গোপন পাপ

সাদিয়া সুলতানা

বড় আব্বার হাঁকডাক শুনে তকদির ছুটতে ছুটতে সজনে তলায় এসেছে। লুঙ্গি পায়ে জড়িয়ে বেকায়দা পতন সামলে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই খালি হাতে এসে ভুল করেছে শুনে লুঙ্গি কাছা মেরে আবার ও হাত দাখানা আনতে ছুটেছে। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকে তকদির। বড় আব্বার ইঙ্গিত পেয়ে সে সজনের ডাল কাটতে শুরু করে। গাছের ডাল প্রবেশদ্বার বরাবর ঝুলে থাকায় তা ছেঁটে ফেলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই জরুরি বিষয়টা বুকে ব্যাচ লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো স্বেচ্ছাসেবকদের চোখ এড়ালেও সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর অভিজ্ঞ চোখ এড়ায়নি।
প্রবেশদ্বারের কাছে বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষা এই সজনে গাছের পাতার চেয়ে সজনের আড়ম্বর বেশি। তাছাড়া এই সবজির কদর এই তল্লাটে আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য পীর বাড়ির সীমানার গাছ বলে হাতের নাগাল ছোঁয়া সবজি বা আম পাড়তে এলাকার দস্যি ছেলেপেলেও সাহস পায় না। কার অভিশাপে কী হয় তা তো আর বলা যায় না। এই বিষয়ে বাবা-মার উপদেশ মেনে ওরা একে-অন্যকে সাবধান করে। মাজারের কুলটা, আমটা চুরি করার সাহস এদের দুরন্ত শৈশবের নেই। বরং নিজেদের ছোটখাট পাপ কাটাতে এদের কেউ কেউ সবার অগোচরে মাজারের বাইরে পাতা ঝলমলে চাদরের ওপর আগরবাতি আর মোমবাতি রেখে যায়।
শোনা যায় সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর পূর্বসূরী সৈয়দ মীর হাবিবি তুরানী কামেল পীর ছিলেন। প্রতি বছর জিলক্বদ মাসের দশ-এগারো তারিখে এই পবিত্র দরগায় ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। আজ নয় তারিখ। মাজারের লাল সালুর নিচে শুয়ে আছেন সৈয়দ মীর হাবিবি তুরানী, যার স্মরণে বার্ষিক ওরস শুরু হচ্ছে কাল থেকে। তিনি কামেল পীর। বড় জাগ্রত। অনুতপ্ত পাপী-নাফরমানদের জন্য তার মাজারের দরজা বরাবরই খোলা। যারা ভক্তিভরে মাফ চায়, তারাই গন্তব্যে অগ্রগামী হয়।
ওরসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে এই বাড়ি এখন সরগরম। যদিও আগের সেই শান-শওকত এখন আর নেই। তকদিরের মনে আছে, ওরসের আগের দিন দিবাগত রাত থেকে গরু, ছাগল, ভেড়া সারি করে আল্লাহর নামে জবাই দেয়া হতো। ওরসকে কেন্দ্র করে রাস্তার দুধারে বিশাল মেলা বসতো, এখন এর পরিসর অনেক কমে এসেছে। হারমোনিয়াম, মন্দিরা, কাঠজুড়ি আর ঢোল হাতে গানের দল দয়াল বাবাকে উদ্দেশ্য করে প্রেম-ভক্তির গান গাইত আর সেই তালে কলব যেন নতুনভাবে জেগে উঠতো। কয়েক বছর হলো গানের দলের সেই জমজমাট আসরও নেই। ওর মনে আছে বছর তিন আগে দফায় দফায় হোমড়া-চোমড়া নেতাকর্মী আর সরকারি লোক এসে কী কী মিটিং-সিটিং করে গেল। এরপর থেকে ওরসের জৌলুস মিইয়ে এসেছে।
তকদির পশ্চিম দিকের ডাল ছেঁটে বড় আব্বার নির্দেশের অপেক্ষা করে। ওকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী অন্যান্য কাজের তদারকি করতে বাড়ির দিকে পা বাড়ান। এই পীর বাড়ি প্রায় তিন বিঘা জমির ওপরে নির্মিত। বাড়ির চারদিকে সীমানাপ্রাচীর ঘেরা। প্রবেশপথে সজনে গাছ লাগোয়া সোনাঝুরি গাছটা পাতা আর ফুলে একাকার হয়ে আছে। সীমানাপ্রাচীর থেকে ৭/৮ গজ দূরে দূরে নানা রকম ফলজ গাছ। পীর বাড়ির পশ্চিম ভিটা পূবদুয়ারী ঘরে পাশে বেমক্কাভাবে মাথা চাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা তালগাছ। তালগাছে ঝুলন্ত বাবুই এর বাসা থেকে সাবধানী পাখিরা হঠাৎ হঠাৎ ছুটোছুটি করছে। দু’একটা কাক তালগাছের ছড়ানো পাতায় বসে শিকারী চোখে ইতি-উতি তাকাচ্ছে। বাড়ির সম্মুখ ভাগের ডানপাশে পরিকল্পিতভাবে করা সবজি বাগানে লকলক করে বেড়ে উঠেছে বারোমাসি সবজি। ফুল গাছের বিস্তার করে কোনো জমি অহেতুক অপচয় করা হয়নি এখানে। মুরিদান, আশেকান, ভক্তদের চলাচলে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য মাজারের সামনের জেড শেপের রাস্তা পিচ ফেলে পাকা করা হয়েছে। যদিও এখন আশেকানদের সংখ্যা কমে এসেছে তবু এবারের ভিড় নেহায়েৎ কম হবে না আশা করা যায়। ফি বছরের মতো এই বছরও ওরসকে ঘিরে মাজারের সংস্কার কাজ চলছে। আজ সেই কাজ তরতর করে এগুচ্ছে। কাজের তদারকি করছেন স্বয়ং সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী।

