বিবর্তনের ধারায় প্রেম, বিয়ে ও দাম্পত্যজীবন

আকেল হায়দার

প্রেম অনাবিল এক সুখানুভূতির নাম! ভিন্ন এক আত্মার মাঝে নিজেকে হারিয়ে খোঁজার উপন্যাস। সময়ের ঘূর্ণ্যমান খেয়ায় রয়েছে এর নানা বিবর্তন ও বিস্তারের ইতিহাস। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই নারী পুরুষ উভয়ের একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ চিরন্তন। কাউকে ভালো লাগা, কারো প্রতি আসক্ত হওয়া বা কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রবৃত্তিও খুব সহজাত। প্রতি মুহূর্তে, প্রতিনিয়ত বিশ্বের অসংখ্য মানুষ নিমজ্জিত হচ্ছে প্রেমে, ভালোবাসায়। সামগ্রিকভাবে প্রেম-ভালোবাসার উদ্ভব কিংবা বিকাশ রীতিমত এক উপাখ্যান। ইতিহাসের ডায়েরি থেকে পাওয়া তেমন কিছু প্রেম- ভালোবাসার ঘটনাকে উপজীব্য করে এই প্রবন্ধ।

প্রেম বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মানুষের জীবনে আসে। কেউ’ই এর বাইরে নয়। কেউ প্রকাশ্যে কেউবা নিভৃতে। পর্যালোচনা করে দেখা যাক রোমান্টিসিজম কীভাবে বিবর্তনের ধারায় গতিপথ পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে আজকের যুগে এসে উপস্থিত হয়েছে। প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টাই বা কেমন ছিল সেই সময়ে? মানুষ কীভাবে নিজের প্রয়োজনে বাস্তবতার আলোকে যৌক্তিক বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে শিখল? প্রকৃত প্রেমের মাঝে জীবনের সুন্দরতম মুহূর্তে কীভাবে আবিষ্কার করলো নিজেকে?

খ্রিস্টপূর্ব ১৭৭৫ সাল। সিরিয়ার মারি শহরের সম্রাট জিমরি লেন পার্শ্ববর্তী দেশ ইয়ামহাডের রাজকন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শক্তিশালী এই দুই রাজ্যের মধ্যে বিয়ের নেপথ্যে ছিল মূলতঃ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন ও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ বিয়েই ছিল লেনদেন-নির্ভর। সংশ্লিষ্ট বিয়ের ফলস্বরূপ সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার সাথে দ্রুত ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। আধুনিক সময় বিচারে আমাদের কাছে বিষয়টা খানিক অস্বাভাবিক মনে হলেও, সে সময়ে এটাই ছিল বিয়ের অন্যতম লক্ষ্য। বিয়ের পর দাম্পত্য জীবনে সম্রাট জিমরি লেন আট কন্যার পিতা হন এবং তাঁর কন্যাদের প্রত্যেককে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন পাত্রের সাথে বিয়ে দেন। বিয়ের পরবর্তী সময়ে প্রত্যেক জামাতাকে লিখিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে একেকটি রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পণ করেন আর সবাইকে তাঁর অধিনে রাজ্য পরিচালনার আদেশ দেন।

উক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে এই বিয়েতে প্রেম বা ভালবাসার কোন মূল্যায়ন বা বিবেচনার লেশমাত্র ছিলনা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সাম্রাজ্য বিস্তারই ছিল এই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক সময়ের প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে প্রেম বা ভালোবাসা বলতে একটা মহলে কেবল রাজত্ব, ক্ষমতা আর অর্থের সংশ্লিষ্টতাকেই বোঝানো হতো।

পর্যালোচনা করে দেখা যাক রোমান্টিসিজম কীভাবে বিবর্তনের ধারায় গতিপথ পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে আজকের যুগে এসে উপস্থিত হয়েছে। প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টাই বা কেমন ছিল সেই সময়ে? মানুষ কীভাবে নিজের প্রয়োজনে বাস্তবতার আলোকে যৌক্তিক বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে শিখল? প্রকৃত প্রেমের মাঝে জীবনের সুন্দরতম মুহূর্তে কীভাবে আবিষ্কার করলো নিজেকে?

