কালো গোলাপ

মঞ্জু সরকার

সৌদি আরবের আবহা সিটির একটি আবাসিক মহল্লায় আবু বকরের দোকান। নিজের কফিল ছাড়াও মহল্লায় বসবাসকারি প্রতিটি সৌদি পরিবারই তার দোকানের নিয়মিত খদ্দের। অনেকেরই নাম আছে বাকির খাতায়। ফোনে অর্ডার পেলেও সহকারীকে দিয়ে তৎক্ষণাৎ মাল পৌঁছে দেয় বাড়িতে। ফলে নানা পেশা ও গোত্রের সৌদি পরিবারকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনাজানার যে সুযোগ পায় আবু বকর, তেমন নসিব এ দেশে কর্মরত পাঁচিশ লাখ বাংলাদেশির ক’জনের হয়? খদ্দেরদের সঙ্গে খাতিরের সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বডি লেংগুইজ প্রয়োগ ছাড়াও, আবু বকর এখন স্বচ্ছন্দ আরবি বাতচিতও করতে পারে।

নগরীর যেসব রাস্তায় যানস্রোত বিরতিহীন, এমন দু’টি ব্যস্ত সড়কের সংযোগকারী এ রাস্তাটা অন্তত আধামইল জুড়ে সমতল। সমুদ্র-সমতল থেকে সাত হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত পাহাড়ি শহর আবহায় চড়াই-উতরাই ছাড়া এটুকু সমতলও দেখতে পাওয়া ভাগ্য। এ কারণেই বোধহয় প্রশস্ত সংযোগ সড়কের সমতলে অনেকগুলো চারতলা বাড়ি গড়ে উঠেছে। সমতল থেকে উঁচুতে টিলার দিকে উঠে গেছে যে দুটি রাস্তা, সে রাস্তাও পেঁচিয়ে রেখেছে বেশ কিছু আবাসিক ভবন। একদম টিলার উপরে দুর্গসম বাড়িটি আবু বকরের কফিল সুবহান ইবনে শাইখের। উচ্চতম সেই বাড়ির দিকে তাকালে করিডোরে দাঁড়ানো কফিলের মুখ এমনকি বোরখাঢাকা কফিল-কন্যার মুখখানাও স্পষ্ট দেখতে পায় আবু বকর। তবে দেখার জন্য আবু বকরের মনে জানালা-করিডোর যতই থাক, বাস্তবে এ মহল্লার বাড়িগুলোর জানালাগুলো খুব ছোট, করিডোর কি উন্মুক্ত বারান্দা নেই একটিরও। স্থাপত্য গঠনশৈলী প্রায় একইরকম। নিজস্ব পার্কিং ও প্রাঙ্গনও নেই। প্রশস্ত রাস্তার দু’পাশটাই বিনাভাড়ার নিরাপদ কারপার্কিং হিসেবে ব্যবহার করে সবাই। আবু বকর রাস্তার দু’পাশের শত শত কার দেখে তাদের সৌদি মালিকদের শনাক্ত করতে পারবে না সত্য, কিন্তু দুর্গসম বাড়িগুলির অন্দরের ছোট বড় বাসিন্দা, এমন কি কালো বোরখায় অভিন্নরূপা নারীদেরও স্বতন্ত্র পরিচয় সনাক্ত করতে পারবে নির্ভুলভাবে। কারণ আবু বকরের বাকালায় এরা সবাই কমবেশি উপস্থিত হয় নিয়মিত।

আমাদের এই গল্প বাংলাদেশি আবু বকর এবং কালো বোরখায় আবৃত এক সৌদি যুবতীর গোপন সম্পর্ক নিয়ে। নিষিদ্ধ সেই সম্পর্কের স্বরূপ দেখার আগে আবু বকর ও তার বাকালার অবস্থান-বৈশিষ্ট্য ভালো করে খেয়াল করা দরকার।

সমতল চওড়া সড়টির দুপাশে যত ভবন, তার অনেকগুলির নিচতলায় বেশ কিছু ব্যবসা অফিস ও নানা পদের দোকান আছে। লন্ড্রি, টার্কিশ সেলুন, টেইলারিং শপ, ফেমিলি হোটেল ইত্যাদি। প্রতিটি দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আরবিতে লেখা সাইনবোর্ড। আবু বকরের দোকানেও প্রবেশপথের ওপরে বড় সাইনবোর্ডে লেখা আল বুশরা বাকালা। কিন্তু আরাবি ভাষার সাইনবোর্ডের তুলনায় বাংলাদেশি আবু বকর নিজেই যে বাকালার উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় সাইনবোর্ড, সেটা দোকানে ঢুকে ক্যাশকাউন্টারে বসা তার হাসিখুশি মুখের দিকে তাকিয়ে কাস্টমারগণ নির্দ্বিধায় স্বীকার করবে। সালাম বিনিময়ের পর কেয়ফা হাল নিয়েও টুকটাক কথাবার্তা বলে তার সঙ্গে। কারণ সৌদি খদ্দেরগণ দোকানকে আবু বকরের বাকালা হিসেবেই চিনতে শুর“ করেছে, এমনকি কফিল সুবহান ইবনে শাইখও সারপ্রাইজ ভিজিটে এলে জানতে চায়, ইয়া আবু বকার, কেমন চলছে তোমার বাকালা? লক্ষ টাকা মূল্যের শতরকম মালপত্র আগলে, দৈনন্দিন বিক্রির কয়েক হাজার রিয়াল গোনাগুনতির গর্বে বাকালা তো আবু বকরের নিজস্ব সাম্রাজ্য হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে একঘেয়েমির ক্লান্তি নিয়ে কফিলের মালিকানাধীন এ জায়গাটাকে সে জেলখানাও ভাবে কখনো-বা।

