Author Picture

প্লেগের প্রকৃত জার্নাল

কায়সার আহমদ

The Guardian পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে (১৯শে মে ২০২০) “Beyond Daniel Defoe: the real journals of the plague year” শিরোনামে Sam Jordison-এর প্রকাশিত প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখাটি তৈরি করেছেন কায়সার আহমদ


ড্যানিয়েল ডিফোর ‘A Journal of the Plague Year’ পড়ে যদি আপনার মনে হয় যে যারা ১৬৬৫-১৬৬৬ সালের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী তাদের কাছ থেকে আপনি আরো বেশী কিছু শুনতে চান, তবে আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। সেই অসামান্য সময়ের অজস্র বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ আছে।
কোনোটা পড়তে অদ্ভূত এবং বিভ্রান্তিকর মনে হয়। যেমন ধরুন টমাস ভিনসেন্ট-এর ‘Terrible Voice in the City’।( এই শিরোনামের শক্তিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই)। ভিনসেন্ট গভীরভাবে ডুবে গিয়েছিলেন সেই প্লেগের ভয়াবহতার মধ্যে। হারিয়েছিলেন পরিবারের সাত সদস্যকে এবং ভাবতে অবাক লাগে যে তিনি রোগটিকে আমল দিতেন বলে মনে হয়নি। ভিনসেন্ট ছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী পাদ্রী এবং তিনি বাস্তবে যা ঘটে যাচ্ছিল তার উপর বাইবেলীয় নজির উল্লেখ করার দিকেই অধিকতর আগ্রহী ছিলেন। তিনি ১৬৬৫ এবং ১৬৬৬ সালের ঘটনাকে লন্ডনের ‘পাপী মাতাল ও গালমন্দকারী’দের সাথে সম্পর্কিত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ডিফোর কাছে বইটাকে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে বইয়ের সেই ভ্রান্তিগুলোর কারণেই এবং এতে একটা কার্যকর সুরের মিশ্রণ রয়েছে বলে তিনি অনুভব করেছেন। পরবর্তী বই ‘আমরা এখন যা চিনতে পারছি তার অধিকাংশই বর্ণনা করছে’-এতে ভিনসেন্ট আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে অতীত দূরবর্তী একটি বিদেশী রাষ্ট্রের মতোও বটে।

জোরালো বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও ডিফোর ভয়াবহ প্লেগের বিবরণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ ছিল না, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে অনেক কিছুই জানার আছে।
—স্যাম জর্ডিসন

একই রকম আকর্ষণ দেখা যায় ন্যাথানিয়াল হজেস নামে একজন চিকিৎসকের লেখা বই Loimologia নিয়ে, যেটি ১৬৭২ সালে প্রথম ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং ১৭২০ সালে তা ইংরেজিতে অনুদিত হয়। হজেসের বর্ণনা শুনে মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা হয় এবং এখানে প্রথমেই তিনি বর্ণনা দিচ্ছেন কিভাবে ‘জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণী’ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিলো ‘নীচু স্তর’-এর মানুষের মধ্যে। আর এভাবেই ‘তারা তাদের শারীরিক অবস্থাকে সংক্রমণ প্রতিরোধে কম সমর্থ করে ফেলেছিলো’।
কিন্তু এখানে আরো বাস্তব সম্মত উপাদান আছে। তিনি একটি অসামান্য বর্ণনা দিচ্ছেন যেখানে তিনি নিজে সব প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি দেখেছেন ‘জ্বরগ্রস্থ যুবকের স্ফীত গ্রন্থির ‘কালো বর্ণ’ মানুষের দরজার উপর স্থাপিত ক্রুশসমূহ, ‘বাড়ি-ঘর বন্ধ করে দেয়া’। ডিফো স্বাধীনভাবেই এসমস্ত উদ্ধৃতাংশ থেকে ধার করেছিলেন এবং হজেসের সে সমস্ত বর্ণনাও নিয়েছিলেন যেখানে সে বলছে কোথায় এবং কখন প্লেগ রোগের মহামারি চরমে পৌছেছিল, ‘আতঙ্কিত বাসিন্দা’দেরকে বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য গৃহীত জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচিসমূহ এবং ‘হাতুড়ে ডাক্তার’ যারা এর থেকে ফায়দা লুটার চেষ্টা করেছিল তাও ডিফো এখান থেকে পেয়েছেন। তিনি শেষোক্তদের কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা করেছেন চমৎকারভাবে, যদিও তার নিজস্ব বিজ্ঞান প্রশ্নবিদ্ধ মনে হতে পারে কখনো কখনো। উদাহরণস্বরূপ ‘এটা মধ্য দুপুরের আলোর মতো পরিষ্কার’ যে,
‘প্লেগের মহামারিটি হচ্ছে একটি রোগ যা এসেছে একটি অলৌকিক আভা থেকে যেটা কিনা বিষাক্ত, খুবই সূক্ষ, মারাত্মক এবং সংক্রামক এবং এটি কোনো দেশে একই সাথে অনেক লোককে সংক্রমিত করছে। আর এটা জ্বর ও অন্যান্য গুরুতর লক্ষণসহ ছড়াচ্ছে প্রধানত বাতাসে অবস্থিত শক্তিশালী আত্মার দূষিত হয়ে যাওয়ার কারণে’।

