শেষ করার আগেই আমি মারা যাব, তবুও আমি নতুন বই কেনার লোভ সংবরণ করতে পারি না। যখনই আমি কোনো বইয়ের দোকানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে আমার শখের বিষয়ে কোনো বই পেয়ে যাই— উদাহরণ স্বরূপ, প্রাচীন ইংরেজি বা প্রাচীন নর্স কাব্য— আমি নিজেকে বলি, ‘আহা কী করুণ ব্যাপার, আমি এই বইটি কিনতে পারি না কারণ বইটি আমার বাড়িতে আছে।”

তিনি নিজেকে উন্মুক্ত করতে চান, আবার সংশয়কেও পুরোপুরি দূরীভূত করতে অক্ষম। শিল্পে কোনও নতুন সমস্যা যেমন তিনি তৈরি করছেন না, তেমনি কোনো সমাধানও দিতে অপারগ, তিনি কেবল সৃষ্টি করতে পারেন চিরন্তন কিছু বিভ্রম, তবে এ কাজটি তিনি করেন নিপুণতার সঙ্গে এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও উদাহরণ সবই ছিল আগ্রহোদ্দীপক

রূপক সাদৃশ্যমূলক অলংকার। ব্যাকরণগতভাবে রূপক হলো উপমান এবং উপমেয়ের অভেদ কল্পনামূলক অলঙ্কারবিশেষ। যে দৃশ্যকাব্যে কোনো তত্ত্বকে রূপ দেওয়া হয়, তাও রূপক। বোর্হেস রূপকালংকার এর সবগুলো রূপ নিয়ে কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে রূপক বিষয়ে চীনাদের বহুল আলোচিত ধারণাগত বৈশিষ্ট্যকে তিনি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। চীনারা জগতকে বলে দশ হাজার জিনিস, বা দশ হাজার সত্তা। অর্থাৎ, তাদের কাছে রূপকের ধারণা সংখ্যাগতভাবে ধরা দিয়েছে। বোর্হেস দশ হাজার সংখ্যাটাকে আলোচনায় রেখে বীজগণিতের সূত্র ধরে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, সকল রূপকই সৃষ্টি হয় দুটো ভিন্ন ধরনের জিনিসের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে, এবং এর মাধ্যমে অবিশ্বাস্য সংখ্যক সম্ভাব্য রূপক বের করে আনা যায়। এই অবিশ্বাস্য সংখ্যক সম্ভাব্য রূপক দশ হাজারকে নয় হাজার নয়শ নিরানব্বই দিয়ে গুণ করে তাকে আবার নয় হাজার নয় শত আটানব্বই দিয়ে গুণ করলে যা দাঁড়ায় তার সমান। এই সম্ভাব্য জোড়া অসীম নয় কিন্তু এর পরিমাণ বিপুল। বোর্হেস বলতে চান, রূপকের ধারণা এমন বিশাল যে, রূপক ব্যবহারে জগতের সকল কবিকে অনুকরণের দ্বারস্থ হবার প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য রয়েছে অসংখ্য নতুন নতুন রূপক।