এ দেশে মেয়েরা যে ঘরের বাইরে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ জীব, সেটা তো সৌদিতে আসার আগে থেকেই জানত আবু বকর। বাকালায় নারী ক্রেতাদের দেখিয়ে শ্যালককে সতর্ক করেছিল ফারুক দুলাভাই। বোরখা পইরা আওরাত কাষ্টমার আসে, আগ বাড়াইয়া কথা না কইলে কারো লগে কথা কইবি না। খবরদার চোখের দিকে তাকাইবি না ভুলেও। এ দেশের আইন কিন্তু  বহুত কড়া।

কেনাকাটার জন্য আবহায় আসির সুপারমল কিংবা পান্ডার মতো বিশালাকৃতির শপিংমল ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের অভাব নেই। সেগুলির সমানে বিস্তীর্ণ মাঠের মতো কারপার্কিং সত্ত্বেও ছুটির দিনে সপরিবার শপিং করতে গিয়ে গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজে পায় না অনেকে। ঘরের বাইরে আপাদমস্তক কালো বোরখাবৃত নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও ঘোরাফেরা করার জন্য শপিংমলগুলো উপযুক্ত জায়গাও বটে। অনেকেই ট্রলি-বাস্কেটে বাচ্চাদের বসিয়ে দিয়ে মার্কেটের ভিতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে দাড়ায়। আরবের মানুষরাও কতোটা ভোগবাদি হয়ে উঠছে, সেটা বড় সুপারমল ঘুরলেও খানিকটা আঁচ করা যায়।

বড় শপিংমলের তুলনায় আবু বকরের বাকালা অতি ক্ষুদ্র হলেও পনের শ’ বাই এক হাজার স্কোয়ার ফিট আয়তনের ঘরটায় সুপারমলের স্টাইলেও সাজিয়েছে সব পণ্য। ট্রলি-বাস্কেট নিয়েও দু’সারি শেল্ফের মাঝ দিয়ে ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে পারে খদ্দেররা। তাদের সাহায্য করার জন্য আছে আবু বকরের সহকারি সালামত। সুপারমলে যেতে নারীদের পুরুষ অভিভাবক ও ড্রাইভারদের উপর নির্ভর করতে হয়। সময় লাগে বেশি, রিয়াল খরচও হয় বিস্তর। কিন্তু এ মহল্লার বোরখাওয়ালিরা বাড়ি থেকে গাড়িতে এক মিনিটে, গাড়ি না পেলেও পায়ে হেঁটে দু’চার মিনিটে আবু বকরের বাকালায় চলে আসতে পারে। একই দামে চটজলদি সংগ্রহ করতে পারে প্রয়োজনীয় পণ্য। অনেক সময় ক্ষুদে ক্রেতারাও আসে মায়েদের সঙ্গে। কিংবা ওরাই টেনে আনে মাকে। বাকালাওয়ালা হিসেবে আবু বকরকে চেনে ওরা, যথাযথ সম্মানও দেয়।

বড় শপিংমলের তুলনায় বাকালায় কাষ্টমারগণ বড় পার্থক্য অনুভব করে সম্ভবত আবু বকরকে দেখে। শপিংমলের নির্গমন পথে যেমন ডিজিটাল চেকিং মেশিন, ক্যাশ মেশিনের সাহায্যে দ্রুত মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা বাকালা তেমন যান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি এখনো। আবু বকরের মেশিন বলতে পুরনো ক্যালকুলেটার। খদ্দেরদের মাল বুঝিয়ে দিয়ে দাম গ্রহণের কাজ করতে হয় একই হাতে। সবাইকে তুষ্ট রাখতে হাসিমুখে মেশিনের মতো কাজ করে আবু বকর। বিশেষ করে কাস্টমার যখন কালো পোষাকের আড়ালে অভিন্ন মা-বোনের জাত, তখন সেবাদানের দায় ও তৎপরতাও আরো আন্তরিক হয়ে ওঠে। নিজের আরবি-দক্ষতা বোঝাতে মহিলা খদ্দেরদের শুনিয়ে সরবে আরবিতেই হিসাব করে আবু বকর। মাল বুঝিয়ে দাম নেয়ার সময় টুকটাক কথাও হয় অনেকের সঙ্গে। এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের সময় নগদ লেনদেনের ফাঁকে আবু বকরের আরো কিছু পাওয়ার কিংবা দেওয়ার আন্তরিক আগ্রহ ধরা পড়ে কি? বোরখাওয়ালিরা যাই ভাবুক, কালো হিজাবের বাইরে উন্মুক্ত চোখের জমি, হাতের নাঙা কব্জিতে বাঁধা ঘড়ি কি সোনার চেন, হাতে চেপে রাখা দামি পার্স কিংবা স্মার্টফোন, আঙুলের গঠনশৈলি, রঙ – সবই মুগ্ধ হয়ে দেখে আবু বকর। তাদের চোখের নীরব ও মুখের সরব ভাষার সূত্র ধরে কারো কারো হৃদয়ের গহীনেও প্রবেশের ইচ্ছে জাগে।

