নদীজলে মাছশিকার ও পতঙ্গ-মিথুনের অলোকচিত্র

মঈনুস সুলতান

শ্যানানডোয়া নদীটির বাঁকানো রেখাকে নিশানা করে অনেকক্ষণ হলো হাইক করছি। রূপালি জলের বঙ্কিম অবয়ব ছোট ছোট হতে হতে এমন আকার ধারন করেছে যে- স্রোতের এ স্বচ্ছ সলীলা শরীরকে এখন অস্ট্রেলিয়ার আদীবাসীদের হাতিয়ার বুমেরাং এর মতো দেখাচ্ছে। আজকের হাইকে কেন জানি খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তাই দ্রুত বেগে হাঁটি। কোন দিকে যাচ্ছি ঠিক বুঝতে পারি না। আবার ট্রেইলের মানচিত্রওয়ালা বই-পুস্তক ঘাঁটতেও ইচ্ছা হয় না। ঘন্টা দুয়েক জোর কদমে হেঁটে আমি বেশ খানিকটা উঁচু এলিবেশনে এসেছি, তাই পথ চলাতে পরিশ্রম হচ্ছে বিস্তর। সাথে সলিড খাবার-দাবার তেমন কিছু নেই, এ কারণে ক্ষুধা পাচ্ছে বারবার।

আমার দৃষ্টিপথ থেকে শ্যানানডোয়া নদীটির রূপালি রেখাও হারিয়ে গেছে কিছুক্ষণ হলো। স্পষ্টত আমি ডেব্রা ও নাথানিয়েল দম্পতির ক্যাম্পসাইট থেকে দূরে সরে এসেছি। আড়াই দিন আগে এ দম্পতির নদীতীরের ক্যাম্পসাইটে আমি মেহমান হিসাবে দুই রাত্রি কাটিয়েছি। নাথানিয়েল ভুগছেন মারাত্মক রকমের ক্যান্সারে। ডাক্তার তাকে ছয় মাসের মেয়াদ বেঁধে দিলে তার স্ত্রী ডেব্রা তাকে নিয়ে এসে তাদের প্রিয় নদী শ্যানানডোয়ার কুলে নিবিড় বনানীতে ক্যাম্প করে বসবাস করতে শুরু করেন। অরণ্যের সিগ্ধ ছায়ায় একটি ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে নাথানিয়েল শ্যানানডোয়া নদীর বহতা স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। ডাক্তারের কাছ থেকে ছয় মাসের মেয়াদ পেয়ে তিনি ঘর ছেড়ে ক্যাম্পসাইটেবাস করছেন। তারপর কেটে গেছে সাড়ে সাত মাসের মতো। স্ত্রী ডেব্রা সাথেই আছেন। স্বামীর পরলোকপ্রাপ্তি ঘটলে নদীজলে দেহভষ্ম ভাসিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন। দুই রাত্রি কাটিয়ে আমেরিকার বিচিত্র এ দম্পতির নিসর্গ-ছোঁয়া কম্পেনিতে অভ্যস্থ হয়ে ওঠছিলাম। তাদের সাথে আরো দিন কয়েক কাটালে নাথানিয়েলের শারিরিক দুর্যোগে হয়তো আমি ডেব্রাকে সহায়তা করতে পারতাম। মনে হয়, এ যুগলের যাপিত জীবনের কাছাকাছি এসেও স্বেচ্ছায় সরে আসলাম। কিন্তু আমি তো হাইকার, অজানা পথে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে চলে যাওয়াই আমার নিয়তি। কাউকে সঙ্গ দেয়া বা কোন সংকটে সহায়তা দান আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত না।

ট্রেইলে পতঙ্গের ছবি তোলা হাইকার। 

ব্যাকপ্যাকে শুকনো খাবার ও তাঁবু নিয়ে আমি সপ্তাহ তিনেক আগে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের শ্যানানডোয়া ন্যাশনেল পার্কে যাত্রা শুরু করি। শ্যানানডোয়া নদীর জলরেখাকে ল্যান্ডমার্ক ধরে হাইক করতে করতে অবশেষে নিবিড় অরণ্যানী চষে চলে আসি ব্লুরীজ মাউন্টেনের পশ্চিম পাশে। সপ্তাহ খানেক পথ চলার পর আমার ফুড সাপ্লাইয়ে তঙ্গি পড়ে। কিন্তু তখনো হাইকিং ট্রেইলে পথ চলতে গিয়ে দেখা হচ্ছিলো অন্যান্য হাইকারদের সাথে। আমি ব্যাকপ্যাকে করে কিছু পণ্য ক্যারি করছি। তো অন্যান্য হাইকারদের সাথে আমি এ সব পণ্য বার্টার পদ্ধতিতে বিনিময় করে খাবারের সংকুলান করছিলাম। কিন্তু ব্লুরীজ পাহাড়ের কাছে এসে হাইকিং ট্রেইল নির্জন হয়ে পড়ে। সলিড কোন খাবার প্রায় না খেয়ে, খানিকটা চিনাবাদাম ও চকোলেটের ওপর ভরসা করে আমি দিন দুয়েক হেঁটে অবশেষে এসে পৌঁছি শ্যানানডোয়ার কুলে। ওখানে নাথানিয়েল ও ডেব্রা দম্পতির সান্নিধ্যে দিন দুই কাটাই, আহারাদিও জেটে মন্দ না। তারপর আবার তাদেরকে গুডবাই বলে হাইকিং ট্রেইল হিট্ করলাম। খাবারের নিদারুণ সংকটও পথচলাতে ছায়ার মতো আমার সঙ্গী হলো।

হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা তীব্র হলে ব্যাকপ্যাকের জিপার খুলে খুঁজি- খাবার কিছু পাওয়া যায় কিনা। তিনটি হার্সসির চকোলেট বারের সন্ধান পাই। এগুলো নাথানিয়েল ও ডেব্রা দম্পতির কাছ থেকে সৌজন্য হিসাবে পাওয়া। তীব্র ক্ষুধার মুখে চকোলেট চুষতে ইচ্ছা হয় না। বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেই তাদের চমৎকার সান্নিধ্য তীব্রভাবে মনে পড়ে। এ  দম্পতির জীবন সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তা যেন একটি উপন্যাসের খানিক ছেড়ে ছেড়ে মাঝখান থেকে পড়া কয়েকটি পৃষ্টা। কী এমন ক্ষতি হতো যদি সারা নভেলখানা ধর্য্য ধরে মনযোগ দিয়ে পড়ে ফেলতে পারলে?

স্পষ্টত আমি ডেব্রা ও নাথানিয়েল দম্পতির ক্যাম্পসাইট থেকে দূরে সরে এসেছি। আড়াই দিন আগে এ দম্পতির নদীতীরের ক্যাম্পসাইটে আমি মেহমান হিসাবে দুই রাত্রি কাটিয়েছি। নাথানিয়েল ভুগছেন মারাত্মক রকমের ক্যান্সারে। ডাক্তার তাকে ছয় মাসের মেয়াদ বেঁধে দিলে তার স্ত্রী ডেব্রা তাকে নিয়ে এসে তাদের প্রিয় নদী শ্যানানডোয়ার কুলে নিবিড় বনানীতে ক্যাম্প করে বসবাস করতে শুরু করেন। অরণ্যের সিগ্ধ ছায়ায় একটি ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে নাথানিয়েল শ্যানানডোয়া নদীর বহতা স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। ডাক্তারের কাছ থেকে ছয় মাসের মেয়াদ পেয়ে তিনি ঘর ছেড়ে ক্যাম্পসাইটেবাস করছেন। তারপর কেটে গেছে সাড়ে সাত মাসের মতো। স্ত্রী ডেব্রা সাথেই আছেন। স্বামীর পরলোকপ্রাপ্তি ঘটলে নদীজলে দেহভষ্ম ভাসিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন।

