হিন্দু বর্ণবাদের অভিশাপ মোচনে জনহিতকর কর্মে রাজচন্দ্র-রাসমণি

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মোগল শাসনামলে দেশীয় সামন্ত-জমিদারদের নিয়োগের একচ্ছত্র এখতিয়ার ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অনুগত-আজ্ঞাবহ নবাব, রাজা, মহারাজাদের। জমিদারেরা ছিল কেবল মাত্র খাজনা সংগ্রাহক। ভূমির অধিকার ছিল কৃষকের। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গদেশে শোষণ-লুণ্ঠনের অবাধ ক্ষেত্র গড়ে তোলে। কোম্পানির নানাবিধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীদার হয়ে স্থানীয় কতিপয় ইংরেজ অনুগত মুৎসুদ্দি-বেনিয়া চক্র রাতারাতি অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলে। এই মুৎসুদ্দিদের তালিকা খুব ছোট নয়। প্রায় সবাই ব্রাহ্মণ-কায়স্থ বর্ণেরই ছিলেন, নিম্নবর্ণের সংখ্যা নগণ্য। যেমন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন নয়, রাজা কালীকৃষ্ণ ঠাকুর, রাজা রাধাকান্ত দেব, দেওয়ান গঙ্গাগবিন্দ সিংহ, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, অক্র‚র দত্ত, মহারাজা সুখময় রায়, রাজা গোপীমোহন দেব, বেনিয়ান বারানসী ঘোষ, ব্যতিক্রম নমঃশূদ্র রাজচন্দ্রসহ প্রমুখ ভূঁইফোঁড় বিত্তবানদের কপাল খুলেছিল কোম্পানির মুৎসুদ্দি-ব্যবসায়ী রূপে। তেজারতি ব্যবসা, ঠিকাদারী, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, নানাবিধ ব্যবসায় দ্রুতই এরা হয়েছিল ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ। অঢেল নগদ অর্থের মালিক এসকল মুৎসুদ্দিরা সম্পদের পাহাড় যেমন গড়ে তুলেছিল তেমনি আয়াসে, বিলাসে, বল্গাহীন কুৎসিত আমোদ-প্রমোদে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল।

কোম্পানি প্রধান কর্নওয়ালিসের আমলে কৃষকদের জমির অধিকার হরণ করে আরোপ করা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। অঢেল নগদ অর্থের বদৌলতে ভুঁইফোঁড় মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ীরা জমিদারী ক্রয়ে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে। পূর্বেকার স্থানীয় জমিদারদের ক্ষমতা-অধিকার হস্তান্তরিত হয়ে বঙ্গদেশে নতুন অস্থানীয় জমিদারদের বৃত্ত গড়ে ওঠে। ইংরেজ অনুগত-আজ্ঞাবহ এসকল নব্য ধনীরা যেহেতু অস্থানীয় তাই তাদের জমিদারী দেখভালের জন্য নিয়োগ দেয়া হয় জমিদারের দেওয়ান, নায়েব, এস্টেট ম্যানেজার, গোমস্তা, পাইক, তহশীলদার, দফাদার। পাটোয়ারী, মণ্ডল, জমিদারের ভৃত্য প্রভৃতি। এছাড়াও জমিদারী শোষণের শোষণযন্ত্র রূপে নিয়োগ করা হয় ইহ্তিমামদার, ঠিকাদার, ইজারাদার, লাথেরাজদার, জায়গীদার, ঘাটোয়াল, আয়মাদার, মকরারীদার, তালুকদার। পত্তনিদার, মহলদার, জোতদার, গাঁতিদার, হাওলাদার নামধারী কৃষক-প্রজা শোষণকারীদের। এর ফলে মোগল আমলে বঙ্গদেশে ১৭৬৪-৬৫ সালে খাজনা আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা। ১৭৬৬ সালের কোম্পানির শাসনামলে সেটি দাঁড়ায় ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকায়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলনে খাজনা আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ২ লক্ষ টাকা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অর্থনৈতিক শোষণের জাঁতাকলে কৃষক-প্রজাদের ত্রাহি অবস্থা অপর দিকে মুৎসদ্দি চক্র অর্থাৎ নব্য জমিদারদের এবং কোম্পানির রাজস্ব প্রাপ্তির অবাধ সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। ঘৃণিত ব্যবস্থাটি যাতে নিষ্কণ্ঠক হয় সেই অভিপ্রায়ে ১৭৯৯ সালে কোম্পানি নতুন আইন প্রণয়ন করে। যে আইনে জমিদার সরকারি অনুমতি ছাড়াই প্রজাকে বন্দি করতে পারবে। জমিদার খাজনা আদায়ে প্রজার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে কিন্তু প্রজা আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে না। বকেয়া খাজনা আদায়ের জন্য বসতভিটা থেকে প্রজাকে জমিদার উৎখাত করতে পারবে। জমিদারগণ নিজ নিজ কাছারিতে প্রজাকে যখন-তখন ধরে বা ডেকে আনতে পারবে। জমিদারদের দ্বারা দৈহিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে নির্যাতিত কৃষক-প্রজারা ফৌজদারী মামলা করতে পারবে না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূলেই ছিল কৃষক-প্রজা শোষণের স্থায়ী ব্যবস্থা। পাশাপাশি জমিদার শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এবং সর্বাগ্রে কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণ-লুণ্ঠনকে নিরঙ্কুশ রাখা।
পূর্বেই বলেছি কোম্পানির বদান্যতায় মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ী এবং পরবর্তীতে জমিদারদের সিংহ ভাগই ছিল ব্রাহ্মণ-কায়স্থ অর্থাৎ উচ্চবর্ণের সম্ভ্রান্ত হিন্দুরা। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তেমন সুযোগও ছিল না। বঙ্গদেশের স্থানীয় জমিদারেরা ছিলেন ঠাকুর, দত্ত, দেব, সিংহ, মল্লিক, অঢ্য, শেঠ পদবির উচ্চবর্ণের অভিজাতেরা। ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের প্রবল দৌরাত্ম্যে তখন ছিল হিন্দুবর্ণবাদের স্বর্ণযুগ। মোগল কিংবা ইংরেজ শাসকেরা বর্ণবাদের নিষ্ঠুরতাকে কখনো ঘাঁটাতে সাহস করেনি, তাদের শাসন-শোষণ এবং লুণ্ঠনকে নিরাপদ রাখতে।

