Author Picture

আয়া সোফিয়া, ভেতরে-বাইরের রাজনীতি ও আমাদের মুসলমানিত্ব

ইমরুল কায়েস

গত কিছুদিন ধরে তুরস্কের আয়া সোফিয়া মসজিদ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিতর্ক লক্ষনীয়। আয়া সোফিয়াকে পুণরায় মসজিদ হিসেবে চালুর সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পক্ষে লিখছেন কেউ কেউ। কেউ আবার বিপক্ষে। এই তর্কে বিপক্ষে যোগ দিয়েছেন কিছু মুসলিমও। তাদের দাবি কাজটি ঠিক হয়নি। অনেকেই এরদোয়ানের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করতে ছাড়ছেন না। যদিও এসব লেখায় তুরস্ক ও এরদোয়ানদের কিছু আসবে যাবে না। তারপরও থেমে নেই বিতর্ক। ইসলামের জ্ঞান তেমন না থাকায় আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে চালু করার কাজ ঠিক না বেঠিক হল সেদিকে আমি যাব না। আমি শুধু যারা তর্ক-বিতর্ক করছেন তাদের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি বাস্তবতার আলোকে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই। তুরস্কের বর্তমান সরকার কি গির্জাকে সরাসরি মসজিদে রুপান্তর করেছে? যারা বিতর্ক করছেন তাদের সঠিক ইতিহাস জানা দরকার।

১৪৫৩ সালের আগ পর্যন্ত তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুল তথা কনস্টান্টিনোপল খ্রিস্টান রোমানদের পরিচালিত পুর্ব বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। মর্মর সাগর ও বসফরাস সাগরের মোহনায় অবস্থিত এই আয়া সোফিয়া ৩৬০ সালে প্রথম তৈরি করেন বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টানটিয়াস। কাঠের তৈরি গির্জা পুড়ে গেলে দ্বিতীয় থিওডিয়াস ৪১৬ সালে মর্মর পাথরের গির্জা গড়ে তোলেন। ৫৩২ সালের এক বিদ্রোহের কারণে সেটিও ধ্বংস হয়ে যায়। ৫৩৭ সালে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান বর্তমান অবকাঠামোর আয়া সোফিয়া গির্জা নির্মাণ করেন। তখন এটি অর্থডক্স খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হত। তারপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ইস্তাম্বুল ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের দখলে আসলে ১২০৪ সাল থেকে এটা তাদের উপাসনালয় হয়ে যায়। তবে গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এটা বাইজেন্টাইন সম্রাটদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। সব বড় বড় অনুষ্ঠান এখানে হত। এরপর ১৪৫৩ সালে উসমানীয়দের কাছে ইস্তাম্বুলের পতন হলে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ মেহমেত আল-ফাতিহ আয়া সোফিয়াকে নিজ অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে মসজিদ হিসেবে চালু করেন।

সুলতান এটাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি না রেখে ওয়াকফ করে দেন এবং ওসিয়ত করেন যেন পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এটাকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উসমানীয় আমলেও বড় বড় অনুষ্ঠান এই জায়গায় হত। যেমন যুদ্ধে বিজয় উদযাপন, রাষ্ট্রীয় বা সালতানাতের কোন বড় ঘটনা উদযাপন। ফলে ধীরে ধীরে আয়া সোফিয়া তুর্কিদের কাছে একটা সিম্বল বা প্রতিক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। তুর্কি সমাজে এর গুরুত্ব এখনও একই রকম। সুলতান সেসময় আয়া সোফিয়া গির্জা কিনে নিয়েছিলেন না জোর করে দখল করেছিলেন তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বিতর্ককারীদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি আয়া সোফিয়ার পাশেই টপকাপি প্রাসাদে বাস করতেন সুলতানরা। মজার বিষয় হল আয়া সোফিয়াকে ক্রয় করে সুলতান মসজিদ চালু করলেও টপকাপি প্রাসাদের আরেকটি গির্জাকে কিন্তু গির্জা হিসেবেই রেখে দেন যাতে খ্রিস্টানরা উপাসনা করতে পারেন। সেই গির্জাটি এখনও বর্তমান।

সুলতান যদি জোর করে আয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানাতেন তাহলে অপর গির্জাটিকে অটুট রাখলেন কেন? সেটিও তো তাহলে মসজিদ বানাতেন, না হয় নিদেনপক্ষে ভেঙে ফেলতেন। কোনটাই কিন্তু করেননি তিনি। উসমানীয় সুলতানরা খ্রিস্টান বা অন্যধর্ম বিদ্বেষী হলে কি সেখানে একটি গির্জা দখল করে আরেকটি গির্জা রাখতেন? একসময় ইউরোপের একটা অংশ, বলকান অঞ্চল, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশ মিলে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী শাসন করতেন উসমানীয় সুলতানরা। কিন্তু আয়া সোফিয়া ব্যাতিত আর কোন গির্জা, মন্দির, প্যাগোডা বা অন্য কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে তারা মসজিদে রুপান্তর করেছেন ইতিহাসে এমন কোন তথ্য-প্রমাণ নাই। বিজিত অঞ্চলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোন উপাসনালয় দখল করা যাবে না ইসলামের এই আদর্শ ও রীতিকে মেনে চলতেন উসমানীয়রা।