১১৪৭ সালে ফ্রান্সের রাজপুত্র রুডেল লেবাননের রানীকে দেখে দারুণ বিমোহিত হন! প্রথম দেখায় তার প্রেমে পড়ে যান। রুডেল ছিলেন সেসময়ের প্রখ্যাত কবিদের একজন। প্রেমের কবিতার জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। ১২০০ শতকের দিকে নিজ দেশ ফ্রান্সে অবস্থানকালে অনেক কবিতা রচনা করেন তিনি। লেবাননের রানীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন অজস্র কবিতা। যদিও সেসবের অনেক কিছুই ছিল রানীর অজানা। রুডেলের সেই প্রেম ছিল একটা সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে কেন্দ্রীভূত। সেখানে অর্থ, সাম্রাজ্য, সন্তান, প্রতিপত্তি কোনকিছুরই স্থান ছিলনা। সান্নিধ্য, কামনা বা অধিকার করার কোন ইচ্ছাও কখনো পোষণ করেননি রুডেল। তার কাছে আবেগ অনুভূতিই ছিল মুখ্য। প্রায় একশো মাইলেরও বেশী দূরে অবস্থান করে রুডেল লেবাননের রানীকে উদ্দেশ্য করে রচনা করেন অজস্র আনন্দ-বিরহের গান। নিজে নিজে সেগুলোর সুরারোপও করেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশতঃ কোন একবার ত্রিপোলিতে থাকার সময়ে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন রুডেল। ঘটনাক্রমে সেই খবর পৌঁছে যায় লেবাননের রানীর কাছে। সংবাদ শুনে রানী আর স্থির থাকতে পারেন না। উদগ্রীব হয়ে রুডেলের কার্যালয়ে ছুটে যান তাকে দেখার জন্য। রানীকে দেখার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন রুডেল। সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছুক্ষণের মধ্যে রানীর কাঁধে মাথা রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বস্তি আর শান্তির নির্যাস নিয়ে প্রিয় মানুষের বুকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রেমকে এক অনন্য অবয়বে দেখেছিলেন রুডেল। সত্যিকার প্রেম কখনো নৈমিত্তিক ব্যবহার্য বস্তুর মতো নয়। এই সত্য নিবিড়ভাবে উপলব্দি করেছিলেন রুডেল।

১৭৪৫ সালের কথা। ঘটনাটি ফ্রান্সের বিচেই নগরীর। জেনাটয়েট পেয়ারসন নামের তেইশ বছরের এক সুন্দরী তরুণী কালো ড্রেস পরে কোন এক সন্ধ্যায় রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের দরবারে প্রবেশ করেন। রাজার সম্মুখে গিয়ে সম্মানসূচক তিনবার কাঁধ ঝাঁকান। পেয়ারসনের আকস্মিক উপস্থিতি ও এই সাধারণ অঙ্গভঙ্গি রাজা লুইয়ের কাছে ভীষণ ভালো লেগে যায়। দারুণভাবে প্রলুব্ধ হন তিনি। তার সৌন্দর্য ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে তাকে রানী হিসেবে বরণ করে নেন। মিথাস ঠিকলারে ছিল রাজা লুইয়ের প্রথম স্ত্রী। পেয়ারসনকে যখন রাজা লুই বিয়ে করেন তখন তিনি বাইশ বছরের দাম্পত্য জীবন পার করছিলেন। সম্রাট লুইয়ের ছিলেন একাধিক স্ত্রী। চৌদ্দ বছর বয়সী মেরিলো উইজোমাফি ছিল তাদের সর্বকনিষ্ঠ। সেসময়কার চিত্রকর ফসমে বুশরের আঁকা কিশোরী রানী মেরিলো উইজোমাফির সেমি পর্ণগ্রাফিক পেইন্টিং ফ্রান্সে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।

১৮০০ শতকের দিকে এসে প্রেম ও বিয়ে ভিন্নতর রূপ নিতে শুরু করে। অনেকের মতে বিয়ে দাম্পত্য আর বংশবৃদ্ধির জন্য একটি সামাজিক রীতি। অন্য দিকে প্রেম আবেগ, অনুভূতি, নানাবিধ ঘটনা আর সেক্স। তাই এই দুটি ব্যাপারকে কখনো এক করে দেখা উচিত নয়। ফ্রান্সের রাজার মতে প্রেম মানে বিয়ে। সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে দুজন মানুষের জীবনকে একীভূত করে চিরন্তন বন্ধনে সহাবস্থানের নাম।

