Author Picture

রেশমপথের তাসখন্দে

ফারুক মঈনউদ্দীন

ছাত্রাবস্থায় লোকাল ট্রেন বা বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা হয়নি এমন মধ্যবিত্ত সন্তান বিরল। কলেজের হোস্টেলে সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুদিন সকাল বেলায় ডেলি প্যাসেঞ্জার আর ভিক্ষুক বোঝাই করে ফেনী শাটল নামের যে ট্রেনটি চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতো, সেই ট্রেনে চড়ে কলেজে হাজিরা দিয়েছি বহুদিন। স্থানীয় লোকজন মজা করে এই ট্রেনের নাম দিয়েছিল ‘ফইন্নির ট্রেন’। ফেরার সময় প্রায়ই আসতে হতো শুভপুরের লোকাল বাসে। কারণ চট্টগাম থকে ফেনী বা নোয়াখালির লংরুটের বাসে আমরা লোকালরা ছিলাম অন্ত্যজ শ্রেণীর যাত্রী। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরও হলে সিট পাওয়ার আগে কয়েক মাস শ্যামলী থেকে গাবতলী-গুলিস্থান লোকাল বাসে চড়ে নীলক্ষেত নেমে তারপর ক্লাস ধরতে হতো।

এই সব অভিজ্ঞতা প্রায় যখন ভুলতে বসেছি, তখন এরকম লোকাল সার্ভিসের দেখা পাওয়া গেল আকাশপথে। আমাদের গন্তব্য উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। এক কাকভোরে ঢাকা থেকে উড়ান দিই বাংলাদেশ বিমানে, সেটি প্রথমে যায় চট্টগ্রাম, এটি ছিল আমাদের জন্য এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’, কারণ ফ্লাইটটি প্রথমে চট্টগ্রাম যাবে জানার পর আমাদের কিছুই করার ছিল না। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়েতে আমরা প্লেনের পেটের মধ্যে বসে থাকতেই সেখান থেকে যাত্রীরা ওঠে। বলাবাহুল্য, সবসময়ের মতো কয়েকজন পরিচিত যাত্রীর দেখা মিলে যায়। তারা এই কলকাতাগামী ফ্লাইটে আমাদের অপেক্ষমান দেখে অবাক হলেও কিছু বলে না। অবশেষে ঠিক সময়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করে বিমান এবং নির্ধারিত সময়েই কলকাতা নামিয়ে দেয় আমাদের। বিমানও যে কাঁটায় কাঁটায় শিডিউল রক্ষা করতে পারে, তার প্রমাণ পেয়ে অবাক হই। কলকাতায় কয়েকঘণ্টা যাত্রাবিরতির পর ধরতে হয় দিল্লিগামী ফ্লাইট। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধি এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছি তখন শেষ বিকেলের আলো স্তিমিত হয়ে এসেছে। হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সে রাত দিল্লিতে পার করে পরদিন আবার দুপুরের পর দিল্লি থেকে চড়তে হয় তাসখন্দগামী ফ্লাইটে। অবশেষে তাসখন্দ পৌঁছা গেল সেদিন সন্ধ্যার পর। ছত্রিশ ঘন্টার এই দীর্ঘ ও ভাঙা ভাঙা যাত্রাপথের বর্ণনা এত সহজে লিখে ফেলতে পারি, কারণ সিল্করুটের একটি অংশে প্রথমবারের মতো পা রাখার উত্তেজনা দীর্ঘ এই যাত্রার ক্লান্তিকে মুছে দিয়েছিল। উল্লেখ করা দরকার, তাসখন্দ নামের অর্থ ‘পাথর নগরী’, এই নামটি প্রথম ব্যবহার করে তুর্কিরা। বিখ্যাত সিল্করুটের সংযোগস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এক নগরী হয়ে ওঠে তাসখন্দ এবং পরিনত হয় মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী নগরীতে।

আলিশের নাভাই থিয়েটার। আলোকচিত্রী : লেখক

তাসখন্দ এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে আসে স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টের দুই প্রতিনিধি মোহাম্মদ ও আলিশের বাইসভ। উল্লেখ্য নায়কোচিত চেহারার যুবক আলিশের নিজেই এই এজেন্সির মালিক। স্বয়ং মালিক এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে এসেছেন দেখে আমরা যারপরনাই অবাক। আমাদের গন্তব্য আমির তিমুর স্ট্রিটের ওপর দাঁড়ানো সিটি প্যালেস হোটেল। হোটেলের লবিতে ঢুকেই চোখ জুড়িয়ে যায়। লবির দুপাশ দিয়ে উঠে গেছে তিনতলা সমান উঁচু দুই থাম, তার একটিকে লতার মতো পেঁচিয়ে ধরে সিড়ি উঠে গেছে মেজনাইন ফ্লোর পর্যন্ত। আরেকটি নিঃসঙ্গ থাম ছাদে গিয়ে ঠেকেছে। দুটো থামের গায়েই টাইলসের ওপর জ্যামিতিক নকশা আর ফুলের কারুকাজ। লবির অন্য দেয়ালগুলোতেও ময়ুরকন্ঠি নীলপ্রধান একই ধরনের নকশা। পরে ঠিক এরকম নকশার কারুকাজ দেখতে পাই বুখারা সমরকন্দের বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্যে। ভবনটির আধুনিক স্থাপত্যের ভেতর এরকম প্রাচীন অন্তঃসাজ প্রত্যাশার অতীত।

