যে কোনো সুন্দরীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ভালবাসি

হাশেম খান

ছবি আঁকার এই শিল্পসংসারে হাশেম খান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রঙের বর্ণিল আলোয়। অনেক এঁকেছেন, লিখেছেনও প্রচুর। সান্নিধ্য পেয়েছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শফিউদ্দিন আহমেদ, আমিনুল ইসলাম ও পটুয়া কামরুল হাসানসহ আরও অনেক শিল্পীর।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : মনি হায়দার


মনি হায়দার : আপনার শৈশবটা কোথায় কীভাবে কেটেছিল?
হাশেম খান : আমার শৈশব গ্রামে, গ্রামের নাম শেখদি, একেবারে সবুজে ভরা, এখনও সবুজ। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানা, বরকল উপজেলা, ডাকাতিয়া নদীর তীরে, একদম গাছগাছালিতে ভরা। একেবারে সবুজ, বাগান-টাগান ফসল, সব মিলিয়ে আমি বলব পৃথিবীর এত দেশে গিয়েছি, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাস করছি, কিন্তু আমার কাছে সব চেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি এবং যদি বলি অর্জন, ওই পনেরো-ষোলো বয়স পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম, গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কাটিয়েছিলাম, সেটাই আমার জীবনের উজ্জ্বল স্মৃতি। তাকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়েই আমার ছবিতে, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছি।
আপনি কবে বুঝলেন যে, আপনার মধ্যে একটা শিল্পীসত্তা কাজ করছে?
: কোনোদিনও বুঝিনি, এখনও বুঝি না। এটা বুঝলেই মনে হয় আর কিছু করতে পারব না। আমি মনে করি যে নানা কারণে ছবি আঁকায় চলে এসেছি। সেসব গল্প অন্য সময় করা যাবে। এসেছি, তারপরে অবাক দৃষ্টিতে দেখছি, কিছুই জানা ছিল না। মফস্বল শহর থেকে ঢাকা শহরে তখন এসেছি ১৯৫৬ সালে।
আপনি কি করে বুঝলেন যে ছবি আঁকতে হবে, আপনার বাবা-মা, এরাই বা কি করে মেনে নিলেন?
: আসলে নিন্মধ্যবিত্ত বা কৃষক পরিবারের ছেলে, মা-বাবাদের আশা থাকে যে, কী করে একটা ছেলে বিএ পাস করবে, একটা চাকরি করবে। আমরা অনেক ভাইবোন, চৌদ্দজন। সাতজন ভাই এবং সাতজন বোন। আমার বাবা কিন্তু খুব কষ্ট করে, মাও খুব কষ্ট করে আমাদের চালাচ্ছেন কিন্তু বাবার একটা বিষয় ছিল সবাইকে লেখাপড়া শেখাতে হবে। এই লেখাপড়ার জন্য তিনি যত রকম কিছু করার করেছেন, ফসল ফলাতেন, একটা ছোট চাকরি করতেন, পুরো বেতনটা দিতে হতো আমাদের লেখাপড়ার খরচে। তাও কুলোতো না, যাই হোক, তখন আমার বড়ভাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েন, তিনি ডাক্তারি পড়বেন এবং আমার খুব ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়ার, কিন্তু আমার ম্যাট্রিকের রেজাল্টটা বাবার পছন্দ হল না, কারও পছন্দ হল না, এমনকি আমার নিজেরও পছন্দ হল না। করে ফেলেছি, কিন্তু এটা ডাক্তারি পড়ার জন্য খুব একটা উপযুক্ত নয়। তখন কি করা হবে। আমি ছোটবেলায় প্রচুর বই পড়তাম, ছবি আঁকতাম। এই কারণেই কিন্তু চিত্রকলার জগৎ, সাহিত্যের জগৎ, সংস্কৃতির জগৎ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা ছিল। সেই সময় আমার বড় ভাই সোলেমান এবং আমার ভগ্নিপতি, যিনি টিচার্স ট্রেনিংয়ে চাকরি করতেন, বাবাকে বললেন, ‘ওর তো ছবি আঁকার খুব শখ, ঢাকায় এখন আর্ট কলেজ হয়েছে, সেখানে নতুন নতুন ছাত্ররা ভর্তি হচ্ছে। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে, জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, এরা এখন খুব নামকরা শিল্পী, সেখানে গেলে মন্দ হয় না’। আমার খুব ভালো লাগল, আমার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমি আশা করিনি বাবা এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন। বাবা যেন ভাবলেন, কি করবে? পরে বলেন, ‘আচ্ছা যাক’। এভাবেই চলে আসা। এসে দেখি, প্রথম দিনই, মফস্বল থেকে আসা, কিছুই জানি না। ভর্তি পরীক্ষা দশটার সময়, আমি সাড়ে আটটায় হাজির। আর্ট কলেজে ঢুকতেই একটা ইদারা, পানিভর্তি, একজন সাধারণ লোক নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করছেন। আমি বললাম, ‘এটা তো আর্ট কলেজ’। ‘হ্যাঁ, কী বিষয়’, ‘আজকে তো এখানে ভর্তি পরীক্ষা?’, ‘হ্যাঁ, সে তো দশটায় হবে, এখন তো অনেক সকাল। আপনি কি সেখানে ভর্তি হতে এসেছেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। বললেন, ‘পরে আসেন, অনেক দেরি, স্যারেরা এলে আপনাকে এভাবে দেখলে রাগ করবেন’। যা হোক, আমি আবার কিছুক্ষণ পরে গেলাম, দশটার কিছুক্ষণ আগে। সেই লোকটাকে দেখলাম একটা শার্ট গায়ে বসে আছেন। আমি বললাম, ‘আপনি কি এখানে দারোয়ান?’ বললেন, ‘না, আমি এখানেরই একজন, বলেন কী চাই?’ ‘আমি তো ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম’। ‘ও, দেবেন আপনি ভর্তি পরীক্ষা, সকালে তো আসছিলেন আপনি?’ তারপর আমার আপদমস্তক দেখে বললেন, ‘আপনি ভর্তি হতে পারবেন’। আমি অবাক হয়ে গেলাম, ‘কী করে বুঝলেন?’ ‘আমরা চেহারা দেখলে বুঝি, যেখান থেকে আসেন না কেন? আপনি ভর্তি হতে পারবেন’। আমি দেখছি, একজন বয়স্ক মানুষ, লম্বা, বেশ সুন্দর চেহারা, বারান্দা দিয়ে খুব ছোটাছুটি করছেন। আমি তাকে বললাম, ‘উনি কি জয়নুল আবেদীন, প্রিন্সিপ্যাল?’ একবার আমার দিকে তাকান আরেকবার উনার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রিন্সিপ্যাল’, চেনেন জয়নুল আবেদীনকে?’, আমি বললাম, ‘না, চিনি না, দেখিনি কখনও?’ ‘আচ্ছা ভর্তি হলে সব জানতে পারবেন। এক কাজ করুন তো, কাছে আসুন। চার আনা পয়সা দেন’। চার আনা পয়সা কিন্তু তখন অনেক পয়সা। আমি দেখলাম লোকটা আমার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা বলেছেন, অনিচ্ছাসত্ত্বেও দিলাম। আমার কষ্ট হচ্ছিল, কারণ তখন পাঁচ আনা দিলেই একবেলা মাছ ভাত খাওয়া যেত। দেয়ার পর তিনি বললেন, ‘খুব ভালো। আপনি ভর্তি হতে পারবেন, অপেক্ষা করেন। আরও ছেলে আসছে, এখানে প্যারেডে আসবে, নাম ধরে ডাকবে, চলে যাবেন’। যাক ভর্তি হলাম আমি। ওই লোকটা চাকরি করতেন না, ছিলেন মডেল যাকে দেখে দেখে উপরের ক্লাসের ছাত্ররা ছবি আঁকতো, স্টাডি করত, অনুশীলন করত, তার নাম ফরাজী, তাকে নিয়ে আমি অনেক গল্প লিখেছি।
এরপরে আমাদের চারুকলা কলেজ চলে গেল বর্তমান কলেজ যেখানে, সেখানে। আগে ছিল সেগুনবাগিচা একটা বাড়িতে। আমরা ভর্তি হয়েছিলাম সেগুনবাগিচায়। পরে সেখানে মিউজিক কলেজ হয়েছিল। ১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে আমরা বর্তমান যে নিজস্ব ভবন সেখানে চলে এসেছিলাম। সেগুনবাগিচায় ছয়মাস ক্লাস করেছিলাম। খবরের কাগজে দেখলাম, জয়নুল আবেদীন ইউরোপ ভ্রমণ করে সেদিনই ফেরত আসছেন। শাহবাগে ক্লাস শুরু হওয়ার দশ বারোদিন আগের কথা। কলেজে ঢুকতে গিয়ে দেখি, কয়েকজন শিক্ষক জয়নুল আবেদীনকে ঘিরে গল্প করছেন, ততদিনে কাগজে ছবি দেখে জয়নুল আবেদীনকে চিনে ফেলেছি।
তখন শিক্ষক কে কে ছিলেন?
: আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, খাজা শফিক আহমেদ এবং আমিনুল ইসলাম। এরা কয়েকজন বসে গল্প করছেন আর আমি পাশ দিয়ে আমার ক্লাসে যাচ্ছি। প্রথমবর্ষের ক্লাসরুম প্রথমেই পড়ে। এমন সময় দেখি, থামের আড়াল থেকে ফরাজী, এতদিন তাকে কিন্তু পাইনি। ফরাজী যাকে আমাকে জয়নুল আবেদীন বলে চিনিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আনোয়ারুক হক। সে যাই হোক, ঢুকতেই আমাকে বললেন যে, ‘স্যার একটু শুনেন, আমি তো ফরাজী’। আমি বললাম ‘আমি তো চিনি আপনাকে, কী হয়েছে?’ ‘স্যার, আপনার কাছ থেকে চার আনা পয়সা নিয়েছিলাম, এই নিন’। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, প্রথম দিন গচ্চা দিতে হল। ফরাজী আমাকে বলেন, ‘স্যার, আমাকে মাফ করে দিয়েন, সেদিন আপনাকে ভুল দেখিয়েছিলাম, জয়নুল আবেদীন স্যার আজকে এসেছেন’।
এই লোকটিকে আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি, তিনি আমাদের মডেল ছিলেন, দীর্ঘকাল আর্ট কলেজে, এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি।
আপনার গল্পেই বুঝতে পারলাম যে তার মৃতদেহ ওখান থেকে বের হয়েছে
: তার লাশ পড়ে ছিল একটা ঘরে। তিনদিন পরে আবিষ্কার হয়।
ট্রাজিডিটা কিরকম, তাকে দেখে এঁকে এঁকে কত লোক বিখ্যাত হয়েছেন, ওর জীবনের কোনো উন্নতি নেই
: আমার গল্পটাতে, শোকসভাতে বলা হচ্ছে, কে বলেছে ফরাজী মরেছে, তাকে দেখে প্রথম দিকের সব শিল্পী ছবি এঁকেছে, ফিগার এঁকেছে, মানুষের ফিগার। এই ছিল ফরাজী।
চাকরিতে ঢুকলেন কত সালে?
: এটাও একটা মজার ঘটনা, আমি যখন পঞ্চম বর্ষে, তখন তো আমাদের পাঁচ বছরের কোর্স ছিল, পঞ্চম বর্ষ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে আমাদের অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন স্যার আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘আমাদের এখানে সিরামিক বিভাগ খুলব, তোমাকে সিরামিকের কাজ শিখতে হবে। তোমাদের পাঁচজনকে আমরা বেছে নিচ্ছি। তুমি এখানে কালকে থেকে ক্লাস কর। আমি বললাম, ‘স্যার আমার তো ফিফথ ইয়ার চলছে, এখনও পরীক্ষা-টরীক্ষা হয়নি’। ‘এতদিন শিখেছ হয়নি, পরীক্ষার সময় তোমাকে ছুটি দেয়া হবে। একই জায়গা তো, মাঝে মাঝে ক্লাস করবে’। যাই হোক পরীক্ষা সেভাবে দিলাম। আমার একটা ভয় ছিল, এতদিন কাজ করেছি, আমার রেজাল্টের কোনো ঠিক ছিল না। নানা কারণ, এর আগের ফলাফল ঠিক ছিল না। আমার একটা ইচ্ছা ছিল, অন্তত প্রথম শ্রেণী নিয়ে যাওয়া। ভালো ছবি আঁকি, সবাই জানে, স্যাররা খুব স্নেহ করেন। কিন্তু আমার রেজাল্ট আগে ভালো হয়নি। পঞ্চম বর্ষে এসে যখন পরীক্ষা দিতে যাই, রাজ্জাক স্যার আমাদের ক্লাস শিক্ষক। খুব অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন, সবাইকে স্নেহ করতেন। বললাম, ‘স্যার, আর এক বছর থাকতে চাই’। ‘কেন?’ ‘স্যার, আমি একটা প্রথম শ্রেণী নিয়ে যেতে চাই’। ‘কি বল তুমি? আরেক বছর থাকলে যে তুমি ফার্স্টক্লাস পাবে, সিওর?, শোন, তোমাদের এই ব্যাচটা সাংঘাতিক মেধাবী। তোমরা প্রত্যেকেই ভালো, তোমরা চার-পাঁচ জন সাংঘাতিক ভালো, কেউ কারও চেয়ে কম না। তোমাদের পরের ব্যাচটা যে তোমার ভালো লাগবে তা তো না, ভালো নাও লাগতে পারে। শোন, তোমাকে একটু গোপনে বলি, তোমার রেজাল্ট তো এমনিতেই ফার্স্টক্লাস’। আমাদের ক্লাসের কাজ দেখে দেখে পঞ্চাশভাগ নম্বর আসত।
চাকরি আপনার হয়েই গেল
: চাকরি হল এভাবে, সিরামিকস শিখছি, স্যার আবার ডাকলেন, আমি হাতে কাদাটাদা মাখা, অ্যাপ্রোন পরা। বলেন, ‘শোন, তোমার জন্য দুটি চাকরি আছে। কালকে থেকে জয়েন করো। বাসেত সাহেব আমেরিকা চলে যাচ্ছেন। তুমি কালকে থেকে ফার্স্ট ইয়ারে ক্লাস নেবে, তোমার সমস্ত বায়োডাটা রফিকুল আমীন সাহেব ঠিক করেছেন। তুমি সই করে দিও, হয়ে যাবে। কালকে আমি ডিপিআই ও ফেরদৌস খান সাহেবের কাছে নিয়ে যাব’। আমার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, একি! হঠাৎ করে স্যার আমাকে ডেকে বলছেন ‘সই কর। না, তোমার জন্য দুটি চাকরি আছে, আরেকটি আছে ইউএসআইএস, আমেরিকান ইনফরমেশন সার্ভিসে, নিতুন কুণ্ডু যেখানে আছে, শিল্পী আনোয়ার হোসেন বলে আরেকজন আছে, তাদের সঙ্গে তুমি কাজ করবে। মি. জনসন, কালচারাল ডিপার্টমেন্টের হেড, সে তোমাকে খুব পছন্দ করে, তোমার ছবি পছন্দ করে গেছে। আমাদের এখানে জয়েন করলে তুমি পাবে একশ’ আশি টাকা, আর ওখানে জয়েন করলে পাবে তিনশ’ পনেরো টাকা। জনসন বিকালে আসবে। আর এটা আমরা তোমাকে এখনই দিচ্ছি। তুমি ভেবো না, আমরা তোমাকে এখানে জোর করে রাখছি। তুমি এমনিতে কালকে থেকে ক্লাস নাও। তোমার যেটা ভালো লাগে তুমি সেটা গ্রহণ কর’। আমি কী একটা সমস্যায় পড়ে গেলাম। আবার তিনি বললেন, ‘টাকার প্রয়োজন আছে, আর তোমাকে ছয়মাস পরে একবছরের জন্য পাঠিয়ে দেবে, আর এখানে কবে তুমি স্কলারশিপ পাবে? ওখানে সিওর। জনসন আমার সঙ্গে বসবেন তোমাকে নিয়ে, তুমি ডিসাইড করো, তুমি আজকে না কর, কালকে কর’। রফিকুল আমীন বললেন, ‘না, ও আজকে করবে, আজকে ডিসিশন নেবে’। আমি বললাম, ‘স্যার, আমি এই মুহূর্তে ভাবছি, আমি চারুকলাতে থাকতে চাই’। ‘কেন? দুনিয়াটা দেখবে না?’, আমি বললাম, ‘স্যার, পরবর্তী কালে দেখার চেষ্টা করব’। ‘তুমি কাল থেকে ক্লাস নাও’, ‘স্যার, আমার সিরামিক্স?’ ‘সেটাও পরে হবে, যেভাবে এখানে দিয়েছিলে’। ‘স্যার, আমার রেজাল্ট তো জানি না। আমার রেজাল্ট কি আউট হয়ে গেছে?’ বলেন যে, ‘দু-একদিনের মধ্যে আউট হয়ে যাবে, শফিকুল আলম সাহেব ওর রেজাল্টটা দিয়ে দিন। তুমি প্রথম শ্রেণী পেয়েছ, না হলে তোমাকে শিক্ষক করব কেন?’। এভাবেই আমার শিক্ষকতা, আমি তখনই সই করে দিলাম। আমি আর চিন্তা করলাম না।
ছবি আঁকতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন, অনেক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন, তা আমাদের বলবেন কি?
