কৌস্তুভ শ্রীর একগুচ্ছ কবিতা

কৌস্তুভ শ্রী

আমার মা আমার অবাক শিশু

আমার মাকে আমি বলি অবাক শিশু। ‘সোফির জগত’ এর জ্ঞানী বড়দের মতো নয় সে, যারা পৃথিবীটাকে একটা অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে। আমার মা এক অবাক শিশু। পৃথিবীর সবকিছুতে তার অপার বিস্ময়।

ফল কাটতে গিয়ে তার রঙ, ঠিক তখন মরিচ খেতে আসা টিয়াপাখির ঠোঁট, আর একটা খোঁড়া কাকের জীবনযুদ্ধ, সব কিছু সে শিশুর চোখ নিয়ে দেখে অবাক হয়ে৷ আমার তখন নিজেকে তার মা মনে হয়। কারণ আমার চোখ এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবে! অথচ আমার ৫৫ বছর বয়সী মা, এখনো পৃথিবীকে প্রথমবারের মতো দেখে!

মেঘ থেকে বৃষ্টি, আর আকাশ থেকে আলো, মাটি থেকে গাছ, আর পানি থেকে রাজহাঁস, সবকিছুকে তার অবিশ্বাস্য লাগে। আর আমি, হেসে ফেলি। ভাবি, আমার চোখ এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবে! অথচ আমার মা এখনো পৃথিবীকে প্রথমবারের মতো দেখে।

মটরশুঁটির খোলস থেকে টপটপ করে দানা বেরিয়ে আসে, শুকনো চায়ের পাতা থেকে রঙ ছড়ায়, সারারাত ধরে ফুল ফোটে, নাইট কুইন। আমার মা আমাকে দেখায়। আর আমি, পৃথিবীতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি কবে! আমার মা এখনো দেখে, এখনো শোনে, এখনো ছোঁয়। পৃথিবীকে। প্রথমবারের মতো।

আমি শুধু তাকেই দেখি। এক রাত পানি না পাওয়া গাছেদের অভিযোগ শোনে সে। পাখিদের জন্য ভাত বসিয়ে যখন আমার কাছে আসে, আমি শুধু তাকেই শুনি। খেলার মতো আমাদের চারপাশের দেয়াল ঠেলে যখন ছুঁতে চায়, আমি শুধু তাকেই ছুঁই, প্রথমবারের মতো। নাম দেই তার, আমার মা আমার অবাক শিশু।

 

মরণোত্তর দেহদান

চোখগুলো খুলে রেখো। দেখো কত কিছু দেখেছে এ চোখ। সকাল থেকে দুপুর। দুপুর থেকে রাত অব্দি হলুদ কমলা কালো।
হাতের আঙুল সামনে সাজিয়ে ছুঁয়ে দেখো কতকিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছে এসব। বুকের ওম। পোষা প্রাণীর মতো আদরের যা কিছু। গন্ধ পাবে।
পা থেকে মেপে নিয়ো কত ক্রোশ হেঁটে হেঁটে মৃত্যুর সাথে দেখা হলো।
মরণোত্তর দেহদান করে যাব। সাথে নেব না কিছুই। আমার সকল মুদ্রাদোষ তোমরা যারা মনে রাখোনি, রেখে যাব তাদেরও একা করে।
আমাকে যারা ডাকোনি অনেকদিন, ভালনাম লিখে রেখো পাথরের ফলকে। আমার সকল ডাকনাম ভুলে যেও।।

 

এসো

জলের মতো সহজ মানুষ যারা এসেছিল, জলের মতোই মুঠো থেকে হারিয়ে গেছে।
ছবির মতো। মরে গেছে। দিয়ে গেছে ফুল। ফুলের মতো কবর। তা থেকে তাদের মতো গন্ধ আসে। শোকের মাতমে ফেটে যায় মাটি। একান্তে কাঁদলে আবার জুড়ে যায়।
তা থেকে কবরের মতো গাছ ওঠে। প্রাণের মতো পাখিরা আসে। যায়।
ব্যথার মতো গান গায়। এইসব ব্যথা কোথায় গিয়ে জমা হয় তা দেখতে একদিন বেরিয়ে যাব। এসো।