এমন ইচ্ছের বড় কারণ আবু বকরের যুবাবয়স অবশ্যই, উপরন্তু এই উত্তপ্ত মরু ও পাহাড়ের দেশে সে একজন অপ্রকাশিত কবিও বটে। কলেজে পড়ার সময়ে শতাধিক কবিতা লিখেছে। কবিতার ডায়েরিখানাও সঙ্গে করে সৌদিতে এনেছে সে। যে সময়টায় একটি মেয়েকে প্রিয়া হিসেবে পাওয়ার বাসনায় নারীরহস্য আবিষ্কারের অদম্য আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়, প্রেমের ফাঁদে ধরা দিয়ে দিনরাত একাকার করে ফেলে ছেলেরা, এমন নবীন বয়সে, গ্রাজুয়েট হওয়ার আগেই চাকরি করতে সৌদি আরবে এসেছে সে। এ জন্য অবশ্য নিজের সৌভাগ্যের চেয়ে বড় ভগ্নিপতির কৃতিত্বটাই বেশি। দেশে থাকতেই মাদ্রাসা লাইনে পড়া ও ইসলামি রাজনীতি করা দুলাভাইয়ের সৌদিপ্রীতি ছিল। সৌদিতে এসে সুবহান ইবনে শাইখের মতো কফিল পেয়ে নিজেও আরব ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছিল। সৌদিদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে আরবি বলত, পরনে তাদের মতো সাদা তোপ। সৌদিদের মতো মাথায় ইগাল না বাঁধলেও টুপির উপরে বা ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখত চেক রুমাল। এমন যোগ্য ভগ্নিপতি যখন এই বাকালার ইজারাদার, কফিলের মাধ্যমে ভিসা বের করে শ্যালক আবু বকরকেও আরবে এনেছিল সে বাকালার সেলস এ্যাসিটেন্ট হিসেবে। অবশ্য এ জন্য শ্বশুরের কাছে দুই লাখ টাকা আদায় করতেও দ্বিধা করেনি। ছয় বছরের মাথায় কর্মদক্ষতা ও সততা গুণে দুলাভাইয়ের স্থান দখল করেছে আবু বকর। কফিল ও অন্যান্য সৌদি ক্রেতাদের মূল্যায়নে, এমনকি কফিলকন্যার দৃষ্টিতেও ভগ্নিপতির চেয়ে আবু বকর বাকালার যোগ্যতর পরিচালক। এ কারণেও হয়তো মহিলা ক্রেতাদের প্রতি তার পক্ষপাত ও দুর্বলতা কিছুটা বেশি।

দুলাভাই হেসে জবাব দিয়েছে, আরে শালা বোকচোদ, ওইডা কফিলের মাইয়া না, কফিলের বাড়ির চাকরানি, ফিলিপিনো খানকি। অনেক সময় ওই ফিলিপিনো খানকি একলা সওদা নিতে আইব, ওইটার কাছে ঘেঁষবি না তুই।

এ দেশে মেয়েরা যে ঘরের বাইরে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ জীব, সেটা তো সৌদিতে আসার আগে থেকেই জানত আবু বকর। বাকালায় নারী ক্রেতাদের দেখিয়ে শ্যালককে সতর্ক করেছিল ফারুক দুলাভাই। বোরখা পইরা আওরাত কাষ্টমার আসে, আগ বাড়াইয়া কথা না কইলে কারো লগে কথা কইবি না। খবরদার চোখের দিকে তাকাইবি না ভুলেও। এ দেশের আইন কিন্তু  বহুত কড়া। কেউ কম্পিলিন দিলে জান লইয়া দেশে ফেরা লাগব না। আর খেয়াল রাখবি, আমার বাকালায় যারা আসে, তারা সবাই কিন্তু খানদানি, এ মহল্লার মালদার সৌদিগো বউ-বিবি। একটু আগে সওদা লইয়া যে লম্বা বোরখাওয়ালি গেল, সে পুলিশ অফিসারের ওয়াইফ।
পুলিশের ওয়াইফকে চিনলেন কেমনে দুলাভাই! তার গায়ে তো পুলিশের মতো ড্রেস ছিল না, এ দেশের মেয়েরা দেখি সবাই রাতের আঁধার গায়ে মেখে আবডালে থাকে।

সৌদিদের হাড়েমজ্জায় না চিনলে কি ওদের তেল দিয়া ওদেরই কই ভাজতে পারতাম? আমার বাকালার আয়-উন্নতি দেইখা আবহার সব বাঙালি শালাই আমারে হিংসা করে। দুইদিন বাদে নিজের শালাও করব।
হিংসে নয়, দুলাভাইয়ের প্রতি আবুবকর অশেষ কৃতজ্ঞ বোধ করে মূলত দুটি কারণে। আরবি ভাষাটা অল্প সময়ে রফত করতে পেরেছিল দুলাভাইয়ের মতো যোগ্য গুরু পেয়ে। দ্বিতীয়ত, কফিলকন্যা উম্মে শাইখাকে দেখার ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সে দুলাভাই দোকানে থাকতেই।

একদিন দোকানে আসা দুই নারী খদ্দের এলে তাদের কান বাঁচিয়ে দুলাভাই আবুবকরকে ফিসফাস স্বরে বলেছিল, আমাগো কফিলের দোসরা বিবির বড় মাইয়া। এরকম তিন মাইয়া আছে, বিয়া হয় না একটারও। ট্রলিটা লইয়া পিছে পিছে যা। কফিলের পরিবারকে যত বেশি মাল গছাতে পারবি, কফিলার কাছে দেনার ভারও তত কমবে।

