Author Picture

সিদ্ধার্থ হকের ১০টি লজিং মাস্টার

সিদ্ধার্থ হক

কবিতাগুলো পড়ে প্রথমে মনে হবে- লজিং মাস্টারের জীবন তুলে আনা হয়েছে। দ্বিতীয়বার পড়লে মনে হবে- লজিং মাস্টার সকল জাগতিকতার ভ্রমণ শেষে দৃশ্যদের ইহজাগতিকতার হাতছানি দিয়ে পশ্চিমাকাশে অস্তমিত হতে যাচ্ছে। তৃৃতীয়বার পড়লে মনে হবে- পৃথিবীটা এই লজিং মাস্টারের ভিতরে ঘুর্নায়মান।  সিদ্ধার্থ হকের একটা কবিতা স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি কাব্যময়তা ধরনে সক্ষম। তাঁর কবিতায় বাস্তবতাকে চিত্রকল্প রুপেও দেখা যায়, আবার চিত্রকল্পও বাস্তব রুপে হাজির হয়। এ এক ভয়ংকর সুন্দর যাদু বাস্তবতার কবি।


লজিং মাস্টার ‍‍১

লজিং মাস্টার একা বসে আছে, পৃথিবীর দরজার ঘরে।
যা সত্য তা কষ্টের। ভাবছে সে, মৃত্যুই একমাত্র কষ্ট নয়।
জন্ম, বেড়ে ওঠা, কিম্বা জীবন-যাপন আরো অতল গহ্বর।
ঘূর্ণ অসুস্থতা, শ্বাস, ছাত্রীকে পড়ানো, ক্ষয়, সুধা, সত্য সবই।
বিষন্ন রুটিনের ঘরে, মাস্টার অপেক্ষা করে ছাত্রী আসবার।
ভিতরের ঘর থেকে আসবে সে দরজার ঘরে। পাঠ নেবে।
ফিরে যাবে, ভিতরের ঘরে। গহন কুয়ায় নেমে পানির মতন,
ঠান্ডাভাবে আগামীর অপেক্ষা করবে। বিকালে হাঁটতে যায়
লজিং মাস্টার। মাঠে গিয়ে বসে চুপি, দূরের ভিতরে।
ভাবে সে, হয়তো আমি পৃথিবীর নই। অলীকের
শূন্য থেকে এখানে এসেছি, শূন্যে ফিরে চলে যাব
মাঝখানে কিছুদিন ছাত্রী পড়াবো। রাত্রে স্বপ্ন দেখে
তার কিছু নাই ছাত্রী, লজিং; চৌকি, দরজার ঘর,
কিছু নাই তার। সে এক অনতিক্রম্য স্বপ্ন, আর কিছু নয়।


লজিং মাস্টার ২

লজিং মাস্টারের পথ ভাসমান; উঁচু নিচু হতে হতে হতে
চলে গেছে দূরে, তার দৃষ্টির বাইরে। অন্তত চাটাইয়ের মত
ঢেউ ওঠে নামে। বিষন্ন ঘরের মধ্যে বসে, তার পথ
দেখতে পায় লজিং মাস্টার। পথের নিঃশ্বাস লাগে মুখে।
শীতের আগাম অনুভূতি পায় নাকি তার মন পথ ভেবে?
আরেক দেশের বহু ঝরা পাতা উড়ে উড়ে আসে। কথা বলে।
সতর্ক ঘোড়ার মত পৃথিবীর গাছ স্থির আছে। জানে পাতা
ঝরে যাবে; দেহে ত্বক থাকবে না আর। মাথা নিচু করে রেখে
কেটে যাবে অসীম সময়। এশিয়ার নানা দেশে
তুষার ঝরবে। এক ঋতু থেকে, পৃথিবী, আরেক ঋতুর মধ্যে
যাবে, মাতৃ জরায়ুতে ফিরবার মত। ফলে যা মসৃণ তা
পথ নয়। ইট সুড়কি পিচ পথ নয়। বস্তুতও নয় কোন পথ।
শুধু শীতকালে আমি ভ্রমণ করব; পাথরের ঠান্ডা জিহবা
আমার ভিতরে ঢুকে যাবে। ফলে পথ শীতকাল।
তাই পথ অন্বেষণের দিকে ক্রমাগত যায়। সত্য নয়;
নয় মিথ্যা; এই শীতকাল ভেদ করে ক্রমাগত হাঁটাই
তবে পথ। পথ তবে পাথরের আলো, আর সূর্যের আঁধার;
এইসব ভেবে, একা, ঝিম মেরে বসে থাকে লজিং মাস্টার।


