Author Picture

হাইকেল হাশমী’র একগুচ্ছ কবিতা

হাইকেল হাশমী

জাগ্রত স্বপ্ন
~
জাগ্রত চোখে কতো স্বপ্ন দেখি
কিন্তু জীবনের একটি এড়ো পথে এসে
থমকে দাঁড়াই।
জীবন তো কোন যানবাহন নয়
ইচ্ছে মতো দিক পরিবর্তন করা যায় না
থমকে দাঁড়াতে হয়।
জীবন তো অনেক দিন ধরে অতিবাহিত করছি
এটাও জানি, অভিজ্ঞতা থেকেই জানি
জীবন খুব বেশীক্ষণ থেমে থাকে না।
জীবন তো স্রোতের মতো
নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নিজে খুঁজে নেয়
তার তো মহাসাগরের সাথে মিশে যাবার তাড়া আছে।
কিন্তু এই ভ্রমনের মধ্যে
দুই চোখ স্বপ্ন দেখে
ঘুমের স্বপ্ন,
ঘুম শেষ হবার সাথে সাথে মরে যায়
তাই জাগ্রত চোখে স্বপ্ন বুনতে হয়।


আলোহীন আলো
~
আলোতে আর সেই আগের মতো আলো নেই
সূর্যের আলো
চাঁদের আলো
তারার আলো
সব আলোর আলো কেউ অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
শহরে কোন আলো নেই
রাস্তায়- পথে আলো নেই
ঘরে- দালানে আলো নেই
সব জ্যোতি যেন মলিন হয়ে গেছে।
মানুষ আলোহীন চোখ নিয়ে
শূন্যতা বুকে ভরে
আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে, কী যেন খুঁজছে,
কোনো দীপ্তি
কোনো আলো
কোনো কিরণ
কোনো রোশনাই’র সন্ধান যদি পাওয়া যায়
আলোতে আর আগের মতো আলো নেই
তবুও মনের গভীরে আশার জ্যোতি টিম টিম করে জ্বলছে।


অক্ষর, শব্দ, ধ্বনি
~
শব্দ, আকাশের নীলিমায় আবদ্ধ
ধ্বনি, নির্জনতার কারাগারে বন্দী
অক্ষর, মস্তিস্কের বরফ ঢাকা চূড়ায় নিদ্রামগ্ন।
শব্দ আকাশের নীল চাদর পেরিয়ে
সময়ের অদৃশ্য কণায় হচ্ছে সিক্ত,
ধ্বনি নিঃশব্দতার দেয়াল ভেঙে
আমার কন্ঠে উচ্চারিত,
অক্ষর মস্তিস্কের চোরাবালি পেরিয়ে
ভাবনার উদ্যানে প্রস্ফুটিত।
শব্দ, অক্ষর, ধ্বনি
একত্রিত হয়ে তুলেছে আমার সত্তার মরুভূমিতে
এক অদ্ভুত সুর ও ধ্বনি,
কখনো কবিতার পংক্তি
কখনো সুরের মুর্ছনা
কখনো জীবন পথে চলমান মরুকাফেলা
সারি সারি উটের গলার ঝুনঝুন ঘন্টি।
তোমার কথা, আমার কবিতা
তোমার গল্প, আমার কথকতা
তোমার গান, আমার সুর-লয়-তাল
সবই তো আছে উপস্থিত ওই মহাশূন্যে,
শব্দ, ধ্বনি, উচ্চারিত অক্ষরের নেই কোন মৃত্যু
তারা তো ভেসে বেড়ায় বাতাসে
উড়ে বেড়ায় ঈথরের পাখায় চড়ে
তার অনুরণন যায় শোনা শুধু আত্মার মাঝে।


স্তম্ভিত আত্মা
~
আমি তো তোমাকে ভালোবেসেছি নিরাকার সমুদ্রের মতো
নীল আকাশে উড়ে বেড়ানো মেঘের মতো,
মেঘ যে তার আকৃতি বদলায়
অদৃশ্য বাতাসের ইশারায়,
ভালোবাসাও বদলে যায়
সময়ের কক্ষে ঘুরতে ঘুরতে।
একটু অনুভব করে দেখো
শুনতে পাবে স্তম্ভিত আত্মার নীরবতা।
আমি যতোই তোমার দিকে এগিয়ে যাই
তুমি তোমার দেয়া প্রতিশ্রুতির মতো
আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাও
দূর তোমার ইচ্ছের গগনপ্রান্তে,
ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হও
তোমার অনধিগম্য বাসনার আকাশপ্রান্তে।


