অস্কার ওয়াইল্ড (Oscar Wilde, ১৮৫৪-১৯০০):

‘Tread lightly, she is near under the snow,
Speak gently, she can hear the daisies grow.’

‘And alien tears will fill for him
Pity’s long-broken urn,
For his mourners will be outcast men,
And outcasts always mourn.’

লেখক : বরফ কি মৃত্যুর প্রতীক? চাপ চাপ বরফের নিচে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন সমাজচ্যুত, নির্বাসিত কবি অস্কার ওয়াইল্ড এবং তাঁর এক ভালোবাসার জন। শীত কি গ্রীষ্মের অভাব? সে আমলে ইংল্যান্ডে শীত বেশ জাঁকিয়ে বসতো, সেই সাথে রোগ, বালাই, নিউমোনিয়া, মৃত্যু। ১৬২৬ সালে এমনি এক শীতের সকালে মারা গেলেন দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন।

ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon, ১৫৬১-১৬২৬): আমি একজন দার্শনিক, বিজ্ঞানী, এবং আইনবিদ। আমাকে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের (expermental science) জনক বলে ডাকা হয়। যুক্তিবিদ্যার আরোহপ্রানালী (inductive logic) এবং বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ প্রণালীর (scientific methodology) পিতা হিসাবেও আমি পরিচিত। ‘মুরগির মাংস সংরক্ষণে বরফের প্রভাব’ জাতীয় একটা পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাকে প্রাণ হারাতে হয়। একটি মুরগিকে জবাই করে যদি তাকে বরফে ঢেকে রাখা হয় তবে কতদিন পর্যন্ত তার মাংস খাওয়া যেতে পারে? মুরগির খোঁজে লন্ডন শহরের বাইরে একটি গ্রামে যেতে হয়। প্রচন্ড শীতে কয়েকবার আসা যাওয়া করে নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হই। এই রোগ থেকেই আমার মৃত্যু ঘটে।

লেখক : মুরগি-বিষয়ক জটিলতায় তোমার মতো একজন দার্শনিকের মৃত্যু পৃথিবীর ইতিহাসে এক দুঃখজনক ঘটনা।

টুডোর (Frederic Tudor, ১৭৮৩-১৮৬৪): আমাকে সে আমলে আমেরিকার বরফ রাজা বলে ডাকা হতো। বরফ বিক্রি করে আমি কোটিপতি হয়েছিলাম। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে আমাদের ছিল এক বিশাল ফার্ম। বিল এবং পুকুরে ভর্তি এই অনাবাদি ফার্ম শীতকালে বরফে জমে যেত। সে যুগে রেফ্রিজারেটর ছিল না, পৃথিবীর গরম এলাকায় বরফের বেশ চাহিদা ছিল। বরফ বিক্রি করে টাকা উপার্জনের কথা ভাবি। আমি অনেক স্বপ্ন দেখতাম, আমার বরফ ভর্তি জাহাজ আটলান্টিক, ভারত, এবং প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতবর্ষে পৌঁছে যাবে, সারি সারি ঘোড়াগাড়ি আমার ফার্মের বরফ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে সরবরাহ করে বেড়াবে। প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিল আমি একটা বদ্ধ পাগল। বরফ তো গলে যায়! মধ্যেপ্রাচ্যে যেতেযেতেই জাহাজ ভর্তি বরফ সব গলে পানি হয়ে যাবে, বিক্রি করবে কি? জাহাজ কোম্পানির মালিকেরা আমার বরফ ফেরি করতে রাজি হলো না। অগত্যা আমি নিজেই জাহাজ কিনে ফেললাম!

জোসেফ ব্ল্যাক (Joseph Black, ১৭২৮-১৭৯৯): আমি একজন ব্রিটিশ রসায়নবিদ এবং ডাক্তার। আমি কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস আবিষ্কার করেছিলাম। বরফের একটা বিশেষ গুণের কারণে ‘বরফ রাজা’ টুডোরের স্বপ্ন সফল হয়েছিল। আমি এই রহস্যের সন্ধান পাই বরফ এবং পানি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে। আমি এর নাম দিয়েছিলাম বরফ গলার এবং পানির বাষ্পে পরিণত হওয়ার সুপ্ত তাপ (latent heat)। এই তাপ ছুঁয়ে বোঝা যায় না, কোনো থার্মোমিটার এই তাপ মাপতে পারে না! আমি একটি পাত্রে একটুকরো বরফ নিই যার তাপমাত্রা ছিল -১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাত্রটিকে খুব ধীরে ধীরে গরম করতে থাকি। বরফের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে শুন্য ডিগ্রি সেলিসাস হয়ে গেলো, এরপর বরফের টুকরোটা ধীরে গলতে শুরু করলো, কিন্তু সেই পানিমিশ্রিত বরফের তাপমাত্রা আর বাড়ছে না। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই তাপ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? এই হারিয়ে যাওয়া তাপের নাম দিয়েছিলাম সুপ্ত তাপ।

জেমস ওয়াট (James Joules, ১৭৩৬-১৮১৯): অনেকে মনে করে আমি বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছি। কথাটা ভুল। ‘মা কেটলিতে চায়ের পানি গরম করছেন, উত্তপ্ত বাষ্পের ধাক্কায় কেটলির ঢাকনা ওঠানামা করছে, আর তাই দেখে আমি বাষ্পীয় ইঞ্জিন বানানোর কথা ভাবি’, এমন একটা মজার গল্প বাজারে চালু আছে। এই গল্পটাও মিথ্যে। আমার আগেই বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছিল, এমন কি প্রাচীন আমলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাষ্পের শক্তিকে কাজে লাগানোর কৌশল মানুষের জানা ছিল। জোসেফ ব্ল্যাক আমার বন্ধু ছিলেন, তাঁর সুপ্ত তাপ আবিষ্কারের ঘটনা আমাকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তোলে। পানির বাষ্পীয়ভবনের সুপ্ত তাপ অনেক বেশি ! এই কথা মনে রেখে আমি নতুন ভাবে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নকশা তৈরী করি।