: আমার কাজ নিয়ে, আমার ছবি আঁকা ইত্যাদি নিয়ে আমি বহু কথা শুনেছি, আজকে আমার বলতে দ্বিধা নেই, কথা প্রসঙ্গে আসবে, ক্যানভাসে ছবি করা, এক্সিবিশন করার অনেক আগে থেকেই কিন্তু বইয়ে ছবি আঁকছি। আমার ছোটবেলা থেকে ধারণা ছিল, শিল্পীদের প্রধান একটি কাজ হচ্ছে বইয়ে ছবি আঁকা। আমি তখন ইলাস্ট্রেশনটা বেছে নিয়েছিলাম ছোটবেলায়। আর যেহেতু আমি শিশু সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম, কঁচিকাঁচার মেলা, দাদাভাই, কবি হাবিবুর রহমান আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। সুযোগ করে দেয়াতে আমি ইলাস্ট্রেশন করতে গিয়ে দেখেছি যে ইলাস্ট্রেশন কিন্তু পেইন্টিংয়ের একটি কম্পোজিশান। ছোট হোক, একই জিনিস কিন্তু। সে সময় আমি অনেক নিন্দা পেয়েছি। তখন যারা ইলাস্ট্রেশন করত তাদের খুব খারাপ চোখে দেখত। আমি ভাবলাম পিকাসো ইলাস্ট্রেশন করেছেন, খুব দূরে যাব না, আমাদের যিনি শিল্পকলার প্রতিষ্ঠা করেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান তারা দুজনই কলকাতায় ইলেস্ট্রেটার একই সঙ্গে পেইন্টার। তারা তো কিছু বলছেন না। অথচ অন্যরা অনেকে বলেছে। এমনকি দু’জন শিক্ষকও বলেছেন। আমার অভিভাবক, আমার ভগ্নিপতি খোঁজ নিতে এসেছে আমি কী করছি, বলেছেন, ওর হাত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ইলাস্ট্রেশন করে ওর হাত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ও ছবি আঁকতে পারবে না। আর আমি শিক্ষক হওয়ার পরে, আমার ছাত্রদের বলেছি, সব রকম কাজ কর। তুমি যে সমাজের একজন প্রয়োজনীয় ব্যক্তি তোমাকেই প্রমাণ করতে হবে। সমাজে একজন ইঞ্জিনিয়ার যেমন প্রয়োজন, একজন আর্কিটেক্ট যেমন প্রয়োজন, একটা টেকনোক্রেট যেমন প্রয়োজন তেমনি একজন শিল্পীরও সমাজকে সুন্দরের পথে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় পেশা। সুতরাং এতে তো কোনো ক্ষতি নেই। আমি মনে করি যারা গ্রাফিক ডিজাইন করছে, বিজ্ঞাপনসংস্থা করছে, বিভিন্ন কাজের সঙ্গে আছে আমাদের শিল্পীরা। কোথায় নেই আজকাল! এটাই না শুধু, শিল্প আন্দোলনেও আছে। না হলে যারা আজকাল প্রদর্শনী করছে, তারাও তো জায়গা পাবে না।
কয়েক বছর আগে, জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী অডিটোরিয়ামে আপনার একটা বিশাল এক্সিবিশন হয়েছিল। আমি ছবি দেখতে যেতাম। আমি তো ছবির মানুষ না, ওই অর্থে ছবি ভালো করে বুঝিও না। কিন্তু রঙ আর রঙ, মনে হচ্ছে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে হলটা। সবুজ রঙে হলুদ রঙে, বাংলাদেশকে পাগলের মতো আমি দেখেছি। অনেকবার গিয়েছি আপনার প্রদর্শনীতে, আমি আর কারও প্রদর্শনীতে যাইনি, আপনার প্রদর্শনীতে যেভাবে গিয়েছি। হাশেম খানের ছবিতে এত রঙ কেন? কী বলতে চায় হাশেম খানের ছবি?
: এই যে আপনার ভালো লেগেছে, এটা আমাকে অনেকেই বলে, এটায় আমার সার্থকতা। এই রঙ দিয়েই, রেখাও আছে, ড্রইংও আছে, অনেক কিছুই আছে, আবার কিছুই নেই, সব মিলিয়ে মানুষকে কাছে টানতে পেরেছি। মুনতাসীর মামুন, শিল্প সমালোচক বলেছেন, ‘হাশেম খানের ছবির সামনে গিয়ে অন্তত যে কোনো মানুষকে এক মিনিট থেকে তিন মিনিট দাঁড়াতেই হবে’, একজন শিল্পীর জন্য এটা যে কত বড় সার্থকতা! এই যে আপনার ভালো লেগেছে, আপনি অভিভূত হয়েছেন।
এই যে রঙের ব্যবহার, এটা কি গ্রামের সেই শৈশবের সম্পর্ক?
