Author Picture

তলস্টয় পুরস্কার বিতর্ক

নাজিব ওয়াদুদ

‘স্মরণ করতে চেষ্টা করুন তো কোন সব মহান রুশ লেখককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে?’ রাশিয়ার সাংবাদিক-লেখক আঁদ্রে চারখাজভ ২০০২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর প্রাভদা পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার উত্তরও দিয়েছিলেন- এসব লেখকরা হলেন মিখাইল শলোকভ, ইভান বুনিন, বরিস পাস্তেরনাক ও জোসেফ ব্রডস্কি। শেষোক্ত জনকে রাশিয়ায় কেউ কবি হিসেবে চেনেই না, এই দাবি করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার প্রায় ৪০ জন সহকর্মী-সাংবাদিককে ব্রডস্কির কবিতার অন্তত একটা চরণ স্মরণ করতে বলেছিলাম। একজনও পারেননি।’
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেজন্য ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে তিনি আরো কয়েকটা প্রশ্ন করেন, ‘সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার কে পেয়েছিলেন বলুন তো? তার নাম কেউ স্মরণ করতে পারবেন কি?’ সত্যি, তার নাম জানেন এমন লোক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তো খাতা-পত্র ঘেঁটে দেখা যায় তিনি হলেন ফ্রান্সের কবি সুলি প্রুডহোম (১৮৩৯-১৯০৭)। চারখাজভ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘এই কবি এমনকি খোদ ফ্রান্সেও অজ্ঞাতনামা।’ অথচ তখন মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০), আন্তন চেখভ (১৮৬০-১৯০৪), লিও তলস্টয় (১৮২৮-১৯১০) এবং আরো সব বড় ও মহান লেখক তাঁদের সাহিত্যকৃতির চূড়া স্পর্শ করে বেঁচে রয়েছেন। সেটা ১৯০১ সালের কথা, যে বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার চালু হয়। আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের কল্যাণে কারো সম্পর্কে কিছু জানা বেশ সহজ হয়ে উঠেছে। সেই সূত্রে জানা যাচ্ছে, ফ্রান্সের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি-লেখকদের তালিকায় প্রুডহোমের নামই নেই। জুল ভার্ন (১৮২৮-১৯০৫), এমিলি জোলা (১৮৪০-১৯০২), আনাতোল ফ্রাঁস (১৮৪৪-১৯২৪), আঁদ্রে জিদ (১৮৬৯-১৯৫১), পল ভালেরি (১৮৭১-১৯৪৫), মার্শেল প্রুস্ত (১৮৭১-১৯২২), গুইলোম অ্যাপোলিনেয়ার (১৮৮০-১৯১৮) প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক সে সময় ফ্রান্স ছাড়াও ইউরোপ জুড়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন এবং পুরোপুরি সৃজনশীল।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের শুরুতেই এজন্য বিতর্ক উঠেছিল। সে বিতর্কের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। আসলে সাহিত্যে নোবেলবিজয়ীদের তালিকা হাতড়ালে দেখা যাবে অন্তত প্রতি দশ জনের মধ্যে চারজনের নাম এখন অজ্ঞাত। অজ্ঞাত মানে নোবেল কমিটি তাদের নাম ঘোষণা করার আগে পর্যন্ত তাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে অশ্রুতপূর্ব ছিলেন এবং বর্তমানে তাঁদের নাম এবং লেখার কথা মানুষ বিস্মৃত হয়েছে। তার মানে কি এই দাঁড়াচ্ছে যে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার সাহিত্যের জন্য দেওয়া হয় না? অন্য কোনো সাফল্যের জন্য দেওয়া হয়? এই প্রশ্ন করেছেন চারখাজভ। ধারণা করা হয়, ইউরোপ-আমেরিকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙি ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ এক্ষেত্রে প্রায়শঃই প্রভাবশীল ভূমিকা রাখে। দেখা গেছে, নোবেল বিজয়ীদের অধিকাংশই ইউরোপ-আমেরিকার লোক। এর বাইরের যারা নোবেল পেয়েছেন, বেশির ভাগ আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার, তারাও কোনও-না-কোনওভাবে ইউরোপ-আমেরিকা সংশ্লিষ্ট। হয় তারা ইউরোপ-আমেরিকায় অভিবাসী, নাহয় লেখেন ইউরোপ-আমেরিকার কোনও ভাষায়, কিংবা রাজনীতি-কূটনীতি-সংস্কৃতি, বা এমনকি বন্ধুত্বের সূত্রে ইউরোপ-আমেরিকায় অনূদিত, আলোচিত ও পঠিত।