এখন প্রশ্ন হল সুলতান ফাতিহ মেহমেত আয়া সোফিয়াকে কেন মসজিদে রুপান্তর করেছিলেন? এর পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে। সম্রাট জাস্টিনিয়ান যখন আয়া সোফিয়া নির্মাণ করেন তখন তার লক্ষ্য ছিল এটি হবে পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ উপাসনালয়। এর সমকক্ষ আর কিছুই থাকবে না এমন অহংবোধ থেকে তিনি বলেছিলেন, “সুলাইমান আমি তোমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছি।” আল্লাহর নবী হযরত সুলাইমান (আঃ) ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমতাধর মহান শাসক। জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তিনি। এটাকেই চ্যালেঞ্জ করে আয়া সোফিয়া তৈরি করেছিলেন জাস্টিনিয়ান। তার এই ঔদ্ধত্যে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন উসমানী সুলতান ফাতিহ মেহমেত। কারণ আল আকসার সাথে মুসলমানদের আবেগ জড়িত। এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। জাস্টিনিয়ানের এমন অহংবোধকে চুর্ণ করতেই ১৪৫৩ সালে ফাতিহ মেহমেত কনস্টান্টিনোপল জয় করেন এবং অর্থের বিনিময়ে আয়া সোফিয়াকে খরিদ করে মসজিদে রুপান্তর করেন।

আয়া সোফিয়া

ইতিহাসে গির্জা কিনে মসজিদ করার প্রচলন শুধু কিন্তু আয়া সোফিয়াই নয়। আরও আছে। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন সময় গির্জা বিক্রি করেছেন। এর জন্য খুব বেশি পেছনে যেতে হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ-আমেরিকার দিকে তাকালে এরকম উদাহরণ পাওয়া যাবে ভুরি ভুরি। ইউরোপের অনেক দেশে গির্জা কিনে নিয়ে মসজিদ বানান হয়েছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখলেই মিলবে এর বাস্তবতা। ২০১৫ সালে কাতারের অর্থায়নে ইতালির শান্তা মারিয়া দেল মিজরেকডিয়া গির্জাকে মসজিদে রুপান্তর করা হয়। ২০১৩ সালে লন্ডনের সেন্ট পিটার্স ক্যাথলিক গির্জাকে বিক্রি করে দেয়া হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্সের বিখ্যাত এমানুয়েল মুনিয়ার, জর্জেস বার্নানোস, ফ্রাসোয়া মরিয়াক, জ্যাক মরিটেইন, তেইলহার্ড ডি চার্ডিনসহ বহু গির্জার স্থানে মসজিদ, শো-রুম ও শপিং মল গড়ে উঠেছে। সেইন্ট ক্রিস্টোফারের পুরাতন গির্জা কুই মালাকফ নান্টিসের স্থানে গড়ে উঠেছে ফোরকান মসজিদ। ২০১৩ সালের জুনে ভিরজনের সেইন্ট-ইলোই গির্জাকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। শুধু ফ্রান্সেই নয় পাশের দেশ জার্মানীতেও থেমে নেই গির্জা বিক্রি। নিরেশ্বরবাদী লোকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০বছরে দেশটির ব্র্যান্ডেবার্গ এলাকায় ২৫টি গির্জা বিক্রি করে দেয়া হয়। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ৩৪০টি গির্জা বন্ধ করে দেয় জার্মানি ইভানজেলিকাল সম্প্রদায়। ২০১৩ সালে একটি গির্জা কিনে নেয় হামবুর্গের মুসলিম সম্প্রদায়। একই সময়ে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও ইউট্রেস্টটে দুটি গির্জা কিনে নিয়ে মসজিদে রূপান্তর করেন মুসলমানরা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। কিন্তু সেসব নিয়ে পশ্চিমাদের মাথাব্যথা নাই। কোন উচ্চবাচ্য নাই। আবার এই করোনাকালে পশ্চিমা কোন কোন দেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায় মুসলমানদের নামাজের জন্য খুলে দিয়েছেন তাদের গির্জার দ্বার। মে মাসে মুসলমানদের জুম্মার নামাজের জন্য খুলে দেয়া হয় জার্মানীর ক্রুজবার্গের মার্থা লুথেরান গির্জা। এখানে উদারতা দেখালেও আয়া সোফিয়া ইস্যুতে পশ্চিমারা শত্রুতা করছে কেন? শুধুই কি ধর্মীয় কারণ না এর পেছনে অন্যকোন রাজনীতি আছে তা শেষদিকের আলোচনায় আসবে।