ছয়টি বক্তৃতার তৃতীয় আলোচনাটি ছিল ‘গল্প বলা’ বিষয়ে। তাঁর কল্পনায় কবিদের যেন দুটো ভাগ। একপক্ষ লিরিক বা গীতিকবিতা লেখেন। বাকীরা লেখেন মহাকাব্য। লিরিক যা কাহিনী বা গল্প বর্ণনা করে না, যার মধ্যে কেবল একজন মানুষের মনের ভাব, অনুভূতি বা চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটে, মোটামুটি ছোট কবিতার এই কাব্যরূপটির চেয়ে বোর্হেসের পক্ষপাত গল্প বলিয়েদের প্রতি। যাকে তিনি বলেছেন মহাকাব্য। উপন্যাসকে তিনি মনে করেন মহাকাব্যের ক্ষয়প্রাপ্ত রূপ। বিনয়ের সঙ্গেই তিনি একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, একদিন গল্প এবং গান মিলে মিশে এক হয়ে যাবে। ১৯৬৭-৬৮ সালে বলা বোর্হেসের উপরোক্ত উক্তির যথার্থতা ২০১৬ সালে বব ডিলানের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর অনেকটা সত্য হয়ে ধরা দেয়। তিনি লেখেন, ‘আমি হয়তো উনিশ শতকের একজন সেকেলে লোক কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে আশাবাদ, আমার মধ্যে রয়েছে প্রত্যাশা, এবং যেহেতু ভবিষ্যতের ভান্ডারে রয়েছে অনেক কিছু, সম্ভবত, ভবিষ্যতের ভান্ডারে রয়েছে সবকিছু— মহাকাব্য আমাদের কাছে ফিরে আসবে। আমি বিশ্বাস করি কবি আবারো হয়ে উঠবে নির্মাতা। আমি বোঝাতে চাইছি, সে আবার গল্প বলবে এবং সেই গল্প গানের মতো করেই গাইবে। এবং আমরা দুটো জিনিসকে আলাদা করে ভাবব না, যেমনটা আমরা আলাদা করি না হোমার বা ভার্জিলের ক্ষেত্রে।’ ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে তিনি যে অতুলনীয় ছিলেন এসব উদাহরণের পর এখন আর সেটি নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।

শব্দ-সংগীত এবং অনুবাদ পর্বে তাঁর পক্ষপাত আক্ষরিক অনুবাদের দিকে। আক্ষরিক অনুবাদকে তিনি তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে চান। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ইংরেজিতে বলা হয় good morning (শুভ সকাল), আর হিস্পানিক ভাষায় বলা হয় Buenos manana (শুভ দিবস)। যদি good morning কে অনুবাদ করে বলা হয় Buenos manana (শুভ সকাল) তাহলে আমরা বুঝতে পারি যে অনুবাদ আক্ষরিক হয়েছে কিন্তু সত্যতার কাছাকাছিও হয়নি।
এক্ষেত্রে হিব্রু ভাষার তুলনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘হিব্রু ভাষায় কোনো সুপারলেটিভ নেই। তাই তারা ‘সর্বোৎকৃষ্ট গান’ কিংবা ‘শ্রেষ্ঠ গান’ বলতে পারেনি। তারা বলেছে ‘গানের গান’, যেমন তারা সম্রাট কিংবা সর্বোচ্চ রাজা বোঝাতে বলত, ‘চাঁদের চাঁদ’ কিংবা সবচাইতে পবিত্র রাত বোঝাতে বলত ‘রাতের রাত’। ইংরেজি অনুবাদ ’গানের গান’ এর সাথে যদি লুথারের জার্মান অনুবাদের তুলনা করা হয় তাহলে আমরা দেখতে পাব যে সৌন্দর্যের দিকে লুথারের কোনো নজর ছিল না, তিনি কেবল চেয়েছিলেন জার্মানরা যেন টেক্সটটি বুঝতে পারে। তিনি অনুবাদ করলেন, ‘ডাস হোহে লিড’, উচ্চাঙ্গের গীতিকবিতা’। তো, আমরা দেখলাম আক্ষরিক অনুবাদ দুটি সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।’’
‘চিন্তা এবং কবিতা’ পর্বে তিনি রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের প্রস্তাবিত কবিতার দ্বৈত চরিত্রের কথা স্মরণ করেন, স্টিভেনসনের মতে : কবিতা সাধারণ মানুষের, পথের মানুষের কাছের জিনিস, কারণ কবিতার উপাদান হলো শব্দ, আর সেই শব্দগুলো আসলে জীবনেরই ভাষা। অন্যদিকে কবিরা প্রাত্যহিক কিংবা বিমূর্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহার্য প্রতীককে দিয়ে যে নকশা বোনার ক্ষমতা রাখেন এটিও বিস্ময়কর।
বোর্হেস কবিতার পংক্তি এবং অর্থ নিয়েও অভিনব কিছু কথা বলেন। কবিরা পংক্তি রচনা করেন, পাঠক সেটিতে অর্থ বসিয়ে দেয় যে যার মতো করে। বোর্হেস মনে করেন, অর্থ হলো পংক্তির উপর আরোপিত বাড়তি কিছু। আমরা কোনো কবিতার সৌন্দর্যে প্রধানত মুগ্ধ হই, এরপরই এতে অর্থ আরোপ করতে থাকি। আবার কোনো কোনো পংক্তি কেবল সৌন্দর্যের বিচারে উৎরে যায়, সেখানে কোনো অর্থ না থাকলেও কবিতা হতে তার কোনো বাধা থাকে না।
শেষ পর্বে তিনি বলেছেন ‘কবির ধর্ম’ নিয়ে। বোর্হেস বলেন, ‘আমি নিজেকে মূলত একজন পাঠক মনে করি। আপনারা লক্ষ করে থাকবেন যে আমি দুঃসাহস দেখিয়েই লেখালেখি করেছি; কিন্তু আমি মনে করি যে আমি যা লিখেছি তার চাইতে আমি যা পড়েছি তা ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ তাই পড়ে যা সে পছন্দ করে— অথচ মানুষ তার পছন্দ মতো লিখতে পারে না, সে লিখে তার সামর্থ অনুযায়ী।’