দুই নারী কাষ্টমারদের মধ্যে একজনের খোলা মুখ দেখে চমকে উঠেছিল আবু বকর। সেই প্রথম সৌদি যুবতীর খোলা মুখ দেখা, তাও যে যুবতীর পিতা ধনাঢ্য সৌদি, আবহা নগরীতে যার আটটা বাড়ি, দুই স্ত্রী ও পরিবারের জন্য গোটা ছয়েক দামি গাড়ি, কয়েক রকম ব্যবসা এবং যে সৌদি শাইখ কিনা শ্যালক-দুলাভাইসহ দশ বাংলাদেশির কফিল! মুখখোলা ও মুখঢাকা যুবতী দুই বোন কিনা, বোন হলে একজন লম্বা ও আরেকজন বেঁটে কেন, এসব কৌতূহল মনে জাগলেও চোখ নিচু করেই সম্মানজনক ব্যবধান রেখে ট্রলি নিয়ে তাদের পিছে দাঁড়িয়েছিল আবুবকর। মুখখোলা বেঁটে লম্বাটিকে কী যেন বলছিল। লম্বা মেয়েটির হিজাব ঢাকা মুখ থেকে খোলা চোখ জোড়া চঞ্চল পাখির মতো উড়ে এসে আবু বকরকে ঠোকর দিয়েছিল যেন। আবু বকরকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিল সে, ঠিক বুঝতে না পারলেও নিজের স্মার্টনেস জাহির করতে আরবি-ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে জবাব দিয়েছিল আবু বকর, শোকরান ম্যাডাম। আমি আবু বকর, বাকালার এ্যাসিটেন্ট, আপনাদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত।

মুখ খোলাটি খিলখিল শব্দে হেসে উঠেছিল। চঞ্চল বিহঙ্গদৃষ্টি একাগ্র হয়ে উঠেছিল আবু বকরের দিকে, কালো হিজাবের আড়ালেও নাকেমুখে হাসির উজ্জ্বল আভা দেখে অপ্রস্তুত বোধ করেছে আবু বকর। ভয়ও পেয়েছিল কিছুটা। পেছনের কাউন্টারে ব্যস্ত দুলাভাই ও অন্য কাস্টমারদের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। কেনাকাটা সেরে কফিলকন্যা চলে যাওয়ার পর আবু বকর দুলাভাইয়ের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল, কফিলের এক মেয়ের মুখ খোলা দেখলাম যে!

দুলাভাই হেসে জবাব দিয়েছে, আরে শালা বোকচোদ, ওইডা কফিলের মাইয়া না, কফিলের বাড়ির চাকরানি, ফিলিপিনো খানকি। অনেক সময় ওই ফিলিপিনো খানকি একলা সওদা নিতে আইব, ওইটার কাছে ঘেঁষবি না তুই।

গৃহকর্মীকে কফিলকন্যা হিসেবে ভুল করার লজ্জা ঢাকতে, দুলাভাইয়ের কাছে প্রকৃত কফিলকন্যার কথা, রহস্যময় দৃষ্টি ও হাসির মানে বুঝতে না পারার অক্ষমতা আর প্রকাশ করেনি আবু বকর।
প্রথম সাক্ষাতের মাসখানেক পরই, বাকালার ল্যান্ডফোনে জরুরি কিছু মালামাল সাপ্লায়ের অর্ডার পেয়ে আবুবকরকে কফিলের বাড়িতে পাঠিয়েছিল দুলাভাই। গাড়ি নিয়ে বাকালায় আসা খদ্দেরদের গাড়িতে ভারি মালের বোঝা তুলে দেয়ার কাজ প্রতিদিনই করতে হয় আবু বকরকে। কিন্তু ট্রলি-বাস্কেট ঠেলে টিলার উপরের কফিলের দুর্গবাড়িতে সেই প্রথম যাওয়া। ট্রলি ঠেলে চড়াই বেয়ে উপরে উঠতে কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু কালো বোরখার রেখাবের মাঝে উন্মুক্ত চোখ জোড়া চুম্বকের মতো টেনে তুলতে সাহায্য করছিল যেন। দুলাভাইয়ের নির্দেশ মতো বাড়িটির গেট পেরিয়ে লিফটে তিনতলায় উঠে দরজার কলিংবেল টিপেছিল আবু বকর। দরজা খুলে দিয়েছিল সেই মুখখোলা ফিলিপিনো গৃহকর্মী। গায়ে যথারীতি কালো বোরখা। ট্রলির মালগুলো দরজার বাইরে নামাতে গেলে কথা ও ইসারায় ঘরের ভিতরে নেয়ার হুকুম করেছিল সে। ট্রলিটা ভিতরে ঢোকাবে, এতটা আহাম্মক নয় আবুবকর। দু’হাতে ধরে বোতলভরা পানির কার্টন ও অন্যান্য মালপত্র ঘরের ভিতরে লাল কার্পেটের উপর রাখার সময় কোনো দিকেই তাকায়নি আবু বকর। ঝটপট দায়িত্ব পালন শেষে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার মুখে বোরখার আবরণ ছাড়াই হঠাৎ ঘরে ঢুকেছিল লম্বাগড়ন যুবতী। পরনে নীল জিন্সের শর্টস, গায়ে টাইট ফিটিং শাদা গেঞ্জি। উদ্ধত বুক ঢাকার জন্য ওড়না জাতীয় কোনো বস্ত্র নেই। কপালে ঝুলে পড়া ববকাটিং চুলের গোছা সরিয়ে হাসিমুখে সালাম দিয়ে সে জানতে চেয়েছে, কেমন আছো আবু বকর?