১৮১২ সালের ১ জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের ক্রেনাগ্রিনে গোপনীয়ভাবে এক দম্পতি বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। পাত্রের নাম জন ল্যাম্পটন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও দেখভালের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিল জনের হাতেই। হঠাৎ করে হেরিয়েট নামে সাধারণ পরিবারের এক মেয়েকে বিয়ে করে বসে জন। যার অর্থ প্রতিপত্তি বা সামাজিক পরিচিতি বলতে ছিলনা কিছুই। বলা বাহুল্য অর্থ প্রতিপত্তি না থাকলেও হেরিয়েট দেখতে বেশ সুন্দরী ছিলেন। ঘটনা জানাজানি হলে জনের পরিবার বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে এই বিয়ে ঠেকানোর জন্য। কিন্তু জন ও হেরিয়েট দুজনেই ছিল অটুট প্রেমের বিশ্বাসে অবিচল। তাদের মতে সবার আগে প্রেম ও ভালোবাসা এর পর অন্যান্য বিষয়। প্রচলিত এই বলয় থেকে বেরিয়ে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য তারা স্থান পরিবর্তন করে চলে যায় স্কটল্যান্ডেই অবস্থিত ক্রেনাগ্রিন নামক নির্জন এক গ্রামে। অনেকেই মনে করেন তাদের সে চিন্তাচেতনা থেকেই রোমান্টিসিজম নামক দর্শনের জন্ম। তারাই প্রথম প্রেমে নতুন ঘরানার সংজ্ঞা প্রবর্তন করেন। যুগে যুগে যা নারী ও পুরুষের আবেগ অনুভূতির মাঝে নতুন এক পথের নির্দেশনা দেয়। সে থেকেই মূলতঃ বিশ্বজুড়ে প্রেম বা ভালোবাসার তাৎপর্য কিংবা মূল্যায়ন সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক দিক, রাজ্য সম্প্রসারণ, ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যকার বিষয়গুলো গৌণ হতে থাকে ।

ফ্রি সেক্স বা নগ্ন সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল মূলতঃ আমেরিকা। ১৯৯৬ সালের দিকে বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব ভীষণভাবে লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমাবিশ্বসহ বিভিন্ন দেশে সেক্সুয়াল সম্পর্ক, বিবাহপূর্ব সেক্স, অবাধ মেলামেশা প্রভৃতি স্বাভাবিক নৈমিত্তিক বিষয় হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। তখনই মনোগামী বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে আর ক্রমান্বয়ে বিয়ে এবং যৌথ জীবনের বিষয়টি নাজুক আকার ধারণ করে।

প্রেমের মহান মর্যাদার কারণে ক্রেনাগ্রিন সবার কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। জন ও হেরিয়েটের দেখাদেখি ১৮০০ শতকে প্রায় একশর’ও বেশী দম্পতি তাদের পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে জীবন সাজায়। সামাজিক বাধা ও ত্যাগ মেনে নিয়ে বিয়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রেমকে সফল পরিণতিতে রূপ দেয়। জনগনের মুখে মুখে রটে যাওয়া প্রেমের গল্পগুলোর সংকলন তৎকালীন সময়ে পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত হয়। ধীরে ধীরে ক্রেনাগ্রিন প্রেম ভালোবাসার এক গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের ভেতর জন্ম নেয় নতুন একটা ধারণা। প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতির নামই বিয়ে। দুজন মানুষ যখন একে অন্যকে গভীরভাবে ভালবাসে, আপন করে পেতে যায় তখন পৃথিবীর অন্যসব অনুষঙ্গগুলো গৌণ হয়ে পড়ে।

