লাল রক্ত সবুজ হরিয়াল

সাইফুর রহমান

শ্যাওলার আধিক্যের কারণেই সম্ভবত পানির রং ঘন সবুজ দেখাচ্ছে। পুকুরটিকে মোটেও ছোট বলা চলে না। চারপাশে উঁচু পাড়। পাড়জুড়ে নানা প্রজাতির গাছ-গাছালিতে ভর্তি। ওগুলোর মধ্যে বাউল সন্ন্যাসীদের ঝাঁকড়া চুলের মতো কুল গাছটি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে পুকুরের পাড় ছেড়েও বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে পুকুরের ওপর। বৃক্ষের প্রাচুর্যতার কারণে সূর্যের আলোও ঠিক মতো এসে পড়ে না পানিতে। তারই মধ্যে বরই গাছটির পাতা গলে যেটুকু ছিটেফোঁটা আলো পুকুরে পড়ে তারই আকর্ষণে বোধকরি বোয়াল, মৃগেলগুলো জলের ওপরের দিকে এসে ফুটকুরি কাটে। পাড়ে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে আনোয়ার সবুজাভ জলে রোদের খেলা দেখে। মাছদের ভুড়ভুড়ি কাটা দেখে। মুখাবয়বটি আকাশের দিকে তাক করে বিস্ময়াপ্লুত নেত্রে খানিক অপলক তাকিয়ে থাকে কুলগাছের পাতা ভেদ করে যেখান দিয়ে সোনা ঝরা রোদ এসে পুকুরের জলগুলোকে ভিজিয়ে দিয়ে যায় সেদিকে। হঠাৎ কিছু একটা দেখতে পেয়ে শরীরের ধূসর রঙের ময়লা ও জীর্ণ চাদরটি ঠিক করতে করতে দৌড় দেয় বাড়ির অন্দর মহলের দিকে।

আব্বা তাড়াতাড়ি আসো। বরইগাছে দু’টা হরিয়ালপাখি বইসা আছে। কুটুস কুটুস কইরা বরই খাইতাছে। মনজেদ আলী আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললেন- ক্যামনে বুঝলি যে ওগুলা হরিয়াল। তুই কি হরিয়ালপাখি চিনস। চিনমুনা ক্যান। পাগুলা হলুদ। দেখতে কবুতরের মতো। সারা শরীল সবুজ কিন্তু পিঠের দিকটা হালকা হলুদ।

মনজেদ আলী পুকুর পাড়ে এসে কুলগাছের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যি সত্যি দুটি হরিয়াল ডালে বসে নিঃশ্বব্দে উদরপূর্তি করছে ছোট ছোট বরই গিলে। আনু জলদি যা। তোর সুলতান স্যাররে ডাইকা নিয়া আয়। দোনলা বন্দুকটাও যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে। বলবি কুলগাছে হরিয়াল বসছে দুইটা।

সুলতান মাহমুদ পেশায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হলেও নেশায় একজন শিকারি। শুধু শিকারি বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়। তিনি একজন পাক্কা শিকারি। বয়স সত্তর অতিক্রম করে গেছে বছর দু-তিনেক আগে। তারপরও শক্তপোক্ত শরীর। চুলগুলো যতটা ধবল হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি। ঝুল পড়েনি চামড়ায়। পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও অনেকটা উপবাস বহুল জীবন যাত্রাই সম্ভবত তার দেহে মেদ জমতে দেয়নি এক ফোঁটা। তিনি ভোজন রসিক বটে কিন্তু ভোজন বিলাসী নন। রূপগঞ্জের সুবর্ণপুর গ্রামের লোকজন তাকে কর্নেল বলে সম্বোধন করলেও আসলে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। তার মতো চৌকস অফিসার হয়তো যেতে পারতেন আরও বহুদূর। কিন্তু সে সময়ের সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোর্শেদের সঙ্গে কি বিষয়ে যেন বচসা হওয়ায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন বিশ্রামাশ্রিত জীবন। ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএসে পাঁচতলা বাড়ি। তারপরও প্রকৃতির টানে ঢাকায় না থেকে তিনি বাস করেন গ্রামে। সুবর্ণপুর গ্রামে তার পরিচয় একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ মানুষ হিসেবে। কর্নেল সুলতান মাহমুদের বিচক্ষণতা পুস্তকনির্ভর নয়। তার অর্জিত জ্ঞান বরং পর্যবেক্ষণনির্ভর ও বৈষয়িক বিষয় ঘেঁষা। কর্নেল সাহেব পারিবারিকভাবেও স্বার্থক মানুষ। বনেদি পরিবার থেকে আগতা স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম সুশ্রি ও বিদুষী। দুটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তানের পিতা তিনি। মেয়ে দুটিকে পাত্রস্থ করেছেন বড় ঘর দেখে। একমাত্র পুত্র রেহান মাহমুদ পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র হিসেবে সে অসামান্য। পাশাপাশি করেন রাজনীতি। যদিও ছেলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি ভালো চোখে দেখেন না সুলতান মাহমুদ। কিন্তু রেহানের ভাষ্য হচ্ছে- ভালো ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলে রাজনীতির সবটুকুই হয়তো একদিন নষ্ট ও দুর্বৃত্তদের দখলে চলে যাবে। অনুর মুখে হরিয়ালপাখির আগমন সংবাদে কর্নেল সাহেবের মনের উদ্ভিদগুলো মুঞ্জরিত হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটলেন বন্দুক কার্তুজ হাতে।