 

জরুরি খবর

বইয়ের খাঁজে রেখে দেয়া ফুলের মতো
ছবিতে ভাঁজ করে রেখে দিয়ে এসেছি নিজেকে।
আমার কোন গন্ধ নেই আর কোথাও।

ধরে রাখা সময় থেকে ঝরে যাওয়া গন্ধ আসে।
জীবন থেকে গন্ধ আসে মৃত্যুর।
আর আমার গায়ে মেখে থাকে
জঠরের জলের গন্ধ।

আমি ভাবি, আমার জন্য জরুরি কী ছিল?
শহরের পেট্রোল পাম্পের মতো
রাত জেগে জেগে ফুরিয়ে গেছে জীবন।
যাপনের ছবি থেকে নিজেকে তুলে নিয়ে
আমিও ফিরে গেছি। আমার জন্য তবে জরুরি কী ছিল?

আমার জন্য জরুরি ছিল জানা
যে, আমার জন্য জরুরি কিছুই ছিল না।।

 

তুমি

একটা অবধারিত স্মৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি। চারদিক থেকে ধূপের গন্ধ আর হলুদ অন্ধকার আমাদের নাকে এসে ঠিকরে পড়ে। দেয়ালে ঠেস দেয়া এক হাতের আয়োজনে যেটুকু খালি জায়গা বুকের কাছে, সেটুকুর মধ্যে ঢুকে পড়লে কতটা তীক্ষ্ম আর্তনাদ অবধারিত হতে পারে, সেই ভয়ে কেউ কাওকে ছুঁয়ে দেখি না।
আমাদের কথা আমাদেরই কাছে এসে ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়ে। আমাদের কথা আমাদেরই সামনে অতীত হয়ে পড়ে। আর সেই ভারে একে অপরের দিকে আমরা ঝুঁকে পড়ি। একটা অবধারিত স্মৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি।

আরো পড়তে পারেন

কামরুল আলম সিদ্দিকীর একগুচ্ছ কবিতা

তোমার জন্য রাখছি তুলে . তোমার জন্য রাখছি তুলে আমার চোখের রক্ততারা ফুল। হয় যদিবা দেখা আমার, রেখো তোমার, বুকের ফোটা দু’কূল। তোমার সাথে দেখা হলেই বৃষ্টি হতো অমন খরার দিনে… মেঘেরা সব আসতো ফিরে, আসতো ফিরে উজান ঠেলে মীনে। আগুন ফুটে ফাগুন হতো, দোঁআশ দেশে বাণ ডাকতো জলে। দোঁআশ ফুলের মেয়ে তুমি, তোমায় দেখে….

মুহম্মদ ইমদাদ-এর তিনটি কবিতা

অতীত বহু বছর ধরে আমরা আমাদের অতীতের পাশ দিয়ে আসা যাওয়া করি। কিন্তু একটাও কথা বলি না অতীত আমাদের দুশমন ছিল নাকি? মনে হয় ছিল। না হলে কীভাবে কীভাবে সে অল্প দামে কিনে নিয়েছিল জীবনের প্রথম হাতঘড়ি লাল ওয়াকম্যান মানিব্যাগ চিঠি?   আমিই আমার নৌকা, আমিই আমার মাঝি জন্ম উত্তাল, রাগী, বিপদসংকুল এক সমুদ্রে। জন্মমাত্র….

ফয়সল নোই’র একগুচ্ছ কবিতা

এক বর্ষা সন্ধ্যায় আজিজ মার্কেটের ঘটনা বারান্দা ছেড়ে ছোট্ট নর্দমা সৌখিন এক লাফে পার হয়ে শেষ-মেশ একটি রিকশা পেয়ে গেল মেয়েটি; আঁধার বৃষ্টির সন্ধ্যা মাঝ পথে ক’ফোটা বৃষ্টি ধন্য হলো তাকে ছুঁতে পেরে ! … পিছে ভুত-চোখে চেয়ে আছে মুগ্ধ আজিজ মার্কেট দোকানের বইগুলো সুখে আছে আজ, জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে র্যাকে। ঝড়-বর্ষার রাত, শাহবাগে….