মাহিষ্য জাতভুক্ত নমঃশূদ্র হতদরিদ্র প্রীতিরাম ভাগ্যান্বষণে হাওড়ার খোশালপুর গ্রাম থেকে পদব্রজে কলকাতায় এলেন। সঙ্গে দুই ভাই রামতনু ও কালীপ্রসন্ন। কলকাতায় তাদের পিসির বাড়ি। পিসি বিন্দুবালার বিয়ে হয়েছে জানবাজারের মান্না পরিবারে। পিসেমশাই অক্র‚রচন্দ্র মান্না ডানকিন সাহেবের দেওয়ান। সাহেবদের সাথেও তার সুসম্পর্ক। সজ্জন পিসেমশাই তাদের তিনভাইকে নিজ পরিবারে আশ্রয় দিতে দ্বিধা করলেন না। প্রীতিরাম বুদ্ধিদীপ্ত বলেই দ্রুত শিখে নিলেন পিশেমশাইয়ের ব্যবসায়িক কাজ-কর্ম। অল্প বিস্তর ইংরেজিও রপ্ত করে নিলেন। পিসেমশাইর অনুরোধে ডানকান সাহেবের বেলেঘাটার লবণ কারখানায় মুহুরীর চাকরি জুটে গেল প্রীতিরামের। মাইনে কম কিন্তু কাজ বেশি। একাজে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না প্রীতিরাম। অন্যত্রে আরো ভালো চাকরির খোঁজ করছিলেন তলে তলে। আকস্মিক তার পরিচয় ঘটে যশোরের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে। ডানকান সাহেবের মুহুরীর চাকরি ছেড়ে ভালো চাকরি জুটিয়ে চলে এলেন ঢাকায়। তার চিন্তা ও মনোজগৎ জুড়ে কেবলই বিত্তবান হবার আকাক্সক্ষা। সেই অভিপ্রায়ে ঢাকার চাকরি ছেড়ে নাটোরের মহারাজার দেওয়ানের চাকরিতে যোগ দিলেন। দেওয়ানের চাকরিতে সৌভাগ্যের দ্বার খুলে গেল প্রীতিরামের। দু’হাতে আসছে টাকা। সে টাকা খরচ না করে সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণে। দেওয়ানের চাকরিতে বেশ অর্থ জমিয়ে চাকরি ত্যাগ করে ব্যবসায় নেমে পড়লেন। বলা বাহুল্য সাহেবদের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িয়ে উচ্চবর্ণের নব্য বিত্তবানদের ন্যায় তারও ভাগ্য দ্রুত বদলে গেল। ঊনিশ হাজার টাকার বিনিময়ে ক্রয় করলেন মকিমপুর তালুক। বেলেঘাটায় বাঁশের আড়ৎ খুললেন। হতদরিদ্র থেকে বিত্তবানের পথে পা দেয়া মাত্র নমঃশূদ্র পদবি ‘দাস’ পাল্টে ‘মাড়’ পদবি গ্রহণ করলেন। শ্রেণি উত্তোরণের ধারাবাহিকতায় দ্রুত অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যাওয়ায় পিসেমশাই অক্র‚রচন্দ্র মান্না নিজ কন্যাকে বিয়ে দিলেন প্রীতিরামের সঙ্গে। পণ হিসেবে জানবাজারে দিলেন ১৬ বিঘা জমি। সেখানেই তৈরি করলেন বিশাল প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা। দুইপুত্র-দুইকন্যার জনক হলেন প্রীতিরাম। পুত্রদ্বয় হরচন্দ্র ও রাজচন্দ্র। কন্যা দয়াময়ী ও বিশ্বময়ী। ব্যবসায় প্রীতিরামের ক্রমাগত উন্নতি ঘটছে। নিজে স্বশিক্ষিত হলেও সন্তানদের শিক্ষালাভে ত্রুটি করেননি। বড় ছেলে হরচন্দ্রের সঙ্গে হুগলি জেলার জানু দাসের কন্যা আনন্দময়ীর বিয়ে দিলেন। কিন্তু এ সংসার বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মাত্র একুশ বছর বয়সে হঠাৎ হরচন্দ্রের মৃত্যু হয়। বড় ছেলের মৃত্যুর পর প্রীতিরামের নিকট বংশ রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ হয়ে পড়ে ছোট ছেলে রাজচন্দ্র। রাজচন্দ্রের বিয়ে দিলেন কিন্তু এক বছরের মাথায় স্ত্রীর মৃত্যু হয়। বংশ রক্ষার তাগিদে আবারো বিয়ে দেন রামচন্দ্রকে কিন্তু সে বিয়েরও একবছর যেতে না যেতেই দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু হয়। প্রীতিরাম প্রায় দিশেহারা। তার অঢেল অর্থ-বিত্তের কি হবে যদি বংশ বৃদ্ধি না ঘটে। এই দুশ্চিন্তায় প্রীতিরামের মনে কোনো শান্তি নেই, স্বস্তি¡ও নেই।

কোম্পানির বদান্যতায় মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ী এবং পরবর্তীতে জমিদারদের সিংহ ভাগই ছিল ব্রাহ্মণ-কায়স্থ অর্থাৎ উচ্চবর্ণের সম্ভ্রান্ত হিন্দুরা। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের তেমন সুযোগও ছিল না। বঙ্গদেশের স্থানীয় জমিদারেরা ছিলেন ঠাকুর, দত্ত, দেব, সিংহ, মল্লিক, অঢ্য, শেঠ পদবির উচ্চবর্ণের অভিজাতেরা। ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের প্রবল দৌরাত্ম্যে তখন ছিল হিন্দুবর্ণবাদের স্বর্ণযুগ। মোগল কিংবা ইংরেজ শাসকেরা বর্ণবাদের নিষ্ঠুরতাকে কখনো ঘাঁটাতে সাহস করেনি, তাদের শাসন-শোষণ এবং লুণ্ঠনকে নিরাপদ রাখতে।

অতপর রাজচন্দ্র নিজে পাত্রী পছন্দ করলেন। অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতিতে রাজচন্দ্র তৃতীয় বিয়ে করলেন। পাত্রী অজ পাড়াগাঁও কোনা গ্রামের হতদরিদ্র কৈবত্য-হালিক বর্ণের হরেকৃষ্ণের কন্যা রাসমণি। দরিদ্র পরিবারের মাতৃহীন কন্যা রাসমণি বৌ হয়ে উঠে এলেন নমঃশূদ্র প্রীতিরামের জানবাজারের প্রাসাদে। এগারো বছরের রাসমণি একুশ বছরের রাজচন্দ্রের সংসারে এসে স্বীয় বুদ্ধিমত্তায়-বিচক্ষণতায় দ্রুতই সকলের মন জয় করে ফেলেন। ক্রমেই হয়ে ওঠেন সকলের রানিমা।

