চিঠিতে কোন নামও ছিল না আর কোন ঠিকানাও ছিল না— হাতে লেখা একটি চিরকুট, খামটাও অতিসাধারণ। গুরু দরজা খোলার সময় যদি পাপোষ না সড়াতো তা হলে হয়ত ওটা ওর চোখের গোচরই হত না। সে সব সময় বাইরে যাওয়ার সময় পাপোষটা ভিতরে রেখে দরজায় তালা লাগিয়ে যায়, কারণ হচ্ছে বাইরে থাকলে পাপোষটা চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যে লোকটি চিঠি দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে চলে গেছে সে তো আর জানে না যে সেই চিঠিটি পাপোষের তলে ঢুকে গেছে।
চিঠিতে লেখা—
‘ইয়াং সুই ভিয়েতনাম থেকে এসেছে। তোমার সাথে দেখা করতে চায়। আমরা সন্ধ্যার সময় কাশিয়া মলের বাসায় মিলিত হচ্ছি। তোমার নতুন কবিতা নিয়ে চলে এসো’।
‘কবিতা?’ গোরখ পান্ডে কিছুই বুঝতে পারে নাই। কেমন কবিতা? সে নিজেও কবি না আর এই হোস্টালে অন্য কোন কবিকেও সে চিনে না। আর চিঠিতে কোন নামও নেই, চিঠির উপরেও নেই নিচেও নেই। সে চিঠিটি ভাঁজ করে তার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। সে খাটের নিচ থেকে ‘কেডজ’ বের করল, পড়ে জগিং করার জন্য বেরিয়ে গেল। এটাই ওর প্রত্যেক সকালের নিয়ম। কলেজ গ্রাউন্ড পেরিয়ে, হাই-ওয়ে পেরিয়ে অন্য দিকে যে নতুন পার্ক বানানো হচ্ছে, ওই পার্কে দুই চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসে। গোরখ পান্ডে, যাকে ছেলেরা বিখ্যাত নকশাল নেতা হিসেবে জানে, গোরখ পান্ডের ডাক নাম, ‘গুরু’ সেই নামেই ডাকে।
দুই দিন পরে আবার একই ঘটনা ঘটলো। জগিং থেকে ফিরে এসে সে নিজের রুম পরিস্কার করার জন্য পাপোষটা সরালো, আবার একটি চিঠি পেল। আগের চিঠির মতন, সাদা কাগজের উপর লেখা আর অতিসাধারণ খামে বন্দী। এই চিঠিতেও কোন নাম ঠিকানা নেই। কোন তারিখও নেই। শুধু এবার সম্বোধন করা হয়েছে—
‘দাদা, আপনাকে অনেক মিস করলাম। ইয়াং সুই আজ কলকাতা যাচ্ছে, ওখান থেকে তারা দেশে ফিরত চলে যাবে। সেই দিন, সে আপনার অনেক অপেক্ষা করেছে। সে ট্রেনে যাচ্ছে, যদি দেখা করতে আসতে পারো তাহলে ঠিক সাড়ে চারটা সময় স্টেশনে চলে এসো। আমি বাইরেই থাকবো। প’
এবারের হাতের লেখা আগের চিঠির চেয়ে একটু ভিন্ন মনে হল। এই বার লেখাতে বেশ স্থিরতা ছিল। আর হাতের লেখা মেয়েলি মনে হলো। সে শেষ বাক্য আবার পড়লো, ‘আমি বাইরে থাকব’! ‘প’ প্রীতি বা পুস্পা তো হবে না, কোন পার্থ হবে। তখন তাঁর মনে পড়লো যে আগের চিঠি তো ট্র্যাকসুটের পকেটে রেখে ছিল আর সেই ট্র্যাকসুট এখন লাউন্ড্রিতে আছে। সে রাইটিং টেবিলের ড্রায়ার খুলে চিঠিটি রেখে দিল।
কিছুক্ষণ সেই চিঠির কথা মনে থাকল, এই নাস্তা করার সময়, চা খাওয়ার সময়। মনে মনে একটি যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিল। হয়ত কারোর প্রেম চলছে কোন ভিয়েতনামি মেয়ের সাথে। আর সে দেখা করতে যায় নাই তাঁর অর্থ সে হয়ত রাগ করে আছে অথবা মেয়ের সাথে প্রতারণা করছে। কলেজে পৌঁছানোর পর গল্পটি বাতাসে মিলে গেল।
তারপর অনেক দিন কোন চিঠি বা চিরকুট আসে নাই। কিন্তু সকাল বা সন্ধ্যা, যখনি এই চিঠির কথা মনে হতো সে পাপোষ উঠিয়ে দেখতো যে কোন চিঠি এসেছে কি না। এটা একটি অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছিল। এটার কোন কারণ ছিলনা, ছিল শুধু কৌতুহল, জানার ইচ্ছে যে চিঠিটা কাকে লেখা হয়েছিল? সে কোনো সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পায়নি এবং এর উত্তর খোঁজার কোন চেষ্টাও করেনি।