মার্থা লুথেরান গির্জার মত দু’একটি জায়গায় উদারতা দেখালেও পশ্চিমাদের মসজিদ বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ৭১১ সালে মুসলিম সেনানায়ক তারেক বিন জিয়াদ কর্তৃক আন্দালুসিয়া তথা স্পেন জয়ের পর মোটামুটি ৭০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল মুসলিম শাসন। বর্তমান স্পেনের তৎকালীন খ্রিস্টান রাজা রডারিক ছিলেন অত্যাচারী। বশ্যতা স্বীকারের রীতি স্বরুপ সিউটার শাসক জুলিয়ানো নানা উপঢৌকনসহ তার একমাত্র মেয়েকে রাজা রডারিকের দরবারে পাঠান। পরে রাজা রডারিক জুলিয়ানোর মেয়েকে ধর্ষন করেন। এর প্রতিশোধ নিতে জুলিয়ানো সেসময়ের দুর্দন্ড প্রতাপশালী মুসলমানদের স্পেন জয়ের আমন্ত্রণ জানায়। তার আমন্ত্রণে মুসলিম সমরনায়ক তারেক বিন জিয়াদ স্পেন জয় করেন। তারপর স্পেন জুড়ে বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সাত শত মসজিদ নির্মিত হয়। প্রশ্ন হল এখন সেখানে কতটি মসজিদ অবশিষ্ট আছে? ১৪৯২ সালে মুসলমানদের অধীনে থাকা স্পেনের সবশেষ শহর গ্রানাডা দখলের পর শত শত মসজিদ পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেন পর্তুগালের রানী ইসাবেলা ও তার স্বামী আরগুনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ। আর এর আগেই পতন হওয়া স্পেনের অন্যান্য মুসলিম শহরের মসজিদগুলো দখল করে গির্জা বানানো হয়। খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাদশাহ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আল-আহমার স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের দক্ষিণাঞ্চলে কসরুল হামরা মসজিদ নির্মাণ করেন। ১২৩৬ সালে আন্দালুসিয়ার পতনের পর এটিকে ‘সেন্ট মেরি’ গির্জায় রূপান্তর করা হয় যা এখনও আছে। ৭৫৪ সালে কর্ডোভা নগরীতে নির্মিত হয় গ্র্যান্ড কর্ডোভা মসজিদ। আন্দালুসিয়ার পতনের পর এটিকেও গির্জায় রুপান্তরিত করে নাম দেয়া হয় ‘ভার্জিন মেরি’। এভাবে টলেডোতে ৯৯৯ সালে নির্মিত বাবুল মারদুম মসজিদ ১০৮৫ সালে খ্রিস্টান রাজা ষষ্ঠ আলফানসো কর্তৃক হয়ে যায় ‘লাইট অব ক্রাইস্ট’ গির্জা। শুধু ইউরোপেই নয় বিশ্বের অন্যান্য জায়গা বা দেশেও অন্য ধর্মাবলম্বীরা মসজিদ ভেঙে গড়েছে তাদের উপাসনালয়।

আযান চালুর অপরাধে ১৯৬১ সালে তুরস্কের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফাঁসিতে ঝোলান মোস্তফা কামাল আতাতুর্কর ভাবাদর্শীরা।

৯০ দশকে তো পার্শ্ববর্তী একটি দেশে ৪০০ বছরের পুরোণো একটি মসজিদকে গুঁড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয় মন্দির। যদিও এ কাজের বৈধতা দিতে বহু বছর পরে এসে আদালতের রায় পক্ষে নেয়া হয়েছে। মুসলমানদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ ও প্রথম কিবলা জেরুজালেমের বায়তুল মোকাদ্দাস (আল আকসা) বছরের পর বছর অবরুদ্ধ করে রেখেছে জায়নবাদী ইউরোপ-আমেরিকার মদদপুষ্ট ইসরাইল। এরকম আরও অনেক উদাহরণ আছে যা উল্লেখ করতে গেলে লেখার কলেবর বাড়বে। তাই এ উদাহরণ টানায় এখানেই ক্ষান্ত দিতে হচ্ছে। লক্ষনীয় বিষয় হল এসব নিয়ে কিন্তু পশ্চিমারা কখনও কোন টু শব্দ করেন না। কিন্তু আয়া সোফিয়াকে কেন্দ্র করে যেই তারা গলা চড়িয়েছে সেই মুসলমানদেরও কেউ কেউ তাদের সাথে গলা মেলাতে শুরু করেছেন।

যাইহোক, প্রায় পাঁচ শত বছর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর ১৯৩৪ সালে পশ্চিমাদের অনুগ্রহ লাভের আশায় আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রুপান্তর করেন সেক্যুলারপন্থী পশ্চিমা মদদপুষ্ট তুর্কি শাসক মোস্তফা কামাল পাশা। শুধু এই মসজিদই নয় এরকম হাজার হাজার মসজিদ বন্ধ করে দেন তিনি। এমনকি মসজিদ বন্ধ করে সেখানে পশুশালা, মদ্যশালা বা সরাইখানা গড়ে তোলেন। সমাজ থেকে ইসলাম ও উসমানীয়দের চিহ্ন মুছে ফেলতে এসব করেন তিনি। মসজিদের পাশাপাশি বন্ধ করে দেন আরবী আজান। আরবী কুরআন ও মেয়েদের হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করেন। বাতিল করে দেন ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা। তদস্থলে চালু করেন পশ্চিমা ভোগবাদী ও নিরেশ্বরবাদী শিক্ষা-সংস্কৃতি। আরবী হরফের পরিবর্তে চালু করেন ল্যাটিন হরফ। তুর্কি সমাজে চালু করেন পশ্চিমা ভাবধারার আদলে সম্পূর্ণ অনৈসলামিক রীতি-নীতি ও আচার ব্যবস্থা।