মার্কেস একটি পৃষ্ঠা লিখতে পাঁচশ তা কাগজ নষ্ট করেছেন, আর জীবনানন্দ সম্পাদকের কাছে লেখা পাঠিয়ে প্রুফ দেখিয়ে নিতে তাগাদা দিতেন। অবশ্য লেখালেখিতে কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অবিকল এক রকম সাদৃশ্য অনুসন্ধান করা যায় না। তবু লেখায় সহজ ভাব ধরে রাখতে বোর্হেসীয় অনুধাবনকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে

বোর্হেস নিজের গল্প লেখার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একটি উদাহরণ উপস্থাপন করেন। ঐ বিশেষ ধরনের গল্পগুলো যখন তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন, তখন মূলত এর শৈলী নিয়ে খাটাখাটনি করেছিলেন, এবং অনেক সময় গল্পগুলোকে বহুস্তরের প্রলেপের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তাঁর মনে ধরেনি। এ প্রসঙ্গে যে গল্পটির কথা বলা হয় এর নাম ‘এল ইর্মোতাল’। এর পেছনের ধারণা সস্পর্কে তিনি বলেন, যদি কোনো মানুষ অমরত্ব লাভ করত তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তার সব কথা বলা হয়ে যেত, সব কাজ করা হয়ে যেত, যা লেখার তা লেখা হয়ে যেত, এরকম বিষয় কল্পনা করে গল্পটি লেখা হয়েছিল। গল্পে তিনি হোমারকে উদাহরণ হিসেবে নিয়েছিলেন; হোমার ইলিয়ড লিখেছেন। তিনি কল্পনা করলেন ইলিয়ড লেখার পরও হোমার বেঁচে রইলেন, এবং প্রজন্মের পালা বদলের সাথে সাথে তিনি বদলাতে শুরু করেন। এভাবে বদলাতে গিয়ে হোমার গ্রিক ভাষা ভুলে যান এবং এ সময়ের মধ্যে তিনি ভুলেই গিয়েছেন যে তিনি আসলে হোমার ছিলেন। একটা সময় হয়তো আসে যখন পোপ অনূদিত হোমারকে কেবল চমৎকার শিল্পকর্ম হিসেবেই দেখা হবে না বরং মূল্যের প্রতি সৎ থাকার জন্যও একে স্মরণ করা হবে। গল্পে হোমারের এই আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ার বিষয়টি গোপন করা হয়েছে অনেকগুলো কাঠামোর আড়ালে, যেগুলো বোর্হেস বুনেছিলেন একটি নতুন কাঠামো হিসেবেই। কিন্তু পরে গল্পটি পড়ে তাঁর মনে হয়েছিল, এটিতে তিনি বেশ পান্ডিত্য ফলিয়েছেন, বস্তুত তিনি যদি সরলভাবে গল্পটি লিখতেন তবে অনেক ভালো হতো বলে বোর্হেস বিশ্বাস করেন। তার মানে, গল্পের শৈলী নিয়ে বেশি পান্ডিত্য প্রদর্শন তিনি অনুমোদন করেন না।