কই না তো, দেখা যাচ্ছে না কোথাও। গেল কোথায় পাখিগুলো। ঈদের নতুন চাঁদ দেখার মতো করে বারবার গাছের ডাল ও পত্র-পল্লবের ওপর দৃষ্টি বুলাচ্ছিলেন কর্নেল সাহেব। মনজেদ আলী ভ্রু কুঁচকে বলল- পাতা-টাতার আড়ালে মনে হয় লুকাইয়া আছে বজ্জাতগুলা।

ওদের বজ্জাত বললা মনজেদ? হরিয়াল হচ্ছে খুবই শান্ত স্বভাবের পাখি। অন্য প্রজাতির পাখি তো দূরের কথা নিজ প্রজাতির কারও সঙ্গেও কখনও ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাঁধায় না ওরা। আনু, মনজেদ ও সুলতান মাহমুদ তিনজন মিলেও যখন পাখিগুলোর কোনো চিহ্ন খুঁজে পেল না তখন সুলতান সাহেব বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন।

মনজেদ আলী ঈষৎ বিনীত গলায় বলল- স্যার এত কষ্ট কইরা আসলেন যখন একটু বইসা যাইতেন। পাখিগুলা যদি ফিরা আসে। বরইয়ের লোভেও তো ফিরা আসতে পারে আবার। সুলতান মাহমুদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন- তোমরা কি সত্যি সত্যি পাখিগুলো দেখছিলা, নাকি দৃষ্টিভ্রম। হরিয়ালকিন্তু সূর্যোদয়ের পরপর কিংবা সূর্যাস্তের ঠিক আগে ছাড়া বের হয় না সচারাচর। ভোর বেলায় ওরা বট, অশ্বথ, ডুমুর গাছে বসে ফল খায়, রৌদ্রস্নান করে। বট-পাকুড়ের ফল এদের আবার খুব প্রিয়। শিমুল ফুলের কুড়িও খায় বেশ মজা করে।

মনজেদ সহাস্যে বলল- আনুই পাখিগুলোকে প্রথম দেখছে। আমি তো উঠানে বইসা কাম করতেছিলাম। দৌড়াইয়া পুকুর পাড়ে আইসা দেখলাম সত্যি সত্যিই দুইটা হরিয়াল পাতার আড়ালে বইসা বরই খাইতাছে। আমরা দুইজন মানুষ-ই কি ভুল দেখলাম?