লজিং মাস্টার ৩

এই একচালা ঘরই তার দেশ, অন্তরের গ্রাম আর নদী।
তার ঘরের সামনে যে পুকুর, সেটা এক সমুদ্র।
ঘরের পাশ দিয়ে যে শুড়কির রাস্তা চলে গেছে,
তা আন্তনক্ষত্রীয় মহাপথ। মফস্বলের রিক্সাগুলো,
ছোট ছোট স্যাটেলাইট, টুন টুন করতে করতে
চলে যায়। অন্তহীন ঢেউটিন, ছড়ানো রয়েছে,
চলে গেছে অপার নিঃসীমে, সব, দৃষ্টির বাইরে।
শীতের বাতাস শোনা যায়। মাস্টার টের পায়
এবারের শীতে বাতাস কিংম্বা শব্দেরও শীত লাগছে।
সে তোমাকে যায় নাই ছেড়ে, তুমিও ছাড়োনি তাকে।
দুজনেই দুজনার ভিতরে রয়েছ। তোমার প্রতিটি
এটোমের মধ্যে সে আছে; তুমি তার প্রতি শূন্যে,
পৃথিবীর প্রতিটি ঘরের মধ্যে আজো আছো।
প্রত্যেক শয্যায়, প্রতিটি ঘরের কম্পিত অন্ধকারে
অদৃশ্য অস্পষ্ট ঘুণপোকা আছে। দুইহাতে
মাথা চেপে লজিং মাস্টার এইসব ভাবে।
রাত বাড়তে থাকে। দূরে পুকুরের নম্র পাড়ে
ডাব খসে পড়ে। কেউ কাশে। কেউ নিঃশব্দে
জন্ম নেয়। লজিং মাস্টারের ঘুম নাই।
চোখ খুলে শুয়ে আছে, দুর্বিষহ স্বপ্নের ভয়ে।


লজিং মাস্টার ৪

অনিঃশেষ রিলে রেসে লজিং মাস্টার বাস করে।
বেদনার, অসুস্থতার, অনিদ্রার, অবহেলার, অপ্রেমের
রিলে রেসগুলি চারপাশে ক্রমান্বয়ে ঘোরে। এক অসুস্থতা
আরেক অসুস্থতার হাতে তুলে দেয় তাকে। এক বেদনা,
না ফুরাতেই, পরবর্তী বেদনাকে খোঁজে। হাওয়া গাছ
থেকে গাছে অসীম মাদুরের মত ঢেউ হতে হতে যেতে থাকে।
পাখিদের রিলে রেস রাত্রির আগে আগে শান্তভাবে ঘটে।
তার ঘরে বহু পাখি থাকে। বহু মানুষের নিঃশ্বাস তার
ঘরের ভিতরে শোনা যায়। ক্ষুদ্র ঘরে শীতকালে
পাতা ঝরে দলে দলে। পাতাদের ক্রমে ঘুরে ঘুরে
নেমে আসা দেখে বাতাসের অতল অস্পষ্ট
সিঁড়িগুলি যেন দেখা যায়। সে যখন বসে থাকে,
এক বসা তাকে পরের বসার মধ্যে ক্রমাগত
ঠেলে দিতে থাকে। ফলে বসার ভিতর থেকে
আরো বসার ভিতরে, আরো আরো বসার ভিতরে
যেতে থাকে, লজিং মাস্টার। সবচেয়ে বেশি ঘোরে ক্লান্তি।
এক ক্লান্তি তাকে আরেক ক্লান্তির হাতে তুলে দেয় ভোরে।
ক্লান্তি থেকে ক্লান্তি থেকে ক্লান্তিতে যেতে যেতে,
যে কোনো সময়ে, মাস্টার, অনেক ক্লান্তির মুঠির ভিতরে
গ্রহের মতন ঘুরতে থাকে। হাত থেকে হাত থেকে হাতে,
শেষহীন রিলে রেসে যেতে যেতে, লজিং মাস্টার ভাবে,
আমার জীবন এক গোলমেলে রিলে রেস, যার শেষ নাই।