পরিবার, ক্যারিয়ার, সমাজ— এ বিষয়গুলো তখন অনেক নগণ্য মনে হয়। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, অনেক বাবা-মা ও পরিবার এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন না কিংবা বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখেন না। বিবেচনায় রাখা উচিত, প্রত্যেকটি বিষয়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টি দিক আছে। সেগুলো নিয়ে সুচিন্তিত আলোচনার মাধ্যমে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ক্রেনাগ্রিনের সেই সব অধিবাসীরা আজ নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কেননা তাদের বদ্ধমূল মানসিক ধারণাকে পরিবর্তন করে দু’জন মানুষের বোঝাপড়া সুন্দর ও সাবলীল সম্পর্কের নতুন একটা দিক উন্মোচন করতে পেরেছিল। পরবর্তীতে যা বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রেম হলো মূলতঃ বোঝাপড়ার একটি বিষয়। এটা কোন প্রতিযোগিতা কিংবা দুজনের মধ্যকার কোন যোগ্যতা পরীক্ষা নয়।

১৮১৩ সালের ইংল্যান্ডের লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় জেইন অস্টিনের উপন্যাস “প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস”। প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। গল্পে দেখা যায় নায়ক ফিজ উইলিয়াম ডারচি নায়িকা এলিজাবেথ বেনেটকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তাৎক্ষনিকভাবে এলিজাবেথ সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। যদিও এই বিয়ে হলে এলিজাবেথের ব্যক্তিগত অনেক সমস্যার সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতো। তবুও সে বিয়েতে রাজি হয়না। ডারচি দেখতে তেমন হ্যান্ডসাম ছিলনা সত্য তবে অর্থ প্রতিপত্তির কোনরূপ কমতি ছিলনা। অন্যদিকে এলিজাবেথের ছিল অবিবাহিত চার বোন। যাদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল এলিজাবেথের ঘাড়ে। ডারচি ছিল প্রচণ্ড জেদী। সে প্রতিনিয়ত এলিজাবেথের কাছে দামী ও আকর্ষণীয় সব সুন্দর সুন্দর উপহার পাঠাতো। প্রথম দিকে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেও পরবর্তীতে একটা সময় এলিজাবেথ তার মতের পরিবর্তন করে। অনেক নাটকীয় ঘটনা শেষে এলিজাবেথ ও ডারচি আবদ্ধ হয় বিবাহ বন্ধনে। এই উপন্যাস প্রকাশের পরে মূলতঃ ইংলিশ সোসাইটিতে প্রেমের প্রকাশ ও পরিণতি হিসেবে বিয়ের বিষয়টা ধীরে ধীরে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে থাকে।

অর্থবিত্তের জন্য বিয়ের প্রসঙ্গ আসলেও এলিজাবেথ সবাইকে প্রেমের পরিণতি বিয়ে— এই ধারনার সাথে সম্পৃক্ত করেন। এই ধারণাটিকে অস্টিন খুব জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন। তার অতীত জীবনে, এগারো বছর আগে, তিনিও এমন বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তার মতে প্রেম আর আবেগ থাকলে সবকিছুই সহ্য করা যায়। মেনে নেয়া যায় অনেক কিছু। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসা যদি না থাকে সে জীবন অর্থহীন, নিরানন্দ। যদিও তার উপন্যাসে ভালোবাসার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব সহকারে এসেছে তবে তিনি রোমাঞ্চের সাথে সাথে অর্থের বিষয়টিকেও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন।

তার মতে শুধু মাত্র অর্থের জন্য বিয়ে একটি বিপর্যয় ছাড়া আর কিছু নয়। আবার অর্থহীন বিয়েতেও আছে অনেক বিপত্তি। অস্টিনের মতে একটি সফল দাম্পত্য জীবন সেটাই যেখানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও পারস্পরিক সমঝোতা থাকে। অস্টিন এই বলে ইতি টানেন যে, কিছু বিয়ে থাকে শুধু আবেগ বা ঝোঁকের বসে করা। সেসব বিয়ে কখনো সুখদ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হয়না বরং পরবর্তীতে অসুখী দাম্পত্যের কারন হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত প্রেম ও পারস্পরিক আস্থার বন্ধনে যে সম্পর্ক, সেটাই সত্যিকারের প্রেম।