নিষেধ স্বত্বেও সৌদি মনিবের বাড়ির অন্দরে ঢুকে তার কন্যার অর্ধনগ্ন রূপ দর্শনের এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার কথা দুলাভাইকে তো নয়ই, চেনাজানা কাউকেই বলতে পারেনি আবু বকর। কফিলের বাড়ির চেনা ইন্ডিয়ান ড্রাইভারটিকে শুধু বলেছিল, গত শুক্রবার কফিলের বাড়িতে পানি নিয়ে গেলাম, তোমাকে বা তোমার গাড়ি দেখলাম না তো।

লম্বা গড়ন ও চোখ দুটি দেখে তো মুহূর্তেই চিনতে পেরেছে, কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার মেয়েদের মতো এমন বেশরম বেয়াব্রু চেহারা দেখার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। মাথা হেলিয়ে বিনীত জবাব দেয়ার সময় সেই যে মুখ নিচু করেছিল আবু বকর, মুখ তুলে আর তাকাতে পারেনি। আরব যুবতী আবু বকরের আনা কোড রেড ড্রিংকসের ক্যান হাতে নিয়ে আবু বকরকে সোফায় বসার কথাও বলেছে। বাকালায় জরুরি কাজের কথা বলে দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে লিফটে ঢুকে হাঁফ ছেড়েছিল আবু বকর।

নিষেধ স্বত্বেও সৌদি মনিবের বাড়ির অন্দরে ঢুকে তার কন্যার অর্ধনগ্ন রূপ দর্শনের এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার কথা দুলাভাইকে তো নয়ই, চেনাজানা কাউকেই বলতে পারেনি আবু বকর। কফিলের বাড়ির চেনা ইন্ডিয়ান ড্রাইভারটিকে শুধু বলেছিল, গত শুক্রবার কফিলের বাড়িতে পানি নিয়ে গেলাম, তোমাকে বা তোমার গাড়ি দেখলাম না তো।

ঘটনার দিন কফিলের পরিবারের সবাইকে নিয়ে জিদানের বাগানবাড়িতে পিকনিকে যাওয়ার খবর ড্রাইভারের কাছে জানতে পেরেছে আবু বকর। শরীর খারাপ ছিল বলে উম্মে শাইখা আর ফিলিপিনোটা বাড়িতে ছিল। তথ্যটা জানার পর নতুন করে সন্দেহ জেগেছে। উম্মে শাইখা কি দোকানে বেহুদা মালামালের অর্ডার দিয়ে আবু বকরকে দেখতেই ডেকে পাঠিয়েছিল, নাকি নিজেকে ওভাবে দেখাতে? বাকালায় আবু বকর তাকে যথাযথ চিনতে না পারলেও সে নিশ্চয় প্রতিবারই বাংলাদেশি সুদর্শন যুবককে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছে। ভাল লেগেছে বলেই হয়তো বাসা ফাঁকা হওয়ার সুযোগোর অপেক্ষায় ছিল। বসার জন্য অনুরোধও করেছিল। সাহস করে আবু বকর ঘরে বসলে ফিলিপিনোটিকে হয়তো কোনো কাজের কথা বলে বাইরে পাঠিয়ে দিত উম্মে শাইখা। তারপর যা ঘটতে পারত, সেই কল্পনায় উম্মে শাইখার উন্মোচিত রূপ এতটাই অবারিত হয়ে ওঠে যে, রাত জেগে নিষিদ্ধ কালো গোলাপের রূপ ও ঘ্রাণ শিরোনাম দিয়ে কবিতা লেখারও চেষ্টা করে আবু বকর। আবার অবরুদ্ধ সমাজে তোলপাড় জাগানো দুঃসাহসী ও ব্যতিক্রমী নায়কের পরিণতির কথা ভেবে খুব ভয় পায়। সৌদিতে আসা কোনো বিদেশি এ দেশের নাগরিকত্ব পায় না। বিদেশি কারো সঙ্গে সৌদি যুবতীর বিয়ে হয়ে হওয়ার কথা শোনেনি আবু বকর। নিজেকে সতর্ক করে সিদ্ধান্ত নেয় সে, দুলাভাই পাঠালেও আর কখনও যাবে না কফিলের বাড়িতে।

একটি কালো গোলাপের ভিতরের রূপ দেখার কি ঘ্রাণ পাওয়ার সুযোগ যে এ দেশে লাখ লাখ আজনবিদের মধ্যে আবু বকর একাই পেয়েছে, এমন জোরদাবি করে না আবু বকর। গৃহকর্মী হিসেবে যারা সৌদিবাড়ির অন্দরমহলেই থাকে, নিঃসন্দেহে তারাই পরিবারের লোকজনের আসল চোহারা দেখার সুযোগ পায় সবচেয়ে বেশি। এসব গৃহদাসী সম্পর্কে দুলাভাই ছাড়াও চেনাজানা সহ-প্রবাসীদের কাছে মেলা কুকথা শুনেছে আবু বকর। অন্দর মহলে নাকি সৌদি জানোয়ার দেখা এবং হিংস্র আক্রমণের শিকার হওয়াটাই তাদের অনিবার্য নিয়তি। অন্যদিকে হাউস-ড্রাইভারদেরও সৌদি পরিবারের মেয়েদের দেখার ও জানার সুযোগ ঘটে বেশি। কিন্তু নিজ কফিলের ইন্ডিয়ান ড্রাইভারকে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না আবু বকরের, নিজের অভিজ্ঞতায় স্মৃতির সঞ্চয়টুকু জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই হয়তো।