হোটেলে চেক ইন করার আনুষ্ঠানিকতা সারার পর আমাদের রাতের খাবার খেতে নিয়ে যায় আলিশের। হোটেল থেকে বড় রাস্তায় নামার পর মাথার ওপর ছোট ছোট বাতির সাজ সজ্জা দেখে মনে হয় কোনো বিশেষ উপলক্ষে এই আলোকসজ্জা। আলিশেরকে মজা করে জিজ্ঞেস করি, এই আয়োজন কি আমাদের সম্মানে? ও জবাবে বলে, সেটা আমরা ভাবলেও ভাবতে পারি, কারণ কোনো বিশেষ উপলক্ষ নয়, এই আলোকসজ্জা নগরীর নৈশশোভা বর্ধনের জন্যই। কাছাকাছি যে রেস্তোঁরায় আমাদের খেতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেটিতে রাতের এই প্রহরেও জনসমাগম দেখে বোঝা যায় খুব মশহুর ওটা। ওসব দেশে ডিনার সারা হয় সন্ধ্যার পরপরই। খাওয়া শেষে যখন আমরা বের হয়ে আসি, তখন প্রায় টেবিলই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাইরের ৪ ডিগ্রি ঠান্ডায় সামনের চত্বরটায় কিছুক্ষণ চড়ে বেড়াবো, সে উপায় নেই।

তাসখন্দে যাওয়ার আগেই ভেবে রেখেছিলাম পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিখ্যাত তাসখন্দ চুক্তিটি যেখানে হয়েছিল সেই জায়গাটা দেখতে যাবো। উল্লেখ্য ১৯৬৫ সালের সেই যুদ্ধ ১৭ দিনের বেশি চলেনি, এর মধ্যে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করে। অথচ এই যুদ্ধের প্রায় তিরিশ বছর আগে মুসোলিনি আফ্রিকার আবিসিনিয়া (বর্তমানের ইথিওপিয়া) দখল করে নিলেও বর্তমান জাতিসংঘের মতো ঠুঁটো জগন্নাথ তখনকার লিগ অভ নেশনস কিছুই করতে পারেনি। যা-ই হোক পাকভারতের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও পরবর্তী সময়ে অমিমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই কোসিগিনের উদ্যোগে তাসখন্দ শহরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরের রাতেই শাস্ত্রীকে হোটেলের রুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আকস্মিক এই মৃত্যুকে অনেকেই স্বাভাবিক মনে না করলেও এটি অপমৃত্যু ছিল কি না, তার সুরাহা হয়নি আর।

কিশোর বয়সের দেখা সেই যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত চুক্তি স্বাক্ষরের জায়গাটি নিয়ে আমাদের চারভ্রমণসঙ্গীরই বিশেষ আগ্রহ ছিল। গুগলে অনেক খুঁজেও জায়গাটার হদিস পাইনি, আলিশেরকে জিজ্ঞেস করলে ও মাথা চুলকে সেখানেই জায়গাটা খোঁজার চেষ্টা করে। বুঝতে পারি এদের জন্ম ষাটের দশকের পরে বলে দুই বিদেশী যুদ্ধবাজ নেতার চুক্তির খবর এদের জানা নেই। আমরা ওকে বলি, বয়স্ক কাউকে জিজ্ঞেস করে যাতে আমাদের জানায়। আমাদের উজবেকিস্তানে থাকা অবধি বয়স্ক কোনো লোককে ও খুঁজে পায়নি বলেই মনে হয়।

বারাক খান মাদরাসার মূল ফটক। আলোকচিত্রী : লেখক 

তাসখন্দ চুক্তির ঐতিহাসিক জায়গাটা বের করতে না পারলেও জন্য আরও প্রাচীন একটা ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখানোর ব্যবস্থা ছিল আমাদের ভ্রমণসূচিতে। ঝকঝকে রোদের মধ্যে আমরা যেখানে গিয়ে গাড়ি থেকে নামি, সেটি এক চমৎকার স্থাপত্যমন্ডিত মসজিদচত্বর। বরফশুভ্র দেয়ালের গায়ে পরিমিত নীল লতাপাতার নকশা, তার পাশে দীর্ঘ মিনার, ফিরোজা রঙের গম্বুজ— সবকিছু এতটাই পরিচ্ছন্ন, যেন মনে হয় মাত্র গতকাল শেষ হয়েছে মিনর মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনার কাজ। প্রকৃতপক্ষেই মসজিদটি একেবারেই আনকোরা নতুন, মাত্র সেদিন অর্থাৎ ২০১৪ সালে এটির উদ্বোধন করা হয়। সেকারণে এর সাথে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা কিংবদন্তির গল্প জড়িত নেই। প্রাচীন স্থাপত্যের মসজিদগুলোর সাথে এটির কোনো মিলও নেই। এর শ্বেতপাথরের দেয়াল পুরো আবহে ছড়িয়ে দিয়েছে এক পবিত্রতার আমেজ। প্রখর সূর্যালোকে এই শুভ্রতা আরও বেশি ঝকঝক করে যেন। দুপাশে দুটো দীর্ঘ মিনার মেঘমুক্ত নীলাকাশের দিকে তর্জনী তুলে দাঁড়ানো, মূল মসজিদের ওপর একটা আকাশি নীল গম্বুজকে দূর থেকে উল্টানো এক বিশাল গামলার মতো দেখায়। বিশাল উঁচু তোরণের গায়ে শ্বেতপাথরের ওপর লতাপাতার কাজ। মেহরাবের মতো ভেতর দিকে অবতল অংশের শীর্ষে প্রাচীন যুগের সাংকেতিক চিহ্নের মতো নানান নকশা আঁকা। তার ওপরের চাঁদওয়ারিতে দীর্ঘ কোরানের আয়াত উৎকীর্ণ। তোরণের পায়ের কাছের বেমানান কাঠের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে প্রশস্ত চাতাল, তার দুপাশে টানা বারান্দার মতো করিডর। বিপরীত প্রান্তে মসজিদে ঢোকার প্রায় একই ধরনের নকশাশোভিত একই উচ্চতার আরেকটি তোরণ। সেটির মাঝখানের মূল কাঠের দরজাটি কেবল মহিলা নামাজী ও দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষিত, দুপাশে দুটো করে আরও চারটি অপেক্ষাকৃত ছোট দরজা, সেগুলো পুরুষদের জন্য। প্রায় আড়াই হাজার মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পারে এই মসজিদে। ভেতরে গম্বুজের বিশাল ঘেরের নিচে প্রশস্ত হলরুম, হলরুমের দেয়াল জুড়ে মেঝে থেকে উঠে যাওয়া দরজার দ্বিগুণ উচ্চতার বিশাল সব জানালা গলে ঢুকছে দিনের আলো। গম্বুজের ঘের জুড়ে নকশার সুষম কাজ, তার ওপরের অংশে বাঁকানো খিলানের গবাক্ষের বৃত্তাকার সারি, সেখান থেকেও ঝরে পড়ছে স্নিগ্ধ দিবালোক। গম্বুজের ছাদের তলার কেন্দ্র সূক্ষ্ম নকশায় পরিপূর্ণ। কেবলামুখি মেহরাবটি সোনার গিল্টিকরা নকশা আর আরবি ক্যালিগ্রাফিতে পরিমিতভাবে সাজানো।