না না ভুল দেখবে কেন? এমনি বললাম। আচ্ছা এসেছি যখন তখন একটু বসেই যাই। যদি আবার আসে পাখিগুলো। চল উঠানে গিয়ে বসি। পুকুর পাড়ে এত মানুষের সরগোল শুনে পাখিগুলো হয়তো ঘেঁষতে চাইবে না এদিকটা।

মনজেদ স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বললেন- যা তো বাবা আনু ঘরের ভেতর থ্যাইকা চেয়ারটা নিয়া আয়। আনু ঘর থেকে প্লাস্টিকের চেয়ারটি এনে দেয় কর্নেল সাহেবকে। চেয়ারটি ভূমিতে স্থাপনের জন্য সমতল জায়গা খুঁজতে খুঁজতে আনুকে জিজ্ঞেস করে- কোন ক্লাসে পড়ছিস রে আনু। এই তো এবার নাইনে উঠব। মনজেদ হাঁক ছাড়ে জোরে- কই গো আনুর মা। আমাগো একটু চা-টা খাওয়াও। এতদিন পর স্যার আসল এদিকে। মোয়া-টোয়া আছে কিছু, থাকলে দিও কয়েকটা। শুধু চা দিয়ে কি আর অতিথি আপ্যায়ন করা যায়। আনু কৌতূহলী হয়ে কর্নেল সুলতান মাহমুদকে জিজ্ঞেস করে- স্যার আপনি কি কখনও হরিয়ালপাখির মাংস খাইছেন? সোয়াদ কেমন?

হাহাহা। কিযে বলিস আনু। শিকার করি আজ ত্রিশ, চল্লিশ বছর। এমন পাখি খুব কমই আছে যা আমি শিকার করিনি। আর জীবনে পাখির মাংস খেয়েছি বিস্তর। হরিয়ালের মাংস অনেক সুস্বাদু। হরিণের শরীর যেমন হরিণের শত্রু, হরিয়ালের সুস্বাদু মাংসও ঠিক তেমনি হরিয়ালের শত্রু। সে জন্যই তো মানুষ হরিয়াল শিকার করে করে একেবারে হরিয়ালশূন্য করে ফেলেছে। এখন আর হরিয়ালপাখি দেখাই যায় না বলা চলে।

চখা নামের একটি পাখি আছে ওটার মাংসও অনেক মজা। চখা পাখি চিনিস নাকি আনু? আনু মাথা নেড়ে বলে- না। পাশ থেকে মনজেদ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে- আমি মাছ ধরতে গিয়া শীতলক্ষ্যা নদীতে চখা পাখি দেখছি। কী সুন্দর পাখি। দেইখাও চোখের শান্তি হয়। জোড়ায় জোড়ায় থাকে। আমরা বলি সরালী পাখি। মনজেদের কথায় সায় দিয়ে বলে সুলতান- হ্যাঁ ঠিকই বলছ মনজেদ। চখা দেখতে সরালীর মতো। তবে সরালী আর চখা এক না। চখার মাংস হয় এক থেকে দেড় কেজি আর সরালী আকারে একটু ছোট। কমলা-বাদামি কিংবা কখনও কখনও দারুচিনি বর্ণের পাখিগুলো দেখতে অনেকটা হাসের মতো। মোটা চেপটা চঞ্চু। এটাও ঠিক যে এরা চরে বেড়ায় জোড়ায় জোড়ায়। একটি চখা কিংবা চখি যখন খাবার খায় তখন অন্যটি মাথা ঈষৎ উঁচু করে চারদিকে খেয়াল রাখে কেউ তাদের দেখছে কিনা। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই চখাচখি ডাক দিয়ে ওঠে। কোয়াক… কোয়াক…। খোঁড়ড়ড়…। তারপর পাখা ঝাপটে উড়ে যায় দূরে।

এই যে হরিয়াল, চখাচখি কিংবা সরালী এদের মাংস এত মজা কেন জানিস আনু। আমি জানমু ক্যামনে, আমি কি পাখাল। কর্নেল সাহেবের প্রশ্নবানে জর্জরিত আনুর চোখ মুখে বিরক্তির আভাস। সে শুধু গল্প শুনতে চায়। এত প্রশ্ন বোধকরি ভালো লাগে না তার।

ঠিক আছে। এত বিরক্ত হওয়ার প্রয়োজন নাই। তুই গ্রামের ছেলে এগুলো তো তোর জানা দরকার। চখাচখি, সরালী এ ধরনের পাখিগুলো তৃণভোজী। জলজ উদ্ভিদ, উদ্ভিদের বীজ আর ধান এদের প্রিয় খাদ্য। খাবারের অপর্যাপ্ততা থাকলে কখনও কখনও জলজ পোকামাকড়ও খায় এরা। হরিয়ালের কথা তো আগেই বলেছি। হরিয়াল খায় ফল। এ জন্যই এদের মাংস এত সুস্বাদু।