২.
কার গোপন পাপে তকদিরের জন্ম তা ওর জানা নেই। এই বাড়ির কারোই তা জানা নেই। জন্মের ঠিক নেই বলে ওকে নিয়ে পাড়া বা মহল্লায় যে মুখরোচক আড্ডা বা গল্প চলে তা কিন্তু না। নয়নগঞ্জের মতো আধা শহর আধা মফস্বলের মানুষের এসব নিয়ে আলাপচারিতার সময় নেহায়েৎ কমও না। আসলে পীর বাড়ির আশ্রিত তকদিরকে তেমন কেউ ঘাঁটায় না। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর প্রভাবকে লোকজন সমীহ করে। এছাড়া আলোচনার তালিকার ক্রমিকে ওপরের দিকে থাকতে হলে লোকসমাজে চলাফেরা তো করা চাই। সেই সুযোগ তকদিরের আর হয় কোথায়। এই পীর বাড়ির সীমানা প্রাচীরের বাইরে ওর পা পড়ে কদাচিৎ। এই বাড়ির বাজার করা থেকে শুরু করে সব কাজের জন্য আলাদা আলাদা লোক আছে। তবে তকদির বড় আব্বার বিশ্বস্ত অনুচর। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী যখন শহরে অফিস-আদালতে যান তখন তার সফরসঙ্গী হয় তকদির। গতমাসে ডিসি অফিসে মিটিঙে যাবার সময় বড় আব্বা তাকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এর চেয়ে সম্মানের বিষয় ওর জন্য আর কীই বা হতে পারে।
সারাদিন তো ওকে বাড়ির সবার ফুট-ফরমাস খাটতে হয়। রান্নার কাজে নূরজাহান খালাকে সাহায্য করার সঙ্গে সঙ্গে ওকে মাজার ধোয়ার কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। যার জন্মের কোনো ঠিক নেই তাকে দিয়ে পবিত্র মাজার ধোয়ার কাজ করানো ঠিক হবে কীনা সেই বিষয় নিয়ে বড় আম্মা আপত্তি উথ্থাপন করলেও বড় আব্বার সামনে তা ধোপে টেকেনি। বড় আব্বার বড় দয়ার শরীর। তাছাড়া তিনি নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাকে তা থেকে সরানো মুশকিল।
বড় আব্বার প্রতি কৃতজ্ঞতায় রোজ হাউজ থেকে বালতিতে করে পানি এনে খুব যত্নের সঙ্গে মাজারের সিঁড়ি পরিষ্কার করে তকদির। এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে ওর শুকুর-গুজরানের কোনো শেষ নেই। যে লোকটা তার জন্মের ঠিক নেই বলেও তাকে ঘৃণার চোখে না দেখে এত পবিত্র কাজের দায়িত্ব দিয়েছে তার দেয়া কোনো দায়িত্বে ও কখনো অবহেলা করে না। বরং মনে মনে তকদির ঠিক করে রেখেছে, বড় আব্বা কোনো বিপদে পড়লে ও নিজের কল্লা পেতে দিবে।
সিঁড়ির শেষ ধাপের পানি ন্যাকড়াতে নিঙড়াতে নিঙড়াতে তকদির উঠে দাঁড়াতেই দেখে সামনে নুসরাত দাঁড়িয়ে আছে। ওর মাথায় ঘোমটা নেই। বাড়ি ভর্তি লোকজন অথচ এই মেয়ের কোনো হুশ নেই। নুসরাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে জিহবাতে কামড় দিতে দিতে তকদির অন্য দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনার কিছু লাগব?’
সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর একমাত্র মেয়ে নুসরাত। মোমের মতো পেলব শরীর মেয়েটার। হঠাৎ নুসরাতের দিকে চোখ পড়লে মনে হয় জান্নাত থেকে হুর নেমে এসেছে। নুসরাত খুব রহস্যময় মেয়ে। তাকে সবসময় মোবাইল হাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। তকদির ওকে দেখলেই আড়চোখে তাকায় আর ওর মনে প্রশ্ন জাগে, আঙুলের ছোঁয়ায় অমন যন্ত্র কেমন করে চলে! কিন্তু এই প্রশ্ন বড় আব্বার মেয়েকে করার মতো সাহস ওর হয় না। এই বাড়ির সবার চেয়ে এই মেয়ে আলাদা। পাগল কিছিমের। প্রতিদিনই আছরের ওয়াক্তে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নুসরাতকে দেখার ছুতো করে তকদিরও রোজ সেই সময়ে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করে। মাঝেমাঝে কাজের ব্যস্ততায় বা কেউ দেখে ফেলবে ভেবে সাহস করে যেতে পারে না। তবু বালতি বা কিছু একটা আনবার ছুতো করে ছাদে গেলে ওর চেখে পড়ে নুসরাত দূরের এক বাড়ির ছাদে দাঁড়ানো কোনো ছেলের সঙ্গে ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলছে। এই মেয়ের সাহস দেখে তকদিরের কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। বড় আব্বার জালি বেতের ভয়-ডর নাই এক ফোঁটাও।
তকদিরের সঙ্গে চোখাচোখি হলেই নুসরাত চঞ্চল চোখে হাসে। পর্দা-পুশিদার বালাই নেই। দূর থেকে বাপকে দেখলেই কেবল মাথায় ওড়না টেনে সে নিজেকে আড়াল করে। ওকে দেখলে কোনো এক অজানা কারণে তকদিরের বুকের ভেতরটা থরথর করে কাঁপে। যার কোনো কার্যকারণ ও খুঁজে পায় না।
‘তকদির ভাই। এই পাঁচশ টাকা ধরেন। মোবাইলে টাকাটা ভইরা দিবেন।’ নুসরাতের কথা শুনে বড় আব্বার নিষেধাজ্ঞার কথা মনে পড়লে ও নত মস্তকে বলে, ‘আমি পারুম না। বড় আব্বার নিষেধ আছে।’ বলেই তকদির খালি বালতি নিয়ে দুদ্দাড় করে হেঁটে যায়। কী মনে হতে পেছন ফিরে তাকালে নুসরাতের পিঙ্গল চোখের তারার আগুনের ফুলকি ওর চোখ ঝলসে দেয়। তকদিরের বুক আবার থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে থাকে। পরীর মতো মেয়েটাকে না বলা খুব কঠিন। জীবনে যদি কোনো পূণ্য করার কারণে সে জান্নাতে যায় তবে হুর হিসাবে কাকে চাইবে সে বিষয়ে মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় ও। তকদির ধীর পায়ে নুসরাতের সামনে এসে হাত বাড়ায়। খিলখিল করে হেসে নুসরাত চকচকে একটা পাঁচশো টাকার নোট ওর দিকে এগিয়ে দেয়। তকদির তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলীর চাপে টাকাটা এমনভাবে নেয় যেন কোনোভাবেই মুনিবের মেয়ের হাত তার হাত স্পর্শ না করে। কিন্তু উল্টোরথে নুসরাতের সুঢৌল আঙুলগুলো ছুঁয়ে দেখার অদম্য বাসনায় ওর বুকের ভেতর ঢেঁকির পাড় পড়তে থাকে। তকদির দাঁত দিয়ে জিহ্বা কাটে। এসব কী ভাবছে সে! ভাগ্যিস ওর মনটা ওর মুখের মতো কেউ দেখতে পায় না!