প্রেম বা ভালোবাসার মূলমন্ত্র হলো সমঝোতা আর স্যাক্রিফাইস। একে অন্যকে সর্বোত্তমভাবে জানা, বোঝা আর পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। প্রেম বা দাম্পত্য জীবনে অমিল, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান থাকতেই পারে। অতটুকু মেনে নেয়ার মতো স্যাক্রিফাইসিং মনোভাব সবার থাকা উচিত। ভুলত্রুটি-খুনসুটি মেনে নিয়ে প্রকৃত প্রেমের মাধ্যমেই সুখী জীবনের ভিত রচনা সম্ভব।

এই উপন্যাসে তিনি আধুনিক প্রেমের কিছু সুন্দর ধারণার তুলে ধরেন। তার মতে বিয়ে বিষয়টি এক ধরণের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যের মতো। গ্রামের ছোট হাটে রুটিন করে একটি ব্যবসা চালিয়ে নেয়ার মতো। কারো যদি বাস্তবসম্মত ধারণা ও যে কোন পরিস্থিতি প্রতিকূলতা মেনে নেয়ার প্রবণতা না থাকে সে ক্ষেত্রে এটি অবধারিতভাবে অসফল। অন্যদিকে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ সম্পর্ক, আস্থা ও প্রেম দিতে পারে একটি নির্মল সুখী জীবনের প্রতিশ্রুতি। ‘প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসের’ মাধ্যমে অস্টিন বিভিন্ন ধারণা ও উপমা দিয়ে প্রেম বিষয়টির স্বচ্ছ ধারণা দিতে চেষ্টা করেছেন। তার মতে সবাই যদি কিছু বিষয় নিয়ে সজাগ থাকে তবে ভাগ্য, প্রকৃতি, সময় একদিন অবশ্যই মঙ্গলজনক ফলাফল বয়ে আনবে। সুখী দাম্পত্য জীবনের অন্যতম মাপকাঠি হলো আস্থা ও বিশ্বাস। শুধু ভালোবাসলে হয়না! ভালোবাসার জন্য একে অপরকে পরিপূর্ণ করে জানা ও একে অন্যকে বোঝার বিষয়ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২৪ নভেম্বর ১৮৫৯ তারিখে প্রকাশিত হয় চার্লস ডারউইনের “দা অরিজিন অফ স্পিশিস”। যেখানে যুক্তি তর্কের মাধ্যমে ডারউইন নারী পুরুষের প্রেম ভালবাসা বিষয়ক অনেক অজানা বিষয় যুক্তিতর্ক সহকারে উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়িত নানা চিন্তা চেতনার উদ্রেক হয়। এটি মনস্তত্ত্বের মৌলিক একটি বিষয়। তাই মানুষ সবসময় গৎবাঁধা কোন কিছুর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে পারেনা। তার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা সত্তা মাঝে মাঝে তাকে ভিন্নপথে পরিচালিত করে। ডারউইনের মতে, দাম্পত্য জীবনে পরিপূর্ণভাবে সুখী হওয়া, বিশ্বস্ত থাকা, ধৈর্য্য সহকারে মানিয়ে নেয়া কিছু ক্ষেত্রে বেশ কষ্টকর ঠেকে। যে কারণে অনেকের বিবাহিত জীবন সুখের হয়না। ডারউইন তার গ্রন্থে বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে বিষাদপূর্ণ অনেকগুলো বিষয়ের কথা বর্ণনা করেছেন। তার মতে ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ দ্বৈত সাংসারিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত, বিধায় প্রকৃতিগতভাবে মানুষ বহুগামী।