ক্রমশ ভোঁতা হয়ে আসা ক্ষুধার অনুভূতির ভেতর আমার চলার পথ ভরে উঠে লালচে হলুদ সব বর্ণাঢ্য ঝরা পাতায়। ট্রেইলে এবার আরেক জন হাইকারের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে একটু ভরসা পাই। এ মানুষটির সাথে আমার দেখা হয়েছিলো তিন দিন আগে ক্যাম্পসাইটের ডকে। তিনি শ্যানানডোয়ার জলে রাবারের ডিঙ্গি ভাসিয়ে ক্যামেরা তাক করে ধরেছিলেন।সামান্য হাই-হ্যালোতে জানতে পেরেছিলাম যে, ইনি গোধূলির আলোয় জলের সারফেসে ভেসে ওঠা মাছের পতঙ্গ ধরে খাওয়ার ছবি তুলছেন। তাকে দেখতে পেয়ে আমি বাঁক নিয়ে ঘুরে তার দিকে এগিয়ে যাই। কাঁচাপাকা চুলদাড়িওয়ালা মাঝ-বয়সি এ মানুষটি মাটিতে হাঁটু গেড়ে ঝরাপাতার উপর বসে থাকা কোন কীটের ছবি তুলছেন। জানতে চাই,‘হেই, ইউ গট সামথিং ইন্টারেস্টিং টু পিকচার আবাউট?’ তিনি না তাকিয়ে জবাব দেন,‘ ও ইয়েস, কাম ক্লোজ এন্ড টেইক অ্যা লুক অ্যাট দি ইনসেক্ট,’ বলে তিনি মাথা তুলে আমাকে ইনভাইট করেন। আমি কাছে গিয়ে দেখি, তিনি বিশেষ লেন্স লাগিয়ে এক জোড়া হোবারফ্লাইয়ের মিথুন করার ছবি তুলছেন। আমি কাছে যেতেই পতঙ্গ দুটি পরষ্পরের শরীরে প্রবিষ্টহওয়া হালত থেকে বিযুক্ত হয়ে সরসর করে সরে যেতে থাকে অন্য আরেকটি ঝরাপাতার আড়ালে। ছবি তোলা শেষ হতেই এ হাইকার উঠে দাঁড়িয়ে জাপানি কেতায় আমাকে বাও করে বলেন, ‘আর ইউ ইন্টারেস্টেড ইন ইনসেক্টস্ ?’ আমি কপট সম্মতিতে মাথা ঝাঁকালে তিনি প্রীত হয়ে ফের বলেন,‘তোমার কোন তাড়া না থাকলে আমার সাথে চলো, একটু খেয়াল করে তাকালে এদিকে পাওয়া যাবে জোড়ায় জোড়ায় মিথুনরত পতঙ্গ।’ আমি তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই, ‘আপনার স্পেশিয়ালটি কি পতঙ্গের ছবি তোলায়?’  তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে জবাব দেন, ‘শুধু ছবি তোলা নয়, আমি যে কাজ করতে চাচ্ছি তা আরো জটিল। আমি এ ছবিগুলো ব্যবহার করে প্রিন্ট বানাবো। তারপর জাপানি কাগজে ছাপ দিয়ে তৈরী করবো ছোট্ট ছোট্ট ভিউকার্ড।’ তিনি ফের হাঁটতে শুরু করলে আমি তার সাথে চলতে চলতেজানতে চাই,‘কার্ড বানানোর কাগজগুলো কি আপনি জাপান থেকে সরাসরি আমদানি করেন?’ মাথা হেলিয়ে জবাব দেন, ‘ও হেল নো, আমদানির কোন দরকার পড়ে না। আমার ফার্ম হাউসে আমি পেপার মালবেরীর চাষ করছি। এগুলোর বাকল জ্বাল দিয়ে তৈরী করবো তোসা ওয়াসিনামে এক ধরনের কাগজ। তোসা ওয়াসি কাগজ দিয়ে তৈরী করা ভিউকার্ড হয় খুবই দৃষ্টিনন্দন।’ আমার কৌতূহল চাগিয়ে ওঠে, ‘কাগজ তৈরীর এ ইন্টারেস্টিং কাজ আপনি শিখলেন কোথা থেকে?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘ওয়েল, কিছুদিন আগে আমি আমেরিকান নেভীতে কাজ করতাম। পনেরো বছর সার্ভিস করে মাত্র রিটায়ার করেছি। যে সাবমেরিনে আমি নিউক্লিয়ার রিয়েক্টারের তত্ত্বতালাবির কাজে পোস্টেড ছিলাম, তা বছরের বেশীর ভাগ সময়ই ডক করা থাকতো জাপানের ওকিনাওয়া আইল্যান্ডে।’ আমি এবার জানতে চাই, ‘তা সাবমেরিনের রিয়েক্টার মেরামতে তোসা ওয়াসি কাগজের কোন দরকার পড়ে কি?’ তিনি মাথাটি হেলিয়ে বলেন, ‘না, তা পড়ে না অবশ্য। তবে একবার ছুটি কাটাতে শিকোকু দ্বীপে বেড়াতে গেলে আমি তোসা ওয়াসি নামের কাগজ তৈরী কলাকৌশল শিখে নেই। জাপনি ভাষায় তোসা হচ্ছে কিংডমের প্রতিশব্দ। শিকোকু দ্বীপ হচ্ছে.. ইন অ্যা ট্রু সেন্স কিংডম অব পেপার। সব ধরনের কাগজ তৈরীর হেকমত আমি এখনো শিখে উঠতে পারিনি। ভিউকার্ড তৈরীর জন্য আমি যে কাগজ পরীক্ষামূলকভাবে তৈরী করেছি তাকে বলা হয় হোসোগামি। আদিকালে এ কাগজ কেবলমাত্র জাপানের সম্রাট ডেইগোর জন্য তৈরী করা হতো। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে,হোসোগামি কাগজে পতঙ্গ-মিথুনের ছাপ দিয়ে নিচে ক্যালিওগ্রাপ করে জুড়ে দেবো ধ্রুপদী ধারার এক একটি হাইকুর তিনটি ছোট্ট চরণ। হাউ ডু লাইক মাই আইডিয়া?’

মিথুনরত জোড়া হোবারফ্লাই।

আমি তার প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সবুজ পাতার উপর জড়িয়ে থাকা একটি শূয়াপোকার দিকে নির্দেশ করি। প্রজাপতি হয়ে উঠার দিন কয়েক বাকি আছে, এ ধরনের শোয়াপোকাটির নিচে পাতায় শুঁড় তুলে হাঁটছে লোহিতে কালো গোলাকার ফোঁটাওয়ালা মিল্কউইড বিটেল নামে আরেকটি পতঙ্গ। তিনি সাবধানে তার ছবি তুলতে তুলতে বলেন, ‘একই পাতায় এ পতঙ্গ দুটির কালার কনট্রাস্ট ছবিতে ভালো আসবে। তবে এ ধরনের পতঙ্গের ছবি তোলার আমার কোন প্রয়োজন নেই। আমি খুঁজছি মিথুতরত কীট।’ এ ছবিতে অসুবিধা কি জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন, ‘লিসেন,আমি স্ট্রেইট টক করতে ভালোবাসি। এ ছবি দিয়ে প্রিন্ট বানানো যাবে, তবে আমার কালেকশনে যে হাইকুগুলো আছে তার সাথে তা ম্যাচ করবে না।’ আমি এবার প্রশ্ন না করে পারি না,‘শুধু মিথুনরত পতঙ্গের ছবি তোলা এত জরুরি কেন?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,‘দি রিজন ইজ পিওর কমার্শিয়াল। খুব লার্জ স্কেলে আমি ভিউকার্ড প্রডাকশন করছি না। মিলিটারি বা নেভীতে যারা জাপানে কাজ করেছে বা জাপ সংস্কৃতির সাথে যাদের আছে খানিক জানাশোনা,শুধু তারাই আমার কার্ডগুলো কিনবে। এদের অনেকেই শুনগানামে জাপানে পরিচিত উডব্লক প্রিন্টের ইরোটিক আর্টের কদরদানি করে থাকে। আমার কার্ডগুলোও হবে শুনগা ধারার। সিস্টেমেটিকেলী মার্কেট আমি স্টাডী করিনি। তবে আমার ধারনা, পতঙ্গের ইরোটিক এলিমেন্টের জন্য আমার কার্ডগুলোর চড়া দামে কাটতি হবে।’

আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি জংগলের স্যাঁতস্যাতে অঞ্চলে। এ দিকে ছড়ানো আছে কিছু বড়সড় ধূসর রক। তার একটির উপর বসে শুঁড় নাড়াচ্ছে বাদামি রঙের শামুখ। আমি তার দিকে ইশারা দিলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন,‘শুট, দিস ইজ অ্যা ড্যাম লোনলি স্নেইল। একদম একা একটি শামুকের ছবি তোলা কোন কাজের কথা নয়। লেটস্ লুক এন্ড ফাইন্ড এ কাপোল।’  শামুকের মিথুন সংক্রান্ত বিষয়-আশয়ে আমি তেমন একটা আগ্রহী না, তবে তার সাথে আলাপ জমানোর প্রয়োজন আছে। তার রাবার ডিঙ্গিতে যদি আমি লিফ্ট পাই, তাহলে যেতে পারবো শ্যানাডোয়ার ভাটিতে। বর্তমানে আমার অবস্থান জনপদ থেকে কম-সে-কম তিরিশ কিংবা পয়ত্রিশ মাইল দূরে অরণ্যের ভেতর মহলে। তবে শ্যানানডোয়ার ভাটিতে নেমে যেতে পারলে মাইল পাঁচেক হাঁটলেই পাওয়া যাবে আবাসিক এলাকা। তাই, খুব কৌতূহলি ভঙ্গিতে ভাব জমানোর প্রয়াসে জানতে চাই,‘পতঙ্গের বিষয়ে আপনার আগ্রহ হলো কিভাবে?’ জবাবে তিনি জানান,‘একবার ভেকেশনের সময় আমি পরপর অনেকগুলো সামুরাই যুগের জাপানি কেল্লায় ঘুরে বেড়াই। তাসুইমা নামক কেল্লার চার পাশের বনানীতে আমি জাপানি পর্যটকদের মিথুনরত পতঙ্গের ছবি তুলতে দেখি। পরে বেড়াতে যাই নাগোইয়া, হাইমেজি ও শিরো প্রভৃতি দুর্গে। ওখানেও দেখি জোড়ায় জোড়ায় কাপোল দুরবিন বাগিয়ে নীরবে পতঙ্গের সংগম প্রত্যক্ষ করছে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি যে- এ অবলোকনেরও নাকি আছে আফ্রোদিসিয়াক প্রভাব। বিষয়টি তখন থেকে মনে ধরেছিলো। নাউ আই অ্যাম ট্রায়িং ইট আউট।’

শোঁয়াপোকা ও মিল্কউইড বিটেল।

জোড়া শামুকের সন্ধানে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে আমি এবার মন্তব্য করি, ‘রিটায়ার করে মনে হয় আপনার হাতে প্রচুর সময়?’ তিনি কোন চিন্তাভাবনা না করে জবাব দেন,‘ ইয়েস, আই হ্যাভ অ্যা লট অব টাইম। হাতে হিউজ টাইম বুঝলে, করারও বিশেষ কিছু নেই, আবার একই সাথে আমার নেস্টটিও এম্পটি। নেভীতে জাপানে দু বছরের ট্যুর সেরে ঘরে ফিরে দেখি, এলাস্, আমার বিউটিফুল পার্টনার আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ আমি এবার সরাসরি প্রশ্ন না করে পারি না,‘ সে কি আপনাকে ডিভোর্স দিয়েছে?’ ব্যবসায়িক ভঙ্গিতে তিনি জবাব দেন,‘ না, কাগজপত্রে আমরা বিবাহিত ছিলাম না, সুতরাং ডিভোর্সের প্রয়োজন পড়েনি। তার সাথে আমার বেশ বছর কয়েকের সম্পর্ক, কিন্তু বুঝতে পারিনি সে যে.. শি ওয়াজ অল এলং অ্যা গে ওয়োম্যান।’ এবার আমার কৌতূহল চাপা দুষ্কর হয়,‘  হাউ ডু ইউ নো শি ইজ গে নাউ?’ তিনি নিরাসক্ত ভঙ্গিতে জবাব দেন,‘ তার সেক্সুয়েল ওরিয়েন্টশন যে গে তা জানার জন্য আমাকে খোঁজ খবর করতে হয়নি, সে নিজেই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়েছে- কোন নারী যদি সামাজিকভাবে নিজের গে পরিচিতি তুলে ধরতে লজ্জা পান, তাহলে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। সে তাদের সেক্সুয়েল সার্ভিস প্রভাইড করবে।’ আমার পরবর্তী প্রশ্ন হয়, ‘তার এ আচরণে আপনি কি খুব বিষ্মিত হয়েছেন?’ মাথাটি হেলিয়ে তিনি জবাব দেন, ‘খুব বেশী না, তবে.. আই মাস্ট সে অ্যা লিটল বিট্ সারপ্রাইজড দো! অ্যজ অ্যা ম্যাটার অব ফ্যাক্ট, ঠিক প্রফেশনালি না হলেও আগে সে কয়েকবার শৌখিনভাবে প্রসটিটিউশনে জড়িয়েছে। পয়সা উপার্জনের প্রয়োজন তার ছিলো না, আমার ধারনা ছিলো বেচারী একা, স্রেফ বোরডোম কাটানোর জন্য এসব করছে, বাট দিস গে বিজনেস, কামার্ত মহিলাদের সার্ভিস প্রদান করার ব্যাপারটি আমার কাছে একটু সারপ্রাইজই বটে।’