লজিং মাস্টার ৫

নিঃসঙ্গতা আরেকজন মানুষের মত। এবং নিঃসঙ্গতাই
তার বন্ধু; আর কেউ নয়। আর সব মরিচীকা।
মৃদুভাবে বসে থাকা ছাড়া, তার, আর কোনো অভিপ্রায় নাই।
দিনে সত্য প্রকাশিত হয়। রাত্রির অন্ধকারে, বুক ভেদ করে
অজস্র জোনাকি পোকা বাইরে বের হয়;
অনেক জোছনা বুকে ঢোকে। ঘরের ভিতরে উইপোকা আসে;
পিঁপড়ার ঢিবিগুলি যুদ্ধের কবরের মত ওঠে নামে।
লজিং মাস্টারের ওই শব্দহীন বসে থাকা, মাঝে মাঝে
সশব্দে আমাকে ডাক দেয়। ধাক্কা মারে।
সে আর এ আমি এক নই; তবু, তবু যেন এক।
টেবিলে কুনুই রেখে বসে আছে, সে কে?
বহুদিন ঘুম নাই বলে তার ঘুমবিহীনতা আমাদের
ঘুমে দেখা দেয়। তার জেগে থাকা আমি আমার ঘুমের
মধ্যে দেখি। আমার সজাগ হওয়া, সেকি তার
ঘুমে দেখতে পায়? লজিং মাস্টারের শ্বাস সর্বদাই শুনি।
পাখিদের ডাকগুলি কাছে আসে, দূরে সরে যায়।
অদ্ভুত এক পাখি, কেন যেন উড়তে উড়তে ডাকছে।
লজিং মাস্টারের মুখহীন মুখ, কেন আমি
সারাদিন, সারারাত দেখি? কী করে একটি লোক
ক্ষুদ্র এক ঘরে বসে তার সব জীবন কাটায়… হয়ত বা
একচালা ঘরের ছাদ, ছাদ নয়, অন্তহীন মহাকাশ।
একটি ক্ষুদ্র চৌকি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টেবিল, মাটির কলসে পানি,
দুতিনটা বই, এই নিয়ে লজিং মাস্টারের ঘর, প্রতি রাতে,
আšতনক্ষত্রীয়যান হয়ে ওঠে। মায়ার বাঁধনগুলি খুলে ফেলে
কোথায় না কোথায় সে যায়। চৌকির নিচে বসে
পিঁপড়ার সৈন্যদল গান করে কিম্ভুতকিমাকার রবে;
চুপ করে শুয়ে বসে সেই গান শুনি। তুমিও কি শোনো?