তরুণ তুর্কিদের পশ্চিমাদের আদলে মাথায় হ্যাট ও মেয়েদের খোলামেলাভাবে পোশাক পরিধান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উৎসাহিত করা হয়। নিষিদ্ধ করা হয় প্রকাশ্যে ধর্মীয় কার্যকলাপ। উসমানীয় ও ইসলামপন্থী অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেন তিনি। এধরনের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী অনেক কাজ করেন কামাল পাশা। ফলে পরিবেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পরবর্তী তুর্কি সমাজে জানাজা পড়ানোর মত ইমাম বা আলেম পাওয়া যেত না। পরবর্তীতেও কামাল পাশার ভাবাদর্শীরা ক্ষমতায় থেকে তুরস্কে বলবৎ রাখেন তার রীতিনীতি। এর অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেমন আযান চালুর অপরাধে ১৯৬১ সালে তুরস্কের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফাঁসিতে ঝোলান তার ভাবাদর্শীরা। ১৯৯৭ সালে ধর্ম নিরপেক্ষতা লংঘনের অভিযোগ এনে মাত্র এক বছরের মাথায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করেন কামাল পাশার আদর্শবাহী সেনাবাহিনী। ১৯৯৯ সালে ফজিলত পার্টির এমপি মেরভে কাভাকচিকে শপথ পড়তে দেওয়া হয়নি এবং পার্লামেন্ট থেকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয় শুধু হিজাব পরার কারণে। এছাড়াও রাস্তাঘাটে নারীদের ওড়না কেড়ে নেয়াসহ নানাভাবে হেনস্থা করা হয় গত শতকজুড়ে।

ইসলামপন্থী এরদোয়ানদের ক্ষমতারোহন ও কিছুদিন পর পর্যন্ত তুরস্কে এ ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০২ সালে এরদোয়ানের জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ক্ষমতায় আসলেও নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারেন নাই। প্রধানমন্ত্রী হন তাঁর দলের আব্দুল্লাহ গুল। একবছর পর নিষেধাজ্ঞা উঠলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। তবে ২০০০ সালে সংসদে (পিপলস এসেম্বলি) নির্বাচিত সেক্যুলারপন্থী আহমেদ নেকদেত সেজার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বহাল থাকায় নানাভাবে সরকারের কাজে বিশেষকরে ইসলাম সম্পর্কিত পদক্ষেপে বাধা প্রদান অব্যাহত রাখেন। যাইহোক, সেজারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতা সংহত ও একচ্ছত্র হওয়ায় এরদোয়ানরা ধীরে ধীরে হিজাব চালুসহ ইসলামের উপর চাপিয়ে দেয়া বিধিনিষেধগুলো উঠিয়ে নেয়া শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ৮৬বছর পর পাঁচ শত বছর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত আয়া সোফিয়াকে ২০২০ সালে এসে জাদুঘর থেকে আবারও মসজিদে রুপান্তর করলো এরদোয়ান সরকার। তবে এবার কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্তে সরকার আয়া সোফিয়ায় মসজিদের কার্যক্রম শুরু করেছে।

এরদোয়ানের একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে মামলা করা হয়। মামলার মূল বাদী ছিল Sürekli Vakıflar Tarihi Eserlere ve Çevreye Hizmet Derneği নামে একটি সিভিল সোসাইটি। কিন্তু ২০০৮ সালে মামলা খারিজ করে দেয় আদালত। এরপর আবারও মামলা দায়ের করে বাদীপক্ষ। মামলার গ্রাউন্ডগুলো ছিল;
১. আয়া সোফিয়া একটি ওয়াকফ সম্পত্তি। এটাকে যে কাজে ব্যবহার করার জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে সে কাজ ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার আইনসঙ্গত নয়। আর ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর এটাকে ফাতিহ সুলতান মেহমেত কিনে নিয়ে মসজিদের জন্য ওয়াকফ করেছিলেন। ১৯৩৬ সালের ট্যাক্স পে করার কাগজেও আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে লেখা আছে।
২. জাদুঘরে রুপান্তর করার নির্বাহী আদেশটি তড়িঘড়ি করে লেখা হয়েছে যা ঐ বছরে জারি করা আগের অধ্যাদেশের নম্বরের সাথে মেলে না। এমনকি আতাতুর্কের স্বাক্ষরটির ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করা হয়। কারণ, আতাতুর্ক নামে ওখানে স্বাক্ষর করা আছে কিন্তু মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক নাম গ্রহন করেছিলেন ১৯৩৫ সালে (জাদুঘরে রুপান্তর করা হয় ১৯৩৪ সালে)।

দীর্ঘ শুনানী শেষে গত ১১ জুলাই তুর্কি আদালত জাদুঘর বানানোর সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষনা করে মসজিদ চালুর পক্ষে রায় দেয় এবং সরকার সেটা বাস্তবায়ন করে।

ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী অনেক কাজ করেন কামাল পাশা। ফলে পরিবেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পরবর্তী তুর্কি সমাজে জানাজা পড়ানোর মত ইমাম বা আলেম পাওয়া যেত না। পরবর্তীতেও কামাল পাশার ভাবাদর্শীরা ক্ষমতায় থেকে তুরস্কে বলবৎ রাখেন তার রীতিনীতি। এর অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেমন আযান চালুর অপরাধে ১৯৬১ সালে তুরস্কের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফাঁসিতে ঝোলান তার ভাবাদর্শীরা। ১৯৯৭ সালে ধর্ম নিরপেক্ষতা লংঘনের অভিযোগ এনে মাত্র এক বছরের মাথায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করেন কামাল পাশার আদর্শবাহী সেনাবাহিনী। ১৯৯৯ সালে ফজিলত পার্টির এমপি মেরভে কাভাকচিকে শপথ পড়তে দেওয়া হয়নি এবং পার্লামেন্ট থেকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয় শুধু হিজাব পরার কারণে