অর্থ, বিত্ত বৈভবে ঠাসা প্রীতিরাম নিম্নবর্ণের নমঃশূদ্র বিধায় কলকাতার উচ্চবর্ণের অভিজাতদের কাছে ব্রাত্যজন। উচ্চবর্ণের দাপটে ম্রিয়মান। ওদিকে ব্যবসায় মুনাফা তার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। জাহাজী ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করলেন। ইংরেজ কেলভিন কোম্পানির প্রতিনিধি হলেন পুত্র রাজচন্দ্র। রপ্তানি ব্যবসায় হাত দিলেন। তসর, মৃগনাভী, নীল প্রভৃতি রপ্তানি করে ইংল্যান্ডে। ব্রিটিশ কেলভিন কোম্পানির মাধ্যমে সে সকল পণ্য ইংল্যান্ডের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। রপ্তানি বাণিজ্যের পাশাপাশি স্টক-এক্সচেঞ্জের ব্যবসায় হাত দিলেন রাজচন্দ্র। নগদ অঢেল অর্থে কিনে ফেলেন বেলেঘাটা অঞ্চলটি। মজুদদারী ব্যবসায় ধান, পাট, চাল, গুড়, মুগ, মুসুর ডাল, তামা ইত্যাদি স্বল্প দামে কিনে অধিক দামে বিক্রিতে জলের মতো টাকা আসে। আজকের কলকাতার ধর্মতলা, ফ্রি স্কুল স্ট্রীট, নিউ মার্কেট, রাসমণি স্কোয়ার সহ পুরো অঞ্চলটি রাজচন্দ্র খরিদ করেছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহজে ভারত ত্যাগ করবে না। কলকাতায় তারা জাঁকিয়ে বসেছে। দূরদর্শী বৈষয়িক রাজচন্দ্র সেটা আঁচ করতে পেরে দ্রুত ময়দানের আশ-পাশের সমস্ত জমি খরিদ করে নিলেন। সাহেবদের পাড়ায়ও বাড়ি কিনতে শুরু করেন। দক্ষিণ কলকাতার সেরা জমিগুলো ক্রয়ের পর রাজচন্দ্র কলকাতার সবচেয়ে অধিক জমির মালিক হন। হন কলকাতার প্রধান জমিদার।

১৮০৪ সালে রাজচন্দ্রের বিয়ের দু’বছর পর জন্ম হয় কন্যা পদ্মমণির। ১৮১১-তে দ্বিতীয় কন্যা কুমারী, ১৮১৬ সালে তৃতীয় কন্যা করুণাময়ী, ১৮২৩ সালে চতুর্থ কন্যা জগদম্বার জন্ম। এক পুত্র জন্মের পরই মারা যায়। তাই পুত্র ভাগ্য ছিল না। চার কন্যার পিতা হিসেবেই অগত্যা সন্তুষ্ট থাকলেন। ১৮১৭ সালে রাজচন্দ্রের পিতা প্রীতিরামের মৃত্যু হয়। ওই বছরই মারা যান তার মা’ও। অঢেল অর্থের বদান্যতায় পিতা-মাতার শ্রাদ্ধ করলেন বিশাল আয়োজনে। ৭১ নং ফ্রি স্কুল স্ট্রীটের প্রাসাদতুল্য আবাসে পিতা-মাতাহীন রাজচন্দ্র স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে বসবাস করেন।

১৮১৩ সালে ছয় বিঘা জমির ওপর প্রীতিরামের শুরু করা প্রাসাদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করলেন রাজচন্দ্র। তিন শ’ কক্ষের এ প্রাসাদে ছয়টি উঠোন, একটি সরোবর। সাতটি মহল, ঠাকুরদালান, নাটমন্দির, দেওয়ানখানা, কাছারি ঘর, অতিথিশালা, গোশালা, অস্ত্রশালা, প্রহরী-দেওয়ানদের কক্ষ। পঁচিশ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হলো জানবাজারের প্রাসাদের লাগোয়া এই প্রাসাদটি।

এত ব্যাপক অর্থ-বিত্তের মালিক হবার পরও নিম্নবর্গের নমঃশূদ্র বিধায় রাজচন্দ্রের সামাজিক মর্যাদা লাভ সম্ভব হয়নি। পায়নি স্বীকৃতি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা। সমস্তই দখল করে নিয়েছিল উচ্চবর্ণের ঠাকুর, দত্ত, দেব, সিংহ, মল্লিক, আঢ্য, শেঠরা। নিম্নবর্ণের অনুপ্রবেশ ঘটাতে হবে ওই বনেদী উচ্চবর্ণদের পাশে। এই অভিপ্রায়ে রাজচন্দ্র মরিয়া হয়ে ওঠেন। উচ্চবর্ণের ধনীরা গঙ্গার ওপারে স্নানের ঘাট তৈরি করেছে। স্ত্রী রাসমণির পরামর্শে মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গঙ্গার এপারে ঘাট তৈরিতে নেমে পড়েন। কোম্পানির অনুমতি সংগ্রহ করে প্রথমে নদীর পাড় তৈরি করলেন। নির্মাণ করলেন ছত্রিশটি স্তম্ভ বিশিষ্ট ঘাট। স্তম্ভের উপর জুড়ে আচ্ছাদন। স্নানের জন্য নারী-পুরুষের পৃথক ব্যবস্থা। লর্ড বেন্টিঙ্ক-এর ঘোষণাপত্রে নাম দেয়া হলো ‘বাবু রামচন্দ্র দাসের ঘাট’। লোকমুখে আজও সেটি ‘বাবুঘাট’ নামে প্রচলিত।

কোম্পানির মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ী কাম নব্য জমিদারেরা যখন আয়াসে-বিলাসে, বাইজি-নর্তকী-গণিকা ইত্যাদি নিকৃষ্ট স্থ‚ল বিনোদনে মেতে ছিল, রাজচন্দ্র নিম্নবর্ণের নমঃশূদ্র হওয়ায় তাদের সঙ্গে যুক্ত হবার অধিকার পায়নি। তাদের কাছে ব্রাত্য রূপেই ছিল তার সামাজিক অবস্থান। রাজচন্দ্র নিজের সুনাম-মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনহিতকর-জনকল্যাণমূলক কর্ম সাধনে মনোনিবেশ করেন। বাবুঘাটের পর আহেরীটোলায় নির্মাণ করেন বিশাল স্নানঘাট। নিমতলা শ্মশানঘাটে মৃত্যু পথযাত্রী অন্তজর্লির রোগীদের জন্য নির্মাণ করেন নিজ জমিতে বিশাল পাকা বাড়ি। অন্তজর্লিদের জন্য ব্যবস্থা করা হয় থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসাব্যবস্থা। রোগীদের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য নিয়োগ করা হয় চিকিৎসকসহ পরিচারক-পরিচারিকা। রাজচন্দ্রের জনহিতকর এসকল সংবাদ দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদপত্রে ছাপা হয় রাজচন্দ্রের কীর্তি। ইন্ডিয়া গেজেটে নথিভুক্ত হয় রাজচন্দ্রের জনকল্যাণমূলক রাজকার্য।