মসজিদটির নাম মিনর মসজিদ হলেও এটি ‘শ্বেত মসজিদ’ নামেও পরিচিত। হোটেল থেকে রওনা হওয়ার সময় গাইড মোহাম্মদ যখন জানায় আমাদের পরবর্তী গন্তব্য খাস্ত ইমাম কমপ্লেক্স, ভেবেছিলাম তুষারশুভ্র এই মসজিদটিই খাস্ত ইমাম। অবশ্য এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে খাস্ত ইমাম কমপ্লেক্সে পৌঁছার পর সে ভুল ভাঙে। কমপ্লেক্সটির পোশাকি নাম খাজরাতি ইমাম। এখানে আছে বারাক খান মাদ্রাসা, তিল্লা শেখ মসজিদ, মুই মুবারক মাদ্রাসা, কাফ্ফাল শাশির মাজার ইত্যাদি। উল্লেখ্য এই কাফ্ফাল শাশির পুরো নাম আবু বাকার আল-কাফ্ফাল আল-কাবির আশ-শাশি। তাঁর ছিল কোরান, হাদিস ও ইসলামি আইন সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। তিনি ছিলেন কবি ও গীতিকার এবং ব্যতিক্রমীভাবে ছিলেন এক দক্ষ তালার কারিগর (কাফ্ফাল), তাই তাঁর নামের সাথে আল কাফ্ফালও যুক্ত হয়েছে। ৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর প্রায় সাতশ বছর পর তাঁর কবরের ওপর তৈরি দরগা পরিনত হয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের তীর্থভূমিতে।

খাস্ত ইমাম কমপ্লেক্সের তিল্লা শেখ মসজিদের সামনে দিয়ে বেশ কিছুদূর হেঁটে গেলে মুয়ি মুবারক মাদ্রাসা ও কুতুবখানা, যেখানে রক্ষিত আছে হজরত উসমান (রাঃ)এর সময়ে তাঁর হাতে লেখা কুফি কোরানের প্রাচীনতম পান্ডুলিপির একটি। কুফি হচ্ছে আরবি হরফের প্রাচীনতম রূপ, যা সপ্তম শতাব্দীতে কুফা নগরে প্রবর্তিত হয়। এটি যখন উজবেকিস্তানে আসে তখন ধারণা ছিল যে এটিই কোরানের প্রাচীনতম পান্ডুলিপি। কিন্তু গবেষকদের মতে এটি লেখা হয়েছিল অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে। কিন্তু হজরত উসমান (রাঃ) নিহত হয়েছিলেন ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে, সুতরাং গবেষকদের ধারণা যদি সঠিক হয় এটি তাঁর হাতে লেখা এমনকি তাঁর আমলের হওয়াও সম্ভব নয়। কিংবা যদি সত্যিই তা-ই হয়, তাহলে গবেষকদের ধারণা ভুল। তবে এই বিতর্ক বা বিভ্রান্তির সুরাহা করা এখানে সম্ভব নয়।
ইস্তাম্বুলের তোপ কাপি প্রাসাদের জাদুঘরেও এরকম প্রাচীন কোরানের পান্ডুলিপি রক্ষিত আছে। সেটির ছবি তুলতে গেলেই প্রহরীরা ‘রে রে’ করে ছুটে আসে। এটিকেও প্রাচীনতম পান্ডুলিপি বলে দাবী করা হয়, গবেষকরা এখানেও বাগড়া দিয়ে বলেছেন এটি প্রাচীনতম না হলেও উসমানীয়া কোরানের চেয়ে অন্তত এক শতাব্দী আগের।