টুডোর: বরফের সুপ্ত তাপও অনেক বেশি। তাই বরফ গলতে অনেক তাপ লাগে, অনেক সময় লাগে! আমার জাহাজের শতকরা কুড়ি ভাগ বরফ গলে যেত, কিন্তু বাকি আশি ভাগ বরফ বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা হতো। সে যুগে যন্ত্র দিয়ে পানি থেকে বরফ বানানোর কৌশল মানুষের জানা ছিল না। বরফের সাথে পৃথিবীর গরম দেশগুলোর লোকজনের পরিচয় ছিল শুধুই শিলাবৃষ্টির মাধ্যমে, ঠান্ডা পানির শরবত শুধু রাজা-রানীদের কপালে জুটতো। সে যুগে বরফ ছিল দুর্লভ সামগ্রী, রাজার ভান্ডার লুট করে হীরা-মানিক পাওয়া যায়, বরফ পাওয়া যায় না! প্রহরী দিয়ে ধন-সম্পদ পাহারা দেওয়া যায়, বরফকে নয়, ও শুধুই গলে যায়।

জেমস জুলস (James Joules, ১৮১৮-১৮৮৯) : তাপ কি, তা সে আমলে কেউ জানতো না। ফ্রান্সের বিজ্ঞানী লাভোজিয়ের মনে করতেন তাপ একধরণের পদার্থ। তিনি এই পদার্থের নাম দিয়েছিলেন ক্যালোরি। এটা ছিল একেবারেই ভুল ধারণা। আমি প্রমান করি যে তাপ আসলে শক্তি, আরো স্পষ্ট করে বললে, তাপ হলো পদার্থের অনু-পরমাণুর গতিশক্তি। এই পরমাণুগুলো ছোটাছুটি করছে, ঝাকাঝাকি করছে, দোল খাচ্ছে। একটি বস্তুর তাপমাত্রা হলো এই গড় গতিশক্তির পরিমান।

বরফের ভিতরে পানির অনুগুলো বৈদ্যুতিক বল দিয়ে একে অপরের সাথে শক্ত বাঁধনে বাঁধা আছে। এই অদৃশ্য শিকলকে রসায়ন শাস্ত্রে বলে কেমিকাল বন্ড। এই বাঁধনের শক্তিকেই সুপ্ত তাপ বলে। বাইরে থেকে উত্তাপ দিয়ে এই বাঁধন ভাঙার সময় বরফের তাপমাত্রা আর বাড়ে না, উত্তাপ যাচ্ছে শিকল ভাঙার খাতে, ছোটাছুটি বাড়ানোর কাজে নয়।

লেখক : তাপ কি তা না জেনেই মানুষ বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিল। শক্তি, এবং কাজ যে তাপের দুটি বিশেষ রূপ এবং তাপ খরচ করে কতটা কাজ আশা করা যায় তা জেমস জুলসের কাছে জানার পরে তাপ-ইঞ্জিন বানানো সহজ হয়ে গেল। শুরু হলো যান্ত্রিক বিপ্লব। গড়ে উঠলো কারখানা, শহর, বস্তি। রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি নিয়মিত চলাচল শুরু করলো, এরোপ্লেন পাখা মেললো। সামন্তবাদী অর্থনীতি পরিণত হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে।


লেখক: পদার্থবিদ ও ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ইমিরিটাস প্রফেসর।

আরো পড়তে পারেন

আয়া সোফিয়া, ভেতরে-বাইরের রাজনীতি ও আমাদের মুসলমানিত্ব

গত কিছুদিন ধরে তুরস্কের আয়া সোফিয়া মসজিদ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিতর্ক লক্ষনীয়। আয়া সোফিয়াকে পুণরায় মসজিদ হিসেবে চালুর সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পক্ষে লিখছেন কেউ কেউ। কেউ আবার বিপক্ষে। এই তর্কে বিপক্ষে যোগ দিয়েছেন কিছু মুসলিমও। তাদের দাবি কাজটি ঠিক হয়নি। অনেকেই এরদোয়ানের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করতে ছাড়ছেন….

শিল্পের মানদন্ড হতে পারে?

সাহিত্যে সম্মাননা বেশিরভাগ সাহিত্যিকেরই প্রত্যাশিত এবং সাহিত্যিকদের জন্য সম্মাননাপ্রাপ্তি খুব বিরলও নয়। যেটি বিরল তা হলো, সম্মাননা প্রত্যাখ্যান, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে। কোনো সাহিত্যিকের সম্মাননা ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা উল্লেখ করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের ঘটনাই ঘুরে-ফিরে আসে। সেটিও কোনো গভীর দার্শনিক উপলব্ধিসঞ্জাত সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল নেহাতই রাজনৈতিক: ব্রিটিশদের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। ১০০….

রক মিউজিকঃ অতিকায় হস্তী কি সততই লোপ পাইয়াছে?

এক. শোর উঠেছে রক মিউজিক নাকি বিলুপ্ত হবার পথে। গত শতকের নব্বই দশকের পর থেকেই রক মিউজিকের উন্মাদনা পড়তির দিকে। তার নানান কারণও অবশ্য রয়েছে। মূল কারণ সম্ভবত কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বিপ্লব ঘটে যাওয়া। কেননা এই দু’টি বিষয় আসলে মানুষের বিনোদিত হবার ধরণকেই পাল্টে দিয়েছে। অবশ্য রক মিউজিকের এই ক্ষয়ের পেছনে তার….

error: Content is protected !!