প্রথম থেকেই যে বিতর্কের শুরু সেটা হলো, আলফ্রেড নোবেল যে লক্ষ্যে পুরস্কার দিতে বলেছেন তা মান্য করা হচ্ছে কিনা। অবশ্য এ বিতর্ক এখন আর কেউ করে না। কারণ সেটাই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া যুগের প্রয়োজন বলে একটা ব্যাপার রয়েছে সেটা অনস্বীকার্য। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, কিসের ভিত্তিতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এর কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি নেই। হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬), মার্শেল প্রুস্ত (১৮৭১-১৯২২), ফ্রানজ কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪), জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১), ভ্লাদিমির নবোকভের (১৮৯৯-১৯৭৭) মতো কালজয়ী সাহিত্যিকরা এই পুরস্কার পাননি। কেন পাননি তার কোনও সন্তোষজনক জবাব নোবেল কমিটি কখনো দিতে পারেনি, বা হয়তো দিতেই চায়নি।

২০০৮ সালে সর্বপ্রথম নোবেল কমিটির প্রথম পঞ্চাশ বছরের কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়। এর থেকে নোবেল কমিটির নানা রকম পক্ষপাতিত্ব ও বিদ্বেষের তথ্য জানা যায়। ‘উচ্চ ও বলিষ্ঠ আদর্শবাদ’-এর দোহাই দিয়ে তলস্টয় ও আন্তন চেকভকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার প্রতি সুইডেন-এর ‘বিদ্বেষমূলক মনোভাবই’ এর প্রকৃত কারণ বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। চেক লেখক ক্যারেল ক্যাপেককে পুরস্কার দেওয়া হয়নি এইজন্যে যে তাঁর বই ওয়ার উইথ দি নিউটস-এ (তখন একটি বইয়ের ওপর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতো) জার্মানি সরকারের বিরুদ্ধে কথা ছিল। ১৯৫০-এর দশকে ফরাশি ঔপন্যাসিক ও বুদ্ধিজীবি আঁদ্রে মালরোর নাম বারবার বাছাই কমিটিতে উত্থাপিত হয়। কিন্তু তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এজন্যে ‘তাঁর উপন্যাসের দিকে প্রত্যাবর্তন না করাকে দায়ী করা হয়। যদিও আসল কারণ তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা প্রায়শঃই ইউরোপীয় শাসকদের অনুকূলে থাকত না। ডব্লিউ এইচ অডেনকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি এই অজুহাতে যে তাঁর একটি অনুবাদে ভুল (!) ছিল। ১৯৭৪ সালে গ্রাহাম গ্রিন, ভ্লাদিমির নবোকভ এবং সল বেলো শীর্ষতালিকায় ছিলেন, কিন্তু পুরস্কার দেওয়া হয় যৌথভাবে আইভিন্দ জনসন ও হ্যারি মার্টিনসনকে। এরা দুজন কেবল যে অপরিচিত ছিলেন তা-ই নয়, ছিলেন নোবেল পুরস্কারের বিচারকও। সল বেলোকে পরে ১৯৭৬ সালে নোবেল দেওয়া হলেও বাকি দুজনের ভাগ্যে শিঁকে ছেঁড়েনি। তাঁদের বামঘেঁষা দৃষ্টিভঙ্গিই এর কারণ বলে অনেকে মনে করেন।