অথচ সব মাছখেকো পাখির শরীরেই আঁশটে একটা গন্ধ থাকে। পানকৌড়ির মাংসেও সে রকম গন্ধ হয়। যাদের ঘ্রাণ অনুভূতি তীব্র তারা আঁশটে ভাবটা বেশি করে পায়। যেমন আমি পাই।

অন্য যে কোনো পাখির চেয়ে পাঁচগুণ বেশি রক্ত থাকে পানকৌড়ির শরীরে। আমার পোস্টিং তখন নীলফামারীতে। একদিন গিয়েছি দিনাজপুরে তিনশত বছর পুরনো কান্তজিউ মন্দিরটি দেখতে। মন্দিরের পাশ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে গেছে ছবির মতো সুন্দর ঢেপা নদী। শীতকালে নদীটিতে পানি হয় হাঁটু পর্যন্ত। জিপ চালিয়ে যাচ্ছিলাম নদীর পাশ ঘেঁষে। হঠাৎ দেখলাম বেশ কয়েকটা পানকৌড়ি বসে আছে চরে। বন্দুকটি সঙ্গেই ছিল। কাছাকাছি গিয়ে ফায়ার করলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম না, একটি পাখিও মারা পড়েনি। অব্যর্থ টিপের যে গৌরব মনের ভেতর জন্মেছিল সেটি তখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। হঠাৎ লক্ষ করলাম টকটকে লাল রক্তমিশ্রিত পানি বয়ে যাচ্ছে আমার পাশ দিয়ে। সন্দেহ হল আমার। ধীরে ধীরে এগোতে থাকলাম সামনের দিকে। প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে গিয়ে দেখলাম একটি পানকৌড়ি গুলিবিদ্ধ হয়ে ভেসে আছে পানির ওপর। একটি পাখির শরীরে এত রক্ত! এত বিশ্বাস করাই কঠিন। হাতে চায়ের পেয়ালাটি তুলে দিতে দিতে মনজেদ বললেন- স্যার সারা জীবন কি শুধু পাখি-ই শিকার করছেন। বাঘ-ভাল্লুক, হরিণ-টরিণ শিকার করেন নাই কোনোদিন। বাঘ-ভাল্লুক অবশ্য শিকার করা হয় নাই কোনোদিন। তবে হরিণ শিকার করেছি কয়েকবার। আর একবার মস্ত বড় একটি অজগর সাপ।

একবার পদ্মা নদীর চরে, এই তো প্রায় আনুর সমান হবে। এই আনোয়ার দাঁড়াত একটু। হ্যাঁ.. হ্যাঁ.. আনুর গলা পর্যন্ত তো হবেই। দুটো ভোঁদড় শিকার করেছিলাম। ভোঁদড়ের তো আর মাংস খাওয়া চলে না। তাই চামড়া সংগ্রহ করে ঘরের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রেখেছিলাম। বহু বছর পর্যন্ত ছিল ওগুলো। হরিণ শিকার করেছি বেশ ক’বার। একবারের ঘটনা বলি। ১৯৮২ সালের ঘটনা। শেরপুরের একেবারে শেষ প্রান্তে ভারতীয় সিমান্তের কাছে সেনাছাউনিতে আমার পোস্টিং। বাহাদুরাবাদ রেলস্টেশন থেকে নেমে আরও বহুদূর হাঁটা পথ। জায়গাটির নাম কর্ণঝরা। পাহাড়ি এলাকা। ভারতের পাহাড় থেকে ঘনবন নেমে এসে মিশেছে কর্ণঝরায়। সকাল থেকে ঘুরে ফিরে কিছুই তখন পাচ্ছিলাম না। তখনই দেখলাম প্রায় আমার থেকে তিন-চারশ গজ দূরে একটি হরিণ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘাস খাচ্ছে। হরিণ সাধারণত তিন-চারটে একসঙ্গে থাকে। কিন্তু এখানে তেমনটা দেখা গেল না। যা হোক আমি ধির পায় নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। হরিণটি থেকে মাত্র দু’শ পঞ্চাশ গজ দূরে আমি। গুলি করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হল নিশানা। আমি আরও সামনে এগিয়ে গেলাম। দূরত্ব হবে একশত আশি কি দু’শ গজের মতো। দ্বিতীয় দফা গুলি চালালাম। না এবারও মিস হল টার্গেট। ততক্ষণে রোখ চেপে গেছে মাথায় সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহও ঢুকে পড়েছে মনে। বন্দুকের টার্গেট পয়েন্ট ঠিক আছে তো? সব দেখেশুনে মনে হল নাহ বন্দুক তো ঠিকই আছে। তবে গুলি লাগছে না কেন। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে গুলির শব্দ শুনেও হরিণটির যেন কোনো ভাবান্তর নেই। ভাবে মনে হচ্ছে যেন গুলির শব্দ শুনছেই না হরিণটি।