ড্যানিয়েল ডিফো ও তাঁর ‘Journal of the Plague Year’

এটার গভীরতা কতটুকু ছিল তা সঠিকভাবে ১৬৬৫ সালে এ্যালেন কোটস-এর লেখা London’s Dreadful Visitation নামক বইটিতে উঠে এসেছে। এই বইটি হচ্ছে ‘মৃত্যুর প্রতিবেদন’ এবং শহরের সমস্ত কবরস্থ হওয়া মানুষের বিবরণ। ঐতিহাসিক অথবা অন্য যারা এই ব্যপারে কৌতুহলী যে ডিফো তার হিসাব কোথায় পেয়েছেন! তারা একথা বুঝবেন যে এই বইটি তিনি গভীরভাবে পাঠ করেছিলেন।

আরো একটা চমকপ্রদ বই আছে যেটা ডিফো সম্ভবত দেখেননি: স্যামুয়েল পীপ্সের ডায়েরী। এটা হচ্ছে ১৬৬৫ সালের ৩০শে এপ্রিল থেকে ঘটে যাওয়া বাস্তব বিপর্যয় এবং এই বইয়ে অন্যান্য বিষয় ডায়েরীতে দীর্ঘভাবে অন্তর্ভক্ত করতে গিয়ে শেষ করা হয়েছে এভাবে—
‘এখানে এই নগরীতে অসুস্থতা নিয়ে চরম শঙ্কা বিরাজ করছে এবং এটা বলা হচ্ছে যে দু’তিনটা বাড়ি ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঈশ্বর আমাদের সকলকে রক্ষা করুন।’
ঈশ্বর সবাইকে রক্ষা করেননি, যদিও পীপ্সের সত্যি সত্যিই চিন্তিত হতে আরো কিছু দিন সময় লেগেছিল। এক মাস পর, ২৮শে মে, তিনি সংক্ষেপে অসুস্থতা’র বিষয়টি তুলে আনেন শুধুমাত্র বিষয়টিকে আলাদা করে ফেলার জন্যই। কারণ তিনি অন্য একটা বিষয়ে খুবই আগ্রহী ছিলেন, যেটা তিনি সেদিন দেখেছিলেন—এক গ্লাস পানিতে রাখা মাছেদের ‘একটা নিটোল দুষ্প্রাপ্যতা’ যারা এভাবে চিরদিন ভালোবাসবে; এবং বিদেশী হওয়ার ফলে এতে স্বতন্ত্র চিহ্ন স্পষ্ট ছিল।