কোরানের প্রাচীনতম সংস্করণ নিয়ে এযাবত যেসব তথ্য পাওয়া যায়, সে হিসেবে ব্রিটেনের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত পান্ডুলিপির দুটি পাতাই এযাবত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সংস্করণ বলে মনে করা হয়। কার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা করা হয় চামড়ার তৈরি পাতায় এটি লেখা হয়েছে ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদ (সঃ)এর নবুয়ত প্রাপ্তির প্রথম দিকে। কালের হিসেবে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় পাওয়া চামড়ার তৈরি কাগজে দুই পাতার পান্ডুলিপিটি দ্বিতীয় প্রাচীনতম বলে গবেষকদের মত। মনে করা হয় এটি লেখা হয়েছে ৬৪৬ থেকে ৬৭১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। গবেষকদের হিসেবে তোপ কাপি প্রাসাদে রক্ষিত কোরানের পান্ডুলিপিটি ৭৬৫ থেকে ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা হয়েছে। এটি প্রায় পূর্ণাঙ্গ পান্ডুলিপি হলেও দুটো পৃষ্ঠা নেই। সে হিসেবে তাসখন্দে আমাদের দেখা পান্ডুলিপিটি চতুর্থ প্রাচীনতম কোরান।

মিনর মসজিদের মূল দরজা। আলোকচিত্রী : লেখক 

পরবর্তী পান্ডুলিপিটা এক সময় রক্ষিত ছিল মিসরের আমর ইবনে আস মসজিদে। নেপোলিয়নের মিসর জয়ের পর এটি দুই অংশে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় প্যারিসে চলে আসে। একাংশ নিয়ে আসেন নেপোলিয়নের সাথে যাওয়া শিল্প বিশারদ জাঁ জোসেফ মার্শেল। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু পৃষ্ঠা নিয়ে এসেছিলেন সে সময় কায়রোতে ফরাসি ভাইস কনসাল হিসেবে কর্মরত জোঁ লুই শেরভিল। এই দুই অংশ এঁদের উত্তরাধিকারীরা বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করে দেওয়ার পর এগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অংশ ছড়িয়ে আছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল লাইব্রেরি, সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ভ্যাটিকান লাইব্রেরি এবং লন্ডনের খলিলি কালেকশানে। পরবর্তী সংস্করণের পান্ডুলিপিগুলোও যথাক্রমে রক্ষিত আছে তিউনিসের বারদো জাতীয় যাদুঘর, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে চেস্টার বেটি লাইব্রেরি এবং জার্মানীর মিউনিকের ব্যাভারিয়ান স্টেট লাইব্রেরিতে।
মুয়ি মুবারক কুতুবখানায় ঢোকার সময় টিকিট কিনতে হয়, তবে সেসব গাইড মোহাম্মদের মাথাব্যথা। মূল দরজার মুখে জুতা খুলে রেখে ঢুকতে হয়। বড় হলরুমের মাঝখানে উঁচু বেদির ওপর কাচের বড় কাসকেডের ভেতর মেলে রাখা বিশাল পাতা জুড়ে ভারি হরফে লেখা বারোশ বছরের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থটি দেখে যে অনুভূতি হয়, সেটি ছাপিয়ে অনুভব করি এটি কেবল প্রাচীন একটি পান্ডুলিপিই নয়, বিশ্বাসী মানুষের কাছে পরম আবেগ ও সম্মানেরও। হরিণের চামড়ার কাগজে লেখা ৩৫৩ পৃষ্ঠার এই পান্ডুলিপির পাতার ওপর রয়েছে রক্তের দাগ, প্রচলিত ধারণা ছিল, এই কোরান পাঠরত অবস্থায় হজরত উসমান (রাঃ)কে হত্যা করা হয়। কিন্তু গবেষকদের হিসেব অনুযায়ী এটির যে বয়স তাতে বোঝা যায় এটি লেখা হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর। সুতরাং রক্তের দাগের উৎসটিও অমীমাংসিত। গাইড মোহাম্মদ আমাদের জানায়, এই পান্ডুলিপি থেকে অনেকগুলো পাতা খোয়া গেছে।
এযাবৎ পাওয়া তথ্যমতে উসমানীয়া কোরানটি রক্ষিত ছিল বাগদাদে। সেখান থেকে সমরকন্দে আসার বিষয়টি অস্পষ্ট। হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ (১২৫৮), পাইকারি হত্যাযজ্ঞ লুটপাটের সময় মঙ্গোল সৈন্যরা মসজিদ, প্রাসাদ, হাসপাতাল লাইব্রেরি— কিছ্ইু বাদ দেয়নি। বাগদাদের ছত্রিশটি পাবলিক লাইব্রেরি থেকে অমূল্য বইগুলো ছিঁড়ে সেগুলোর চামড়ার মলাট দিয়ে তারা চপ্পল বানায়। বাগদাদের গ্র্যান্ড লাইব্রেরিতে ছিল অগনিত ঐতিহাসিক দলিল এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা সহ বিভিন্ন বিষয়ের মূল্যবান গ্রন্থরাজি। সেসব ধ্বংস করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে জানায় টাইগ্রিস নদীর পানি ফেলে দেওয়া বইয়ের কালিতে কালো এবং হত্যা করা বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের রক্তে ছিল লাল। সেই ডামাডোলে পান্ডুলিপিটি ইরাকের কোনো নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান রক্ষা করেছিলেন হয়তো। তা না হলে তৈমুর লং পান্ডুলিপিটি ইরাক থেকে সমরকন্দ নিয়ে এসেছিলেন বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে তার কোনো ভিত্তি থাকে না। এটি সমরকন্দের মসজিদেই রক্ষিত ছিল প্রায় চারশ বছর। ১৮৬৮ সালে সমরকন্দ রাশিয়ান সাম্রাজ্যের করতলগত হয়। এই মূল্যবান পান্ডুলিপিটির কথা জানতে পেরে জেফারশানের জেলা প্রশাসক জেনারেল আব্রামভ মসজিদের তত্ত্বাবধায়কদের ১০০ স্বর্ণমুদ্রা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়ে এটিকে তাসখন্দ পাঠিয়ে দেন। পরের বছর গভর্নর জেনারেল ভন কাউফম্যান এটি পাঠিয়ে দেন সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে। অক্টোবর বিপ্লবের পর লেনিন পান্ডুলিপিটি রাশিয়ার বাশকর্তোস্তানের মুসলমানদের দান করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২৪ সালে এটির মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয় উজবেকিস্তানকে।