রাজচন্দ্রের বেলেঘাটার সম্পত্তিতে নিকাশের ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজন খাল কেটে নিকাশের ব্যবস্থা করা। সর্বসাধারণের পারপারে সেতুও নেই। খাল কেটে সেতু নির্মাণ করে দিলেন রাজচন্দ্র। বেলেঘাটায় ব্রিটিশ কোম্পানির জায়গা না থাকায় তাদের অনুমতি নেবার প্রয়োজন পড়েনি। তবে রাজচন্দ্র সরকারকে শর্তারোপ করেন ব্রিজের জন্য সরকার সর্বসাধারণের থেকে কোনোরূপ টোল আদায় করতে পারবে না। সরকার শর্ত মানতে বাধ্য হয়।

কলকাতার জ্ঞানী-গুণীজনদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে ব্যাপক জনহিতকর কাজে হাত দিলেন রাজচন্দ্র। বিদ্যোৎসাহী মহলে নিজেকে যুক্ত করতে কলকাতার হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় রাজচন্দ্র অকাতরে অর্থ সাহায্য করলেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও অঢেল অর্থ দান করলেন।

এই সকল জনকল্যাণমূলক কাজে ক্রমেই রাজচন্দ্রের সুনাম সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়ে। বিলাসিতা, বেলেল্লাপনার বিপরীতে সর্বসাধারণের জন্য কল্যাণকর কাজে নিজেকে যুক্ত করে তখনকার উচ্চবর্ণের কোম্পানি মুৎসুদ্দি-ব্যবসায়ী ও জমিদারদের থেকে নিজের পরিচ্ছন্ন স্বাতন্ত্র্য ইমেজ দাঁড় করান রাজচন্দ্র। এতে তথাকথিত উচ্চবর্ণের অভিজাত হিন্দুদের নিকট নমঃশূদ্র রাজচন্দ্রের অবস্থান সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা কালীকৃষ্ণ ঠাকুর, রাজা রাধাকান্ত দেব, দেওয়ান গঙ্গাগবিন্দ সিংহ, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, অক্র‚র দত্ত প্রমুখের সমমর্যাদা লাভের পাশাপাশি তাদের কাতারে বসে গেল রাজচন্দ্রের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর উচ্চবর্ণের রাজা, মহারাজা, জমিদারদের সঙ্গে একত্রে স্বীকৃতি পেল মাহিষ্য বংশোদ্ভ‚ত নমঃশূদ্র রাজচন্দ্র। পেলেন সরকারি স্বীকৃতিও। তাকে ‘রায়’ উপাধিতে ভ‚ষিত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাঁকে অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট পদেও নিয়োগ দেয় কোম্পানি। রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা রোধে রাজচন্দ্রও যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৮২৯ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় প্রথম ব্যাংক। সে ব্যাংকেরও পরিচালক হলেন রাজচন্দ্র। রাজচন্দ্রের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়েছেন বাংলার বড়লাটও।

রাণী রাসমণির প্রতিমূর্তি, ধর্মতলা, কলকাতা। ছবি: উইকিপিডিয়া।

রাজচন্দ্র ও রাসমণির সংসারে চার কন্যা। পদ্মমণি, কুমারী, করুণাময়ী ও জগদম্বা। এক পুত্র ভ‚মিষ্ট হবার পরই মারা যায়। মেয়েদের বিয়েও হয় সমবর্ণে। কেননা অসমবর্ণের বিয়ে তখন ভাবাই যেতো না। ধর্মীয় পাপাচার হিসেবে সেটা গণ্য হতো। বড় মেয়ের বিয়ে হয় মাহিষ্যকুলীন রামচন্দ্র দাসের সঙ্গে। দ্বিতীয় কন্যার বিয়ে হয় খুলনা জেলা নিবাসী প্যারীমোহনের সঙ্গে। তৃতীয় কন্যা করুণাময়ীর হয় মথুরামোহনের সাথে। স্বল্পায়ু করুণাময়ীর মৃত্যুর পর তৃতীয় জামাতা মথুরামোহনের নিকট চতুর্থ কন্যা জগদম্বার বিয়ে দিয়ে পুত্রবৎ জামাইকে বাড়িতে রেখে দেন।

৯ জুন ১৮৩৬ সালে ভ্রমণকালে গাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজচন্দ্র মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও প্যারালাইজড হয়ে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