বোর্হেস লেখকদেরকে উপদেশ দিতে চান লেখার বিষয়ে। তাঁর মতে, লেখায় যতদূর সম্ভব কম ঘষা-মাজা করা উচিত। তিনি মনে করেন না যে, বারবার ভাঙ্গা-গড়া কোনো ভালো কিছু বয়ে আনে। লেখায় ঘষা-মাজা বিষয়ে জীবনানন্দ দাশ বা মার্কেসকে বিস্মৃত হয়ে দেখা যাক, যারা এক্ষেত্রে অতুলনীয় উদাহরণ রেখে গেছেন। মার্কেস একটি পৃষ্ঠা লিখতে পাঁচশ তা কাগজ নষ্ট করেছেন, আর জীবনানন্দ সম্পাদকের কাছে লেখা পাঠিয়ে প্রুফ দেখিয়ে নিতে তাগাদা দিতেন। অবশ্য লেখালেখিতে কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অবিকল এক রকম সাদৃশ্য অনুসন্ধান করা যায় না। তবু লেখায় সহজ ভাব ধরে রাখতে বোর্হেসীয় অনুধাবনকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

শিল্প নিয়ে বোর্হেসের এই বক্তৃতাগুলো মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তিবোধের কাছে যেমন, হৃদয়ের কাছেও পৌঁছে যায়। এগুলো ছিল বক্তৃতা; এবং জনতুষ্টির একটি উদ্দেশ্যও এখানে রয়েছে— এ কারণে যুক্তিতর্কগুলো তাঁর লেখার মতো আনুষ্ঠানিক বা সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি— লিখনশৈলী এখানে সরাসরি এবং উদার। তিনি রবার্ট ফ্রস্ট-এর সুপরিচিত স্তবকগুলোর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, বলেছেন, ‘সকল অনুবাদই তাদের অতুলনীয় মূলকে ধারণ করতে পারে না’— এমন সুপ্রচলিত কুসংস্কারের বর্ণনা থাকলেও, মাস্টারমশাইয়ের মতো আঙ্গুল তুলে বোঝানোর ভঙ্গি তাঁর ছিল না, বরং ভঙ্গিটি ছিল আন্তরিক ও দিলখোলা। সাহিত্য বিষয়ে বোর্হেসের ভাবনা সবসময়ই কৌতূহলজনক, এরকম অনেক ভাবনার নির্যাস যেহেতু এখানে স্থান পেয়েছে সেহেতু এটি সাহিত্যেও বিশেষ মূল্য পেয়েছে। তিনি নিজেকে উন্মুক্ত করতে চান, আবার সংশয়কেও পুরোপুরি দূরীভূত করতে অক্ষম। শিল্পে কোনও নতুন সমস্যা যেমন তিনি তৈরি করছেন না, তেমনি কোনো সমাধানও দিতে অপারগ, তিনি কেবল সৃষ্টি করতে পারেন চিরন্তন কিছু বিভ্রম, তবে এ কাজটি তিনি করেন নিপুণতার সঙ্গে এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও উদাহরণ সবই ছিল আগ্রহোদ্দীপক। তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনি কবিতা ও সাহিত্যের দক্ষ ব্যাখ্যাকার— জয়েস-এর ফিনেগান’স ওয়েক পাঠের প্রমাণ যেমন রাখেন, তেমনি প্রকৃত অর্থের তুলনায় অনুভূতির গুরুত্বকেও জোর দিয়ে উল্লেখ করতে ভোলেন না। আমরা জানি বোর্হেস একজন বুদ্ধিজীবী, একটি সাহিত্যকর্মের নেপথ্যে কী কাজ করে তা তিনি বোঝেন ভালোভাবেই, তবে কখনোই কবিতা বা গদ্যকে বুদ্ধির রসে অতিমাত্রায় সিক্ত করতে চান না। বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ বটে, তবে এটাই সব নয় এবং কোনো সাহিত্যকর্মকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে বিশ্লেষণের পক্ষপাতী তিনি নন। তবে এই অভিভাষণে তিনি অন্তর্দৃষ্টির আলোয় আলোকিত এমন সব মন্তব্য করেছেন যা কোনো সাহিত্যকর্মকে বোঝার জন্য খুবই জরুরি। আমরা দেখেছি তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনাকর্মে সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, ছয় পর্বের এই বক্তৃতাগুলোতে সেই উদাহরণ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে দেয়া তাঁর অনেক সাক্ষাৎকারের তুলনায় এটি ভিন্ন রকমের, কারণ সেসব সাক্ষাৎকারে করা অনেক মন্তব্যই সহজেই অনুমানযোগ্য, নতুন ভাবনার উন্মোচনকারী নয়।