এবার পৌঁছে গেলাম একেবারে কাছে। দূরত্ব মাত্র পঞ্চাশ গজ। তারপর তাক করে ট্রিগার টিপলাম। নাহ্ সব চেষ্টা ভেস্তে গেল। গুলিটা এবারও লাগল না। জীবনে এতটা অবাক বোধকরি খুব কমই হয়েছি। হরিণটি এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল আমার দিকে। তারপর ধীর পায়ে মিলিয়ে গেল বনে। আমি মায়া হরিণের কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু সেটি আজ নিজ চোখে দেখার বিরল এক অভিজ্ঞতা হল আমার।

মনজেদ ও আনু অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে শোনে কর্নেল সাহেবের জাদুকরি গল্প। আনু এবার সুলতান মাহমুদকে উদ্দেশ করে বলল- স্যার রেহান ভাইজান ঢাকা থেকে আসব কবে। দুই মাস আগে যখন আসছিল তখন আমারে কথা দিয়া গেছে ঢাকা থ্যাইকা আমার জন্য সুন্দর সুন্দর গল্পের বই নিয়া আসব।

সুলতান মাহমুদ সহাস্য বদনে বললেন- তাই নাকি। তা হলে তো বই তুই এবার পেয়েই গেছিস মনে হয়। কারণ দু’দিন আগেই তোর রেহান ভাই বাড়ি ফিরেছে।

কই আমি তো রেহান ভাইরে দেখলাম না বাড়িতে। কৌতূহলমিশ্রিত গলায় বলল আনু।
কাল রাতে তো বাড়ি ফিরে নাই রেহান। পাশের গ্রামে ওর এক সহপাঠী থাকে, মনে হয় রাতে ওখানেই ছিল। চলে আসবে আজ।

মনজেদ আলী প্রসন্ন গলায় বলে- স্যার আপনার ছেলেটা একটা রত্ন। ওমন ছেলে লাখে একটা হয়। আমি তো আনুরে সবসময় বলি জীবনে যদি কিছু হইতে চাস, তাইলে তোর রেহান ভাইরে অনুসরণ কর। ছেলের প্রশংসা শুনে গর্ভে বুকটা ফুলে ওঠে সুলতান সাহেবের। তিনি মনজেদকে উদ্দেশ করে বলেন- হবে হবে, তোমার ছেলেও অনেক বড় হবে একদিন। তবে কি জান মনজেদ, রেহানের এ রাজনীতি-ফাজনীতি করাটা আমার আদৌ পছন্দ নয়। কার কুপরামর্শে যে ছেলেটির এমন দুর্মতি হল আল্লাই জানে। আমি তো সবসময় মনে মনে বলি, আল্লা যেন ছেলেটার সুমতি দেন।

দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে এলো। সুলতান মাহমুদ ভ্রু তুলে বললেন- নাহ বেলা হয়েছে বেশ। এবার না উঠলেই নয়। কইরে আনু যা তো বাবা চট করে একবার দেখে আয়। কিছু দেখা যায় কিনা। আমার তো মনে হয় পাখিগুলো আর আসবে না আজ।

পুকুরের কাছাকাছি আসতেই এক ধরনের ভুতুড়ে আওয়াজ শুনতে পায় আনু। ভারী কণ্ঠের আওয়াজ। ঘু-য়ূক… ঘু-য়ূক…। উ-হু-হু…। বাড়ির পেছন দিকটা বেশ নির্জন ও গাছপালায় ঠাসা। কোত্থেকে কে আওয়াজ করছে তখন এসব দেখার কিংবা ভাবার সময় নেই আনুর। ভয়ে পালিয়ে আসে সে।