দেশের বাড়ী বিহারে কিন্তু নকশাল আন্দোলনের দরুণ বাংলায় বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। কলেজের যুবকেরা পত্রিকা আর কাগজে তার কবিতা পড়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠতো, তাদের মনের জোশ বেড়ে যেত। যখনই তার কোন নতুন কবিতা ছাপা হত তখন তরুণ ছেলে-মেয়েরা পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাসে, ট্রামে তার কবিতা এঁটে দিত। লোকজন তাকে দেখে নাই, তার ছবি ছাপা হত কিন্তু এক ছবির সাথে অন্য ছবির কোন মিলই থাকত না

অনেক দিন হয়ে গেল— কোনো চিঠি আসেনি, কোনো চিরকুট আসেনি। কিন্তু শহরে অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছিল। নকশালবাড়ী আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছিল। প্রত্যেক দিন কোনো না কোনো ঘটনা, কোথাও না কোথাও বোমার বিস্ফোরণ হচ্ছিল। কলেজে শুধু ছাত্র নয়, শিক্ষকদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছিল। এখন তার বেশীর ভাগ সময় লাইব্রেরী বা ক্যান্টিনেই কাটতে থাকে।
ক্যান্টিনে কানাঘোষা চলছে। সে প্রথমে অতো খেয়াল করেনি। কিন্তু পরে সে আর না থাকতে পেরে তার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করল। সে তাকে বাইরে গ্রাউন্ডে নিয়ে গিয়ে জানালো, ‘একটি অনুষ্ঠান হবার কথা আছে, মনে হয় রাজপুরে হবে’।
‘কেমন অনুষ্ঠান?’
‘এমনি তো সাহিত্য নিয়ে অনুষ্ঠান কিন্তু রাজনৈতিকও হতে পারে’। তারপর আরো কাছে এসে কানে কানে বলল, ‘শুনা যাচ্ছে যে ওই অনুষ্ঠানে গুরু আসবে’।
‘ও আবার কে?’
‘তোমার মিতা যার নাম আর তোমার নাম একই’।

গোরখ পান্ডে, তার দেশের বাড়ী বিহারে কিন্তু নকশাল আন্দোলনের দরুণ বাংলায় বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। কলেজের যুবকেরা পত্রিকা আর কাগজে তার কবিতা পড়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠতো, তাদের মনের জোশ বেড়ে যেত। যখনই তার কোন নতুন কবিতা ছাপা হত তখন তরুণ ছেলে-মেয়েরা পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাসে, ট্রামে তার কবিতা এঁটে দিত। লোকজন তাকে দেখে নাই, তার ছবি ছাপা হত কিন্তু এক ছবির সাথে অন্য ছবির কোন মিলই থাকত না। শোনা যায় যে পুলিশ তারে খোঁজে, তাই সে ঘন ঘন তার ছদ্মবেশ পালটায়। কিছু কিছু লোক বলত যে ওই ছবিগুলোর মধ্যে একটাও তার ছবি না।

নকশালবাড়ী আন্দোলন বাংলা থেকে বের হয়ে বিহারে বেশ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গোরখ স্নাতকের ছাত্র, কোন রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু সাহিত্যের ছাত্র হবার দরুণ সে গোরখ পান্ডের কবিতা অবশ্যই পড়েছে এবং ওই কবিতগুলোর তাপও অনুভব করেছে।