৩.
ওরসের আয়োজনে সামিল হতে দূর দূরান্ত থেকে হাজারো মুরিদ, ভক্ত ছুটে এসেছেন। আগের মতো খাবারের বাহার এখন নেই, তবু হলকার মাঠে চুলা তৈরি করে বিশাল বিশাল দশটা ডেকচিতে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। রান্নার আয়োজন যেখানে করা হয়েছে তার অদূরেই তিনটা বড় নৌকা রাখা। সকালে হাউজ থেকে বালতি বালতি পানি এনে এই নৌকা তিনটা পরিষ্কার করেছে তকদির। তকদির আজ দশরকম দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যোহরের নামাজ পড়ারও ফুরসৎ পায়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর হাঁকডাকে নিজের শরীর পাকসাফ করার সুযোগও তার হয়নি। গতকাল রাতে খোয়াব দেখার পর কী হয়েছে তা মনে করতে না পারলেও লুঙ্গীর অবস্থা ভালো ঠেকেনি ওর। তকদিরের আরেকটু ঘুমাতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর হুঙ্কারে বিছানা না ছেড়ে কোনো উপায় ছিল না। বড় আব্বাকে ও ছোটবেলা থেকে ভয় পায়। বৈঠকখানার খাটের তোশকের নিচে পাঁচটা জালি বেত আছে। সময়ে সময়ে ওগুলো সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী হাতে নিলেই হয়, বেত পড়ার আগেই তুরানী সাহেবের রক্তচক্ষু দেখে অপরাধীর দফারফা হয়ে যায়।
সবাই বলে তকদিরের তকদির ভাল। বড় ভাগ্য গুণে সে মাজার শরিফে জায়গা পেয়েছে, সেই সঙ্গে সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর সাহচর্য লাভ করেছে। বছর কুড়ি আগে এক চিমসে ভাদুরে দুপুরে কে যেন তকদিরকে মাজার শরীফের সিঁড়িতে ফেলে গিয়েছিল। পীরের বংশের লোক বলে কথা, জাতকূলহীন সেই মানব শিশুকে কুজাতের বলে সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী ডাস্টবিনে ফেলে দিতে পারেননি আর সেই থেকে বাড়ির তিন-চার জন বাঁধা লোকের হাতে হাতে তকদির বেড়ে উঠেছিল।
খিচুড়ির ঘ্রাণ ছুটেছে। রান্না করা গরু, খাসির গোশত আর খিচুড়ি একসঙ্গে মেশানোর পর দুপাশে বাঁশের সঙ্গে কায়দা করে ডেকচি টেনে নিয়ে নৌকাতে ঢালা হচ্ছে। কম পক্ষে বিশটা খাসি আর সাতটা গরু জবাই হয়েছে। জবাই শেষে বাড়ির ডিপফ্রিজে সংরক্ষণের জন্য সিনা আর গর্দানের গোশ পাঠানো হলেও মাংসের যেন কমতি না হয় তার জন্য সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীর নিদের্শে তকদির কসাইদের কয়েক দফা তাগিদ দিয়েছে। বিপুল উৎসাহে মুরিদ, আশেকানসহ স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ রান্না পরিবেশনে হাত লাগিয়েছেন। আতপ, কাটারিভোগ, সুগন্ধী কালিজিরা, নাজির শাইল চালের সঙ্গে মুগ, মসুর, কলাই ডালের মিশ্রণে রান্না উপাদেয় খিচুড়ির সুগন্ধে চারপাশের বাতাস ম ম করছে। খাবার সরবরাহের এলাকার ভিড়বাট্টা দেখে তকদির নিজের খাবারের কথা ভুলে গেছে। নাহ্ এখন ওর মনে হচ্ছে ওরসের শান-শওকত একটুও কমেনি।
উপহার, উপঢৌকন ফল-ফলাদিতে ভয়ে গেছে পীর বাড়ির বৈঠক খানা। আলু, পটল, লাউ, বরবটি, পেঁয়াজ, ধামা ধামা এসেছে। হলুদ, মরিচ, রসুন, আদা, জিরা, গরম মসলাসহ নানান রকম মসলাপাতিতে সয়লাব হয়ে আছে স্টোর রুম। অনুপাত হিসাব না করেই চোখের আন্দাজে প্রয়োজনমতো সবকিছু চালান হয়েছে খিচুড়ির হাড়ির ভিতর। বালতিতে করে খিচুড়ি সরবরাহ করতে করতে যখন নৌকা প্রায় খালি হয়ে এসেছে তখন ক্ষুধার্ত তকদির নিজে এক প্লেট যোগাড় করে খিচুড়ির ওপর হামলে পড়ে। স্বাদ গন্ধযুক্ত পরমান্ন পেটে যেতে যেতে নিজের তকদিরকে যখন ও বাহবা দেয় তখন ওর মনে পড়ে এই বেলাতেও নামাজ কাজা হয়ে গেছে। তবে এশার ওয়াক্ত হবার আগেই তকদির গোসল সেরে পরিষ্কার পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়।
রাত বাড়তে থাকলে মাজারের পাশের মাঠে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতিতে দারুণ মজমা বসে। পুলিশ-প্রশাসনের নজরদারিতে যদিও আগের সেই রমরমা ভাব আর নেই। তবু লোকচক্ষুর আড়ালে বিক্রেতারা আশেকানদের কলব চাঙা করতে তাদের সাধ্যমত ইয়াবা, গাঁজা, চরস সরবরাহ করছে। তকদিরও গেরুয়া পরা অর্ধউলঙ্গ জটাধারী ভক্তগণের সঙ্গে বসে নেশায় চুর হয়ে কাজের কথা ভুলে থাকে। এই সময়ে নিজেকে ওর রাজা-বাদশার মতো লাগে। নেশা খানিক জমে এলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়, ফিনফিনে শাড়ি পরা নুসরাত ওর চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আরে, এ কী দেখছে সে! নুসরাত শাড়ি পরেছে! পাতলা নীল শাড়ি নুসরাতের শরীরে ঢেউয়ের মতো লেপ্টে আছে। তা দেখে তকদিরের এমনই কামভাব জেগে ওঠে যে সে ছিলিমে টান দিতে ভুলে যায়।