রাজচন্দ্রের মৃত্যুর পর পুত্র না থাকায় ব্যবসা-জমিদারির একক দায়িত্ব বর্তায় রানি রাসমণির ওপর। অত্যন্ত শক্ত হাতে, ধীর-স্থির, অধিক বুদ্ধিমত্তায় রাসমণি রাজকার্য সামাল দিয়ে স্বামীর অবর্তমানে জমিদারিতে নিজের দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। স্বামীর সিলমোহর পাল্টে নিজের নামে সিলমোহর তৈরি করে জমিদারিতে ক্রমেই পারঙ্গম হয়ে ওঠেন। জমিদারি কার্যে জামাতা মথুরামোহন সর্বদা তাঁকে সাহায্য করতেন।
ওদিকে উচ্চবর্ণের বিখ্যাত বিত্তশালী জমিদার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্রাতিরিক্ত বিলাসে-বেলেল্লাপনায় দেনার দায়ে প্রায় ডুবে গেছেন। তিনি ছিলেন তাঁরই নিঃসন্তান জ্যাঠামশাইয়ের দত্তক পুত্র। সে সুবাদে প্রচুর ধন-সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। আইন পড়েছেন। আইন ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। কোম্পানি কর্তৃক চব্বিশ পরগনার নিমক মহলের কালেক্টরের দেওয়ান নিযুক্ত হয়েছিলেন। কোম্পানির সঙ্গে নানা মুনাফা নির্ভর ব্যবসায় প্রচুর অর্থ রোজগারও করেছিলেন। খুলেছেন ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি। তৈরি করেছেন চিনিকল। আসাম চা কোম্পানি, নীলের অনেকগুলো কারখানারও মালিক ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। বঙ্গের বাইরে উড়িষ্যায়ও জমিদারি ছিল তাঁর। একদিকে অঢেল অর্থ উপার্জন করলেও অন্যদিকে দেশে-বিদেশে মাত্রাতিরিক্ত মদ-মাংসে, নতর্কী-পতিতাদের সংস্পর্শে টাকা উড়ে যেতে বিলম্ব ঘটে না। বেলগাছিয়ার বাগান বাড়িতে মদ ও নতর্কীর আসর বসতো প্রতি রাতে। সেখানে কোম্পানির সাহেব, মেম সাহেব, রাজা, মহারাজাদের আগমন ঘটতো। দ্বারকানাথের আমোদ-ফুর্তির সংবাদ সর্বত্রে রটে গিয়েছিল। তিনি রাজা রামমোহনের অনুগামী-সহযোগী ছিলেন বটে তবে বেলেল্লাপনার ছিলেন শিরোমণি। তাঁর স্ত্রী দিগম্বরী তাঁর এসকল অনৈতিক কর্মকাণ্ডে এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁর জীবদ্দশাতেই শ্রাদ্ধশান্তি পালন করে বেছে নিয়েছিলেন বিধবার জীবন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে পৃথক থাকতেন। দ্বারকানাথের পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘যখন এখানে গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড ছিলেন তখন আমাদের বেলগাছিয়ার বাগানে অসামান্য সমারোহে গভর্নর জেনারেলের ভগিনী মিস্ ইডেন প্রভৃতি অতি প্রধান প্রধান বিবি ও সাহেবদিগের এক ভোজ হয়। রূপে, গুণে, পদে, সৌন্দর্যে, নৃত্যে, মদ্যে, আলোকে বাগান একেবারে ইন্দ্রপুরী হইয়া গিয়াছিল।’ অতিমাত্রায় বেলেল্লাপনায় দ্বারকানাথের অর্থের সংকট দেখা দেয়। জমিদার দ্বারকানাথ নগদ অর্থের প্রয়োজনে চাকরি করতে মনস্থির করেন। তাঁর চোখ পড়ে জানবাজারের রাজবাড়ির দিকে। রাজচন্দ্র গত হয়েছেন। তাঁর বিধবা পত্নী রাসমণির নিশ্চয় দেওয়ান-ম্যানেজারের প্রয়োজন হবে। এই সুযোগে নগদ রোজগারের পথ খুলে যাবে। দেনার দায়ে জর্জরিত দ্বারকানাথের দেনা শোধের এরচেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর কোথায়! তাই তিনি জানবাজারের জমিদার বাড়ির নমঃশূত্র জেলেনি রানি রাসমণির দ্বারস্থ হন। চাকরির আশায় প্রস্তাব দেন। রাসমণি অবাক-বিস্মিত। পিরালী ব্রাহ্মণ পরে ধর্মত্যাগী ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম প্রধান কুশীলব তার কাছে এসেছে চাকরি নিতে। যথাযথ আপ্যায়নের পর রাসমণি তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন জানবাজারের জমিদার তাঁর কাছে পাওনা দুই লক্ষ টাকা। সুদ সমেত সেটা এখন আরো অধিক। বলা-বাহুল্য জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর রাসমণি জমিদারির সমস্ত কাগজপত্র, হিসাব-নিকাশ বুঝে নিয়েছিলেন। রাসমণি প্রিন্স দ্বারকানাথকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘এক অসম্ভব বেমানান প্রস্তাব দিয়েছিন আপনি। কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুরবাড়ির নামজাদা জমিদার জানবাজারের ম্যানেজার-এ হতে পারে না।’ দ্বারকানাথ ইতস্তত, অতঃপর বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। নিতান্ত নিরুপায়ে আপনার কাছে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।’ রাসমণির আশঙ্কা কোনো বদ-মতলব নেই তো! তাছাড়া অধমর্ণকে অধস্তন কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত করাটা যুক্তিসঙ্গত হবে না। অবশেষে দ্বারকানাথকে সাফ জানিয়ে দেন, “বাজারে আমাদের অনাদায়ী ঋণ অনেক। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আপনিও একজন। ম্যানেজারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি আপনি আমাদের জমিদারি থেকে দু’লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন। ফেরৎ দেবার ব্যবস্থা করলে আমাদের অত্যন্ত উপকার হয়।”

রাসমণির কথাগুলো দ্বারকানাথের গালে চপেটাঘাতের তুল্য ছিল। ভেবেছিল জমিদার রাজচন্দ্র প্রয়াত সেই ঋণের অর্থ আর পরিশোধ করতে হবে না। ওই অর্থের সুদাসলের পুরো হিসাব রাসমণি তুলে দেন দ্বারকানাথের নিকট। চাকরি চাইতে এসে এমন বিপদের মুখে পড়বেন ভাবতেও পারেননি দ্বারকানাথ। নিরুপায়ে শেষে ঋণের সুদাসলের সমস্ত অর্থের বিনিময়ে স্বরূপনগর পরগনাটি লিখে দেন রাসমণিকে। রংপুর ও দিনাজপুরের অন্তর্গত স্বরূপনগর। বার্ষিক খাজনা আদায় হয় ছত্রিশ হাজার টাকা। রাসমণি সম্মতি জানালে ক’দিনের মধ্যে দ্বারাকানাথ দলিলপত্র তৈরি করে রামমণির হাতে তুলে দেন। ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বললেও সেটা প্রকাশ না করে রাসমণিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দ্রুত কেটে পড়েছিলেন দ্বারকানাথ।

রাজচন্দ্র নেই এই সুযোগ হাতাতে অনেকেই তৎপর হয়ে ওঠে। নড়াইলের রামরতন রায় পাশের রাসমণির জগন্নাথপুর তালুকের গরিব প্রজাদের ওপর অত্যাচার করে তালুকটি দখলের ফন্দি এঁটেছিল। কিন্তু সংবাদ পাওয়া মাত্র রাসমণি জামাতা মথুরামোহনকে নির্দেশ দিলেন অবিলম্বে মহাবীর সর্দার ও তার বাহিনী নিয়ে রামরতন রায়কে শায়েস্তা করতে। মহাবীর সর্দার সেই অভিযানে নিহত হলেও রামরতন রায় প্রায় পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছিল।

নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের সীমা-পরিসীমা ছিল না। কৃষকেরা নীলকরদের অত্যাচারে জর্জরিত। মকিমপুর পরগনায় জোরপূর্বক কৃষকদের বাধ্য করা হয়েছে নীলচাষে। নীলকুঠিও তৈরি করেছে সেখানে। জোর করে নামমাত্র মূল্যে জমি ক্রয় করে চলেছে নীলকররা। জমি বিক্রিতে এবং নীলচাষে অনিচ্ছুক কৃষকদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে বর্বরোচিত অত্যাচার চালায় নীলকর সাহেবরা। নারীদেরও রেহাই দেয়নি। তাদের সম্ভ্রমহানি ঘটাতেও কালক্ষেপণ করেনি তারা। অসহায় কৃষকেরা কার কাছে সুবিচারের জন্য যাবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার। আদালত, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট সবই তাদের হাতের মুঠোয়। স্থানীয় সুবিধাভোগীদের দেওয়ান, গোমস্তা, ম্যানেজার, নায়েব ইত্যাদি পদে চাকরি দিয়ে নীলকরেরা চরম স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে উঠেছিল। রাসমণি এ সংবাদ পাওয়া মাত্র বাছাই করা পঞ্চাশজন লাঠিয়াল প্রেরণ করলেন মকিমপুরে। নির্দেশ দিলেন মকিমপুরের নায়েককে, এই লাঠিয়ালদের নিয়ে যেভাবেই হোক যেন উচ্ছেদ করা হয় নীলকরদের। মকিমপুরের নীলকুঠির প্রধান ডোনাল্ড সাহেব। তিনিও লাঠিয়াল নিয়োগ করে রাসমণির লেঠেলদের বিরুদ্ধে। দু’পক্ষের মারামারিতে মার খেলো ডোনাল্ড সাহেব ও তার লাঠিয়ালরা। আদালতে মামলা হলেও বিচারক মামলা খারিজ করে দেন। অবশেষে মকিমপুর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় নীলকরেরা।

রাসমণি বর্ণে কৈবত্য। গঙ্গা নদীতে জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে যুগ-যুগান্তর ধরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি করের বোঝা চাপালো মাছ আহরণকারী জেলেদের ওপর। নিরুপায়ে অসহায় জেলেরা শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু রাধাকান্ত দেব জেলেদের সাফ জানিয়ে দিলেন, সরকার বাহাদুরের বিরুদ্ধে তিনি যেতে পারবেন না। জেলেরা ছুটে গেল জানবাজারে রাসমণির কাছে। স্বগোত্রীয়দের এই দুঃসময়ে তিনি নিশ্চুপ থাকতে পারলেন না। জেলেদের অভয় দিয়ে বললেন তিনি দ্রুত ব্যবস্থা করবেন যাতে জেলেদের কর দিতে না হয়। রাসমণি দেওয়ানকে নির্দেশ দিলেন অবিলম্বে সরকারের কাছ থেকে গঙ্গার ইজারা নিতে। দেওয়ান যেন অর্থের পরোয়া না করে, সে নির্দেশও দিয়েছিলেন রাসমণি। দশহাজার টাকার বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে গঙ্গা নদীর মেটিয়াবুরুজ থেকে ঘুসুড়ি পর্যন্ত ইজারা নেয়া হয়। ইজারার বদৌলতে জেলেদের অবাধে মাছ ধরার আদেশ দেন রাসমণি। জেলেরা মহানন্দে গঙ্গায় মাছ আহরণে নেমে পড়ে।

সরকারকে শিক্ষা দেবার অভিপ্রায়ে রাসমণি ইজারা নেয়া গঙ্গা নদীর মেটিয়াবুরুজ হতে ঘুসুড়ি পর্যন্ত লোহার শিকল দিয়ে ঘিরে দেবার নির্দেশ দেয়। কোম্পানির সকল ব্যবসা জলপথেই। নদীতে শেকল দেবার কারণে কোম্পানির জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি সরকার রাসমণিকে লোহার শিকল তুলে নেবার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেন রাসমণি বলেন ইজারা নেয়া অঞ্চলের পূর্ণ অধিকার তার। জাহাজ চলাচলে জেলেদের মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটে তাই ওই শেকল খোলা যাবে না।

সরকার সমঝোতার প্রস্তাব দিলেন। পাশাপাশি ইজারার অর্থ ফেরৎ দিয়ে ইজারা বাতিলেরও অনুরোধ করেন। রাসমণি শর্ত জুড়ে দিলেন, দরিদ্র জেলেদের কাছ থেকে কোনোদিন কর নিতে পারবে না, এই শর্ত মানলেই খুলে দেয়া হবে গঙ্গার শৃঙ্খল-বন্ধনী। শর্ত মেনে দশ হাজার টাকা ফেরৎ দিয়ে কর-বিহীন মৎস্য শিকারের স্থায়ীব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয় কোম্পানি সরকার।

সরকারকে শিক্ষা দেবার অভিপ্রায়ে রাসমণি ইজারা নেয়া গঙ্গা নদীর মেটিয়াবুরুজ হতে ঘুসুড়ি পর্যন্ত লোহার শিকল দিয়ে ঘিরে দেবার নির্দেশ দেয়। কোম্পানির সকল ব্যবসা জলপথেই। নদীতে শেকল দেবার কারণে কোম্পানির জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি সরকার রাসমণিকে লোহার শিকল তুলে নেবার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেন রাসমণি বলেন ইজারা নেয়া অঞ্চলের পূর্ণ অধিকার তার। জাহাজ চলাচলে জেলেদের মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটে তাই ওই শেকল খোলা যাবে না।

রাসমণির ওপর কোম্পানি সরকার ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রতিশোধ নিতে দুর্গাপূজার মিছিলের ঢাক, ঢোল, কাঁসর, ঘণ্টাসহ বাদ্যবাজনার অভিযোগ তোলে, সাহেবদের ঘুমের ব্যাঘাতে। সাহেবরা ঘর থেকে বের হয়ে সমবেত ভাবে শব্দ বন্ধে কড়া ভাষায় হুমকি প্রদান করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সাহেবরা শেষে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে। বিষয়টি ধর্মীয় আবেগের বিষয় ভেবে পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি। সরকারও চায়নি ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করে কোনো অনভিপ্রেত অঘটনের জন্ম দিতে।