একদিন ক্যান্টিনে বসে তার এক বন্ধু বলছে, ‘গুরু, একবার তার কবিতা শুনলে কাপড়ে আগুন ধরে যাবে’।
‘তুমি শুনেছো?’
সে হেসে বলল, ‘এত ভাগ্যবান হলে আমি কি জীবিত থাকতাম, আমার ছাই পড়ে থাকত এই তোমার সামনে রাখা প্লেটে’।
ওই বন্ধুর সাথে সে সেই অনুষ্ঠানে চলে গেল। কিন্তু কিছুই ঠিক ছিলনা, অনুষ্ঠান কোথায় হবে, কেমন করে হবে, কারা থাকবে কিছুই নিশ্চিত ছিল না।
অর্ধেক রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই ট্রাফিক অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হল, কয়েক জায়গায় ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেল। বাদল চকের কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে পুরা শহরে জ্যাম লেগে গেল। ষ্টেশন রোড তো পুরাই বন্ধ করে দেয়া হলো। সে জানতে পারল যে ঠিক চকের সামনে একটি বোমার বিস্ফরণ হয়েছে আর পুলিশ কামিশনারের জীপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ কামিশনার বেঁচে গেছে। গোরখ আর তার বন্ধু বাস থেকে নেমে হেঁটে হোস্টলে ফিরে এল এতে কয়েক ঘন্টা লেগে গেল।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে হঠাৎপাপোষের খেয়াল হল। উঠে গিয়ে পাপোষ তুলে দেখল, আগের মতই একটি চিরকুট রাখা। মনে হচ্ছে অনেক তাড়াহুড়া করে লেখা হয়েছে,“সেন্ট আগনেস চার্চের পিছনে ‘এস’ অপেক্ষা করবে। কোহিমা যাওয়ার জন্য গাড়ী তৈরি পাবে। এখন আর কোন ভাবেই বিলম্ব করা যাবে না। ‘প’।”
গোরখ এর মাথায় কিছুই ঢুকল না, আর সে এই ব্যপারে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল সকাল একটি কোলাহলে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পুলিশ পুরা হোস্টেল ঘিরে রেখেছে এবং সবাইকে গ্রাউন্ডে লাইন করে দাঁড় করানো হচ্ছে। সব কক্ষে তল্লাশি চলছে।
হঠাৎ একজন কন্সটেবল দৌঁড়ে এসে ইন্সপেক্টারকে জানলো, ‘স্যার ওকে পাওয়া গেছে, সে সাইনাইড খেয়ে নিয়েছে’। ইন্সপেক্টার তার পিছু পিছু ছুটল হোস্টালের ভিতরে।
ছাব্বিশ বা সাতাশ বছর বয়স হবে। সুন্দর করে দাঁড়ি কমানো, রিমলেস চশ্মা এখনো চোখে আঁটকে রয়েছে।
‘কোন কক্ষ থেকে তাকে পেলে?’ একজন জিজ্ঞাসা করল।
‘একান্ন নম্বর’। ওটা গোরখের ঠিক উল্টো দিকের কক্ষ।
‘সে কে?’, গোরখ জিজ্ঞাসা করল।
‘কি জানো না, বিখ্যাত নকশাল নেতা গোরখ পান্ডে’। এটা শুনে গোরখ একদম অবশ হয়ে গেল।
‘অনেক দিন ধরে এই খবর ঘুরছে যে সে আমাদের শহরে আছে আর কোথাও লুকিয়ে আছে’।
‘কি বলো? আমাদের হোস্টেলে ছিল আর আমরা কেউই জানি না’।
গোরখের হাত ট্র্যাকসুটের পকেটে থাকা চিরকুট কচলাচ্ছে। এই ট্র্যাকসুট লান্ড্রি থেকে ধুয়ে আনা হয়েছে। পুলিশ রিপোর্ট লেখার সময় ইন্সপেক্টার হোস্টেল ওয়ার্ডেনকে একটি চিরকুট দেখাচ্ছে যেটা গোরখ পান্ডের পকেট থেকে বের হয়েছে। বাংলায় লেখাঃ
‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি’।


গুলজার এর মূল উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন হাইকেল হাশমী
গুলজার ১৮ই আগস্ট ১৯৩৪ সালে পাকিস্তানের জেলা জেহলুমে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি একজন বিখ্যাত কবি, গীতিকার, গল্পকার, ছায়াছবি পরিচালক, ছায়াছবির সংলাপ লেখক। তিনি পদ্মভূষণ, সাহিত্য একাডেমি এওয়ার্ড, গ্রামি এওয়ার্ড, অস্কার এওয়ার্ড পেয়েছেন। তিনি বিশবার ফিল্ম ফেয়ার এওয়ার্ড আর সাতবার ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছেন।

আরো পড়তে পারেন

শ্বশুরবাড়ি সমাচার

মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। যে ব্যক্তি নিজের পরিচয়ে পরিচিত তিনি উত্তম, যিনি পিতার পরিচয়ে পরিচিত তিনি মধ্যম আর যিনি শ্বশুরের পরিচয়ে পরিচিত তিনি অধম। আরো আছে। যিনি শ্বশুরের মেয়ে অর্থাৎ স্ত্রীর পরিচয়ে পরিচিত তিনি নরাধম। আমাদের সমাজে অধম ও নরাধম বিরল নয়। ছোটবেলায় একটি কথা বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে প্রায়ই শুনতাম- বুদ্ধি থাকলে….

প্লেগের প্রকৃত জার্নাল

The Guardian পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে (১৯শে মে ২০২০) “Beyond Daniel Defoe: the real journals of the plague year” শিরোনামে Sam Jordison-এর প্রকাশিত প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখাটি তৈরি করেছেন কায়সার আহমদ ড্যানিয়েল ডিফোর ‘A Journal of the Plague Year’ পড়ে যদি আপনার মনে হয় যে যারা ১৬৬৫-১৬৬৬ সালের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী তাদের কাছ থেকে আপনি আরো বেশী কিছু….

এ ডেড সিক্রেট

অনেক আগে টাম্বা প্রদেশে ইনামুরায়া জেনসুকে নামক এক ধনী ব্যবসায়ী বসবাস করতো। ও-সুনো নামে উচ্ছল, প্রানবন্ত, চালাক এক সুন্দরী মেয়ে ছিল তার। একদা ধনী জেনসুকে তার বাড়ন্ত মেয়ের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে ভাবলেন যে, দেশের শিক্ষকরা তাকে যেমন শিক্ষা দিতে পারে, কেবল সে শিক্ষার ভেতরই তাকে বড় হতে দেয়াটা দুঃখজনক; তাই তিনি তার মেয়েকে বিশ্বস্ত কিছু পরিচারকের….

error: Content is protected !!