সাহিত্যে নোবেলবিজয়ীদের তালিকা হাতড়ালে দেখা যাবে অন্তত প্রতি দশ জনের মধ্যে চারজনের নাম এখন অজ্ঞাত। অজ্ঞাত মানে নোবেল কমিটি তাদের নাম ঘোষণা করার আগে পর্যন্ত তাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে অশ্রুতপূর্ব ছিলেন এবং বর্তমানে তাঁদের নাম এবং লেখার কথা মানুষ বিস্মৃত হয়েছে। তার মানে কি এই দাঁড়াচ্ছে যে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার সাহিত্যের জন্য দেওয়া হয় না?

হোর্হে লুই বোর্হেসের নাম এসেছে বারবার, কিন্তু তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি দক্ষিণপন্থী স্বৈরশাসকদের সমর্থন করার অভিযোগে। অথচ বামপন্থী স্বৈরশাসক স্টালিনের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও সার্ত্রে এবং নেরুদা পুরস্কৃত হয়েছেন। সার্ত্রে অবশ্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। স্বৈরশাসক ফ্র্যাঙ্কোর পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করা সত্ত্বেও ক্যামিলো জোসে সেলাকে পুরস্কৃত করতে বাধেনি নোবেল কর্তৃপক্ষের।

২০০৪ সালে অলফ্রিদে জেলিনেককে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে নোবেল পুরস্কার কমিটির সদস্য নুট আনলুন্দ পদত্যাগ করেন। তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘জেলিনেককে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে নোবেল পুরস্কারের মর্যাদার অমেরামতযোগ্য ক্ষতি করা হয়েছে’। ২০০৫ সালে হ্যারল্ড পিন্টারের নাম ঘোষণা করতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুদিন বেশি সময় লাগে। তখন গুজব ওঠে যে নোবেল পুরস্কারের মাঝে ‘রাজনৈতিক ব্যাপার’ আছে। ২০০৬-এ অরহ্যান পামুক এবং ২০০৭-এ ডোরিস লেসিং-এর নোবেল বিজয়ের পেছনে তাঁদের প্রকাশ্য ‘পাশ্চাত্যপ্রীতি’ কাজ করেছে বলে জোর রটনা। ২০১০ সালের নোবেলবিজয়ী ভার্গাস য়োসার যোগ্যতা নিয়ে কেউ কথা বলেননি বটে কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙি ও অবস্থানও এর পেছনে কাজ করেছে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ তিনি প্রথম জীবনে কমিউনিস্ট ছিলেন। কিন্তু পরে উদারনৈতিক গণতন্ত্রী এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির সোচ্চার প্রবক্তা বনেছিলেন। আর তা এতটাই যে তিনি এমনকি ১৯৯০ সালে এই নীতি প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে পেরুর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে নামেন। অবশ্য হেরে গিয়েছিলেন। তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতি ছেড়েছেন। আমেরিকা ও সাম্রাজ্যবাদের চিরশত্রু কিউবার অবিসংবাদী নেতা ফিডেল ক্যাস্ট্রো এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের কঠোর সমালোচক তিনি। তখন তিনি আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। প্রশ্নটা উঠেছে এসব কারণেই।
এতদিন অভিযোগ করা হচ্ছিল, নোবেল কমিটি কিছুটা বামঘেঁষা হয়ে উঠেছে। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে নিষ্ক্রিয়, বা বামপন্থার প্রতি কিছুটা বিরক্ত, এ রকম লেখকদের গত কয়েক বছর থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছিল। সে অভিযোগ হয়তো বা ভার্গাস য়োসার ক্ষেত্রেও তোলা যায়, যদিও বাম রাজনীতিকে তিনি কেবল প্রত্যাখ্যানই করেননি, তার বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থানও নিয়েছেন।