বিজয়া দশমীতে আবারো প্রবল বাদ্য-বাজনায় বিসর্জনের মিছিল জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত যাত্রা করে। বাজি-পটকার তীব্র শব্দে টালমাটাল অবস্থা। প্রশাসন এবার নড়ে ওঠে, রাসমণিকে শব্দদূষণ ও শান্তি ভঙ্গের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা আদায় করে।

এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে রাসমণি বিলম্ব করেনি। জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি ইজারা নেয়া এবং রাস্তাটি নির্মাণও করেছিলেন রাজচন্দ্র। ইজারার দলিল আদালতে দাখিল করে আদালতকে বিষয়টি অবগত করলেন। পাশাপাশি জানালেন আমার ইজারাকৃত রাস্তায় আমার লোকজন নাচবে, গাইবে, বাদ্য-বাজনা বাজাবে। সরকার জরিমানা করে বাধা প্রদান করেছে। সুতরাং এই রাস্তায় চলাচল করবে স্থানীয় সর্বসাধারণ। সাহেবদের জন্য এ রাস্তায় চলাচল নিষিদ্ধ। No Entry Board লাগিয়ে দেয়া হলো। সাহেবদের চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। রাস্তার দুই পাশে গরানকাঠের গুঁড়িসহ বিভিন্ন ভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে সাহেবদেরকে রাস্তায় আসার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

সরকার দিশেহারা। অবশেষে রাসমণিকে রাস্তার প্রতিবন্ধক তুলে সাহেবদের চলাচলের সুযোগ করে দেবার আর্জি জানানো হলে, রাসমণি দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন, ‘আমার রাস্তার ব্যাপারে কোনো হুকুমদারী চলবে না।’ তবে এক শর্তে রাস্তা খুলে দেয়া যেতে পারে। ফেরৎ দিতে হবে জরিমানার পঞ্চাশ টাকা এবং দুর্গাপূজায় ঢাক, ঢোল, কাঁসর, বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে ওই পথ দিয়েই শোভাযাত্রা যাবে, তাতে বাধা দেয়া যাবে না। সরকার তাৎক্ষণিক রাসমণির সমস্ত শর্ত মেনে স্বস্তির শ্বাস ফেলে।

১৮৫৭ ভারতের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রথম প্রত্যক্ষ মুক্তি সংগ্রাম। বিক্ষুব্ধ ভারতীয় সিপাইদের সম্মিলিত বিদ্রোহে সারা ভারতব্যাপী ইংরেজদের ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। শিখ ধর্মাবলম্বী সিপাইরা ছাড়া সকল ধর্মমতের ও ভাষার সিপাইরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে স্থানীয় জমিদার, মুৎসুদ্দিরা আতঙ্কে দিশেহারা। প্রচুর জমিদার অবস্থা বেগতিক দেখে জমিদারি, তালুক স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিল। রাসমণি সে সকল জমিদারি, তালুক অকাতরে খরিদ করতে থাকে। সঙ্গত কারণে রাসমণি সিপাই বিদ্রোহের সমর্থক ছিলেন না। পক্ষান্তরে ছিলেন কোম্পানি সরকারের প্রতি অনুগত। তিনি বুঝেছিলেন পরাক্রম ইংরেজদের পরাভ‚ত করা বিদ্রোহী সিপাইদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সে আত্মবিশ্বাসে কোম্পানির শেয়ার একচেটিয়া খরিদ করতে লাগলেন। বিদ্রোহ দমনের পর কোম্পানির শেয়ার, দলিল-দস্তাবেজ রাসমণির কব্জায়। স্বল্প মূল্যে যেগুলো কোম্পানি এবং অন্যরা রাসমণির নিকট বিক্রি করেছিল। সিপাই বিদ্রোহ রাসমণির ভাগ্যের চাকা আরো ব্যাপক ভাবে ঘুরিয়ে দিল। অর্থনৈতিক ভাবে রাসমণি লাভ করলেন অজস্র কোম্পানির ও ব্যক্তিগত শেয়ার, কাগজপত্র, ভ‚সম্পত্তি।

সিপাই বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজ সৈন্যরা বেপরোয়া আচরণ শুরু করে। যাকে খুশি ধরে, মারে, হত্যা করে। সৈন্যদের এই হীন অপকীর্তি থেকে রেহাই পায়নি রাসমণির জানবাজারের প্রাসাদটিও। তবে বিচক্ষণ-সাহসী রাসমণি বর্বর সেনাদের জব্দ করেছিলেন দুই ভাবে। ক্ষমা-ভিক্ষা এবং অর্থদণ্ড আদায়ে।

হতদরিদ্র পরিবারের রাসমণি জানবাজারের জমিদার বাড়িতে এসে হয়ে ওঠেন রানি, রানিমা। বিয়ের পর আর পিতৃগৃহে যাননি, কোনো সম্পর্কও রাখেননি। শ্রেণিগত অবস্থানের কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি। শ্রেণির টান যে কত দৃঢ় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে পিতৃকুল চরম অভিমানে রাসমণির সঙ্গে সম্পর্ক মোটামুটি ছিন্নই করেছিল। এরই মধ্যে পিতার মৃত্যু হয়। ৩৫ বছর পর ত্রিবেণী তীর্থ ফেরৎ রাসমণি এলেন পিতৃভ‚মি কোনা গাঁয়ে। পিতার মৃত্যুর পর ভাইয়েরা কে-কোথায় চলে গেছে সে সংবাদও তার জানা নেই। পিতৃভিটাটা কেবল রয়েছে। কোনো ঘর-দোর নেই। জমিদার স্বামী, শ্বশুর, কেউই চাননি সমবর্ণের হলেও সমশ্রেণির না হওয়ায় হতদরিদ্র পিতৃগৃহের সঙ্গে রাসমণি কোনো সম্পর্ক রাখুক। নিকট আত্মীয়তা, সমবর্ণের নৈকট্য শ্রেণি বিভাজনে দূরবর্তী করে দেয়। শ্রেণির প্রশ্নটি যে কত অনিবার্য, সেটা উপেক্ষা করার সাধ্য কার! কোনা গাঁয়ে দ্রুত রাসমণির জন্য আবাস নির্মাণ করা হয়। মাত্র তিন দিন পৈতৃক কোনা গাঁয়ে বিয়ের পর এই একবারই অবস্থান করেছিলেন। তারপর ফিরে গেছেন জানবাজারে রানি রাসমণি।