১৮৬৮ সালে সমরকন্দ রাশিয়ান সাম্রাজ্যের করতলগত হয়। এই মূল্যবান পান্ডুলিপিটির কথা জানতে পেরে জেফারশানের জেলা প্রশাসক জেনারেল আব্রামভ মসজিদের তত্ত্বাবধায়কদের ১০০ স্বর্ণমুদ্রা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়ে এটিকে তাসখন্দ পাঠিয়ে দেন। পরের বছর গভর্নর জেনারেল ভন কাউফম্যান এটি পাঠিয়ে দেন সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে। অক্টোবর বিপ্লবের পর লেনিন পান্ডুলিপিটি রাশিয়ার বাশকর্তোস্তানের মুসলমানদের দান করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২৪ সালে এটির মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয় উজবেকিস্তানকে

মুয়ি মুবারক কুতুবখানার ভাবগম্ভীর পরিবেশে অতি সন্তর্পনে কাচের বাক্সটির সামনে গিয়ে দাঁড়াই। নিজেদের মধ্যে কথাও বলি ফিসফিস করে, এটা কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু এমন জায়গায় গেলে আপনা থেকেই গলা নিচু হয়ে আসে, হাঁটা হয় পা টিপে টিপে। কাসকেডের ভেতর বিশাল গ্রন্থটির পাতায় পাতায় হাতে লেখা ঐশী বাণী নিজের হাতে লিপিবদ্ধ করা লেখকের নিষ্ঠার প্রতি নিজের অজান্তে মাথা নুয়ে আসে। ঘরটির এক কোণে চেয়ারে বসে সতর্ক চোখে আমাদের গতিবিধি লক্ষ করে এক নিরাপত্তা কর্মী। আমরা কিছু সময় কাচের বিশাল বাক্সটির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সরে আসি। লোকটির দৃষ্টি এড়িয়ে একখানা ছবি তোলার সাহস করি না। তুলতে পারলেও কাচের বাধার কারণে ভালো ছবি আসবে না জানি। গুগলে গেলে বরং এই পান্ডুলিপির অনেক ছবি পাওয়া যাবে। পাশের অপেক্ষাকৃত ছোট রুমে ঢুকলে দেখা যায় কাচের শোকেসের ভেতর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কোরান সাজানো আছে দর্শনার্থীদের জন্য। বাংলা একটা কোরানও সেখানে থাকার কথা, কিন্ত চোখে পড়েনি।
মুয়ি মুবারক কুতুবখানার পেছনে খাস্ত ইমাম মসজিদের সুদৃশ্য ভবন, তার দুপাশে দুটো উঁচু মিনার, ভেতরের পাশে দুটো ফিরোজা রঙের গম্বুজ। এই মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল মাত্র চার মাস সময়ের মধ্যে, ২০০৭ সালে। ভেতরের স্তম্ভগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে ভারত থেকে আনা চন্দন কাঠ, তুরস্কের সবুজ মার্বেল পাথর, ইরানের নীল টাইলস।
এর সামনের খোলা বাঁধানো চত্বরের উল্টো পাশে ষোড়শ শতাব্দীর বারাক খান মাদ্রাসা ও মসজিদ। মূল প্রবেশদ্বারটি বুখারা সমরকন্দের বিভিন্ন মাদ্রাসার মতো বিশাল উঁচু পোড়া ইটের তৈরি, তার ওপর বর্ণিল জ্যামিতিক নকশা, চাঁদওয়ারিতে গাঢ় নীল পটভূমিতে লতানো ফুলের কারুকাজ। ভেতরে অবতল প্রকোষ্ঠে ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন বাঁকানো খিলানের দুই তলা কুলুঙ্গি। মাঝখানের মূল দরজার ওপর জাফরি কাটা গবাক্ষ। ফটকের দুপাশে দুটো নীল রঙের গম্বুজ। ভেতরে ঢুকলে আরেকপ্রস্ত চাতাল পার হয়ে কেন্দ্রের মূল প্রশস্ত ঘরটিতে নানান স্যুভেনিরে ঠাসা দোকান। ঢোকার মুখেও সাজিয়ে রাখা উজবেকিস্তানের ট্রাডিশনাল হস্তশিল্পের নানান পণ্য, পেইন্টিং, পোশাক। ভেতরের বিভিন্ন পণ্য দেখে আমরা যখন ওদের সাথে দর কষাকষি করি, তখন গাইড মোহাম্মদ সবার কানের কাছে এসে আস্তে আস্তে বলে যায়, এখান থেকে কিছু না কেনাই ভালো, অনেক দাম নেবে। আপনাদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাবো, সেখান থেকে কিনতে পারবেন। মোহাম্মদের এই উপদেশের পর থেকে বেশ কয়েকটা জিনিস পছন্দ হওয়ায় কিনতে মনস্থ করার পরও সেগুলোর দাম অহেতুকরকম বেশি মনে হতে থাকে। তাই দরকষাকষি করে নামিয়ে আনা দামেও সে সব আর কেনা হয় না।