৪.
এই বাড়িতে কিছু একটা ঘটে গেছে। বড় আব্বার হাঁকডাক কমে গেছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ। বড় আম্মা আর নুসরাতও কয় মাস হয়ে গেল বাড়িতে নেই। প্রথম প্রথম তকদির ভেবেছিল, বাপের বাড়ির নাইওর শেষ হয়নি বড় আম্মার। কিন্তু মা-মেয়ের দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতিতে একসময় ও বুঝতে পারে, ওর অজান্তে কিছু একটা ঘটে গেছে। নজরুলের চিৎকারে হুশ ফেরে ওর।
‘ওইটা পাড়িস না বেক্কল।’
তকদির বাড়ির উত্তর দিকের সীমানা প্রাচীরের কাছ ঘেঁষা আম্রপালি গাছ থেকে আম পাড়ছে। গাছের শেষ আমটিতে হাত দিতেই নজরুল হৈ হৈ করে উঠেছে, ‘অই ছ্যামড়া, ওইটা গাছ পউরি। ছিড়িস না।’ তখনই তকদিরের মনে পড়ে, গতবছরও নজরুল একইভাবে ওকে বাধা দিয়েছিল। গাছের শেষ ফলটি নাকি তোলা নিষেধ, এতে গাছের বুক খালি হয়ে যায়। গাছ থেকে নেমে কাছা খুলে নিয়ে তকদির নজরুলের সঙ্গে ধামায় আম সাজাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এই আম যাবে দড়িয়াবাড়ি। বড় আব্বার শ্বশুরবাড়ি। ভাবতেই তকদিরের মনটা খুশিতে ফড়ফড় করে ওঠে। বহুকালবাদে বড় আব্বার সফরসঙ্গী হয়ে সে দড়িয়াবাড়ি যাবে। এর আগে বেশ কয়েকবার বড় আব্বার সঙ্গে সেখানে গেছে ও। কিন্তু এইবারের বিষয়টা আলাদা। কতদিন নুসরাতকে দেখে না! নাকেমুখে খেয়ে তাই ও বড় আব্বা হাঁক দেবার আগেই দড়িয়াবাড়ি যাবার জন্য ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে তৈরি হয়ে থাকে।