১৯৯৪ সালে জাপানি লেখক কেনজাবুরো ওয়ে, ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জে. এম. কোয়েটজি এবং ২০১২ সালে চীনা নাগরিক মো ইয়ান বাদে ইউরোপীয়ানরাই গত ১৬ বছর ধরে একাদিক্রমে নোবেল পুরস্কার পেয়ে আসছেন। সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতেও ইউরোপীয়ানদেরই প্রাধান্য ছিল। হিসাব নিয়ে দেখা যাচ্ছে ১৯০১ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ১১৪ বারের মধ্যে ইউরোপীয়ানরাই এ পুরস্কার পেয়েছে ৮৮ বার। আমেরিকানরা পেয়েছে ১১ বার। ২০১১ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার কিছু আগে, সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব হোরেস এংদাল পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘…সব ভাষাতেই ভাল ভাল সাহিত্য রচিত হচ্ছে, কিন্তু ইউরোপই এখনো সাহিত্যের রাজধানী…।’ বলা বাহুল্য, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার যারা নোবেল পেয়েছেন তারাও হয় অভিবাসন সূত্রে ইউরোপ-আমেরিকার অধিবাসী, নয়তো ‘পাশ্চাত্যপ্রীতি’র ডোরে তার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা।
অস্বীকার করার উপকার নেই যে, অধিকাংশ নোবেলবিজয়ীর নামই সাহিত্যের পাঠকরা বিস্মৃত হয়েছেন। সে কারণে বিতর্ক বেড়েই চলেছে। তবে বিতর্কের সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটেছিল শুরুতেই। প্রথম প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া হয়েছিল খোদ সুইডেনেই। সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মাসখানিক পরে তলস্টয় একটা চিঠি পান। চিঠির লেখক সুইডেনের একদল লেখক ও শিল্পী। তাঁরা লেখেন-

আঁদ্রে চারখাজভের মতে প্রতি দশ জন নোবেলবিজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে নয় জনই সাধারণ ‘সাহিত্য কারিগর’। তাঁরা এমনকিছু রেখে যাননি যা স্মরণীয়। মাত্র দু-একজনই প্রকৃত গুণী লেখক। এই রকম গুটিকয়েক সত্যিকারের বড় লেখককে মাঝে-মধ্যে বেছে নেওয়া হয় নোবেল পুরস্কারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার বিভ্রম ছড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে

‘প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে আমরা আপনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে চাই। আমরা আপনাকে কেবল সমকালীন সাহিত্যজগতের কুলপতি হিসেবে দেখি না, বরং আমরা আপনাকে ওইসব শক্তিমান বাঁকবদলকারী লেখকদের একজন হিসেবেও বিবেচনা করি যাঁরা প্রথম ও সর্বাগ্রে স্মরণীয় হওয়ার দাবিদার। আমরা আপনাকে এই স্বাগতপত্রের মাধ্যমে সম্বোধন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি, কারণ আমাদের বিশ্বাস এই পুরস্কারের দায়িত্বে রয়েছে যে সংস্থাটি তা লেখকসম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙি কিংবা সাধারণ জনগণের মতামত, কোনো কিছুকেই উপস্থাপন করে না। সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে সত্যিকার শিল্প হচ্ছে সেই শিল্প যার ভিত্তি চিন্তার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতা।’
এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সুইডেনের মোট ৪২ জন লেখক, কবি ও শিল্পী। এদের মধ্যে দুজন পরে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন- ২০০৯ সালে সেলমা লেজারলভ ও ১৯১৬ সালে কার্ল হিডেনস্ট্যাম। এঁদের এই চিঠি একটা সুইডিশ সংবাদপত্র ১৯০২ সালে প্রকাশ করে দেয়। এতে প্রতিবেদক মন্তব্য করেন, সুইডিশ একাডেমির অধিকাংশ সদস্য ‘অসৎ কারিগর এবং সৌখিন সাহিত্যিক, তারা অন্ত্যমিলওয়ালা চরণকে কবিতা বলে।’
তলস্টয় এরকম আরো অনেক চিঠি পেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন-
‘প্রিয় বন্ধুগণ, আমি এটা জেনে খুশি হয়েছিলাম যে আমাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। প্রথমত, এই অর্থ কীভাবে ব্যয় করতাম সেই সমস্যা থেকে আমি বেঁচে গিয়েছি। আমি নিশ্চিত যে, এই অর্থ কেবল অকল্যাণই ডেকে আনত। দ্বিতীয়ত, এর ফলে আমি এত এত সব সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছি এমনকি যাদেরকে আমি চিনিও না তাদের কাছ থেকেও। আমি এসব উপভোগ করেছি।’
বিষয়টা এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯০৫ সালে তলস্টয়ের ‘মহাপাপ’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি দুর্ভাগ্যক্রমে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। একজন রুশ কৃষকের কঠিন জীবসংগ্রামের কাহিনি এটি। এতে জমির ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয় রয়েছে। রাশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্স এই বইটি নোবেল পুরস্কার প্রতিযোগিতায় পাঠানোর প্রস্তাব করে। দেশটির সর্ব্বোচ্চ সাহিত্য প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে অনুমোদন দেয়। ১৯০৬ সালে তাদের এই প্রস্তাব ও ‘মহাপাপ’-এর একটি কপি সুইডিশ একাডেমির কাছে পাঠানো হয়। বিষয়টি জানতে পেরে বিচলিত বোধ করেন তলস্টয়। ফিনল্যান্ডে তাঁর এক লেখক বন্ধু (অরভিদ আরনেফেল্ড) ছিলেন, সুইডিশ কমিটির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁর কাছে চিঠি লিখলেন তলস্টয়-
‘যদি সেরকমই ঘটে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করলে ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হবে। সেজন্যে আমি তোমার সাহায্য কামনা করছি। যদি সুইডেনে তোমার কোনো যোগাযোগসূত্র থেকে থাকে (আমার ধারণা, আছে), তাহলে দয়া করে চেষ্টা করো যেন আমাকে পুরস্কারটা না দেওয়া হয়।.দয়া করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করো যাতে পুরস্কারটা আমি পরিহার করতে পারি।’

পরে যা জানা গিয়েছে সেটা হলো, তলস্টয়ের নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার পেছনে মূল হোতা ছিলেন সুইডিশ একাডেমির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও স্থায়ী সচিব কার্ড ডেভিড আফ উয়িরসেন। তিনি তাঁর অভিমত দিয়েছিলেন এইভাবে-
‘তাঁর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং ‘আনা কারেনিনা’ পুরস্কার লাভের উপযুক্ত… কিন্তু তাঁর ধর্ম, সমাজ এবং রাজনীতি বিষয়ক রচনাগুলো অপরিপক্ক ও বিভ্রান্তিকর… তিনি সবধরনের সভ্যতার নিন্দা করেছেন এবং তার পরিবর্তে সকল ধরনের উচ্চ সংস্কৃতি পরিত্যাগ করে আদিম জীবনপ্রণালীর পক্ষাবলম্বন করেছেন… বাইবেলীয় সমালোচনতত্ত্বে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তিনি উচ্চাকাঙ্খির মতো নিউ টেস্টামেন্টকে নতুনভাবে লিখেছেন, এই আধা-যৌক্তিক ও আধা-রহস্যময় পুনর্লিখন করা হয়েছে সকল ধরনের সভ্যতার প্রতি এমন সঙ্কীর্ণচিত্ত শত্রুতামূলক বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে যাতে লোকে সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে। কেউ একজন যখন স্বীকৃতি পছন্দ করে না… তখন তার ওপর এরকম একটা পুরস্কার চাপিয়ে দেওয়া ভুল হবে…।’

তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই সুস্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে যে, তলস্টয়ের সাহিত্যের মান নিয়ে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই, সমস্যা লেখকের ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক দৃষ্টিভঙি নিয়ে। এখানেই লুক্কায়িত ঔপনিবেশিক মিশনের বিষয়টি।
আঁদ্রে চারখাজভের মতে প্রতি দশ জন নোবেলবিজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে নয় জনই সাধারণ ‘সাহিত্য কারিগর’। তাঁরা এমনকিছু রেখে যাননি যা স্মরণীয়। মাত্র দু-একজনই প্রকৃত গুণী লেখক। এই রকম গুটিকয়েক সত্যিকারের বড় লেখককে মাঝে-মধ্যে বেছে নেওয়া হয় নোবেল পুরস্কারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার বিভ্রম ছড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। নোবেল পুরস্কারও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী মিশনের হাতিয়ার। এর দ্বারা বিশ্বব্যাপী লেখক-পাঠক-সমালোচকদের ওপর এক বিশেষ ধরনের সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক নীতিবোধ, মূল্যমান এবং অনুরাগ ও পক্ষপাত সৃষ্টি করা, এবং কখনো কখনো চাপিয়ে দেওয়া এর মূল উদ্দেশ্য। প্রথম পুরস্কার ঘোষণার সময় থেকেই সুইডিশ নোবেল কমিটি পরিকল্পিতভাবে এই কাজ করে চলেছে। সেজন্যেই তলস্টয়কে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তাদের এই উদ্দেশ্য টের পেয়েছিলেন তলস্টয় নিজেও, সে কারণেই তিনি পরবর্তী কালে নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজস্ব নীতিবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি নিষ্ঠাবান থাকতে চেয়েছেন, অর্থ ও খ্যাতির লোভে পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক চক্রান্তের ক্রীড়নক হতে চাননি।

আরো পড়তে পারেন

তুমি ঢেউ, আমি কণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ‘তোমরা দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও, সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও, বসন-আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে, হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে। তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি, কোনো সুলগনে হবো না কি কাছাকাছি।’ লেখক : মেয়ে যদি হয় ঢেউ, পুরুষ হবে কণা! রবি ঠাকুর, তুমি কোয়ান্টাম রাজ্যে চলে এসো। এখানে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটে।….

ঘটনায় আসলে কি ঘটে; মহামারির কালে সাহিত্য ও সত্যের সম্পর্ক বিচার

করোনা শেষ না হলেও। মহামারীর প্রথম ধাক্কাটা এক রকম শেষ। শোকের আয়ু যেখানে হাতের আঙুলে গোনা যায় সেখানে মহামারীরও লম্বা সময় ধরে চলার সুযোগ নাই। নানান কারণে মৃত্যুর মিছিল সরবে বা নীরবে জারি আছে। সারা দুনিয়াতে একই কারণে মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে উত্তরাধুনিককালে প্যানিক বা আতঙ্ক করোনাকে বিশ্ব মহামারির মর্যাদা দিয়েছে। দুনিয়ার কিছু প্রান্তে এখনও….

আবার পরমাণু

খ্রীষ্টান পাদ্রীর দল (৪৫০-১৫০০): গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস যীশুর জন্মের চার’শ বছর আগে পরমাণুর যে সব গালগল্প শুনিয়েছে সেগুলো সব মিথ্যে। নিশ্ছিদ্র, কঠিন, গোলাকার পরমাণু; দেখা যায় না, ভাঙা যায় না, পরিবর্তন করা যায় না! তাই যদি হবে তবে রুটি এবং মদ থেকে যীশুর রক্ত তৈরী (Eucharist) হলো কেমন করে? নাস্তিক কবি এপিকিউরাস এবং লুক্রেটিয়াস পরমাণু….

error: Content is protected !!