‘গ্রেইট, হেলস্ বেল, হিয়ার দে আর’, বলেএক্সাইটেড হয়ে তিনি এবার পাতার উপর সংগমরত একজোড়া শামুকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। সাবধানে তাদের ছবি নিতে নিতে তিনি অতঃপর উল্লাস প্রকাশ করেন, ‘আই গট ইউ, রিয়েলি গট ইউ।’ যদিও তার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিবৃত্ত আমি কৌতূহলের সাথে শুনেছি, কিন্তু পতঙ্গের মিথুনের বিষয়ে আমার আদি থেকেই কোন আগ্রহ নেই। আমি তার সাথে এতোক্ষণ হেঁটেছি.. ফ্র্যাংকলি  স্পিকিং..সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রয়োজনে। ট্রেইলে আমি নিঃসঙ্গ হাঁটছিলাম, তার চেয়ে বড় কথা প্রচন্ড ক্ষুধা আমাকে অস্থির করে তুলেছিলো। অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে,কারো সাক্ষাৎ না পেলে খাবার সংগ্রহ করা যাবে না। তার ওপর যদি তার রাবার ডিঙ্গিতে লিফ্ট পাওয়া যায়, তাহলে বিনা শ্রমে অতিক্রম করা যায় অনেকটা পথ। তাই তার সাথে পতঙ্গ, জাপানি কাগজ তৈরীর কৌশল ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করে আমি পরিবেশ সৃষ্টি করেছি, এবার মূল বিষয় আলোচনা করতে হয়। সুতরাং ‘এক্সিউজ মি’ বলে জানতে চাই,‘ডু ইউ হ্যাভ এনি এক্সট্রা ফুড?’ তিনি সাদাসাপ্টাভাবে জবাব দেন,‘নো, নট রিয়েলি। আই হ্যাভ মাই ওউন স্যান্ডুইচ দো, দ্যাটস্ ইট।’ আমি এবার বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করার জন্য বলি,‘আই অ্যাম ভেরী ভেরী হ্যাংগ্রী, আমার সাথে ফুড সাপ্লাই সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। আপনার সাথে কি কোন কিছুর বিনিময়ে খানিকটা ফুড বার্টার করতে পারি?’ তিনি স্ট্রেইট কাট জবাব দেন,‘নো, অ্যাবসোলিউটলি নট, আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড ইন বার্টার।’ আমি এবার ডেসপারেট হয়ে কিভাবে খানিকটা বেসিক ফুড সংগ্রহ করা যায় তার জন্য সাজেশন চাই। তিনি ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে বলেন,‘লিসেন,আই ডু স্ট্রেইট টক, খাবারের সংগ্রহের ব্যাপারে তোমার সামনে খোলা আছে দুটি অপশন। আমার সাজেশন হচ্ছে, তুমি এ অপশনগুলো ট্রাই করে দেখতে পারো।’ আমি অধৈর্য হয়ে বলি ‘ কাইন্ডলি অপশনগুলো ব্যাখ্যা করেন।’ তিনি ঝরা পাতার উপর থেকে নাম না জানা কোন পতঙ্গের ছবি শুট করতে করতে অন্যমনস্কভাবে বলেন,‘অপশন নাম্বার ওয়ান হচ্ছে- ট্রেইলে হোমোসেক্সুয়াল কোন হাইকারের সন্ধান পাওয়া, যে তোমার শরীরের বিনিময়ে খাবার বার্টার করবে।’ তার এ মন্তব্যে আমি ইন্সালটেড ফিল করি, তবে রেসপন্স ব্যাক করার আগে তিনি ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে রেখে বলেন,‘ ইফ ইউ আর নট অ্যা গে ম্যান, অপশন বি মাইট বি বেটার ফর ইউ।’ শুনে জানতে চাই,‘ হোয়াট ইজ ইট? অপশন বি-টা আসলে কী?’ বলে আমি তার দিকে তাকালে তিনি ঢেউ খেলানো পাহাড়ের দিকে ইশারা করেন। ওখানে ফের দেখা দিয়েছে শ্যানানডোয়া নদীর রূপালি রেখা, জলের শরীর যেন বনানীর সবুজ কেটে কেটে উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। তিনি মৃদু হেসে বলেন,‘গো টু দি রিভার, একটু চেষ্টা করলে হয়তো তুমি ধরতে পারবে বড়সড় কোন মাছ। তাতে খাবার সমস্যার আশু সমাধান হয়ে যেতে পারে।’ ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও আমি তাকে পতঙ্গ ও জাপানি কাগজ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার জন্য পোষাকিভাবে ধন্যবাদ জানাই। তিনি কোমর বাঁকিয়ে রীতিমতো মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করে বলেন,‘ওয়াক স্ট্রেইট টু শ্যানানডোয়া, ওখানে হয়তো পেয়ে যাবে মজাদার কোন মাছ। আর মাছ যদি বা নাই বা জুটে, ক্যানু নৌকায় বেঠা ফেলা কোন ম্যাসোলম্যান হয়তো পছন্দ করবে তোমার ব্রাউন বডি।’

ধূসর রকে বসে শুঁড় নাড়াচ্ছে শামুখ।

শ্যানানডোয়ার জলরেখা নিশানা করে অতঃপর হাঁটতে শুরু করি। নদীটিকে কুন্ডুলি খুলে দীর্ঘ ঘাস মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া রূপালি এক অজগরের মতো দেখায়। সানগ্লাসে ছলকে যাচ্ছে রোদের বিচ্চুরণ। ঝকঝকে রোদের ভেতর দিয়ে ঘন্টা খানেক হাইক করে অবশেষে এসে পৌঁছি শ্যানানডোয়ার কুলে। পাড়ের পায়ে চলা পথে ফুটেছে পরপর অনেকগুলো ব্লুবেল বলে বর্ণাঢ্য উজ্জ্বল ফুল। এফুলগুলো দেখতে অনেকটা চার্চের ঘন্টার মতো। দেখতে দেখতে ফুলভারে ঈষৎ নত গাছের সংখ্যা বাড়ে। মাটিতেও পড়ে আছে শতশত তীব্র নীল রঙের ফুলের পাপড়ি। আমি ব্যাকপ্যাক মাটিতে রেখে একটু জিরাই। হামিংবার্ডদের দলছুট একটি ঝাঁক উড়ে আসলে মন নিমিষে হয়ে উঠে পুষ্প-রঙীন। খানিক সামনে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা একটি গাছের উপর দাঁড়িয়ে এবার বাইনোকুলারে নদী স্ক্যান করি। এখানে জল অগভীর ও স্রোত মৃদু। অল্প দূরের বাঁকে পাথুরে এক টিলা চরের দিকে নেমে আসতে আসতে ধূসর রকের জগদ্দলে রূপান্তরিত হয়েছে। তাতে দুপুরের সূর্যালোকে ঝলসাচ্ছে রূপালি আগুন। ঠিক নিচে পানিতে হাঁটু অব্দি ভিজিয়ে বড়শিতে মাছ ধরছেন লাল টিসার্ট পরা একজন মানুষ। আমি এবার ব্যাকপ্যাকটি কাঁধে তুলে নদীর পাড় বেয়ে সাবধানে নেমে আসি চরে।

ফিসারম্যানের কাছাকাছি আসতে আমার মিনিট বিশেক সময় লাগে। ততক্ষণে তার বড়শিতে ধরা পড়েছে বড়সড় একটি মাছ। তা নিয়ে তিনি এসে উঠেন চরে ঠেকানো তার নৌকায়। আমি তার কাছে এসে তোয়াজ করে বলি,‘ সুপার্ভ ফিস। হোয়াট অ্যা ফাইন ক্যাচ্ ..ম্যান।’ তিনি দু’হাতে স্বর্ণাভ আভার মাছটি তুলে ধরে বলেন,‘দিস ইজ জাস্ট অ্যা রিভার বিউটি, ইজন্ট শি গোল্ডেন এন্ড ভেরি প্রেটি?’ আমি আলাপে যোগ দেই,‘ অফকোর্স শি ইজ অ্যা ফাইন রিভার এঞ্জেল’, বলে আমার প্রশংসাকে গাঢ় করে তুলি। কিন্তু ফিসারম্যান তার কাঁধ ও মাথাকে যুগপৎ নেতিবাচকভাবে ঝাঁকিয়ে বলেন,‘বাট, আই ডোন্ট ওয়ান্ট হার। এ মাছের আমার কোন প্রয়োজন নেই। আমি এটাকে এখনই ছেড়ে দিচ্ছি জলে।’ আমি ডেসপারেট হয়ে ‘ নো নো, ওয়েট এ সেকেন্ড ম্যান,’ বলে আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাই,‘এ মাছের প্রয়োজন নেই, হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট্?’ বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন,‘ দিস ইজ অ্যা রেড ব্রেস্টেড সানফিস। আমি খুঁজছি রেইনবো ট্রাউট। সানফিস দিয়ে আমি কি করবো। নো নিড ফর মি টু কিপ ইট।’ আমি এবার বিনীতভাবে অনুরোধ করি,‘পানিতে ছাড়ার দরকার নেই, মাছটি আমাকে দান করে দিন।’ তিনি খানিক বিভ্রান্ত হয়ে জানতে চান,‘ টেল মি হোয়াই ইউ ওয়ান্ট দিস ফিস?’ আমি স্ট্রেটকাট জবাব দেই,‘ আই অ্যাম হ্যাংগ্রি, বিলিভ মি রিয়েলি হ্যাংরি।’ আমার জবাব শুনে তিনি রেগে গিয়ে মাছটি পানিতে ছাড়তে ছাড়তে বলেন,‘ লুক ম্যান,ইউ আর হ্যাংগ্রি, দ্যাট ইজ ইয়োর প্রবলেম, তোমার সমস্যা মেটানোর জন্য আমি অত্যন্ত রূপবান সানফিসকে নির্মমভাবে হত্যা করবো কেন?’