বারাক খান মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে প্রশস্ত চত্বর পেরিয়ে খাস্ত ইমাম মসজিদের পাশ দিয়ে আসার সময় এক স্বর্ণকেশী দীর্ঘাঙ্গী তরুণী আমাকে পাকড়াও করে। তার সাথে এক যুবক ট্রাইপডের ওপর ভিডিও ক্যামেরা তাক করে ছবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তরুণী আমার সাথে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইলে সাগ্রহে রাজী হয়ে যাই। মেয়েটি প্যালেস্টাইনি কোনো টেলিভিশনের জন্য উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক জায়গাগুলোর ওপর একটা ডকুমেন্টারি বানানোর কাজ করছে। সুতরাং এই ঐতিহাসিক জায়গায় আমরা কী কারণে এসেছি সেটাই দেখানোর চেষ্টা করবে ও এই ডকু দিয়ে। আমি ভ্রমণকাহিনী লিখব জানার পর ওর উৎসাহ বেড়ে যায়। সঙ্গী ক্যামেরাম্যানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেই লোকটি নানান কসরৎ করে আমাকে নির্দিষ্ট অ্যাঙ্গেলে দাঁড় করায়। আমি একটু অসহিষ্ণুতা দেখালে মেয়েটি ক্ষমাপ্রার্থনা করে বলে, জাস্ট ফিউ মিনিটস। তারপর আমাকে ভ্রমণ সংক্রান্ত নানান প্রশ্ন করে একটা পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার নিয়ে ফেলে। আমার সফরসঙ্গীরা দূরে অপেক্ষায় থেকে উসখুস করলেও কিছু করার ছিল না। সেই সাক্ষাৎকারটি অদৌ প্রচার করা হয়েছিল কি না জানি না। ডকু ফিল্ম প্রস্তুতকারী সেই আরব সুন্দরীর নাম ধাম ঠিকানা কিছুই জেনে নিইনি বলে কিছুটা আফসোস রয়ে গেছে। সাক্ষাৎকারপর্ব থেকে উদ্ধার পেয়ে এগিয়ে গেলে মুসলিম বোর্ড অভ উজবেকিস্তানের সুদৃশ্য আধুনিক ভবনের সামনের বাগিচায় এক উজবেক সুন্দরীকে তার তিনটে ছানাপোনা নিয়ে একটা বেদি তে বসে থাকতে দেখি। আমাদের সাথের মহিলারা ওদের সাথে ছবি তোলার জন্য হামলে পড়লে বেচারী কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেও সম্মতি দেয়।
দুপুরে যেখানে খেতে যাই তার সামনের খোলা জায়গায় তৈরি হচ্ছে কাঠের কাঠামো, সামনে শীত আসছে, তারই প্রস্তুতি হিসেবে এখানে চালাঘর তৈরি করে বসবে বাজার, অস্থায়ী রেস্তোঁরা ইত্যাদি। এখানে থেকে দু’পা এগিয়ে গেলে একটা আটতলা ভবন, সেটার বহির্ভাগের সজ্জা ও নকশাগুলো বিজাতীয় ঠেকে। ওটা দেখিয়ে মোহাম্মদ বলে, এটা রুশ আমলে তৈরি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। এবারে এটির ভিনদেশী চেহারার রহস্য পরিষ্কার হয়। ভবনটির নিচতলায় রুশধাঁচের হরফে লেখা একাধিক সাইনবোর্ড দেখে বোঝা যায় এগুলো বিভিন্ন কোম্পানির অফিস বা দোকান। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে যে ভূমিকম্প হয় তাতে শদুয়েকের মতো প্রাণহানী ঘটলেও, নগরীর বেশিরভাগ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে গৃহহীন হয়েছিল প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ। সেসব ভবনের শূন্যতা পূরণ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসী মানুষের চাপ সামলাতে তৈরি হয় বহু সোভিয়েত ধাঁচের আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। এটিও সেই সব ভবনের একটি।
ডলার ভাঙানোর জন্য লোটে সিটি হোটেল তাসকেন্ত প্যালেস নামের এক অভিজাত হোটেলের ভেতরে ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ বুথে গিয়ে ওটার নাম দেখে আমার আক্কেল গুড়ূম, ব্যাংকটির নাম ট্রাস্ট ব্যাংক, তবে ট্রাস্ট বানান দু’জায়গায় দুরকম, এক জায়গায় Trust আরেক জায়গায় Trast। তবে ব্যাংকটির লোগো দেখে বুঝতে পারি না এটি কোন ধরনের ব্যাংক। লোগোতে একটা ডলফিনের ছবি, ব্যাংকের সাথে ডলফিনের মতো একটা নিরীহ প্রাণীর কী সম্পর্ক ধরতে পারি না। ইলেকট্রনিক ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে এক ডলার ভাঙালে পাওয়া যাবে ৮২৩০ সোম। ২০০ ডলারে ১৬ লক্ষ ৪৬ হাজার সোম পেয়ে নিজের মধ্যে বেশ বড়লোকি ভাব আসে। এতগুলো টাকা একসাথে পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর একটা আলাদা মজা আছে। উল্লেখ্য, সোম হচ্ছে উজবেক মুদ্রার নাম। ঠিক এরকম ঘটনা ঘটেছিল ভিয়েতনামে গিয়ে। সেখানে প্রতি মার্কিন ডলার ভাঙিয়ে পাওয়া গিয়েছিল ১৫ হাজার ৮৬০ দং। অর্থাৎ দুইশ ডলার ভাঙিয়ে পেয়েছিলাম ৩১ লক্ষ ৭২ হাজার দং। ভাগ্যিস ওদের কাগজের মুদ্রায় এক ও দুই লক্ষ দং আছে, তা না হলে এতগুলো টাকা বহন করতে ট্রাংক নিয়ে ঘুরতে হতো। ভিয়েতনামে গিয়েও হ্যানয়ের হোয়াম কিয়েম লেকের কাছে একটা ব্যাংক দেখে চমকে উঠেছিলাম, এবি ব্যাংক। এই দুই ভিনদেশী শহরে দেশী দুইটা ব্যাংকের সমিল নামের ব্যাংক দেখে চমকে উঠতে হয় বৈকি।