লজিং মাস্টার ৬

চেতনার মত, হায়, নিঃসঙ্গতাও, নিরাকার।
সবাই নিঃসঙ্গ নয়; হয়তোবা দুই তিনজন।
তবু অনেকেই ভাবে নিঃসঙ্গ তারাও।
যথার্থ নিঃসঙ্গ তারা তবে?
লজিং মাস্টার ভাবে। তার মনে ঢেউ ওঠে নামে।
যাদের চোখের মধ্যে একা মানুষের মর্মভেদী দ্যুতি নেই,
মুখের হাসিতে ব্যথা নেই; সব মানুষের ব্যথা একসাথে
ধারণ করবার মত নদী নাই যাদের কথায়
তারা কি নিঃসঙ্গ? একা বসে থাকো তুমি অনেক বছর;
এক স্থানে বসে থেকে দিনের আলোর, ছায়ার, অন্ধকারের
ঘুরে চলা বারবার, বারবার দেখো। সারাদিন ধরে দেখো
একটি পাতা আলো আর বাতাসের সাথে,
ক্রমে, কিভাবে খেলছে। দেখ একা বসে
পাতার বৃন্তচ্যুতির মুহূর্ত কি অসীম কী গভীর।
ঝরা পাতাদের সাথে সাথে ব্রহ্মা- ঐ
বাতাসের মধ্য দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে আসছে নিচে।
মানুষ হাঁটতে হাঁটতে নাই হয়ে যায় দেখো সেই
সীমাহীন নাই হয়ে যাওয়া বারবার, বারবার।
গুহার ভিতরে এক সূর্য কথা বলে।
করোটিতে তবু শুধু ব্যাপ্ত অন্ধকার।
মন হয়, আলোর চেয়েও দ্রুতগামী।
সকলের মধ্যে বসে নিঃসঙ্গতা দাবী করে যারা,
তারা শুধু সকলের মধ্যে বসে আছে, হয়তোবা,
তারা বেশ ফ্যাশনেবল, এবং দিনে দিনে
অনুকরণের মত আরামদায়ক হয়ে গেছে।
অযুত মসৃণ পথ ফেলে রেখে পিছে,
কেবা আর পথ খোঁড়ে নিজের ভিতরে।
হায়, তবু হয়ত বা, নিঃসঙ্গ সকলে।
সকলেই খুঁড়ছে তার পথ, একা একা।
ভাবে বসে লজিং মাস্টার।
বহু জীবনের ফুল অত্যন্ত ধীরে ধীরে ফোঁটে।
ভোর বেলা, ঝরা পাতা দিয়ে দাঁত ঘঁষতে ঘঁষতে,
নিহত পাখির মত, নিঃসঙ্গতা, ধুপ করে,
পুকুর পাড়ের, কালো, নরম মাটিতে পড়ে যায়।


লজিং মাস্টার ৭

স্পেস স্পর্শ করতে করতে পাতাগুলি নেমে আসছে নিচে।
ঝরছে বাঁশের পাতা দলে দলে রাতে অন্ধকারে; ঝরতে ঝরতে
নাই হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। বাগানের দিক থেকে অবিরাম
পাতা ঝরবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। পাতাগুলি নামতে নামতে
কথা বলছে পরস্পরের সাথে। জীবনে গল্প করছে ওরা সব
মৃত্যুর পরে। কিন্তু ওরা বৃন্তচ্যুত শুধু মৃত নয়। মাটির ওপরে
জমে উঠছে নাড়াকুটাদের মত, বছরের ক্লান্ত প্রদীপের মত।
শীতের গভীরে নেমে, ধীরে ধীরে হাঁটছে ওরা পৃথিবীর
চাটাইয়ের ওপরে। ডাকছে পরস্পরকে; পথের ওপর দিয়ে
গড়াতে গড়াতে কত শব্দহীন কথা যে বলছে। পথে পথে,
পাতার বিভিন্ন চাকা তৈরি হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ফের।
ঝিম হয়ে বসে আছে লজিং মাস্টার। নিভু নিভু হ্যারিকেনটার দিকে
নির্নিমেষে তাকিয়ে রয়েছে, বহুদিন, গত কোন শীত থেকে। বহু ঋতু
এসে ফিরে গেছে শীত ফিরে এসেছে আবার। লজিং মাস্টার
তবু তাকিয়েই আছে। বসে আছে নিভু নিভু আলোটাকে
সামনে নিয়ে। কিম্বা সে অতোদিন ধরে বসে নাই। হয়তো সে
বসে আছে গতকাল সন্ধ্যা থেকে, কিবা আজ সন্ধ্যা হতে।
অথবা অনেকদিন বসে থাকলে মানুষকে যেরকম দেখায়,
আজ তাকে দেখতে সেরকম লাগছে। হ্যারিকেনটার দিকে
একমনে তাকিয়ে সে ভাবছে, সলতেটা বাড়ানো প্রয়োজন;
কাঁচের চিমনি পরিষ্কার করা, ভাবছে সে, আরো বেশি প্রয়োজন।
আরো কেরোসিন, আরো কেরেস তৈল চায় ওই নিভু নিভু বাতি।
বহুদিন হয়ে গেলো, বাতিটার কোনো যত্ন নেয়া হয় নাই।
নিজ হাতে, ছাই আর পানি দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করা
হয় নাই কাঁচের চিমনি। নরম কনসার্টের মত শোনা হয়নি
হ্যারিকেনটাকে। নতুন কেরেস তৈল, তার বুকে হয় নাই ঢালা।
বহুদিন হয়ে গেছে। আরেক শীতের রাত এসেছে নিকটে।
হ্যারিকেন নিভে গেছে বহু আগে। লজিং মাস্টার
তবু বসেই রয়েছে; যেন এক ভূত, এইভাবে চেয়ে আছে
নিভে যাওয়া হ্যারিকেনটার দিকে। স্পেসের ভেতরে
হ্যারিকেনটা বসে আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, অনেক দূরের
কোনো ব্যাকহোল যেন। কিম্বা তাও নয়; হ্যারিকেন
নিভে গেলেও সূর্যই থাকে; ধীরে ধীরে আলো দিয়ে যায়।