নতুন স্বাভাবিক
~
এটা না কী এখন নতুন স্বাভাবিক
দূরত্বই না কী এখন প্রেমের নৈকটত্ব
কি আশ্চর্য-
এখন তোমাকে যাবে না ছোঁয়া
আলিঙ্গন তো দূরের কথা,
তোমার ওই গোলাপ ঠোঁটে
শিশিরের যে রয়েছে আদ্রতা
ওটা যাবে না চুম্বনে শুষে নেয়া।
ওই আঁধার কালো কেশে
মুখ লুকিয়ে, নিষেধ এখন হারিয়ে যাওয়া।
দূরত্ব তো কোন ব্যপার নয়
চাঁদের তো কোন দিন হয়নি সমুদ্রের কাছে আসা
তাও তো তার বুকে সে তোলে উত্তাল জোয়ার-ভাটা।
সূর্য তো অনেক দূরে
তাতে কী কিছু আসে যায়?
এই চন্দ্র, গ্রহ, তারা
সবই তো মোহিত তার চৌম্বক শক্তি দ্বারা।
তুমিও তো আমার সূর্য-চন্দ্র
আমার হৃদয়ের মাটি আর সাগর
তোমার অদৃশ্য আকর্ষণে বাঁধা।


স্বপ্নকে লকডাউন করা যায় না
~
এই বিষন্ন লকডাউনের দিনে
যখন ঘরের ভিতরে দম বন্ধ হয়ে আসে
বাইরে এসে দাঁড়াই আমার ব্যালকনিতে।
দেখি এই পরিচিত জায়গায় কত অপরিচিত দৃশ্য
সারি সারি সবুজ গাছ
সব সবুজ কিন্তু এক নয়
একই গাছে বিভিন্ন সবুজের সমাহার
কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হালকা সবুজ
সব রঙ তো আমার মনের রঙ
সবুজে সবুজে ভরা আশার রঙ।
গাছের ছায়া নাচে লেক’এর জলে
নতুন নতুন আকৃতি বানায় মৃদু জলের তরঙ্গে,
আমার বাসনার আকৃতির মতো
থাকে না স্থির এক জায়গায়
বানায় সময়ের স্রোতে নতুন আকার-আকৃতি।
আকাশের দিকে তাকালে
দেখি কত আকারের মেঘের দল
কোনোটা ধবধবে সাদা শিমুল তুলার মত
কোনোটা কালো জলে ভরা
বর্ষনের জন্যে আকুল
সবই ছুটছে সীমাহীন আকাশে
তাদের বিচরণ অনন্তের মাঝে,
যেমন আমার চিন্তার অসীম আকাশে
ভাবনার মেঘগুলো উড়ে বেড়ায়
এই প্রকৃতি জানে যে মানুষের
অনন্ত স্বপ্নকে লকডাউন করা যায় না।


সামাজিক দূরত্ব
~
এখন বারান্দায় বের হলে
গাছে বসা কাক আর কার্নিশে বসা চড়ুই
আমাকে দেখে উড়ে যায়।
আগে যারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো
কখন আমি তাদের জন্য ছিটাবো চাল বা গম;
এবং তারা উড়ে এসে খাবে।
আগে রাতের বেলা
একটি ছোট ইঁদুর ভয়ে ভয়ে
এদিক ওদিক ছুটতো
এখন তারও কোন খোঁজ নেই।
তবে কি জেনে গেছে তারা
মানুষ এখন সংক্রামক ব্যাধির উৎস
তাদের থেকে দূরে থাকা উচিৎ।
এই বিষাক্ত মানবকুল থেকে
তারাও বোধহয় ধরে রাখছে সামাজিক দূরত্ব।