: হতে পারে। আমি এত সবুজ দেখেছি, আমি সবুজ দিয়ে ছবি আঁকতাম। আমার সব কিছুতেই সবুজ রঙের প্রাধান্য থাকে। এখানে হলুদ থাকে, লাল থাকে। এই যে প্রাইমারি রঙ, এই তিনটি রঙই আমার খুব প্রিয়। আমি এভাবে আঁকতে চাই।
আপনাদের ছবি দেখলে মনে হয়, এটা শুধু ছবি না, ছবিটা কথা বলে
: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের শিল্পকর্ম নিয়ে ভারতে গেলাম। আমাদের কাছে তখন দুয়ার খুলে গেল, কারণ আমাদের কাছে ভারত নিষিদ্ধ ছিল। এখন কাছের হয়ে গেল। ১৯৭২ সালে তখন যে সাংস্কৃতিক চুক্তি বিনিময় হল, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই বিরাট আয়োজনের দায়িত্ব জয়নুল আবেদীন আমাকে দিয়েছিলেন। আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কলকাতা যখন প্রদর্শনী হয় তখন ভারতের নামি-দামি আর্ট ক্রিটিক এবং শিল্প আন্দোলনের একজন নেতা প্রণবরঞ্জন রায়, তিনি ঢাকাও আসেন মাঝে মধ্যে, বাংলাদেশের বন্ধু, তিনি কাইয়ুম চৌধুরী এবং আমাকে একই সঙ্গে একটা প্রশ্ন করেছিলেন একটা সমাবেশে, ‘কাইয়ুম চৌধুরী এবং হাশেম খান, এই যে আপনারা দু’জনে প্রচ্ছদ আঁকেন, আবার ক্যানভাসে ছবি আঁকেন কিন্তু সারা বিশ্বে যারা গ্রাফিক ডিজাইন করে, ড্রইং করে, এমনকি আমাদের দেশে, কলকাতাতেও, খুব কমই কিন্তু তারা বইয়ের জগতে যান। কিন্তু আপনারা দু’জনেই দু’জায়গাতে সমান শক্তিশালী। এটা কেন?’ কাইয়ুম চৌধুরী এবং আমি এগুলো আলাপ করতাম। তিনি বললেন, ‘আমি বইতে ছবি এঁকে একটা আনন্দ পাই, আমি ক্যানভাসে যে ছবি আঁকি, প্রচ্ছদেও তাই আঁকি, এ জন্য আমার একটা দুর্নাম আছে, আমাকে প্রচ্ছদ করতে দিয়ে সময়মতো পান না। আসলে ক্যানভাসের চিন্তাটাকে ঢুকাতে একটু সময় লাগে আমার’।
আমি জবাব দিয়েছিলাম, ‘ওটারই পরিপূরক হিসেবে যে, বাংলাদেশ আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি। ঢাকা শহর বটে, কিন্তু এখনও ঢাকা শহরে একতলা বাড়ি খুব বেশি নেই, ছবি টাঙাবো কোথায়? ছবির গ্রাহক কারা? ছবি বিক্রি হয় না, আপনাদের এখানে কিছু হয়, কিন্তু আমাদের ওখানে সেই সংস্কৃতিটা গড়ে ওঠেনি। দেশ স্বাধীন করেছি। যেমন আমরা বই পড়তে ভালোবাসি, এখন কিছু লোক গান শুনতে ভালোবাসে, একদিন হয়তো গ্রাহক বাড়বে। হয়তো আমাদের দালানকোঠা বাড়ি হবে, মানুষ ছবি টাঙাবে। এভাবে কিছুটা হলেও ক্যানভাসের ছবি, বইয়ের মাধ্যমে, একটি বই তো অন্তত দু’হাজার কপি ছাপা হয়, একটি বই যদি পাঁচজনে পড়ে তাহলে দশ হাজার মানুষের কাছে শিল্পকর্ম পৌঁছে যাচ্ছে। আমরা এভাবেই কিন্তু জনসাধারণের কাছে শিল্পকর্ম নিয়ে যেতে পারছি’।
আপনি বাংলাদেশের অনেক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ঊনসত্তরে গণ অভুত্থান, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং কচিকাঁচার আসরের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একজন মানুষের সঙ্গে আপনার নিবিড় পরিচয় ছিল, তিনি হলেন সুফিয়া কামাল। সুফিয়া কামালকে আপনি কিভাবে দেখেছেন, কিভাবে তার মূল্যায়ন করবেন?