লজিং মাস্টার ৮

বন্যার পানির নিচে, ছোট ছোট ঘাসের মতন, লজিং মাস্টার
বসা আছে। অনেক নবীন মাছ ঘুরছে চারপাশে। লুঙ্গিটা
থেকে থেকে ফুলে উঠছে পালের মত, যে পাল বাতাসে নয়,
পানিতে প্রবাহ খুঁজে পায়। ডুবে যাওয়া তৃণগুলো দুলছে।
মানুষের কথা, অনেক ওপর থেকে নেমে এসে,
ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে এই স্রোতহীন পানির অতলে।
আজ তার কারো সাথে কোনো কথা নাই।
হয়তো ছাত্রীর জ্বর, কিম্বা সে বেড়াতে গিয়েছে কিছু দূরে,
ডিঙ্গি নৌকায় চরে। কথাহীন দিনগুলি, পানির অনেক
নিচে ঘোরে। তেসরা রশ্মিগুলো খেলা করে ধীরে।
পুনরায়, পানির অনেক নিচে, কথাহীন নীরবতা কাঁপে।
ক্রমে রূপ গলে যায়। প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয় হয় মুখ।
দ্রবীভূত হয় তার লুঙ্গি, জামা। দ্রব হয় ত্বক।
একদিন দেখা যায়, তার সবই গলে গেছে, চোখ দুটি ছাড়া।
ধবল কঙ্কাল, তার দুই চোখ খুলে,
বন্যার পানির নিচে, চুপে বসে থাকে। সে জগতে
জোছনা প্রবেশ করে, সূর্যও আসে।


লজিং মাস্টার ৯

লজিং মাস্টারের জীবন অন্ধকারে চোখ খোলে।
চুপ করে বসে থেকে সেই জীবনের মনে হয়,
এখন অনেক রাত, তবু রাস্তায়, বহু লোক
হাঁটছে নীরবে। কারা যেন ফিসফিস করছে।
চৌদিকে টিনের বেড়া, তবু বেড়া নাই;
এ ঘরের। ফলত সে বসে আছে রা¯তার ওপরে,
যে রাস্তায় মানুষের সাথে সাথে শিশিরও হাঁটছে
তার নম্র ছাত্রীর মত। বহু রাত। তবু কেন যেন
রা¯তায় অনেক লোক; ফিসফিস করতে করতে
ভাসছে নীরবে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে তাদের,
তবু তারা দেখছে না তাকে। হয়তো বা মানুষের
মূল প্রবণতা এই না দেখা, চোখ খুলে, না দেখতে পারা।
লজিং মাস্টারের জীবন অন্ধকারে চোখ খুলে
তাকিয়ে রয়েছে। হয়ত সে, এ জীবন, বিশ্বাস করে,
অন্ধকারেও চোখ খুলে রাখা প্রয়োজন; অন্ধকারে
চোখ খুলে রাখতে পারলে, তার কালো চোখ
একদিন জোনাকির মত হয়ে যাবে। তাই এতো
বারবার লজিং মাস্টারের জীবন অন্ধকারে
চোখ খোলে। ঝিনঝোটির অনুরাগ বিচ্ছুরিত হয়।
মানুষের চোখ যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে দেখে।