কফিল ও কফিলকন্যার সঙ্গে আবু বকরের ব্যতিক্রমী সম্পর্কের অভিজ্ঞতা নিজের কাছে অসমান্য হয়ে উঠতে থাকে বাকালা পরিচালনার দায়িত্ব পাবার পর থেকে। চুক্তি অনুযায়ী দুলাভাই কফিলের পাওনা পরিশোধ করতে পারেনি। মেলা ঋণধার দেখিয়েছে। কফিল দুলাভাইয়ের আকামা নবায়ন করেনি আর। বিপদ বুঝে দুলাভাই বাকালা ও শ্যালককে ছেড়েই রিয়াদে গিয়ে নতুন ব্যবসায় জড়িত হয়েছে। নতুন কফিল ধরে আকামাও বদলেছে। আবু বুকর তখন চাকরি হারানো ও আবহা ত্যাগের ভয়ে দিশেহারা। এমন বিপদে কফিল সুবহান ইবনে শাইখই তার বড় সহায় ও সাহস হয়ে উঠেছিল। দুলাভাইয়ের প্রাপ্য শাস্তি শ্যালককে দেয়নি। উল্টো আবু বকরের সততা ও যোগ্যতার উপর ভরসা করে তাকে বাকালা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। কফিলের সব শর্ত পূরণ করে, তার প্রাপ্য নির্দিষ্ট সময়ে বুঝিয়ে দিয়ে ক্রমশ বেশি আস্থা অর্জন করছে আবু বকর। শুধু সৌদি কফিল ও তার পরিবারের নয়, এ মহল্লায় বসবাসকারী সৌদি নারী-পুরুষ-শিশু খদ্দেরদেরও। এ ভাবে বছর কয়েক চালাতে পারলে ভগ্নিপতির চেয়েও দেশে শ্যালকের উন্নতি-প্রতিষ্ঠা বেশি হবে অবশ্যই।

আযান শুনলেই সব রকম দোকান-ব্যবসা-অফিস বন্ধ রাখাটা এ দেশের নিয়ম। নামাজের বিরতিতে ব্যক্তিগত কাজগুলো সেরে নেয় আবু বকর। একদিন জোহরের আযান হওয়ার মুখে খদ্দেরশূন্য বাকালা বন্ধ করার জন্য যখন কাউণ্টার ছেড়ে আবু বকর গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে, গাড়ি থেকে প্রত্যাশিত বোরখাওয়ালি কাস্টমারকে নামতে দেখে চমকে ওঠে।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, আবু বকরের এই উন্নতির পেছনে শুধু কফিলের দয়া ও বিশ্বাস নয়, নেপথ্যে কফিলকন্যার অবদানই বেশি। বৃদ্ধ পিতাকে উম্মে শাইখা নিশ্চয় আবু বকর সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা দিয়েছে। ফোনে জরুরি মালপত্র পৌছে দেয়ার অর্ডার আসে নি আর। বাড়ি ফাঁকা হয়নি কিংবা বাকালা ফেলে আবু বকরের পক্ষে একা যাওয়া সম্ভব নয় বলেই হয়তো। তবে কেনাকাটার প্রয়োজনে বাকালায় তার উপস্থিতির হার বেড়েছে। সঙ্গে মা-বোন-দাসী-ড্রাইভার যেই থাকুক, খদ্দেরসেবায় যত ব্যস্তই থাক আবু বকর, বাকালায় উম্মের উপস্থিতি টের পেতে ভুল হয়নি কখনো। সেকেণ্ডের জন্য চোখাচোখি ছাড়াও টুকটাক কথাবর্তাও হয়েছে বেশ কয়েকবার। উম্মে শাইখার উপস্থিতি মধুর রেশ ও আগমন প্রত্যাশা বাকালায় আশ্চর্য এক ঘ্রাণ বয়ে আনে, যা বাকালা বন্ধ করার পরও অনেক রাতে বুকের গভীরে খুঁজে পায় আবু বকর।

আযান শুনলেই সব রকম দোকান-ব্যবসা-অফিস বন্ধ রাখাটা এ দেশের নিয়ম। নামাজের বিরতিতে ব্যক্তিগত কাজগুলো সেরে নেয় আবু বকর। একদিন জোহরের আযান হওয়ার মুখে খদ্দেরশূন্য বাকালা বন্ধ করার জন্য যখন কাউণ্টার ছেড়ে আবু বকর গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে, গাড়ি থেকে প্রত্যাশিত বোরখাওয়ালি কাস্টমারকে নামতে দেখে চমকে ওঠে।
আমার শ্যাম্পু লাগবে।

শ্যাম্পু নেওয়ার জন্য উম্মে বাকালার ভিতরে ঢুকলে সাহায্য করার জন্য পিছু যেতে হয় আবু বকরকে। শেম্পু আছে একদম ভিতরের তাকে। সেদিকে যেতে যেতে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে কথা বলে উম্মে, যেন শেম্পু নয়, গোপন কথা বলাটাই জরুরি।

বাকালার দায়িত্ব পেয়ে এত ব্যস্ত থাক যে, আমার দিকে তাকাবারও সময় পাও না।
হ্যাঁ, সারাদিনই কাস্টমারদের চাপ।

কাস্টমারকে দ্রুতি বিদায় করার জন্য আবুবকর যখন কোনায় মেয়েদের প্রয়োজনীয় পণ্যের শেল্ফের সামনে দাঁড়ায়, তখন উম্মে তার এতটাই শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায় যে, তার শরীর নিসৃত ঘ্রাণে যেন দম বন্ধ হয়ে আসবে আবু বকরের। আযানের সময় রিলিজিয়াস পুলিশ ঘুরে বেড়ায় বিধান ভঙ্গকারীদের শাস্তি দিতে। তার উপর দোকানের সামনে গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও হয়তো উম্মের মা-বোন। আযান হওয়ার আগেই আযানের ধ্বনি শুনে আবু বকর উম্মেকে রেখে কাউন্টারে গিয়ে বসে।