যেসকল মুসলমান আয়া সোফিয়া ইস্যুতে বিরোধীতা করছেন তাদের প্রায় সবার যুক্তি ৬শত বছর আগে আয়া সোফিয়া গির্জা ছিল, তাই এরদোয়ানদের মসজিদ করা ঠিক হয়নি। সুলতান ফাতিহ মেহমেত জোর করে গির্জা দখল করে মসজিদ করেছিলেন যদি এ কথাকেও সত্য ধরে নেয়া হয় তবে তাতেও ইসলামী শরিয়াতে কোন সমস্যা থাকার কথা না বলে মনে করেন এর পক্ষের লোকজন। তাদের যুক্তি হল আয়া সোফিয়া বাইজেন্টাইন সম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল এবং ইসলামে গণিমাতের বিধান অনুযায়ী কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর সম্রাটের সব সম্পত্তির মালিক হন সুলতান। ইসলামী বিধি অনুযায়ী গনিমাতের মাল সুলতান যা খুশি তা করতে পারেন এবং তাতে শরিয়াতে কোন নিষেধ নাই। তবুও সুলতান তৎকালীন খ্রিস্টানদের কাছ থেকে এটা কিনে নিয়েই মসজিদ চালু করেছিলেন বলে তুর্কি ইতিহাসের দাবি। উসমানী আমলে পাঁচ শত বছর ধরে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত আয়া সোফিয়াকে কামাল পাশার বানানো জাদুঘর থেকে বর্তমান এরদোয়ান সরকার আবার মসজিদ করেছে। সুতরাং পক্ষের লোকজনের দাবি গির্জা থেকে মসজিদ করার দায় কোনভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না।

যাইহোক বিরোধীদের যুক্তিকে গ্রহণ করলে আরো কিছু প্রশ্নের সমাধান জরুরী হয়ে পড়বে। যদি খ্রিষ্টানদের থেকে কিনে নেয়া গির্জাকে মসজিদ না বানানো যায় তাহলে তাদের থেকে জয় করা কনস্টান্টিনোপলকে (ইস্তাম্বুলের পুর্ব নাম) কি করে ইস্তাম্বুল করা যায়? তাহলে কি এটাও অবৈধ হয়ে যায় না? এখন হয় ইস্তাম্বুলকে কনস্টান্টিনোপল করে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ফেরত দিতে হবে নয়তো পুরো শহরকে জাদুঘর বানিয়ে রাখতে হবে। দেড় হাজার বছর আগে মুসলমানদের ধর্ম ছিল না। তখন দুনিয়ার মানুষ (যারা ধর্ম মানতেন) অন্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন। পৃথিবী জুড়ে ছিল মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা। ইসলাম ধর্ম আসার পর মসজিদের জন্ম। তাই বলে কি সব মসজিদ বেআইনি? ভারত উপমহাদেশে মাত্র কয়েক শত বছর আগেও বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মসজিদের জায়গা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ছিল, কারণ তখন এখানকার মুসলিমদের পুর্ব পুরুষ ছিলেন অন্য ধর্মের অনুসারী। এক্ষেত্রে কি বলা যায়? পাড়ার মসজিদগুলো সব বেআইনি? উপমহাদেশের মুসলমানরা কি সবাই বেআইনি মানুষ? আর মুসলমানিত্ব? তাও কি বেআইনী? নবী (সঃ) এর মক্কা বিজয়ের আগে পবিত্র কাবা ঘরে পৌত্তলিকদের ছোট বড় অসংখ্য মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের পর পবিত্র কাবা থেকে সেগুলো বের করে দিয়েছিলেন তিনি। এখন কি পৌত্তলিকরা কাবাকে নিজের বলে দাবি করবে নাকি মুসলমানরা নিরপেক্ষ সাজতে সেটিকে জাদুঘর বানাবে?

যারা আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে চালুর ক্ষেত্রে তুর্কি সরকারের বিপক্ষে মত দিচ্ছেন তারা কি একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? উসমানীয়দের (১২৯৯ সালে অঘুজ গোত্রের প্রথম উসমান তুরস্কের পশ্চিমাংশে সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামানুসারে এর নাম হয় উসমানীয় সাম্রাজ্য। ১৯২৪ সালে পশ্চিমাপন্থী সেক্যুলার মোস্তফা কামাল পাশা উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করেন। এটাকে অটোমান সাম্রাজ্যও বলা হয়) পতনের পর থেকে এরদোয়ান আসার আগ পর্যন্ত প্রায় একশ’ বছর বাম ও সেক্যুলার পন্থীদের দ্বারা শাসিত হয়েছে তুরস্ক। ফলে সেখানে একটি বিরাট সংখ্যক মানুষ এই ভাবধারার। বর্তমানে সংখ্যায় এরা কমলেও এখনও অনুল্লেখযোগ্য নয়, যা মাঝেমাঝে আমরা সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় দেখি। এরদোয়ান বিরোধীরা ২০১৬ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টাও করেছিল, যদিও তাঁর সমর্থকরা প্রতিহত করায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইসলামপন্থী এরদোয়ানরা প্রায় দুই দশক ক্ষমতায় থাকলেও এখনও ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ সেক্যুলার তথা সেক্যুলারদের গুরু আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল পাশার ভাবাদর্শী। সংসদে কামাল পাশা প্রতিষ্ঠিত কট্টর সেক্যুলার দল সিএইচপি’র প্রতিনিধিত্ব আছে। এমনকি খোদ আয়া সোফিয়া মসজিদ যে শহরে অবস্থিত সেই ইস্তাম্বুলের মেয়রও বিরোধী পক্ষের এবং ইউরোপীয় শহর হওয়ায় এখানে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ পশ্চিমা সংস্কৃতির ও সেক্যুলারপন্থী। আয়া সোফিয়া ইস্যুতে সিএইচপি অথবা এরদোয়ান বিরোধী কোন দল এখন পর্যন্ত বিপক্ষে কোন বিবৃতি দেয়নি। সিএইচপি ব্যতিত অন্যসব দল বরং এ কাজকে সাধুবাদ জানিয়েছে। সিএইচপি বা সেক্যুলাররা কেন প্রতিবাদ করছে না? কারণ স্পষ্ট। ভোটের রাজনীতি।