মাছটি জলে ছেড়ে দেয়াতে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। রেগে গিয়ে বলি,‘ক্ষুধার্থ হলে মাছ খেতে চাওয়া অপরাধ নাকি?’ তিনি মাথা ডানে-বামে দুলিয়ে বলেন,‘ অবকোর্স নট। তোমার ক্ষুধা লেগেছে, মাছ খেতে চাও, ফাইন, হোয়াই নট ক্যাচ অ্যা ফিস অব ইয়োর অউন।’ রেসপন্সে আমি বলি,‘ লিসেন ম্যান,আই অ্যাম অ্যা হাইকার, খাবারের সাপ্লাই শেষ হয়ে গেছে, সাথে বড়শি বা জাল কিছু নেই, মাছ ধরবো কিভাবে?’ তিনি এবার বিদ্রুপের ভঙ্গীতে বলেন,‘ ওয়েল, হাইকার হও আর যাই হও, আই মাস্ট সে.. পথে বেরুনোর সময় ফুডপ্ল্যান তুমি চিন্তাভাবনা করে করোনি।’আমি স্বীকার করি,‘ এটা আমার প্রবলেম। তবে আপনি মাছটা খামোকা জলে ছেড়ে না দিয়ে কোন কিছুর বিনিময়ে আমাকে দিয়ে দিলেই পারতেন।’ আমার এ মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন,‘লুক,আই অ্যাম এ ফিসারম্যান, আমি শুধু রেইনবো ট্রাউট ক্যাচ করে ফিসিং কটেজে স্মোক করি। সানফিসের আমার কোন প্রয়োজন নেই।’ এবার আমি জানতে চাই,‘আপনার কটেজে স্মোক করা রেইনবো ট্রাউট আছে কি? কোন কিছুর বিনিময়ে বার্টার করবেন একটা?’ ফিসারম্যান আমার দিকে চিন্তিতভাবে তাকালে, আমি অনুনয় করে ফের বলি,‘আমার ব্যাকপ্যাকে বার্টার করার অনেক জিনিসপত্র আছে, বিনিময় করবেন একটা রেইনবো ট্রাউট?’ ফিসারম্যান আমার অনুরোধকে এবার আমলে এনে বলেন,‘ বিনিময় করার আগে তোমার জিনিসপত্র মনযোগ দিয়ে দেখতে হবে, এতে একটু সময় লাগবে। আই অ্যাম থাসটি, ঔষধও খেতে হবে, এক কাজ করো, ব্যাকপ্যাক নিয়ে উঠে পড়ো আমার ক্যানু নৌকায়, কটেজে গিয়ে আমি প্রথমে কোল্ড কিছু খাবো, তারপর ধীরে সুস্থে বার্টারের বিষয়-আশয় নিয়ে কথা বলা যাবে। ও-কে?’

বড়শিতে মাছ ধরছেন লাল টিসার্ট পরা একজন মানুষ।

বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ তোড়ে আস্তে-ধীরে ভাসে তার ক্যানু নৌকাটি।  শ্যানানডোয়ার বহতা জলের সারফেস এখানে শান্ত। দুপাশে বৃক্ষরাজির ছায়া পড়ে নদীটিকে অরণ্যের রেখাচিত্রে ভরপুর নিরিবিলি এক প্রদর্শনীর মতো দেখায়। স্রোতের বেগ একটু বাড়তেই ফিসারম্যান হাল ধরে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন- ‘অহ শ্যানানডোয়া আই লং টু সি ইউ..।’কাঠে তৈরী একটি ডকে পৌঁছতে বেশী সময় লাগে না। নদীর তীরে ফিসারম্যানের কাঠের কটেজটি আকারে বেশ বড়সড়। ডেকে এসে উঠতেই নাকে লাগে স্মোক করা ট্রাউট মাছের গন্ধ। ফিসারম্যান ভেতরে গিয়ে ঠান্ডা একটি ড্রিংকস্ নিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করেন। আমি ফেনা উপচানো সোডাজলের দিকে তাকিয়ে বলি,‘আপনার কটেজটি তোফা হে, ডেকে বসে নিশ্চয়ই শ্যানানডোয়ার স্রোতজলের ভেসে যাওয়া রূপ আপনি এনজয় করেন।’ আমার মন্তব্যের কোন জবাব সাথে সাথে না দিয়ে তিনি ভেতরে গিয়ে নিয়ে আসেনব্লাডপ্রেসার মাপার মেশিন। রঙীন ছাতার নিচে চেয়ারে বসে রক্তচাপ মেপে একটি রাংতার স্ট্রিপ ছিড়ে সোডাজল দিয়ে তিনি ট্যাবলেটটি খান। তারপর আস্তে-ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,‘ রিভার ভিউ আমি অবকোর্স এনজয় করি, আর এ ধরনের একটি কটেজের মালিক হতে পারলে এক্সেলেন্ট হতো, কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, আমি রেইনবো ট্রাউট ধরে যাদের সাপ্লাই দেই, তারা আমাকে এ কটেজটি কেবলমাত্র মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে। এখানে আরো সপ্তাহ দিন থাকার মেয়াদ আমার আছে। চুক্তি হচ্ছে মোট দুশ রেইনবো ট্রাউট ক্যাচ করে তাদের সরবরাহ করবো। এগুলো ডেলিকেসি হিসাবে চড়া দামে বিক্রি হবে। এর মধ্যে আমি ক্যাচ করছি মাত্র পচাশিটি ট্রাউট। এগুলো স্মোকও করেছি।’ শুনে আমি পজিটিভভাবে বলি,‘ খুব সুপার্ভ মানের স্মোক হয়েছে হে, আমি সুগন্ধ থেকেই তা বলতে পারি। এ থেকে আমার সাথে শুধু একটি মাছ কোন কিছুর বিনিময়ে বার্টার করা যায় না?’ তিনি জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন,‘ ও হেল নো, তুমি বুঝতে পারছো না আমার হাতে সময় আছে মাত্র এক সপ্তাহ, আর আমাকে ক্যাচ করতে হবে টোটাল এক শ পনেরোটি মাছ। এতগুলো রেনবো ট্রাউট মাত্র পাঁচ-ছয় দিনে ক্যাচ করা সহজ হবে না।’