বড় আব্বার শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে তকদির টের পায় চারদিকে সাবধানী কানাঘুষা চলছে। বারবার আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও নুসরাতের দেখা পায়নি ও। ব্যাগ বোঁচকা রাখতে গিয়ে তকদির দোতলাতেও উঠেছে দু’বার। হুর পরীর মতো ডানা লাগিয়ে মেয়েটা কোথায় যে উধাও হয়ে গেল! তকদিরের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে, মেয়েটা নিশ্চয়ই এই বাড়িতে আছে। সন্ধ্যে নামতেই নুসরাতের কথা ভুলে ক্ষুধায় অস্থির লাগে তকদিরের। সেই কখন এসেছে। এক কাপ লাল চা আর দুটা প্রাণ টোস্ট ছাড়া আর কিছুই খায়নি। অথচ বরাবর এই বাড়িতে এলে বড় আব্বার জামাই আদরের ভাগ পেতো। এইবারই যেন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। কুটুমবাড়ি এসে ওর মতো ভৃত্যশ্রেণির মানুষ নিজের চাহিদার কথা মুখ ফুটে বলতে না পেরে সীমাহীন অস্বস্তি নিয়ে বিছানায় শুয়ে উসখুস করে।
বড় আম্মার বাবাও কেতাদুরস্ত বড়লোক। দোতলা বিল্ডিং এর নিচতলায় গ্যারেজ আর দারোয়ানের থাকার জায়গা। দারোয়ান ওকে বসিয়ে রেখে জলবিয়োগের কথা বলে সেই যে গেছে এখনো ফেরেনি। দরজার কাছে হঠাৎ খুট করে আওয়াজ হলে তকদির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বোধ হয় খাবার এলো। কিন্তু সামনে বড় আব্বাকে দেখে তকদির চমকে যায়। মানুষটার ওপর দিয়ে যেন কালবৈশাখী বয়ে গেছে। একেবারে ভেঙেচুরে গেছে। বিদেশী ছাঁটে কাটা দাড়ির অগ্রভাগে কলপ লাগেনি বলে সাদা সাদা দাড়ি চিকন শলাকার মতো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানী তকদিরের সামনে এসে ওর দু’হাত ধরে বলেন, তোর একটা কাম আছেরে তকদির। বড় আব্বার কথা শুনে ওর বুকের ছাতির বেড় দীর্ঘ হয়। আবেগে সে কেঁদে ওঠে, হুকুম করেন বড় আব্বা। নিজের কল্লা নামায় দিবো!
নিজের কল্লা নামানো লাগেনি তকদিরের। কিন্তু যে কাজের ফরমায়েস সে পেয়েছে তার চেয়ে কল্লা নামানোই বেশি সহজ ছিল বলে এখন ওর মনে হচ্ছে। রাত কয়টা বাজে ও জানে না। অন্ধকারের সঙ্গে পৃথিবী ঘুমে তলিয়ে যেতেই বড় আব্বা ওকে ডাক দিয়েছিল। দারোয়ান ব্যাটা তখনো ফেরেনি। বাড়ি থেকে বের হয়ে ঘুর পথে হেঁটে প্রধান সড়কে উঠেছে ও। রাস্তাঘাটে তেমন কোনো মানুষ নেই। গলি দিয়ে বের হবার সময় কেবল ওকে সতর্ক থাকতে হয়েছে। এ তল্লাটে ওর মুখ অপরিচিত বলে, দুএকজন কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ করেও চোখ সরিয়ে নিয়েছে। ওর কোলে ধরে থাকা পুটলির দিকে তাকিয়ে অতিউৎসাহী একজন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বাচ্চার মাও কই।’ অস্ফুট গলায় তকদির কী জবাব দেয় তা তার কানে না পৌঁছালেও সে হুড়মুড় করে তকদিরকে কাটিয়ে হেঁটে চলে গেছে। বাতাসে ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়ে তকদির বুঝেছে, ব্যাটা নেশাখোর।
বড় আব্বা বলেছেন, মোটামুটি পাঁচ কিলোমিটার গেলেই হবে। জনবিরান এলাকা দেখে কাজটা করতে হবে। এই জায়গাটা বাইপাস ঢোকার মুখে। মাঝে মাঝে দানবের মতো দু’একটা বাস ট্রাক ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। জঙ্গল মতো একটা জায়গা দেখে গতি পরিবর্তন করে রাস্তা থেকে নেমে তরতর করে সেদিকে হাঁটা শুরু করে ও। রাতের কালো অন্ধকার ওকে জাপটে ধরে। কোলের পুঁটলির ভেতর থেকে বচ্চাটা কেঁদে উঠলে চমকে যায় তকদির। দু’একবার বুকের মাঝে পুঁটলিটা নাচিয়ে ও খুব সাবধানে পা ফেলে। বড় আব্বা আদেশ জারি করার বদলে এই প্রথমবারের মতো ওর কাছে একটা ভিক্ষা চেয়েছে।
হঠাৎ দমকা হাওয়া শুরু হয়। ঝড়ের আভাস পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে ছলকে ওঠা আলোতে নিজের শরীরের দৃশ্যমান অংশ দেখে চমকে যায় তকদির। আকাশের দিকে মুখ তুলে ভীত চোখে তাকিয়ে যেন ও টের পায়, কেউ একজন সব দেখছে। এটা মনে হতেই হাতের পুঁটলিটা মাটিতে ফেলে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় শুরু করে ও। রাস্তায় উঠে এসে হাঁপাতে থাকে। সাঁই করে একটা মালবোঝাই ট্রাক ওর পাশ ঘেঁষে ছুটে যায়। এবার চাইলেও ও আর দৌড়াতে পারে না। ধীর পায়ে রাস্তার ধার ধরে এগোতে থাকে।
আচমকা কী মনে হতে তকদির ঘুরে দাঁড়ায়। কারো গোপন পাপে জন্ম নেয়া মানব শিশুটির জন্য ওর বুকের পাঁজর ভেঙে একটা তীব্র দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, যার ঝটকায় আবার দৌড় দেয় ও। অন্ধকারে কচি কণ্ঠের কান্না শুনে হাতড়ে হাতড়ে তকদির বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয়। অজানা এক প্রশান্তিতে ও কেঁপে উঠে সামনে পা বাড়ায়। তারপর কার অলঙ্ঘনীয় ইশারাতে নিজের গতিপথ বদল করে ছুটতে শুরু করে তকদির।