করোনার রাত্রি
~
এই নিস্তব্ধ রাতে
আকাশে একটি তারাও নেই
কোন শব্দ নেই
এমন কী গাছের পাতাও নড়ছে না
চারপাশের পরিবেশকে ঢেকে রেখেছে ঘুটঘুটে অন্ধকার
কোনো ভবনের জানালায় কোন আলো নেই।
আমার চোখে ঘুম নেই
বসে আছি জানালার ধারে
কিছু খুঁজার চেষ্টা এই অন্ধকারের চাদর ভেদ করে।
দূর একটি ভবনে
কোন একটি জানালায়
আলো জ্বলে উঠলো হঠাৎ
একটি ছায়া এসে জানালার পাশে দাঁড়ালো
সে কি আমাকে দেখতে পারছে?
সেও কি আমার মতো কিছু খুঁজছে?
হয়ত খুঁজছে আলো, মানুষের কোলাহল
এই করোনার রাতে।
আমার মতো হয়ত সেও জানে
এই রাতে সে একা নয়
আছে তার সঙ্গী দূর অন্য এক জানালায় দাঁড়িয়ে
আলোর জানালা খুলবেই এই অন্ধকার রাতে
সেও জানে আমিও জানি
এখন শুধু অপেক্ষার প্রহর হবে কাটাতে।


নির্জন গৃহবাস
~
সারা জীবন অভিযোগ করেছি
এত ব্যস্ততা যে বাসায় থাকা হয় না।
এই কয়েক দিন যখন করোনা সুযোগ করে দিল
নিজ গৃহে থাকতে, তখন
মন ভিষন বিষন্ন।
একা কী থাকা যায় ?
কত দিন বাইরে যাইনি
কফি খেতে পারিনি
বই’এর দোকানে যাইনি
কত আপন, প্রিয় লোকের সাথে দেখা নেই!
আবার ভাবি
আমার মা আজ নয় বছর ধরে
বিছানা আর হুইল চেয়ারের মাঝে তার জীবন,
অবশ তার অর্ধেক শরীর
স্ট্রোকের বিষাক্ত ছোবলে।
সে তো কোন দিন অভিযোগ করেনি একাকিত্বের
তার সকল কোলাহল তার ছেলে মেয়েদের ঘিরে
সে একা কিন্তু সঙ্গিহীন নেই বটে!

আরো পড়তে পারেন

দুখু বাঙাল-এর পাঁচটি কবিতা

আঁধার বনাম অন্ধকার . দিতে চাও দিয়ো শাস্তি মায়ের মূর্তির ন্যায় সাগরে ফেলিয়ো ঢেউ হয়ে ফেনা হয়ে ছড়াইব সুরের কম্পন হৃদকূপে ফেলিয়ো না একমাত্র এটুকু মিনতি। দিতে চাও দিয়ো শাস্তি সাড়ে তিন হাত মাটির গভীরে রেখো পুঁতে ঘাস হয়ে ফুল হয়ে সাজাইব সমাধি প্রাঙ্গণ হৃদকূপে ফেলিয়ো না একমাত্র এটুকু মিনতি। পড়ে গেলে একবার হৃদকূপে কে….

সিদ্ধার্থ হকের ১০টি লজিং মাস্টার

কবিতাগুলো পড়ে প্রথমে মনে হবে- লজিং মাস্টারের জীবন তুলে আনা হয়েছে। দ্বিতীয়বার পড়লে মনে হবে- লজিং মাস্টার সকল জাগতিকতার ভ্রমণ শেষে দৃশ্যদের ইহজাগতিকতার হাতছানি দিয়ে পশ্চিমাকাশে অস্তমিত হতে যাচ্ছে। তৃৃতীয়বার পড়লে মনে হবে- পৃথিবীটা এই লজিং মাস্টারের ভিতরে ঘুর্নায়মান।  সিদ্ধার্থ হকের একটা কবিতা স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি কাব্যময়তা ধরনে সক্ষম। তাঁর কবিতায় বাস্তবতাকে চিত্রকল্প রুপেও….

মইনুল ইসলামের টুকরো কবিতা

বৃষ্টি আর মিষ্টি ~ এই ভেজা ডালটাতে যে পাখিটা এসে বসে ওর নাম বৃষ্টি, এই ভেজা চুলে যে মেয়েটি দাড়ায় কাছে এসে ওর নাম মিষ্টি, এই বৃষ্টি আর মিষ্টিকে নিয়েই আমার মনে যতোসব অনাসৃষ্টি। বয়সকাল ~ আমার যখন বয়স হলো সেই সাথে তোমারও হলো, আমি যখন কচি লেবু পাতার ঘ্রানে মাতাল হলাম— সেই রোগ তোমাকেও….

error: Content is protected !!