ফিসারম্যান এবার রঙীন ছাতার নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে আরাম করে বসে পাইপ ধরালে আমি অধৈর্য হয়ে বলি,‘অলরাইট, ট্রাউট আপনি বার্টার করবেন না, ঠিক আছে। আপনার কটেজে নিশ্চয়ই খাবারের সাপ্লাই আছে, তা থেকে না হয় কিছু বিনিময় করেন?’ তিনি বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেন,‘ ইউ আর বিকামিংঅ্যা লিটিল এগ্রেসিভ, আই ডোন্ট লাইক দিস। কটেজে খাবারের খুব সীমিত সাপ্লাই নিয়ে আমি দিন কাটাচ্ছি, এখান থেকে দোকানপাটের দূরত্ব কম-সে-কম বত্রিশ তেত্রিশ মাইল, খাবার বার্টার করার মতো রিস্ক আমি নেবো কেন?’ আমার ভেতর ক্রোধ ও হতাশা এক সাথে গুমরে ওঠে,‘ ওয়েল, খাবার যদি বার্টার না-ই করবেন তা হলে আমাকে নৌকায় তুলে এখানে এনেছেন কেন?’ আমি অধর্য্য হয়ে এবার প্রশ্ন করলে ফিসারম্যান নিভে যাওয়া পাইপটি টেবিলে রেখে বলেন,‘ও-কে, লেটস্কাম টু দ্যা পয়েন্ট,শো মি ইয়োর থিংকস্, তোমার জিনিসপত্র প্রথমে দেখি, তারপর চিন্তা করবো কিভাবে তোমাকে সাহায্য করা যায়। ’ আমি বিরক্তি চেপে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে টেবিলের উপর আমার পণ্যগুলো রাখি। ফিসারম্যান সুগন্ধি মোমবাতি, ক্রিস্টাল বল ইত্যাদি আগ্রহের সাথে নেড়ে চেড়ে দেখে- এগুলো তার কোন কাজে লাগবে না বলে নাকচ করে দেন। অনুনয়ের স্বরে, ‘প্লিজ বি কাইন্ড, ফাইন্ড সামথিং ইউ লাইক.’ বলে আমি এ্যপিল করলে,‘ হ্যাংগ অন ,হ্যাংগ অন ফর অ্যা সেকেন্ড, লেট মি টেইক অ্যা লুক অ্যাট ইয়োর ব্যাকপ্যাক,’ বলে তিনি নিজ হাতে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। অবশেষে তার পছন্দ হয়, মশামাছি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি বাগস্প্রে, আর আমার ব্যবহার করা টুথপেস্টের টিউব।

বাগস্প্রে ও টুথপেস্টের বিনিময় হিসাবে ফিসারম্যান আমাকে একটি ইনারটিউব ও বড়শি ঘন্টা তিনেকের জন্য ব্যবহার করতে দেন। তার আইডিয়া হচ্ছে, গাড়ির চাকার ভেতরকার ইনারটিউবের ভেতর শরীর ব্যান্ড করে বসে ভেসে যেতে যেতে বড়শিতে মাছ ধরার চেষ্টা করা। আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনিপ্লাস্টিকের কভারের ভেতর পোরা ফিসিং লাইসেন্স দিয়ে বলেন ‘এটা তুমি পকেটে রাখতে পারো, ভিজে গেলেও অসুবিধা কিছু হবে না। ফ্লোট ইন দ্যা ওয়াটার পিসফুলি। অপরাহ্ণের রোদে পানি ওয়ার্ম উঠছে, মাছগুলো এবার সারফেসে উঠৈ আসবে। চেষ্টা করবে ডিপপুলে বড়শি ফেলতে। যেখানে স্রোত কম, পানির রঙ কালচে সবুজ আর সফেন বুদবুদকে দেখাচ্ছে শান্ত- এ ধরনের ডিপপুলে একটু ট্রাই করলেই পেয়ে যাবে স্মল মাউথ বাস্ বা ফল ফিস। চাই কি আজ তোমার কপালে জুটে যেতে পারে গোটা দুই ক্যাট ফিস। গো এহেড ম্যান। হোপ ইউ উইল ফাইন্ড অ্যা ফিস টু ইট।’

চরে এসে আমি বালুতে ইনারটিউব রেখে বসে থাকি কিছুক্ষণ। জিহ্বায় এসিডের অম্লতা ঠের পাই। তবে সকালে পাঁজরের কাছে ক্ষুধার যে চিনচিনে ব্যাথা ছিলো তা লোপ পেয়েছে সম্পূর্ণভাবে। খুব লাইট হেডেড্ লাগে। মনে হয় রোদে আগুনের ফুলকি উড়ছে। ইচ্ছা হয় বালিতে সটান শুয়ে পড়ি। কিন্তু ঝিমানি আসলে পরে হয়তো ইনারটিউব ভাসানোর মতো উদ্যোম থাকবে না। ভীষণ উদ্বেগ হয় যদি বড়শিতে মাছ না লাগে।

ফিসারম্যান তুলে ধরেন স্বর্ণাভ আভার মাছটি।

ক্ষুধাজনিত ব্যথা যে খানিক পর ফিরে আসবে- এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। হেভী ব্যাকপ্যাক ক্যারি করার ফলে হাঁটতে হাঁটতে প্রচুর এনার্জি বার্ন করছি। সুতরাং আমার চাই প্রোটিন রিচ্ খাবার। মাছ ধরতে ব্যর্থ হলে আমার কাছে প্রোটিন সংগ্রহের বিকল্পই বা কি থাকবে? ফিসারম্যানের কাছ থেকে কোন খাবার পাওয়া যাবে না। মাছ না পেলে নদীর কুলে কুলে হেঁটে তবে কি অন্য কোন হাইকার বা নাও বাইয়ে লোককে ধরার চেষ্টা করবো? এখান থেকে জনপদে বেরিয়ে যাওয়া-ওতো সে বত্রিশ-তেত্রিশ মাইলের ধাক্কা। কতদিন হলো হাইকিং করছি? আংগুলের আঁকে হিসাব মেলাতে চেষ্টা করি। শ্যানানডোয়ার ন্যাশনেল পার্কে কত তারিখে ঢুকেছি। ব্যাকপ্যাকে খোঁজাখুঁজি করেও ডেইটে দাগ দেয়া ডায়েরির তালাশ পাই না। এ বনানী থেকে যদি কোন ক্রমে বেরুতে পারি, তাহলে যেগ্যারেজে গাড়িখানা সারাই করতে দিয়েছিলাম, তা ফেরত পাবো কি? এতদিন আমি জংগলে হাইক করবো তাতো তাদের বলিনি। গাড়ি ডেলিভারি নিতে আসছি না দেখে তারা না আবার গাড়িখানা জান্ক হিসাবে ফেলে-ঠেলে দেয়।

দুর্ভাবনায় রীতিমতো ডিসফাংশন্যাল হয়ে যেতে থাকলে হঠাৎ করে মনে হয়, নিকট ভবিষ্যতে বা আগামিতে যদি এটা-সেটা যোগাড় না হয় তাহলে কী হবে- এ ধরনের ভাবনা থেকে মূলত দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সুতরাং, চেষ্টা করি বর্তমানের প্রতিবেশ বা এ মুহূর্তকে নিয়ে সচেতনভাবে মশগুল হতে। আবহাওয়া বেশ ওয়ার্ম। বালুচর নির্জন, তাই মুহূর্তের স্বাধীনতাকে উপভোগ করার জন্য আমি কাপড়চোপড় খুলে বালুতে গড়াগড়ি দেই। ফিজিক্যালি আরো ফ্রি হাওয়ার প্রবণতাকে বিস্তৃত করার জন্য ছেলেমানুষিভাবে পাথর কুড়িয়ে নিয়ে নদীজলে ছুড়ে মারি। কুপপুৎ কুপপুৎ শব্দের সাথে লাফিয়ে উঠে বেশ কয়েকটি রূপালি মাছ। আমি ব্যাকপ্যাক ও জামাকাপড় পাথরের আড়ালে রেখে বক্সার শর্টস্ পরে ইনারটিউব নিয়ে জলে নামি।

টিউবে আধশোয়া হয়ে মৃদুস্রোতে ভেসে যেতে রিলাক্স লাগে। জলতলের পাথরে তেড়ছা হয়ে পড়া সূর্যালোকে আঁকা হচ্ছে সোনালি সব জ্যামিতিক নকশা। গুচ্ছ গুচ্ছ ছোটমাছ ঘাই মেরে চলে যায় পাথরের আড়ালে। আমি বড়শি ফেলে কিছুক্ষণ বসে থাকি। চৌখুপ্পি নকশা করা পিটের একটি কচ্ছপ নদীপাড়ের ঘাস থেকেআগ্রহ নিয়ে ঘাঁড় বাঁকায়। নদী কুলের দীর্ঘ ঘাসে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদা সারস। জলে পা ডুবিয়ে একটি ব্লুহিরণ পাখি সচকিত হয়ে আমার দিকে তাকায়। আধডোবা রকে বসে রোদ পোহাচ্ছে মাসকারাত বলে ইঁদুরের মতো দেখতে ছোট্ট কয়েকটি জলপ্রিয় প্রাণি। বার কয়েক রূপালি মাছেরও ঝিলিক পাড়া দেখি, কিন্তু বড়শির টোপে কেউ ঠোকর দিতে আসে না। জল ক্রমশ অগভীর হচ্ছে। ভেসে যেতে যেতে মাঝে মাঝে পাথরের সাথে বাড়ি খাচ্ছে ইনারটিউব। তাতে লাফিয়ে উঠছে সাদাপাথরে রোদ পোহানো লালচে সব ফড়িং।