ব্যাংকের সাথে ডলফিনের মতো একটা নিরীহ প্রাণীর কী সম্পর্ক ধরতে পারি না। ইলেকট্রনিক ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে এক ডলার ভাঙালে পাওয়া যাবে ৮২৩০ সোম। ২০০ ডলারে ১৬ লক্ষ ৪৬ হাজার সোম পেয়ে নিজের মধ্যে বেশ বড়লোকি ভাব আসে। এতগুলো টাকা একসাথে পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর একটা আলাদা মজা আছে। উল্লেখ্য, সোম হচ্ছে উজবেক মুদ্রার নাম। ঠিক এরকম ঘটনা ঘটেছিল ভিয়েতনামে গিয়ে। সেখানে প্রতি মার্কিন ডলার ভাঙিয়ে পাওয়া গিয়েছিল ১৫ হাজার ৮৬০ দং। অর্থাৎ দুইশ ডলার ভাঙিয়ে পেয়েছিলাম ৩১ লক্ষ ৭২ হাজার দং। ভাগ্যিস ওদের কাগজের মুদ্রায় এক ও দুই লক্ষ দং আছে, তা না হলে এতগুলো টাকা বহন করতে ট্রাংক নিয়ে ঘুরতে হতো

চওড়া ছিমছাম উজবেকিস্তান অ্যাভিনিউ থেকে বামে মোড় নিলে হোটেলের সামনের বুয়ুক তুরন স্ট্রিট। ওপারে দীর্ঘাঙ্গ বৃক্ষের ঘন সমাবেশ, কিন্তু পাতা ঝরার মৌসুম শুরু হয়েছে বলে পার্কের মতো জায়গাটি ছায়াঘন নয়। গাছগুলো তাদের একমাত্র পায়ের নিচের অংশে সাদা রং নিয়ে যেন সাদা মোজা পরে সটান দাঁড়ানো। সেই পায়ের আশপাশে সবুজ ঘাসের বিছানা জুড়ে ঝরা পাতার নকশা। রাস্তার পাশের চিনার গাছগুলোর ঝরাপাতা ঝাড়– দিয়ে জড়ো করছে দুই নারী কর্মী। তাদের নাকমুখ ঢাকা মুখোশ আর মাথার হ্যাটের কারণে বয়স বা চেহারা কোনোটাই ভালোভাবে বোঝা যায় না। সেই গাছের নিচে ফাইবার গ্লাসের কিওস্কের ভেতর বসে দুপুরের ভাতঘুম বাদ দিয়ে কি যেন লেখালেখি করছে তাসখন্দ সিটি পুলিশের এক অফিসার। পুলিশের গুমটি ঘরটি পেরিয়ে গেলে চারপাশ বাঁধানো একটা বড়সড় কৃত্রিম পুকুর, তার মাঝে ফোয়ারা। পুকুরটির বিপরীত পাশে প্রাচ্যদেশীয় স্থাপত্যের ছিমছাম একটা ভবন। তার দুপাশে চেস্টনাট গাছেরা এই পাতাঝরার মৌসুমে কিঞ্চিৎ ছায়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। সামনের পুকুরের শান্ত জলে প্রতিবিম্বিত ভবনটির নাম, আলিশের নাভাই অপেরা ও ব্যালে থিয়েটার। উল্লেখ্য, আলিশের নাভাই (১৪৪১-১৫০১) ছিলেন মধ্যযুগের মরমী কবি, লেখক, রাজনীতিবিদ, ভাষাবিদ ও চিত্রশিল্পী। চাগাতাই ভাষা ও সাহিত্যের একনিষ্ঠ সমর্থক আলিশের মনে করতেন, চাগাতাই ও অন্য তুর্কি ভাষাগুলো সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে ফার্সির চেয়ে অনেক উন্নত মানের। চাগাতাই হচ্ছে বিলুপ্ত এক তুর্কি ভাষা, যা এক সময় মধ্য এশিয়াতে চালু ছিল। এই ভাষা থেকে উৎপত্তি হয় উজবেক ও উইঘুর ভাষা। থিয়েটার হলের মূল প্রবেশ পথে তিনতলার সমান উচ্চতার তিনটি বিশাল ধনুকাকৃতি তোরণের পোর্টিকো। তার ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান ছোট দরজার সারি, ওপরের তলায় সারিবদ্ধ জানালা। সেই উঁচু খিলানের ওপর স্টেলেকটাইটের মতো ছোট ছোট ঝুলন্ত কার্নিশ, তার ওপর অনুচ্চ ছোট কয়েকটা মিনার। বুখারা সমরকন্দের পরিচিত স্থাপত্যের একই ঘরানার হলেও এটির মধ্যে রয়েছে একধরনের পরিমিত ধ্রুপদী মেজাজ। থিয়েটার হলের জন্য মানানসই ক্রিম আর সাদা রঙের মিশ্রনে শালীন স্নিগ্ধ আভা।
এই ভবনটির নকশা করে দিয়েছিলেন রুশ স্থপতি আলেক্সেই সুশেভ (১৮৭৩-১৯৪৯)। এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালে। পরবর্তী বছরগুলোতে জাপানি যুদ্ধবন্দীদের এই নির্মাণ কাজে লাগানো হয়েছিল। সুশেভের নামটি এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি একটি কারণে যে, রুশ সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের পড়া কিছু নামের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। যেমন, মস্কোর কমসোমোলস্কায়া স্টেশনের নকশা কিংবা নাৎসী আক্রমণে বিধ্বস্ত নভগরদ শহরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা তাঁরই করা। লেনিনের মৃত্যুর পর তাঁকে একটি সমাধির নকশা করতে বলা হলে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি প্রাচীন কয়েকটি সমাধিমন্দিরের মিলিত বৈশিষ্টসম্পন্ন একটি নকশা তৈরি করে দিয়েছিলেন। তবে পরে কানাঘুষা থেকে অভিযোগ উঠে আসে যে লেলিনের সমাধির নকশার কাজটি মূলত করেছিলেন ফ্রানৎসুজ নামের সুশেভের অধীনস্ত একজন আর্কিটেক্ট। এই বিষয়টি প্রমাণ করে দেওয়ার জন্য সেলিম খান ম্যাগোমেদভ নামের এক স্থাপত্যশিল্প সমালোচককে কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে প্রায় বহিষ্কার করে দেওয়া হচ্ছিল। আসলে ঘটনার মূল কারণ ছিল স্থাপত্য নকশাটির মূল ব্যক্তি ইসিদর ফ্রানৎসুজ ছিলেন ইহুদী। জাতীয়তার প্রশ্নে পার্টির বক্তব্য ছিল এরকম যে, রেড স্কোয়ারের মতো সোভিয়েত জাতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসের সাথে এসব ইহুদী নাম জড়ানো উচিত নয়। সেকারণেই লেলিনের সমাধির স্থপতি হিসেবে সুশেভের নামই সরকারিভাবে স্বীকৃত। যা-ই হোক ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হয়ে গেল, কিন্তু রুশ সাহিত্যের রসে সিঞ্চিত আমাদের গড়ে ওঠা পাঠাভ্যাসের কারণেই প্রসঙ্গটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে হলেও এখানে ঢুকে পড়ল।
বিকেলের দীর্ঘায়িত ছায়ায় নাভাই থিয়েটারের সামনের পুকুরের ধারের বাঁধানো রকের ওপর বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার রওনা হই আমরা। দুপাশে চিনার গাছের সারির মধ্যিখান দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো ফুটপাত, সেখানেও ঝরাপাতার নিঃশব্দ পতনের চিহ্ন আলপনার মতো আঁকা। সেই আলপনা মাড়িয়ে যেতে যেতে আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের কথা গাইডকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে না, ট্যুরিস্টদের জন্য সব অদেখা গন্তব্যই একেকটি অজানা উদ্দিষ্ট।

 

লেখক: গল্পকার, অনুবাদক ও ব্যাংকার

আরো পড়তে পারেন

নদীজলে মাছশিকার ও পতঙ্গ-মিথুনের অলোকচিত্র

শ্যানানডোয়া নদীটির বাঁকানো রেখাকে নিশানা করে অনেকক্ষণ হলো হাইক করছি। রূপালি জলের বঙ্কিম অবয়ব ছোট ছোট হতে হতে এমন আকার ধারন করেছে যে- স্রোতের এ স্বচ্ছ সলীলা শরীরকে এখন অস্ট্রেলিয়ার আদীবাসীদের হাতিয়ার বুমেরাং এর মতো দেখাচ্ছে। আজকের হাইকে কেন জানি খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তাই দ্রুত বেগে হাঁটি। কোন দিকে যাচ্ছি ঠিক বুঝতে পারি না। আবার….

কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই

বাংলা গানের প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং মান্না দে’র গাওয়া শিরোনামের জনপ্রিয় গানটির কল্যাণে কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউজের নাম-পরিচয় এবং কফি হাউজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছিল বাংলাভাষী দুই বাংলার মানুষ। কলকাতার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কফি হাউজের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে উচ্চ ধারণাই জন্মেছিল জনমনে। বাস্তবে আশির দশক পর্যন্ত কফি হাউজ….

সোয়াজিল্যান্ডের হাউস অন ফায়ার ও সেক্স অফেন্ডার

আমার আজকে কোন কিছু করার কোন তাড়া নেই, তাই অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে হাউস অন ফায়ারের দেয়ালটি দেখি। এর কেল্লার মতো করে স্থানীয় স্থপতি ও কলাকারদের হাতে গড়ার কায়দা দেখে ওয়ালটিকে বরং প্রাচীর বলাই সঙ্গত। তার গায়ে নতশীর হয়ে কতগুলো মূর্তি গভীর চিন্তায় মগ্ন। অর্ধভগ্ন হয়ে কয়েকটি প্রতিমা খামোকা ছড়িয়ে আছে আঙ্গিনায় স্রেফ ভাস্করের….

error: Content is protected !!