কয়েক রকমের মেয়েলি পণ্য কাউন্টারে এগিয়ে দিয়ে উম্মে চাপা স্বরে জানায়, তোমার সঙ্গে অনেক জরুরি কথা আছে। রাত বারটার পর আমাকে ফোন করো। এই যে আমার নাম্বার।
একটি কার্ডের সাদা অংশে আরবি হরফে লেখা নিজের ফোন নাম্বারটি দিয়ে উম্মে যখন গাড়িতে গিয়ে ওঠে, নিকটস্থ মসজিদের মাইকে আযান বেজে ওঠে। ঝটপট দোকানের গেট বন্ধ করে, অন্য দিনের চেয়েও জোরপায়ে মেসবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে আবু বকর।

বাকালার বাইরে সময়টুকু নিজের মতো করে কাটাবার জন্য মেসবাড়িতে আলাদা ঘর ভাড়া নিয়েছে আবু বকর। ছোট্ট হলেও রুমে নিজস্ব বাথরুম, ফ্রিজ, টিভি সবই আছে। ঘরে একান্ত সময়টায় সাধারণত ফোনে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলা, টিভির দেশি চ্যানেল দেখে কিংবা ফেসবুকে পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটায়। রাত বারটায় দোকান বন্ধ করার পর ঘরে কারো সঙ্গে কথা বলার এনার্জি থাকে না, ইচ্ছেও হয় না। কিন্ত উম্মের লেখা ফোন নাম্বার ও জরুরি অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারে না সে। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ  ভয়-ভাবনা জয় করে, ঘরের দরজা বন্ধ ও আলো নিভিয়ে দিয়ে, রাত বারটা উনিশ মিনিটে উম্মের আইফোনে সাড়া জাগায় আবু বকর।

উম্মের কথাবার্তা ও ভালবাসার তৃষ্ণা ক্রমে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। আবু বকরেরও যেন আরবি ভাষার স্টক ফুরিয়ে যায়। বদ্ধ ঘরের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ আবেগমময় ভাষায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে না আর। কানের মধ্যে নারীকণ্ঠের জান্তব ধ্বনি শুনে নিজেও গোঁগোঁআহইহ করে অস্তিত্ব জানান দেয় আবু বকর।

তার হ্যালো উচ্চারণেই আবু বকরকে চেনার ও স্বাগত জানানোর সুর ফুটে ওঠে। তারপরও সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দেয় আবু বকর। অতপর ফোনে দুজনের মধ্যে যে কথা হয়, আবু বকর আরবি ভাষায় যতটা বলতে পারে এবং যতটুকু পষ্ট বুঝতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যে কথোপকথন তার স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকবে, তা অনেকটা এরকম:
আজ বাকালায় আমি তোমাকে ছুঁতে চেয়েছি। তুমি সরে গেলে কেন? আমাকে ভাল লাগেনি তোমার?

তুমি খুব সুন্দর। এখনো বিয়ে করো না কেন?

সুবহান ইবনে শাইখ লাখ টাকা দেনমোহর আর উপযুক্ত বংশবুনিয়াদ না পেলে মেয়েদের বেচবে না।

আমাদের দেশে তোমার মতো অবিবাহিত মেয়ে থাকলে তো বাবামায়ের ঘুম হারাম হয়ে যেত।

এ দেশের জোয়ানরা খারাপ, বুড়োরা আরো খারাপ। আমি এ দেশের পুর“ষকে বিয়ে করব না।

কী করবে বাকি জীবন?

আমি আমেরিকায় যাওয়ার কথা ভাবি। আমেরিকা আমার ভাল লাগে। হিজাব ছাড়াই সেখানে একা ঘুরতে পারব। নিজেই গাড়ি চালাতে পারব। তুমি যাবে আমার সঙ্গে আবু বকর?
আমি ডলার-ভিসা পাবো কোথায়? আমেরিকায় গিয়ে আমি করব কী?

সেখানে গিয়ে আমরা দুজনে একটা নতুন বাকালা চালাব। স্বাধীনভাবে ঘুরব, আর যত খুশি লাভমেকিং করব। কীভাবে তুমি আমায় ভালবাসবে, এখন ফোনে একটু দেখাও আবু বকর।

উম্মের কথাবার্তা ও ভালবাসার তৃষ্ণা ক্রমে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। আবু বকরেরও যেন আরবি ভাষার স্টক ফুরিয়ে যায়। বদ্ধ ঘরের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ আবেগমময় ভাষায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে না আর। কানের মধ্যে নারীকণ্ঠের জান্তব ধ্বনি শুনে নিজেও গোঁগোঁআহইহ করে অস্তিত্ব জানান দেয় আবু বকর। ঠিক এ সময় মেসবাড়ির ঘনিষ্ঠ পড়শি অদুদ দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকে, ও আবুবকর ভাই, ঘুমাইছেন নি? আবু বকুর শুধু লাইন কাটে না, ফোনটাকেও টিপে ডেড করে দেয়। তারপর জেগে জেগেই ঘুমাতে থাকে।

পরদিন বাকালায় গেলে খদ্দেরসেবায় আগের মতো হাসিখুশি থাকতে পারে না আবু বকর। বেশ আনমনা দেখায় তাকে। রাত দশটার দিকে কফিল দোকানে সারপ্রাইজ ভিজিটে এলে উম্মের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের স্মৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেটুকু স্বাভাবিকতা ছিল, তাও যেন ভয়ে ম্লান হয়ে যায়। নিজেকে সাহস দিতে উল্টোটাও ভাবে আবু বকর। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে উম্মেই পিতাকে পাঠায়নি তো?