এই অভিভাষণে সব সময়ের মতো সাহিত্য নিয়ে বোর্হেসের গভীরতর অভিজ্ঞতা, বহুতর তথ্য জ্ঞানকে রূপান্তরিত করেছে তত্ত্বজ্ঞানে এবং প্রজ্ঞায়। শেষে বলা যায়, বইটি পাঠ করার অভিজ্ঞতা এবং অনুশীলন পাঠককে তাদের সঙ্কীর্ণ অবস্থা থেকে বিস্তৃত অবস্থায় বিকশিত হতে সাহায্য করবে।

আরো পড়তে পারেন

তুমি ঢেউ, আমি কণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ‘তোমরা দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও, সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও, বসন-আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে, হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে। তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি, কোনো সুলগনে হবো না কি কাছাকাছি।’ লেখক : মেয়ে যদি হয় ঢেউ, পুরুষ হবে কণা! রবি ঠাকুর, তুমি কোয়ান্টাম রাজ্যে চলে এসো। এখানে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটে।….

ঘটনায় আসলে কি ঘটে; মহামারির কালে সাহিত্য ও সত্যের সম্পর্ক বিচার

করোনা শেষ না হলেও। মহামারীর প্রথম ধাক্কাটা এক রকম শেষ। শোকের আয়ু যেখানে হাতের আঙুলে গোনা যায় সেখানে মহামারীরও লম্বা সময় ধরে চলার সুযোগ নাই। নানান কারণে মৃত্যুর মিছিল সরবে বা নীরবে জারি আছে। সারা দুনিয়াতে একই কারণে মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে উত্তরাধুনিককালে প্যানিক বা আতঙ্ক করোনাকে বিশ্ব মহামারির মর্যাদা দিয়েছে। দুনিয়ার কিছু প্রান্তে এখনও….

আবার পরমাণু

খ্রীষ্টান পাদ্রীর দল (৪৫০-১৫০০): গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস যীশুর জন্মের চার’শ বছর আগে পরমাণুর যে সব গালগল্প শুনিয়েছে সেগুলো সব মিথ্যে। নিশ্ছিদ্র, কঠিন, গোলাকার পরমাণু; দেখা যায় না, ভাঙা যায় না, পরিবর্তন করা যায় না! তাই যদি হবে তবে রুটি এবং মদ থেকে যীশুর রক্ত তৈরী (Eucharist) হলো কেমন করে? নাস্তিক কবি এপিকিউরাস এবং লুক্রেটিয়াস পরমাণু….

error: Content is protected !!