মাত্র এক সপ্তাহ পর তিনি লিখছেন: আজকের এই দিনে, অনেকটাই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি ড্রুরি লেনে দু’তিনটে বাড়ির দরজায় লাল রঙের ক্রুশ চিহ্ন আর ‘ঈশ্বর আমাদেরকে দয়া করুন’ লেখা দেখলাম, এবং এটা আমার জন্য খুব দুঃখজনক দৃশ্য ছিল। আর এরকম দৃশ্য, আমি যতটুকু স্মরণ করতে পারি, আমি জীবনে প্রথম দেখলাম।
তারপর থেকে প্লেগের উল্লেখ আরো ঘন এবং আরো দ্রুত হতে থাকে। শিঘ্রই তিনি তার উইলের নকশা তৈরি করতে লাগলেন। ১৬৬৫ সালের ১০ই অগাষ্টে একটা রক্তহিম করা বর্ণনা আছে যেখানে তিনি নিজেকে এ্যাল্ডারমেন বেন্স যার স্ত্রী অসুস্থ ছিল তার সাথে নৈশভোজরত অবস্থায় দেখছেন, বিস্তৃত বর্ণনা— ‘আমি সেখানে যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণই আমার কাছে এটা একটা সমস্যার মতো মনে হয়েছে।’
কয়েক দিন পর পীপ্সের চিকিৎসক একজন ‘গরীব হতভাগা লোক’ মারা যান। এবং তারপর অক্টোবরে, পীপ্স লক্ষ্য করছেন যে তিনি যখন প্রধান সড়কে তখন— প্লেগ রোগে মারা যাওয়া মানুষের শব বহনকারী লোকজন তার কাছাকাছি চলে আসে; ‘কিন্তু ঈশ্বর, নিয়ম কী জিনিস, আমি এটা নিয়ে একটওু চিন্তা করি নাই।’
এটা অন্তদৃষ্টি ও তথ্যের একটি গুপ্তধন। এটাতে তিনি যে ভীবিষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন তার চমকপ্রদ এবং উজ্জ্বল বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি তার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, তার পরচুলা এবং তার রাতের ‘প্রস্রাব’ করা বিষয়ে নোট লেখায় যেমন আগ্রহী ছিলেন তেমনি চলমান বিপর্যয় সম্পর্কেও নোট লেখায় সমান আগ্রহী ছিলেন। এমনকি প্লেগ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন পীপ্স তার নোটে কোথায় তিনি আহার সেরেছেন, তানজিয়ারে বিনিয়োগকৃত টাকা এবং তার দৈনন্দিন কাজ-কর্মের বাকী অংশটুকুর বিষয় নিয়ে বেশী লিখেছেন। এটাই আকর্ষণের বিষয়। আমাদের মতোই পীপ্সকে চতুর্দিকে এতো মৃত্যুর মধ্যে বাঁচার একটা পথ খুঁজে বের করতে হয়েছে এবং মৃত্যু থেকে পালাতে হয়েছে। তার বিবরণ অসামান্য এই কারণে যে তিনি প্লেগের উল্লেখ কতো কমই না করেছেন যা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল। এবং ১৬৬৬ সালে অক্টোবরে তিনি লিখছেন যে তিনি নাট্যশালায় গেছেন ‘ভয়াবহ প্লেগ আসার পর এই প্রথম আমি নাটক দেখলাম’। আর আমরা অনুভব করি তিনি নিরাপদেই গেছেন যেহেতু তিনি অতীতকালেই বাক্যটিকে লিখেছেন। আপনাকে প্রায় আশাবাদী করে তোলার জন্য এটাই যথেষ্ট।

আরো পড়তে পারেন

তুমি ঢেউ, আমি কণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ‘তোমরা দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও, সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও, বসন-আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে, হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে। তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি, কোনো সুলগনে হবো না কি কাছাকাছি।’ লেখক : মেয়ে যদি হয় ঢেউ, পুরুষ হবে কণা! রবি ঠাকুর, তুমি কোয়ান্টাম রাজ্যে চলে এসো। এখানে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটে।….

ঘটনায় আসলে কি ঘটে; মহামারির কালে সাহিত্য ও সত্যের সম্পর্ক বিচার

করোনা শেষ না হলেও। মহামারীর প্রথম ধাক্কাটা এক রকম শেষ। শোকের আয়ু যেখানে হাতের আঙুলে গোনা যায় সেখানে মহামারীরও লম্বা সময় ধরে চলার সুযোগ নাই। নানান কারণে মৃত্যুর মিছিল সরবে বা নীরবে জারি আছে। সারা দুনিয়াতে একই কারণে মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে উত্তরাধুনিককালে প্যানিক বা আতঙ্ক করোনাকে বিশ্ব মহামারির মর্যাদা দিয়েছে। দুনিয়ার কিছু প্রান্তে এখনও….

আবার পরমাণু

খ্রীষ্টান পাদ্রীর দল (৪৫০-১৫০০): গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস যীশুর জন্মের চার’শ বছর আগে পরমাণুর যে সব গালগল্প শুনিয়েছে সেগুলো সব মিথ্যে। নিশ্ছিদ্র, কঠিন, গোলাকার পরমাণু; দেখা যায় না, ভাঙা যায় না, পরিবর্তন করা যায় না! তাই যদি হবে তবে রুটি এবং মদ থেকে যীশুর রক্ত তৈরী (Eucharist) হলো কেমন করে? নাস্তিক কবি এপিকিউরাস এবং লুক্রেটিয়াস পরমাণু….

error: Content is protected !!