এক জায়গায় নদীজল এতো কম যে দেখি, এক হাইকার ট্রেকিং স্টিকে ভর দিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে পাথরের উপর দিয়ে পাড়ি দিচ্ছে শ্যানানডোয়া। আমি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে হাঁক পাড়ি,‘হেই ম্যান, হাউ ইজ লাইফ?’ মানুষটি ঘাড় বাঁকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচু করে সময় যে তার খারাপ যাচ্ছে এ রকমের ইঙ্গিত করে। হঠাৎ করে চোরাস্রোতে আমার ইনারটিউব ভেসে যায় দ্রুত। পাড় থেকে একটি গাছের পত্রবহুল ডাল নেমে এসেছে লম্বালম্বিভাবে পানির উপর। সামনে দিয়ে সাঁতার কেটে তাতে লাফ দিয়ে চড়ে বসে ওটারনামে উদবিড়াল জাতীয় একটি প্রাণী। আরো খানিক সামনে গিয়ে দেখি, জলতলের স্বচ্ছ বালুকায় গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে কিছু চিংড়ি মাছ। ঠিক তখনই ইনারটিউব গোটা তিনেক আধডোবা পাথরে ঠেকে থেমে যায়। হাত দিয়ে ঠেলাঠেলি করেও আমি টিউবকে ফ্রি করতে পারি না। তাই ডোবা পাথরে পা দিয়ে জলে নামি। ইনারটিউবকে গভীর জলের দিকে টেনে আনতে গেলে ক্যামেরা, সুইচ আর্মি নাইফ ইত্যাদি রাখা পলিথিনের ব্যাগটি ছিটকে পড়ে পানিতে। ব্যাগ উদ্ধার করতে গিয়ে শ্যাওলায় পা ছিলাই। খানিক কেটে-ছড়ে গেলেও অবশেষে কোন ক্রমে উঠে দাঁড়াই। ততোক্ষণে ইনারটিউব ফ্রি হয়ে ভেসে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। পাথরের উপর দিয়ে ছুটে যেতে যেতে শামুকের খোলে আবার পা কাটে। কিন্তু আমি বেপরোয়া হয়ে জলে জাপিয়ে পড়ি। এক হাতে পলিথিনের ব্যাগ উঁচুতে তুলে ধরে কোন ক্রমে অন্যহাতে ইনারটিউবটি পাকড়াই।

আবার ভাসতে গিয়ে মনে জাফলংয়ের পাহাড়ি নদীতে চোরাস্রোতে ভেসে যাওয়ায় ফ্লাশব্যাক হয়। এখানে পানিতে ভেসে যাচ্ছে সাদা ও ময়ূরকন্ঠি থোকা থোকা হাঁসের পালক। হয়তো উজানে শিয়াল বা কায়োটি শিকার করছে। আরেকটু ভেসে যাই, দেখি- ঝোপ থেকে সবুজ পাতা চিবাতে চিবাতে বেরিয়ে আসছে একটি কালো ভালুক। প্রাণীটি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চলমান জল¯্রােতের দিকে তাকায়। আরেকটি ডিপপুলে আসতেই আমার কপাল ফেরে। ফাতনায় টান পড়ছে, বড়শি উঠাতেই হাতে চলে আসে আস্ত একটি ট্রাউট মাছ। ছলবলানো মাছটির মুখ থেকে বড়শি খুলতে খুলতে ভাবি, পাড় থেকে শুকনা কাঠ টুকিয়ে এখনই একে পুড়িয়ে গ্রীল করতে হয়। শরীর বাঁকিয়ে রূপালি ট্রাউটটি ঝাপট দিয়ে উঠে। আমি দু’হাতে মাছটিকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরতে চেষ্টা করি। কিন্তু শ্যাওলা মাখা পিছল ট্রাউট ছিটকে পড়ে নদীজলে।

শ্যানানডোয়ার বহতা জলে বৃক্ষরাজির ছায়া।

 

মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে কিছুদূর অযথা ভেসে যাই। নদী এখানে দুভাগ হয়ে মাঝের চড়ায় গাছপালা ঝোপেঝাড়ে তৈরী করেছে ত্রিভুজাকৃতির দ্বীপ। আমি ইনারটিউব পাড়ে ভিড়িয়ে জলতল স্ক্যান করি। স্রোতে মৃদু মৃদু দুলছে স্টারগ্রাস বলে চারদিকে বিচ্ছুরিত শেইপের জলজ গুল্ম। বার্ডকলে সমস্ত নির্জনতা চিরে চিরে উড়ছে কালো পালকে তীব্র লাল টিকা দেয়া রেড উইং ব্ল্যাক বার্ড। স্টারগ্রাসের গুচ্ছে গুচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছে শুঁড় নাড়ানো কয়েকটি ক্যাট ফিস। আমি বেইট বদলিয়ে বড়শিতে রাবার ওয়ার্মের টোপ পরাই। জলে তা ফেলে একটি পাথরে বসতেই ঝিমানি এসে যায়। ফাতনায় টান পড়তে হাত থেকে ছিটকে যায় বড়শি। লাফ দিয়ে উঠে হ্যাচকা টানে তা পানি থেকে তুলি। ডাঙ্গায় তোলা মাছটিকে ঠিক শনাক্ত করতে পারি না। তবে দুপায়ে চেপে ধরে সুইস আর্মি নাইফ দিয়ে তার রূপালি দেহ বিদ্ধ করি। মুখ থেকে বড়শি খোলামাত্র মাছটি আবার শরীর বাঁকালে কোন রিস্ক না নিয়ে ডাঙ্গার ভেতর দিকের একটি পাথরে বারবার আছাড় মেরে নিশ্চিত করি তার মৃত্যু। এখানে ডালপালা ও শুকনা পাতা পাওয়া যায় প্রচুর। আগুন করতে গিয়ে দেখি, পলিথিনের ব্যাগে কিছু পানি ঢুকে ভিজে গেছে ম্যাচের অবশিষ্ট কাটিগুলো।

চরে যেখানে ব্যাকপ্যাক রেখে গেছি, ইনারটিউব ভাসিয়ে সে উজানে ফিরে আসা অসম্ভব। সুতরাং পাড়ের ঝোপঝাড়, বুনোলতা ও পাথর ডিঙ্গিয়ে কোন ক্রমে ফিরে আসি। বুটজুতা ভিজাতে চাইনি বলে তা ব্যাকপ্যাকের সাথে চরে রেখে গিয়েছিলাম.. এন্ড দ্যাট ওয়াজ অ্যা টোটালি রং ডিসিশন। বুনো কাঁটাঝোপ, শার্প পাথর ও শামুখের খোলে লেগে পা রীতিমতো রক্তাক্ত। কিন্তু এ মুহূর্তে পা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় নেই। রোদ এখনও বেশ চড়া। তাই একটি পাথরের উপর দিয়াশলাইয়ের কাঠিগুলো মেলে দিয়ে শুকনা কাঠ, ঝরাপাতা ও ঝোপ থেকে দুটি পাখির বাসা যোগাড় করি।