বর্তমানে তুরস্কে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ আয়া সোফিয়ার পক্ষে। এ ইস্যুতে সরকারের পক্ষে তাদের অবস্থান। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর ভোট যাতে হাতছাড়া না হয় এবং এ ইস্যুতে বিপক্ষে গেলে পাবলিক সেন্টিমেন্ট ক্ষয়িষ্ণু সেক্যুলারদের আরো বিরুদ্ধে চলে যাবে বিধায় তারা চুপ আছে। বর্তমানে দেশটিতে যা পরিস্থিতি তাতে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তাদের রাজনীতিই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান

অন্যদিকে, সেক্যুলার ব্যতিত তুরস্কের ডানপন্থী দলগুলো সর্বদাই আয়া সোফিয়াকে মসজিদে পুন:রুপান্তরের পক্ষে ছিল। কারণ আয়া সোফিয়ার গুরুত্ব তাদের কাছে অপরিসীম। এই জায়গাটা তাদের কাছে একটা সিম্বলের মত। তুরস্কে ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দিন এরবাকান এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। দীর্ঘদিন আয়া সোফিয়ার পক্ষে মানুষকে জাগিয়েছেন, দাবী তুলেছেন। সবশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগেও আয়া সোফিয়াকে পুণরায় মসজিদ হিসেবে চালুর প্রতিশ্রুতি পুণর্ব্যক্ত করেছিলেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। এর আগে ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র থাকাকালে প্রথম এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া ক্রমেই ইসলামী ভাবধারার প্রতি অনুরক্ত হয়ে ওঠা তুর্কি জনগনের একটা বিরাট অংশের চাপ ছিল সরকারের ওপর। সবসময়ই আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর করার বিপক্ষে ছিল তারা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ডানপন্থী ও তুরস্কে ইসলামী জাগরণের অন্যতম কবি নাজিব ফাজিল কিসাকোরেকের (১৯০৪-১৯৮৩) কথায়। তিনি বলেছিলেন, “হে যুবকেরা, আয়া সোফিয়া আজ হোক, কাল হোক (একদিন) খুলবে! কেননা, এই দেশ টিকে থাকবে কি থাকবেনা এমন সন্দেহ যারা করে তারাই আয়া সোফিয়া খুলবে কি খুলবেনা এমন সন্দেহ করে! আয়া সোফিয়া খুলবেই, আর এমনভাবে খুলবে যে তা সারা দুনিয়া জানবে।” এসব কারণেই আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রুপান্তর করেছে তুরস্কের বর্তমান এস্টাবলিশমেন্ট। তবে এরদোয়ানরা ক্ষমতায় এসেই আয়া সোফিয়াকে মসজিদ করেনি। এজন্য দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। ব্যপক প্রচার ও অন্যন্য ইসলামী রীতি (যেমন-হিজাব চালুকরন) পুণঃপ্রবর্তন করে তু্র্কি জনমতকে পক্ষে এনে পরিবেশ তৈরি করেছেন। এরপর আয়া সোফিয়ার মত সিম্বোলিক ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে তুর্কি জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে লাগাতে চাইছেন।