লজিং মাস্টার ১০

শুয়ে শুয়ে নিঃসঙ্গতা বোধ করছিল এক লজিং মাস্টার।
শোয়া থেকে উঠে, কাত হয়ে বসে, লিখতে শুরু করে।
লিখতে লিখতে তার নিঃসঙ্গতা যেন কিছু দূরীভূত হয়।
যে শয়ান ছিল একা, আর যে লিখছে,
তারা কি তাহলে দুইজন? হয়তো দুজন ওরা, ফলে আর
একা নয় কেউ। ক্ষণে ক্ষণে বহুজন হতে থাকে লজিং মাস্টার।
একরাতে একাধিক জীবন কাটায়।
মানুষ যখন লেখে তখন সে অন্য কেউ হয়।
তখন সামনে এসে কে যেন দাঁড়ায়; ভাবি, হয়তো নিজেই।
নিজের সামনে এসে, বাঁশের পাতার মত লজিং মাস্টার
কাঁপতে থাকে। সারাদিন কত শত অনুভব জেগেছিল মনে।
এখন সেসব অনুভব,
একেকজন সার্বভৌম মানুষের মত,
তার সাথে তর্ক করে, কথা বলে, চুপ করে, স্পষ্ট চোখে
টর্চ-লাইট ফেলে তার মুখে। ধীরে ধীরে টের পায় লজিং মাস্টার,
লক্ষাধিক অন্ধকার তার দিকে মানুষের মত চেয়ে আছে।
এবার সে হাঁটতে শুরু করে। যে শুয়ে ছিল, যে বসে ছিল
কাত হয়ে, আর যে হাঁটছে এখন, তারা তবে এক? তবু যেন
এক নয়। যেমন গাছের ডাল, একাধিক হয়ে ডানা মেলে,
রাত্রে তবু, এক হয়ে ফিরে আসে গাছের ভিতরে, সেইভাবে
বিষন্ন লজিং মাস্টার, একাধিক ও এক হয়ে বিকশিত হয়,
অবশেষে এক ও একাধিক থেকে
নির্নিমেষ শূন্য হয়ে ফিরে আসে নিজ অন্ধকারে।

আরো পড়তে পারেন

দুখু বাঙাল-এর পাঁচটি কবিতা

আঁধার বনাম অন্ধকার . দিতে চাও দিয়ো শাস্তি মায়ের মূর্তির ন্যায় সাগরে ফেলিয়ো ঢেউ হয়ে ফেনা হয়ে ছড়াইব সুরের কম্পন হৃদকূপে ফেলিয়ো না একমাত্র এটুকু মিনতি। দিতে চাও দিয়ো শাস্তি সাড়ে তিন হাত মাটির গভীরে রেখো পুঁতে ঘাস হয়ে ফুল হয়ে সাজাইব সমাধি প্রাঙ্গণ হৃদকূপে ফেলিয়ো না একমাত্র এটুকু মিনতি। পড়ে গেলে একবার হৃদকূপে কে….

মইনুল ইসলামের টুকরো কবিতা

বৃষ্টি আর মিষ্টি ~ এই ভেজা ডালটাতে যে পাখিটা এসে বসে ওর নাম বৃষ্টি, এই ভেজা চুলে যে মেয়েটি দাড়ায় কাছে এসে ওর নাম মিষ্টি, এই বৃষ্টি আর মিষ্টিকে নিয়েই আমার মনে যতোসব অনাসৃষ্টি। বয়সকাল ~ আমার যখন বয়স হলো সেই সাথে তোমারও হলো, আমি যখন কচি লেবু পাতার ঘ্রানে মাতাল হলাম— সেই রোগ তোমাকেও….

হাইকেল হাশমী’র একগুচ্ছ কবিতা

জাগ্রত স্বপ্ন ~ জাগ্রত চোখে কতো স্বপ্ন দেখি কিন্তু জীবনের একটি এড়ো পথে এসে থমকে দাঁড়াই। জীবন তো কোন যানবাহন নয় ইচ্ছে মতো দিক পরিবর্তন করা যায় না থমকে দাঁড়াতে হয়। জীবন তো অনেক দিন ধরে অতিবাহিত করছি এটাও জানি, অভিজ্ঞতা থেকেই জানি জীবন খুব বেশীক্ষণ থেমে থাকে না। জীবন তো স্রোতের মতো নিজ গন্তব্যে….

error: Content is protected !!