আনুর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে মনজেদ জিজ্ঞেস করে কিরে আনু এত হাঁপাইতাছস ক্যান। ভয়টয় পাইছস নাকি।

জি আব্বা। পুকুর পাড়ে ভূতের মতো কইরা কে যেন ডাকতাছে। কর্নেল সুলতান মাহমুদ, মনজেদ আর আনু তিনজনেই দ্রুত পা বাড়ায় পুকুরের দিকে।

সুলতান সাহেব তো হেসেই বাঁচে না। আনুর দিকে তাকিয়ে বলে- আরে গর্দভ হরিয়ালপাখি চিনিস আর হরিয়ালের ডাক চিনিস না। হরিয়াল ডাকে এমন করে। অবশ্য তোরও দোষ নেই। নির্জন বনে এদের ডাক হঠাৎ কানে এলে যে কেউ ভড়কে যেতে পারে। দুর্বল মনের লোকজন একে ভূতের আওয়াজ ভেবে ভয় পায় হরহামেশাই। কুলগাছের দিকে তাকিয়ে সুলতান মাহমুদ দেখে তার কথা মিথ্যা নয়। পাতার আড়ালে বসে আছে দুটি হরিয়াল। একটির রং সবুজ হলুদে মাখামাখি। অন্যটি জলপাই হলুদে মেশানো। ডানার ও ঘাড়ের দিকটায় ফিকে গোলাপি ছোপ- ওটাই সম্ভবত হড়িয়ালিনী। কর্নেল সাহেব আস্তে আস্তে তার টুয়েলফ্ বোর কার্টিজ বন্দুকটি তাক করে টার্গেটের দিকে। তারপর নিশ্চিত হয়ে ট্রিগার টানেন তিনি। বিকট শব্দে রাইফেল মুক্ত হয় কার্টিজ। তাদের মধ্যে কেউ লক্ষ্যই করেনি গাছে লুকিয়ে ছিল আরও দু-তিনটি হড়িয়াল। সবুজ হলুদে পাখিটি ভূপাতিত হয়ে ছিটকে পড়ল পাড়ে। কিন্তু কি আশ্চার্য হরিয়ালিনীটি ভয়ে পালিয়ে না গিয়ে পাড়ে নেমে এসে মৃতপ্রায় পাখিটির চারপাশে চক্কর খেতে লাগল। আর শব্দ করতে লাগল ঘূ-য়ূক…। ঘূ-য়ূক…। উ-হু-হু…।

সাধারণ লোকেরা বলে- হরিয়ালনাকি খুব অহঙ্কারী পাখি তাই মাটিতে পা ফেলে না। শুধু তেষ্টা পেলে তবেই মাটিতে নামে। অথচ সুলতান মাহমুদ আজ গভীর বিস্ময়ে দেখলেন। প্রিয় সঙ্গীর জন্য পাখিও কীভাবে আর্তনাদ করে। হৃদয় বিদীর্ণ করে ক্রন্দন করে।

এরই মধ্যে মনজেদের উঠানে বেশ শোরগোল শোনা গেল। অনেক মানুষের হট্টগোল, হৈ চৈ। সুলতান মাহমুদের প্রতিবেশী নিফাজ বিশ্বাস দৌড়ে পুকুর পাড়ে এসে বললেন- ভাইজান তাড়াতাড়ি বাড়ি চলেন। সর্বনাশ হয়ে গেছে।

সুলতান মাহমুদ বিস্ময়াভিভূত নেত্রে বললেন- কি সর্বনাশ হয়েছে খুলে বল। ভাইজান এইখানে এটা বলার বিষয় না। আপনি চলেন আমার সঙ্গে তাড়াতাড়ি। সুলতান মাহমুদ বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখলেন তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকেই দাঁড়িয়ে সেখানে। সবাই শোকে আচ্ছন্ন। কেউ হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ক্রন্দন করছে। কারও কারও চোখে অশ্রুর স্রোত।