নিজেই দামি কার চালিয়ে বাকালার খোঁজখবর নিতে মাসে বার কয়েক আসে কফিল। আবু বকরের সঙ্গে কথা বলার আগে ঘুরে ঘুরে মালামাল পরখ করে। কফিলভক্তি দেখাতে কাস্টমারসেবার হাসিটা যথেষ্ট বোধ না করায় কাউন্টার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আবু বকর। নিজের পাশের চেয়ারটা ঝেড়েপুছে দেয় কফিলকে বসার জন্য।

বাকালায় বসে কফিল আজ কথা বলে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। ফিলিপিনো হাউসমেইডটি পাঁচ বছর ধরে আছে, ছুটি নিয়ে দেশে যেতে চায়, গেলে সে ফিরবে না। তার আকামাও আর নবায়ন করবে না কফিল। কিন্তু কাজের মেয়ে ছাড়া তার বাড়ির পরিবার ও কন্যারা চলতে পারবে না।

আবু বকর সমর্থন দিয়ে বলে, জি চাচা, কাজের মেয়ে তো জরুরি।

তুমি কি জানো, তোমাদের দেশ থেকেও হাউসমেইড আনার কন্ট্রাক হয়েছে। আমি ভিসা দেব, তুমি ভাল দেখে একটা হাউসমেইড আনার ব্যবস্থা করে দাও। আমার মেয়েরাও বলছে, বাংলাদেশি গৃহদাসী আবু বকরের মতো ভাল হবে।

কফিলকে তুষ্ট রাখতে আজ তক তার কোনো প্রস্তাবেই মুখের উপর না করেনি আবু বকর। আজও ভিতরের জোরালো না-কে চেপে রেখে বলে, কোরবানি ঈদের পর তো আমি ছুটি নিয়ে দেশে যেতে চাই মুরব্বি, দেশে আমাকে বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছে সবাই। ছুটিতে গেলে আপনার কাজের মেয়েও খুঁজব আমি।

উত্তম প্রস্তাব। তুমি শাদি করে তোমার স্ত্রীকেই সঙ্গে আনো না কেন? সে বাসায় কাজ করবে, আর তুমি বাকালা চালাবে। দুজন মিলে আয় করবে, রাতে এক বাসাতেই থাকবে। আমার ভাইয়ের বাসায় ইন্দোনেশিনায়ান ড্রাইভারও তার স্ত্রীকে এনেছে। তোমার স্ত্রীরও ভিসা, আকামার ব্যবস্থা করব। বিমানভাড়াও দেব আমি।

ইনশাল্লাহ, আপনার দয়া ও দোয়া পেলে সব হবে চাচা।

সন্তুষ্ট কফিল চলে যাওয়ার পর নিজের আসনে বসে ক্যাশবাক্সে জমা হওয়া নোটগুলি গোছায় আবু বকর। প্রতিদিনই দোকান বন্ধের আগে সারাদিনের বিক্রয়লব্ধ টাকা একাগ্র মনোযোগ দিয়ে গুনতে হয়। বাকালায় এ কাজটাতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ তার। সৌদি বাদশার ছবিযুক্ত বিভিন্ন মানের নোটগুলির দিকে চোখ রেখে দু’আঙুলের আলতো স্পর্শ দিয়ে গোনার সময়টাতে নিষিদ্ধ গোলাপের সৌন্দর্য- ঘ্রাণ কিংবা কোনো অশুভ ভয়-ভাবনা কাছে ঘেঁষতে পারে না অন্তত।

আরো পড়তে পারেন

লাল রক্ত সবুজ হরিয়াল

শ্যাওলার আধিক্যের কারণেই সম্ভবত পানির রং ঘন সবুজ দেখাচ্ছে। পুকুরটিকে মোটেও ছোট বলা চলে না। চারপাশে উঁচু পাড়। পাড়জুড়ে নানা প্রজাতির গাছ-গাছালিতে ভর্তি। ওগুলোর মধ্যে বাউল সন্ন্যাসীদের ঝাঁকড়া চুলের মতো কুল গাছটি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে পুকুরের পাড় ছেড়েও বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে পুকুরের ওপর। বৃক্ষের প্রাচুর্যতার কারণে সূর্যের আলোও ঠিক মতো এসে পড়ে….

গোপন পাপ

বড় আব্বার হাঁকডাক শুনে তকদির ছুটতে ছুটতে সজনে তলায় এসেছে। লুঙ্গি পায়ে জড়িয়ে বেকায়দা পতন সামলে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই খালি হাতে এসে ভুল করেছে শুনে লুঙ্গি কাছা মেরে আবার ও হাত দাখানা আনতে ছুটেছে। সৈয়দ মীর কাশিম তুরানীকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকে তকদির। বড় আব্বার ইঙ্গিত পেয়ে সে সজনের ডাল কাটতে শুরু করে। গাছের ডাল….

মধ্যরাতের ফুর্তিবাজ

আজ বিকালের বাসে খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছে স্বপন। সন্ধ্যেটা কাটিয়েছে বাসস্ট্যান্ডের কাছেই ছোট একটা পার্কে। সেখানে লোকজন তেমন ছিল না। ভিতরের দিকে পাতাবাহার আর কলাবতীর ঝাড়ে আড়াল করা নিরিবিলি কোনায় চুপচাপ বসেছিল। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে নিজেকে খুব নিস্তেজ লাগছিল। ক্লান্তিতে দুই চোখের পাতা বুজে আসতে চাইলেও গত রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা স্মরণ করে….