: চারুকলায় ভর্তি হওয়ার সময়, এর আগে ক্লাস এইট থেকে আমি খুব পড়াশোনা করতাম, আবার লিখতামও, ছড়া লিখতাম, গল্প লিখতাম। সেগুলো ছোটদের পাতায় ছাপা হতো। এভাবে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হল। কচিকাঁচার মেলা যেদিন গঠিত হয় সেদিনই কিন্তু পরিচয় একধরনের। প্রথম সভা যেদিন ডাকলেন, সেই সভাটা ছিল সুফিয়া কামালের বাসায়, ১৩ নম্বর অভয়দাস লেইন। আমি তো বাসা খুঁজে পাই না। আধঘণ্টা খুঁজে গলদঘর্ম। একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, ‘এই তো পাশের বাড়ি’, কিন্তু সেটা পেছন দিক। সামনে দিয়ে যেতে হলে অনেকটা ঘুরে যেতে হবে। কে এম দাশ লেইন দিয়ে। আবার তিনি বললেন, ‘আমাদের এ বাড়ির ছেলেরা, ও বাড়ির ছেলেরা দেয়াল টপকে চলে যায়, তুমি তো বাচ্চা ছেলে, তুমি দেয়াল টপকে চলে যাও’। দেয়াল টপকে যখন গেলাম, ধুপ করে একটা আওয়াজ হল, লাফ দিলাম তো। ‘কে কে কে’ করে চিৎকার, আমি ভাবলাম সর্বনাশ, আমাকে যদি চোর ভাবে। একজন বয়স্ক মানুষ এলেন, মোটামুটি মাঝ বয়সী, বললেন, ‘কী চাও তুমি এখানে, এদিক দিয়ে এলে কেন? দেয়াল দিয়ে নামলে কেন?’ আমি বললাম, ‘কচিকাঁচার মেলার একটা সভা আছে।’ আমি তো ঘাবড়ে গেছি। তিনি বললেন,’ তুমি এদিক দিয়ে এলে কেন? আমি বললাম ‘খুঁজে পাইনি’। বললেন ‘এসো’। তারপর দেখি একটা গাছতলায় পুকুরপাড়ে অনেকে বসে আছেন। পরে চিনেছি এরা, সুফিয়া কামাল, আবদুল্লাহ আলমুতি শরফুদ্দীন, আবদুল ওয়াদুদ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বাবা, তিনি ইত্তেফাকের জেনারেল ম্যানেজার। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ছিলেন। আর ছিল বেশ কিছু আমার বয়সী ছেলেমেয়ে। তখন সবাই মুড়ি খাচ্ছে। আমি দেখলাম আমিই একমাত্র অপরিচিত, যে কচিকাঁচার মেলার বিজ্ঞাপন দেখে এসেছে। আর সবাই কিন্তু পরিচিত। সবাই বললেন, খুব মজার কথা, ও কাগজে খবর দেখে এসেছে। ওই ভদ্রলোক বললেন, ওকে তোমরা এই মেলার সঙ্গে নিয়ে নাও। ও এই সভায় আসার জন্য আধঘণ্টা ঘুরেছে এবং একটা দেয়াল টপকে এসেছে’। সেদিন কিন্তু কথাটির অর্থ বুঝিনি, মানুষটির কথা বলছি। ওই যে পরিচয় হল, আমি দীর্ঘদিন কচিকাঁচার মেলার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এবং ওই মানুষটি হলেন সুফিয়া কামালের স্বামী কামাল উদ্দীন খান। সুফিয়া কামাল যে সুফিয়া কামাল হয়ে উঠেছেন, তার ছেলেমেয়েরা আজকে যে, সুলতানা কামাল, সাইদা কামাল এবং তার অন্য সন্তানরা, তারা যে প্রগতিশীল মানুষ এবং সুফিয়া কামালের বাড়িটি ছিল সারা দেশের, বিদেশের একটা প্রগতিশীল মানুষের মানবতা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র। সারা দেশের মানুষকে যে তিনি সব ভালোবাসা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন, এর পেছনে কিন্তু কামাল উদ্দীন খানের অবদান ছিল অনেক বেশি। তিনি ওয়াসার অর্থ বিভাগে কাজ করতেন। আইয়ুব খান তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য চাকরি থেকে নিচে নামিয়ে দিয়ে দিনাজপুর ট্রান্সফার করে। তিনি বললেন, ‘সুফিয়া কামাল যে কাজ করছে, তাকে বিরত করার ক্ষমতা আমার নেই। দরকার হলে আমার চাকরি চলে যাক, দরকার হলে আমি শাস্তি গ্রহণ করব’। ছেলেমেয়েরা যে কাজ করছে, কত নিন্দা তার করেছে, বুক আগলে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। আমাদের কত উৎসাহ দিয়েছেন এই কামাল উদ্দীন খান। আজকে সুফিয়া কামালের কথা বলেন, আমি বলব কামাল উদ্দীন খানের কথা, নীরবে অনেক কাজ করেছেন। তিনি কিন্তু লেখকও ছিলেন, সুফিয়া কামালের প্রেরণা ছিলেন তিনি। তিনি আগলে রাখতেন, সবাইকে আগলে রাখতেন। নীরবে থাকেন, সামনে আসতেন না।
বাংলাদেশের বাইরে কি আপনার কোনো প্রদর্শনী হয়েছে?
: আমাকে জাপানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আমার ইলাস্ট্রেটেড বই প্রদর্শনী করতে। সেখানে জাপানের শিশু এবং শিশুদের বাবা-মা, একদিনের একটা অনুষ্ঠান, অসাধারণ হয়েছিল।
এটা কত সালে হয়েছিল? আপনি গিয়েছিলেন?
: এটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। গিয়েছিলাম। খুবই মজা লেগেছিল। আমার যে ইন্টারপ্রেটার ছিল, আমি খুব সামান্য ইংরেজি জানি, ছবি তো বেশি ইংরেজি বলতে হয় না। তবু কাহিনীগুলো আমি খুব সংক্ষেপে বলেছি। ওদের খুবই মুগ্ধতা, কেউ নড়তে চায় না, উঠতে চায় না। এমন দলীয় এক্সিবিশন অনেক হয়েছে।
আপনার জীবনে প্রেম, নারী কিভাবে এসেছিল? এখনও আসে কিনা? আপনি কিভাবে দেখছেন?
: বলতে গেলে অনেক লম্বা গল্প। এটা সবাই শুনতে চায় বোধ হয়। কোনো এক জায়গাতে বলা যাবে। যে কোনো সুন্দরী নারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আমি ভালোবাসি। সে দেশের হোক, বিদেশের হোক। আর সুন্দরী বলতে আমি মনে করি না যে শুধু চেহারায় সুন্দরী হবে। আমি মানুষের সঙ্গে যখন কথা বলি, তার কথাবার্তা, ব্যবহারে, তখনই কিন্তু মনে করি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়। আমি কিন্তু তখন চাই তার কাছে আমাকে উপস্থিত করতে। আমি মনে করি তার আমাকে দরকার। আমি একটা বইও লিখেছি, ‘নিরাভরন কন্যার গল্প অল্প’, এখানে পাঁচটি মেয়ে বিদেশি, একটি মডেলের গল্প ‘ফুলজান’, তার আসল নাম নুরজাহান, এই যে পাঁচটি মেয়ে, পাঁচটি মেয়ে কিন্তু সত্যি মেয়ে। এই পাঁচটি মেয়ে যেমন আমাকে ভালোবেসেছে, আমিও।
এই পাঁচটি মেয়ে, কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে আপনার ওপর, কিভাবে আপনি দেখেছেন তাদের?
: প্রভাব পড়েছে তা না, সামান্যতম পরিচয়, যেটুকু পরিচয়, যতক্ষণ ছিলাম পরস্পরের প্রতি আস্থা, ভালোবাসা, বিশ্বাস ছিল। অনেক কথা হয়েছে জীবন নিয়ে, তাদের সমাজ নিয়ে, আমাদের সমাজ নিয়ে, মানুষের আচরণ নিয়ে, মানবতা নিয়ে, এমন কি নারী এবং পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক, এসব নিয়েও কথা হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন

প্রতিটি বই’ই চ্যালেঞ্জ

নোরা রবার্টস। বিখ্যাত আমেরিকান এ ঔপন্যাসিক ১৯৫০ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। রোমান্স রাইটার্স হিসেবে খ্যাত এই লেখিকার ২৫০টিরও বেশী প্রেমের উপন্যাস রয়েছে। স্ব-নামে ছাড়াও ‘জি, ডে রোব’ নামে তিনি তার বিখ্যাত ‘ইন ডেথ’ সিরিজ লিখেছেন। এবং ছদ্মনাম ‘জিল মার্চ’ ও ‘সারাহ হার্ডেসটি’ নামেও লিখেছেন বেশকিছু ফ্যান্টাসী ও সাসপেন্সধর্মী উপন্যাস। ‘আমেরিকা হল অব ফেমে’র রোমান্স….

নিখোঁজ কিশোর পারেখের ‘বাংলাদেশ’

‘আমার মনে আছে, আমরা তখন হংকংয়ে থাকি; আমার বয়স পাঁচ। ছুটির দিনে আমরা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যেতাম। সমুদ্রের পাড়ে বাবা মাঝে মাঝে ছবি আঁকতেন। সেদিন তিনি বেশ অস্থির ছিলেন। বললেন, “আমার দেশ পুড়ছে আর আমি বসে ছবি আঁকছি।” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলতে কিংবদন্তি ফটোসাংবাদিক কিশোর পারেখের আকুতি দেখতে পাই তাঁর ছেলে স্বপন পারেখের এই স্মৃতিচারণে।….

জীবন দেখব, জীবনের ভণ্ডামি দেখব না, এটা তো হতে পারে না

ছোটগল্পের পাশাপাশি উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রেও নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের জীবন প্রণালি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে তার গল্প-উপন্যাসের পটভূমি হয়েছে। হাসান আজিজুল হকের চরিত্রগুলোতে যেমন আছে ক্ষরণ ও ব্যর্থতা, তেমনি রয়েছে সাফল্য ও বিজয়গাথাও। আমাদের সামাজিক ভয়ানক অবক্ষয়ের ইতিহাসও তার লেখায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘বৃত্তায়ন’, ‘শিউলি’, ‘আগুনপাখি’; ছোটগল্পের মধ্যে ‘আত্মজা ও….