মিনিট বিশেক অপেক্ষার পর ক্ষুধা তীব্রভাবে জানান দেয়। চেক করে দেখি ম্যাচকাঠি এখনও স্যাঁতস্যাতে। ঠিক তখনই মাথায় সঠিক বুদ্ধি খেলে যায়। ব্যাকপ্যাক থেকে ম্যাগনেফায়িং গ্লাস বের করে শুকনা ডালপাতার উপর রাখা পাখির বাসার দিকে সূর্যালোক তাক করি। একটু সময় লাগে বটে, বারবার ফুঁ দিতে হয় অবশ্য, তবে আগুন জ্বলে। সাথে লবন নেই তারপরও পোড়া মাছটি খেতে ভালো লাগে। সম্পূর্ণ মাছ একবারে না খেয়ে মাথা সহ অর্ধেক পাথরের উপর রাখি- আগামিকাল কাজে লাগবে ভেবে। এবার পায়ের রক্তাক্ত ক্ষতগুলো দুয়ে পরিষ্কার করা দরকার। জলে ফিরে গিয়ে বালু-মাটি ধুয়ে পরিষ্কার করছি, তখনই পানিতে নিচু হয়ে উড়ে আসা বড়সড় পাখির ছায়া পড়ে। না, সাবধান হওয়ার কোন সময় পাই না। আমার আর্ত চিৎকারের কোন তোয়াক্কা না করেইফিস-ঈগলটি ঝাপটা মেরে পাথরের উপর থেকে তুলে নেয় আধখানা মাছ।

ইনারটিউব ও মাছ ধরার লাইসেন্স ফেরত দিতে এসে দেখি, ডেকের ছাতার নিচে নিস্তেজ হয়ে বসে আছেন ফিসারম্যান। প্রশ্ন করি,‘বিকালে রেইনবো ট্রাউট ধরতে যাননি মনে হচ্ছে?’  তিনি ‘ নট ফিলিং গুড’ বলে টেবিলের উপর রাখা ব্লাডপ্রেসার মেশিনের পাশে নেবুলাইজারের শট নেয়ার ইক্যুইপমেন্ট দেখান। ফিসারম্যানের মৃদু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি ধন্যবাদ দিতে যাই, তখন তিনি জানতে চান- মোট কয়টি মাছ আমি ধরতে পেরেছি। মাত্র একটি মাছ বড়শিতে লেগেছে শুনে, জোরে জোরে দম ফেলতে ফেলতে তিনি ফের বলেন,‘ইউ আর অ্যা ট্রুলি স্টুপিড হাইকার। তিন ঘন্টা ইনারটিউবে ভেসে ধরেছো মাত্র একটি মাত্র মাছ। তোমার তো না খেয়ে থাকা উচিত।’ আমি এ মন্তব্যের কোন জবাব না দিয়ে ফিসিং কটেজের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি।

শ্যানানডোয়ার কুলে কুলে ঘন্টা খানেক হেঁটেও তাঁবু খাটানোর মতো কোন সমতল জমি পাই না। তবে তীরে আরো দুয়েকটি জনহীন কাঠের কটেজ দেখতে পাই। এক জায়গাতে পাড় ঘেঁষে মাঁচার মতো করে বানানো একটি কাঠের ডেক। তাতে পাতা দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার। বেজায়ক্লান্ত লাগছে, তাই চেয়ারে বসে একটু জিরাই। ডেকের উল্টাদিকে ছড়ানো কোন পরিবারের ক্যাম্পগ্রাউন্ড। কয়েকদিন আগেও হয়তো তারা এখানে তাঁবু খাটিয়ে থেকে গেছে রাত কয়েক। ফায়ারপিটে পড়ে আছে পোড়াকাঠ ও নেভা ছাই। বিটারসুইট বেরীর লতানো ঝোপের তলায় কিছু চকচক করলে উঠে, দেখি একটি বার্বিডল নীল চোখে তাকিয়ে আছে কমলা রঙের গুচ্ছ গুচ্ছ গোটার দিকে। চেয়ারে বসে রেলিংয়ে পা তুলে রিলাক্স হওয়ার চেষ্টা করি। সূর্যের অস্তরাগে নদীজল হয়ে উঠছে গোধূলি রঙীন। স্রোতে একটি মাছ ঝিকিয়ে উঠে। তখনই আজ আমার বড়শিতে লাগা অচেনা মাছটির কথা মনে পড়ে। সুইস আর্মি নাইফ বিঁধতে গেলে মনে হয়েছিলো- মাছটি বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাকে আছড়ে আছড়ে মেরে ফেলার পর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলে ঘাই দিয়ে ভেসে উঠেছিলো আরেকটি একই ধরনের মাছ। আমি শুকনা ডালপালা জড় করার পরও অই মাছকে পাড়ের খুব কাছাকাছি এসে আধভাসা হয়ে লেজ ঝাপটাতে দেখেছি। একটি ভাবনা মাথায় আসে। তবে কি এ বিশেষ প্রজাতির মাছ জোড় বাঁধে? এবং যুগলের একটি বিপন্ন হলে অন্যটি অস্থির হয়ে পড়ে অন্তর্গত সংবেদনে? শুনেছি, ফেঞ্চ এঞ্জেল বা ক্লাউন প্রজাতীর মাছ জোড় বাঁধে, কিন্তু ওগুলোতো সামুদ্রিক?  যে মাছটির অর্ধেকটা আমি খেয়েছি, তার একটা ছবি তুলে রাখলে পরবর্তীতে বইপত্র ঘেঁটে দেখা যেতো- জোড় বাঁধার বিষয়টি সঠিক কিনা? মাছের বোবা দৃষ্টি আবার মনে পড়লে উঠে গিয়ে জার্নাল বের করে অসন্ন সন্ধ্যার ম্লান আলোয় বিষয়টি নোট করি।

 

আরো পড়তে পারেন

কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই

বাংলা গানের প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং মান্না দে’র গাওয়া শিরোনামের জনপ্রিয় গানটির কল্যাণে কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউজের নাম-পরিচয় এবং কফি হাউজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছিল বাংলাভাষী দুই বাংলার মানুষ। কলকাতার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কফি হাউজের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে উচ্চ ধারণাই জন্মেছিল জনমনে। বাস্তবে আশির দশক পর্যন্ত কফি হাউজ….

সোয়াজিল্যান্ডের হাউস অন ফায়ার ও সেক্স অফেন্ডার

আমার আজকে কোন কিছু করার কোন তাড়া নেই, তাই অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে হাউস অন ফায়ারের দেয়ালটি দেখি। এর কেল্লার মতো করে স্থানীয় স্থপতি ও কলাকারদের হাতে গড়ার কায়দা দেখে ওয়ালটিকে বরং প্রাচীর বলাই সঙ্গত। তার গায়ে নতশীর হয়ে কতগুলো মূর্তি গভীর চিন্তায় মগ্ন। অর্ধভগ্ন হয়ে কয়েকটি প্রতিমা খামোকা ছড়িয়ে আছে আঙ্গিনায় স্রেফ ভাস্করের….

গোলাপের রাজতোরণ (পর্ব-৬)

একটি মন্দিরও আছে এক পাশে—নাম কাল-ভৈরব। আশ্চর্য এই দেবতা—হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন—তিন ধর্মের দ্বারাই পূজিত। তার মূর্তিটাও বেশ ব্যক্তিক্রমী—পুরুষের পুরো জননযন্ত্র সবিস্তারে খোদিত। দেখেই আপা ঝট করে কাপড়ে মুখ ঢেকে সাথীকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন অন্যদিকে। আর প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটলো—তাতে আমি বিস্ময়ে হতভম্ব। সবুজ আকস্মিকভাবে প্রশ্ন করে বসে: মামা, এত ছোট পুরুষাঙ্গ দিয়ে এসব দেবতারা কিভাবে….