আরো পড়তে পারেন

লাল রক্ত সবুজ হরিয়াল

শ্যাওলার আধিক্যের কারণেই সম্ভবত পানির রং ঘন সবুজ দেখাচ্ছে। পুকুরটিকে মোটেও ছোট বলা চলে না। চারপাশে উঁচু পাড়। পাড়জুড়ে নানা প্রজাতির গাছ-গাছালিতে ভর্তি। ওগুলোর মধ্যে বাউল সন্ন্যাসীদের ঝাঁকড়া চুলের মতো কুল গাছটি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে পুকুরের পাড় ছেড়েও বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে পুকুরের ওপর। বৃক্ষের প্রাচুর্যতার কারণে সূর্যের আলোও ঠিক মতো এসে পড়ে….

প্রতিটি বই’ই চ্যালেঞ্জ

নোরা রবার্টস। বিখ্যাত আমেরিকান এ ঔপন্যাসিক ১৯৫০ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। রোমান্স রাইটার্স হিসেবে খ্যাত এই লেখিকার ২৫০টিরও বেশী প্রেমের উপন্যাস রয়েছে। স্ব-নামে ছাড়াও ‘জি, ডে রোব’ নামে তিনি তার বিখ্যাত ‘ইন ডেথ’ সিরিজ লিখেছেন। এবং ছদ্মনাম ‘জিল মার্চ’ ও ‘সারাহ হার্ডেসটি’ নামেও লিখেছেন বেশকিছু ফ্যান্টাসী ও সাসপেন্সধর্মী উপন্যাস। ‘আমেরিকা হল অব ফেমে’র রোমান্স….

কবিতা ও গণিত

কবিতা ও গণিত নিয়ে বাংলাদেশে তেমন লেখালিখি হয়েছে বলে আমার জানা নাই। নব্বইয়ের দশকে মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা নামক একটা লিটল ম্যাগাজিন বের হতো। ওটার একটা পর্ব ছিলো গণিত সংখ্যা। বেশ ঢাউস আকারের। সংখ্যাটা হাতে না থাকায় বলতে পারছিনা ওখানে গণিত ও কবিতা নিয়ে কেমন লেখা হয়েছিলো। আমার জানা মতে পশ্চিম বাংলা থেকে এরকম কিছু….