আয়া সোফিয়াকে নিয়ে পশ্চিমাদের এত মাথা ব্যথা কেন? মনে রাখা দরকার এসব মসজিদ-গির্জা আসলে কোন ইস্যু না। পশ্চিমাদের মূল টার্গেট হল এরদোয়ান ও মুসলমানরা। মুসলিম কোন দেশ শক্তিশালী হোক তা চায় না তারা। আর এ কারনেই বিশ্ব মানচিত্রের ছোট্ট একটি জায়গা আয়া সোফিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বানিয়ে ফলাও করে প্রচার করছেন তারা। এরদোয়ানকে বিশ্ববাসীর নিকট খল নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস চালাচ্ছেন। আর মনের অজান্তেই তাতে শরিক হচ্ছেন অনেক মুসলিম। এরদোয়ান ইসলামী আদর্শ ও সাবেক উসমানীয় ভাবধারায় নিজের জাতিকে এককাতারে এনে বর্তমানে নানাভাবে নির্যাতিত ও পিছিয়ে পরা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যার প্রমাণ তার কার্যকলাপ থেকে পাওয়া যায়। আর আয়া সোফিয়া ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে এ বার্তাই দিতে চেয়েছেন তিনি। পশ্চিমাদের শত্রুতার এটাই হল মূল কারণ। তারা এরদোয়ানকে ভয় পায়। কারণ এরদোয়ান তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে তুর্কি সমাজে ইসলামী ভাবধারা এবং বিশ্বে সাবেক উসমানী গৌরব ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন। পশ্চিমা বিশ্বের ভয় এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ক সাবেক উসমানী সাম্রাজ্যের মত তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কিনা। কারণ আগামী ২০২৩ সালে শেষ হতে যাচ্ছে তুরস্ক তথা সাবেক উসমানী সাম্রাজ্যের উপর পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া এক শত বছরের লুসান চুক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাবেক উসমানীয় তথা অটোমান সাম্রাজ্য ছিল জার্মান-জাপান নেতৃত্বাধীন পক্ষে। বিপক্ষে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইটালি, গ্রীস নেতৃত্বাধীন শক্তি। যুদ্ধে জয় লাভের পর ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্জ, গ্রিকও ইটালিয়ানরা অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে তুর্কিদের উপর লুসান চুক্তি চাপিয়ে দেয়। সুইজারল্যান্ডের লুসান শহরে ১৯২৩ সালে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি বলে বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যকে কেটেছেঁটে বর্তমান আধুনিক তুরস্কের রুপ দেয়া হয়। এ চুক্তির ফলে তৎকালীন হেজাজ তথা সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, মিশর, সুদান, সাইপ্রাস, ইরাকের মসুল-কিরকুক, বর্তমান ইটালির দোদক্যান দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকা তুর্কিদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এসব এলাকা পশ্চিমা শক্তিরা তাদের নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। যেমন-ফ্রান্স মিশর, বৃটেন তৎকালীন হেজাজ-ফিলিস্তিন নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে হেজাজে সৌদ পরিবারকে ব্রিটিশরা সিংহাসনে বসালে এর নাম হয়ে যায় সৌদি আরব বা কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া। ১৯৪৮ সালে বৃটেনসহ পশ্চিমা শক্তিরা জাতিসংঘের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীকে ভাগ করে জায়নবাদী ইহুদীদের ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যা বার বার চেষ্টা করেও উসমানী আমলে ইহুদীরা করতে পারে নাই। মসুলসহ কিছু এলাকা দেয়া হয় লীগ অব নেশনসের তত্ত্বাবধানে। ভুমধ্যসাগরের অনেক অটোমান দ্বীপ যায় গ্রীসের দখলে। তাছাড়া চুক্তিতে বসফরাস প্রণালী তুরস্কের হলেও তা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তুরস্ক ভুমধ্যসাগরের কোন খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেরা আহরন করতে পারবে না, হারানো অঞ্চল দাবি করতে পারবে না সহ নানা ধরনের নিবর্তন ও অপমানমুলক শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়। এই চুক্তিরই মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ২০২৩ সালে।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক

২০০২ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই এই চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি তুলেছিলেন এরদোয়ান। কিন্তু তা কানে তোলেনি পশ্চিমারা। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হোক তা চায় না গ্রীস, ফ্রান্স, ইসরাইল। চুক্তি যাতে বলবৎ থাকে এজন্য সম্প্রতি জোট গড়েছে এই দেশগুলো। এরইমধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বে বর্তমান তুরস্ক সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাছাড়া পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তানের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছেন এরদোয়ান। ন্যাটো সদস্য হয়েও তুরস্ক কিছুদিন আগে রাশিয়ার সাথে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় এবং সম্প্রতি গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি করেছে। তুরস্কের সাথে গ্যাস পাইপলাইন চুক্তির ফলে ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমবে। কারণ বর্তমানে ইউক্রেন দিয়ে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করে। অন্যদিকে এ চুক্তির ফলে ইউরোপের সাথে দর কষাকষির সুযোগ বাড়বে তুরস্কের। ইউরোপকে চাপে রাখতেই রাশিয়ার সাথে এসব চুক্তি করেছে তুর্কিরা। বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকার বিপরীতে চীন-রাশিয়া জোটের উত্থান লক্ষণীয়। নিজ সীমানার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে তুরস্ক। লিবিয়া, সিরিয়া, আইএসসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা ইস্যুতে নাক গলাতে শুরু করেছে দেশটি। সিরিয়া ছাড়াও লিবিয়ায় সৈন্য রয়েছে তুরস্কের। ভুমধ্যসাগর অঞ্চলে গ্রীসের প্রভাব হ্রাস করতে লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে। লিবিয়ার বর্তমান বৈধ সরকারকে তুরস্ক ও জাতিসংঘ সমর্থন দিচ্ছে। লিবিয়ার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ভুমধ্যসাগর নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে যাবে তুর্কিদের জন্য। ভুমধ্যসাগর ইস্যুকে সামনে রেখে তুরস্কের এখন ঘোর বিরোধী গ্রীস। এ কারণে আয়া সোফিয়া ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি বিরোধীতা করছে এই দেশ। লুসান চুক্তির মেয়াদ শেষে ভুমধ্যসাগরকে নিয়ে গ্রীস-তুরস্ক যুদ্ধ হলেও আশ্বর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এরদোয়ানের তুরস্ক। এ কারণেই ২০০৮ সালে তুর্কি-আফ্রিকা সহযোগিতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আফ্রিকার ২৮টি দেশ অংশ নেয়। আগের বছরের তুলনায় গত বছর আফ্রিকার সাথে তুরস্কের ১২শতাংশ বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৩ সালে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তুরস্কের বিনিয়োগ ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তুরস্কের বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তুর্কি বিনিয়োগে মহাদেশজুড়ে পৌনে এক লাখের বেশি মানুষের কর্ম সংস্থান হয়েছে। গত ১০বছরে আফ্রিকার ৩০টি দেশে ২৮টি সফর করেছেন এরদোয়ান। এমনকি দুর্ভিক্ষ, খড়া ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত সোমালিয়ায় মানবিক সহায়তার জন্য সেনা ঘাঁটিও স্থাপন করেছেন। আফ্রিকাকে ঘিরে তুরস্কের এসব উদ্যোগকে অনেকেই মহানুভব বললেও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা মিত্র সৌদি আরব মনে করে, ‘নব্য অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা দখল করতে চাইছে তুরস্ক। পাশাপাশি বিভিন্ন দিক থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঘিরে ফেলছে তুর্কিরা। মুসলিম বিশ্বকে সৌদির প্রভাববলয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে তারা। যে কারণে মুসলিম বিশ্ব বা উম্মাহর নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে সৌদি বাদশাহদেরও আমরা এরদোয়ানের বিরোধী শিবিরে দেখতে পাই। একথা এখন সবারই জানা জামাল খাসোগি কেলেঙ্কারীসহ নানা ঘটনায় বর্তমান সৌদি শাসকদের জনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তলানিতে। মুসলিম দেশগুলোতেও তার আগের প্রভাব ধরে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন এরদোয়ান। সম্প্রতি (২০১৯) মালয়েশিয়ায় ৫০টির অধিক মুসলিম দেশ নিয়ে তুরস্ক ও মালয়েশিয়া সম্মেলন করেছে। ওআইসির বিকল্প বৈঠক করে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখাতে চাইছেন এরদোয়ান। একদিকে আফ্রিকাকে হাত করে জাতিসংঘের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইছেন, অন্যদিকে সিরিয়ার কিছু অংশ পরোক্ষে দখল করে চাপে রাখছেন সৌদিকে। সুদান, মরক্কো, তিউনিশিয়া ও আলজেরিয়ার মত দেশগুলো তুরস্কের সাথে জোট বেঁধেছে। মনে রাখতে হবে ২০১০ সাল পর্যন্ত এরদোয়ান মোটামুটি বাস্তববাদ তথা রিয়ালিজম দ্বারা আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনা করেছেন। এরপর থেকেই সে জায়গায় স্থান পেয়েছে আদর্শবাদ বা আইডিয়ালিজম। আর তার আদর্শবাদ কি তা আমরা সবাই জানি। ইসলামের মূলমন্ত্রে জনগণকে উদ্বুদ্ধু করতে চাইছেন এবং উসমানীয়দের হারানো গৌরব ফেরাতে চাইছেন তিনি। তাই আয়া সোফিয়ার মত ভবিষ্যতে আরো পদক্ষেপ হয়তো নেবেন তুর্কি এই নেতা। এক্ষেত্রে তিনি কতটুকু সফল হবেন তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। এই বিষয়গুলো আঁচ করতে পেরেই আয়া সোফিয়ার মত নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে হইচই করছে পশ্চিমা দুনিয়া।

আরো পড়তে পারেন

কোয়ান্টাম সত্য

রবীন্দ্রনাথ: “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো পুবে পশ্চিমে। গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম “সুন্দর’, সুন্দর হল সে।” আইনস্টাইন: তোমার কবিতাটি সুন্দর, তবে তোমার সাথে আমি একমত নই। পান্না এবং চুনি কয়েকটি বিশেষ তরঙ্গদৈর্র্ঘের আলো প্রতিফলন করে, তোমার চেতনার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কাঁচের….

বোধ

জীবনানন্দ দাস : আলো – অন্ধকারে যাই – মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে! উপেক্ষা করিতে চাই তারে: মড়ার খুলির মতো ধরে আছাড় মারিতে চাই। তবু সে মাথার চারিপাশে! তবু সে চোখের চারিপাশে! তবু সে বুকের চারিপাশে! রবীন্দ্রনাথ: আরো বেদনা আরো বেদনা, প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা। লেখক : হে প্রভু, কবিদের….

আলো আমার আলো

ভ্যান গ (Vincent Van Gogh, ১৮৫৩-১৮৯০): আমি একজন পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট (post-impressionist) শিল্পী। আমার আঁকা ‘নক্ষত্র-খচিত রাত্রি (Starry Night)’ পৃথিবীর শিল্পানুরাগীদের ঘরে ঘরে টাঙানো থাকে। আমার তোলপাড় মনের দশা প্রকাশ করেছি রঙের বেহিসেবি ছড়াছড়িতে।  আমার সবচেয়ে প্রিয় রং ছিল হলুদ। আমি এঁকেছি ‘ফুলদানিতে হলুদ সূর্যমুখী ফুল,’ কখনো বারোটা ফুল, কখনো বা চোদ্দটা। আমার তুলিতে ভোরের এবং সাঁঝের….

error: Content is protected !!