বাড়িতে ঢোকার মুখে জনাশতেক লোকের বিশৃঙ্খল পদচারণা। অন্দর মহল থেকে ভেসে আসছে উচ্চস্বরে কান্নার শব্দ। উঠানে পা দিয়েই সুলতান মাহমুদ দেখলেন রেহানের প্রাণহীন দেহটি রক্তাপ্লুত হয়ে পড়ে আছে স্ত্রী জেবুন্নেসার কোলে। সুলতান মাহমুদের চেতন স্তিমিত। বোধ নেই কী ঘটছে আশপাশে। নিফাজ বিশ্বাস সুলতান মাহমুদের কাছে এসে বললেন- কাল রাতে বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে র্যাব ধরে নিয়ে যায় রেহান আর ওর এক বন্ধু নেছারকে। ভোর রাতের দিকে রেহান কে গুলি করে হত্যা করলেও ওর বন্ধুটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখনও। পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে সুলতান মাহমুদের। মনে হচ্ছে এক্ষুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন তিনি। নিফাজ শক্ত হাতে তাকে ধরার চেষ্টা করলেন- যেন ঝড়ে পতন্মুখ একটা গাছকে ঠেকা দিয়ে কোনো রকমে দাঁড় করিয়ে রাখা। তার একমাত্র সম্বল যে এভাবে ঝরে পড়বে সুলতান মাহমুদের সেটি কল্পনারও বাইরে। রেহানকে ছাড়া এ জগৎ তার কাছে শূন্য, গৃহশূন্য, হৃদয়শূন্য। জেবুন্নেসার গগন বিদীর্ণ করা নিনাদে প্রকম্পিত পরিবেশ। হাত দিয়ে উঠানের মেঝে থাপড়ে শুধু বারবার বলছে- ফিরাইয়া দাও আমার রেহানকে। দাও ফিরাইয়া আমার একমাত্র অবলম্বন। নির্নিমেষ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে সুলতান মাহমুদ, মর্মভেদি দৃষ্টি দিয়ে দেখে একজন সন্তান বিয়োগান্ত মায়ের করুণ আর্তনাদ। জেবুন্নেসার ক্রমাগত ক্রন্দন তার কানে বাজতে থাকে- ঘূ-য়ূক…। ঘূ-য়ূক…। উ-হু-হু…।

আরো পড়তে পারেন

প্রতিটি বই’ই চ্যালেঞ্জ

নোরা রবার্টস। বিখ্যাত আমেরিকান এ ঔপন্যাসিক ১৯৫০ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। রোমান্স রাইটার্স হিসেবে খ্যাত এই লেখিকার ২৫০টিরও বেশী প্রেমের উপন্যাস রয়েছে। স্ব-নামে ছাড়াও ‘জি, ডে রোব’ নামে তিনি তার বিখ্যাত ‘ইন ডেথ’ সিরিজ লিখেছেন। এবং ছদ্মনাম ‘জিল মার্চ’ ও ‘সারাহ হার্ডেসটি’ নামেও লিখেছেন বেশকিছু ফ্যান্টাসী ও সাসপেন্সধর্মী উপন্যাস। ‘আমেরিকা হল অব ফেমে’র রোমান্স….

কবিতা ও গণিত

কবিতা ও গণিত নিয়ে বাংলাদেশে তেমন লেখালিখি হয়েছে বলে আমার জানা নাই। নব্বইয়ের দশকে মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা নামক একটা লিটল ম্যাগাজিন বের হতো। ওটার একটা পর্ব ছিলো গণিত সংখ্যা। বেশ ঢাউস আকারের। সংখ্যাটা হাতে না থাকায় বলতে পারছিনা ওখানে গণিত ও কবিতা নিয়ে কেমন লেখা হয়েছিলো। আমার জানা মতে পশ্চিম বাংলা থেকে এরকম কিছু….

গোপন পাপ

বড় আব্বার হাঁকডাক শুনে তকদির ছুটতে ছুটতে সজনে তলায় এসেছে। লুঙ্গি পায়ে জড়িয়ে বেকায়দা পতন সামলে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই খালি হাতে এসে ভুল করেছে শুনে লুঙ্গি কাছা মেরে আবার ও হাত দাখানা আনতে ছুটেছে। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকে তকদির। বড় আব্বার ইঙ্গিত পেয়ে সে সজনের ডাল কাটতে শুরু করে। গাছের ডাল….