রাসমণির পরামর্শেই জনহিতকর কাজে হাত দিয়েছিলেন রাজচন্দ্র। রাসমণিও স্বামীর মৃত্যুর পর সেই কাজের পাশাপাশি হিন্দু সমাজে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে ধর্মচর্চায় নিজেকে অধিক মনোনিবেশ করেন। কলকাতার কাছেই দক্ষিণেশ্বরে নির্মাণ করেন ভবতারিণী মন্দির। নমঃশূদ্র রাসমণির মন্দির নির্মাণ করা নিয়ে কম কাণ্ড ঘটেনি। রাজকুমার এবং তার অনুজ গদাধর (রামকৃষ্ণ পরমাংস দেব) মন্দির নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়ক রূপে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভবতারিণী মন্দিরে প্রথম পূজা দিতে কলকাতার একজন ব্রাহ্মণও আসতে রাজি হয়নি। জেলেনি-রাসমণির করা মন্দিরে পূজা করে জাত হারাতে হবে, এই ভয়ে।

ব্রাহ্মণ্যবাদী তৎপরতা তখন ছিল তুঙ্গে। রাজচন্দ্র কিংবা রাসমণি নমঃশূদ্র, এত বিত্ত-বৈভবের পরও সামাজিক স্বীকৃতি বঞ্চিত ছিলেন ওই জাত-বৈষম্যে। ভবতারিণী মন্দিরটিকে দেবোত্তর ট্রাস্টে দান করতে চেয়েছিলেন রাসমণি। কিন্তু উত্তরাধিকারী বড় মেয়ে পদ্মমণি বাধ সাধলেন। দানপত্রে স্বাক্ষর দিলেন না। ছোট মেয়ে জগদম্বা কিন্তু দানপত্রে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। রাসমণিও মৃত্যুর পূর্বদিনে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে দানপত্রে স্বাক্ষর করেন। রাসমণির মৃত্যুর পরে জমিদার রাজচন্দ্রের সম্পত্তি নিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রবল কলহের সৃষ্টি হয়। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে পরিবারটি। উত্তরাধিকারীরা পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়।

যে গদাধর (রামকৃষ্ণ পরমাংস দেব) দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেছিলেন পরবর্তীতে তার প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

রামকৃষ্ণের পেছনের কাহিনীটি এরকমের। রানি রাসমণি ষাট বিঘা সম্পত্তি সহ গঙ্গা নদীর তীরে দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার সমূদয় অর্থ প্রদান করেছিলেন। মন্দির নির্মাণ সমাপ্তির পর মন্দিরে প্রারম্ভিক পূজা অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতা থেকে ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানানো হলে ব্রাহ্মণরা একজোটে রাসমণির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের অভিযোগ, জেলেনির অর্থে নির্মিত মন্দিরে পূজায় অংশ নিলে তাদের জাত-ধর্ম কোনোটিই রক্ষা পাবে না। তাদের পক্ষে নিম্নবর্ণের জেলে সম্প্রদায়ের রানি রাসমণির অর্থে নির্মিত মন্দিরের পূজায় অংশ নেয়া সম্ভব নয়। বহু চেষ্টা করেও ব্রাহ্মণদের রাজি করানো যায় নি। এমতাবস্থায় গদাধরের অগ্রজ রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে বহু কষ্টে রাজি করিয়ে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের উদ্বোধনী পূজা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছিল। রানী রাসমণির অনুরোধে গদাধর চট্টোপাধ্যায় (রামকৃষ্ণ পরমাংস দেব) ওই মন্দিরের স্থায়ী পূজারীরূপে যুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে রামকৃষ্ণের শিষ্য বিবেকানন্দ গঙ্গার এপারের কালী মন্দিরটির অপর পাড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেলুর মঠ। গঙ্গা নদীর দু’পাড়ের এই মঠ ও মন্দির আজও রয়েছে।

রামকৃষ্ণ সম্পর্কে প্রচলিত আছে তিনি বলেছেন, সব ধর্মের আরাধনাতেই ঈশ্বরপ্রাপ্তি লাভ সম্ভব। এক্ষেত্রে তাঁর কথায় অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ মেলে। অথচ এই রামকৃষ্ণই শেষ পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের দেবী মূর্তির নিকট হাত জোড় করে বলেছেন, ‘মা কালী, তুই জেলেনির অন্নপাপের পাপাচারে নিযুক্ত করলি। ভাগবানের নিকট কিসের প্রায়শ্চিত্তে আমার পাপ মোচন হবে জানি না। জেলেনির অন্ন গ্রহণের অপরাধে আমাকে নিশ্চয় চরম শাস্তি ও প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। মা কালী, তুই আমায় রক্ষা করিস মা।’

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

আরো পড়তে পারেন

রক মিউজিকঃ অতিকায় হস্তী কি সততই লোপ পাইয়াছে?

এক. শোর উঠেছে রক মিউজিক নাকি বিলুপ্ত হবার পথে। গত শতকের নব্বই দশকের পর থেকেই রক মিউজিকের উন্মাদনা পড়তির দিকে। তার নানান কারণও অবশ্য রয়েছে। মূল কারণ সম্ভবত কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বিপ্লব ঘটে যাওয়া। কেননা এই দু’টি বিষয় আসলে মানুষের বিনোদিত হবার ধরণকেই পাল্টে দিয়েছে। অবশ্য রক মিউজিকের এই ক্ষয়ের পেছনে তার….

প্রথম ধাক্কা

(একটি কাল্পনিক বিতর্ক। যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : দেকার্ত (Rene Descartes, ১৫৯৬-১৬৫০): ফরাসি দার্শনিক, বিজ্ঞানী, এবং গণিতবিদ। আল হেথাম (Ibn al-Haytham, ৯৬৫-১০৪০): গণিতবিদ, দার্শনিক, জ্যোর্তিবিদ। সে আমলের প্রখ্যাত মুসলিম পন্ডিত। তাঁর লেখা বইগুলো ইউরোপিয়ান দার্শনিকদের উপরে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিলো। গ্যালিলিও (Galileo Galilei, ১৫৬৪-১৬৪২): ইতালির বিজ্ঞানী এবং জ্যোতিবিজ্ঞানী। তিনি প্রথম দূরবীন দিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান….

প্লেগের প্রকৃত জার্নাল

The Guardian পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে (১৯শে মে ২০২০) “Beyond Daniel Defoe: the real journals of the plague year” শিরোনামে Sam Jordison-এর প্রকাশিত প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখাটি তৈরি করেছেন কায়সার আহমদ ড্যানিয়েল ডিফোর ‘A Journal of the Plague Year’ পড়ে যদি আপনার মনে হয় যে যারা ১৬৬৫-১৬৬৬ সালের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী তাদের কাছ থেকে আপনি আরো বেশী কিছু….