১৯৬৫ সালের অগাস্ট মাস। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো সৈকত। জেফারসন পোল্যান্ড নামের এক তরুণী সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মাথায় একটি ফুল গুঁজে সমুদ্রস্নানে নামে। পোল্যান্ডকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম হিপ্পী। যে কিনা পরিশীলিত আধুনিক জীবনযাপনকে অগ্রাহ্য করে প্রকৃতিগত ও ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের ধারণা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। তার দেখাদেখি অনেক তরুণ তরুণী সমবেত হয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে চীৎকার করে শ্লোগান তোলে ‘সেক্স ইজ ক্লিন, নো রিজন অফ সিন’। উপস্থিত অনেক সাংবাদিক ও রিপোর্টার তাদের সেই অবস্থান ও সমাবেশের ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করেন। এই মুভমেন্টের পর অনেকের মাঝে ফ্রি সেক্স ও অবাধ মেলামেশার চর্চা ব্যাপক আকার ধারণ করে। পশ্চিমা বিশ্বে এর বিস্তার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রি সেক্স বা নগ্ন সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল মূলতঃ আমেরিকা। ১৯৯৬ সালের দিকে বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব ভীষণভাবে লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমাবিশ্বসহ বিভিন্ন দেশে সেক্সুয়াল সম্পর্ক, বিবাহপূর্ব সেক্স, অবাধ মেলামেশা প্রভৃতি স্বাভাবিক নৈমিত্তিক বিষয় হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। তখনই মনোগামী বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে আর ক্রমান্বয়ে বিয়ে এবং যৌথ জীবনের বিষয়টি নাজুক আকার ধারণ করে। বৃদ্ধি পায় ডিভোর্সের হার। এই সংস্কৃতি সম্প্রসারিত হতে হতে একসময় দারুণ বিপর্যয়ের রুপ ধারণ করে।

২০১৫ সাল। বেলজিয়াম উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ডিভোর্সের হার সেটাও এই দেশে- ৭১%। খবরের কাগজে হেডলাইন হয় এই সংবাদ। শুরু হয় নানা আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ। মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে খুব বেশী সময় লাগেনা। অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর মেলে। প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা আর পারস্পরিক চাওয়া পাওয়ার মাঝে ঘাটতি আর সমঝোতার অভাবই সমস্যার মূল কারণ। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতেও থেমে নেই এই ডিভোর্স। যুক্তরাজ্যে ৪২%, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩%, হাঙ্গেরিতে ৬৭% এবং পর্তুগালে ডিভোর্সের হার ৬৮%। কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রি সেক্সের যে ধারণাটি জন্ম নিয়েছিলো সেখানে আসলে সত্যিকার প্রেম, ভালোবাসা, আস্থা এসব কোন কিছুর স্থান ছিলনা। ছিল কেবল সাময়িক আবেগ ও শারীরিক প্রবৃত্তি নিবারণের আকাঙ্ক্ষা।

প্রেম বা ভালোবাসার মূলমন্ত্র হলো সমঝোতা আর স্যাক্রিফাইস। একে অন্যকে সর্বোত্তমভাবে জানা, বোঝা আর পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। প্রেম বা দাম্পত্য জীবনে অমিল, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান থাকতেই পারে। অতটুকু মেনে নেয়ার মতো স্যাক্রিফাইসিং মনোভাব সবার থাকা উচিত। ভুলত্রুটি-খুনসুটি মেনে নিয়ে প্রকৃত প্রেমের মাধ্যমেই সুখী জীবনের ভিত রচনা সম্ভব। প্রেম ও ভালোবাসাই পারে অটুট বন্ধনে দু’টি মানুষকে আমৃত্যু শাশ্বত সুখের আস্বাদন দিতে। উচ্ছ্বল আনন্দ-সমুদ্রে নির্নিমেষ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে। পরিশুদ্ধ প্রেমে পূর্ণ হোক আয়ুরেখার প্রতিটি অধ্যায়। অনাবিল শুদ্ধতায় ঋদ্ধ হোক সবার জীবন।

আরো পড়তে পারেন

কবিতা ও গণিত

কবিতা ও গণিত নিয়ে বাংলাদেশে তেমন লেখালিখি হয়েছে বলে আমার জানা নাই। নব্বইয়ের দশকে মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা নামক একটা লিটল ম্যাগাজিন বের হতো। ওটার একটা পর্ব ছিলো গণিত সংখ্যা। বেশ ঢাউস আকারের। সংখ্যাটা হাতে না থাকায় বলতে পারছিনা ওখানে গণিত ও কবিতা নিয়ে কেমন লেখা হয়েছিলো। আমার জানা মতে পশ্চিম বাংলা থেকে এরকম কিছু….

আহমদ ছফার দুর্বল উপন্যাস ‘অলাতচক্র’

অলাতচক্র পড়া শেষ হলে একটা মন্তব্য উদয় হয় মনে যে অলাতচক্র ছফার উপন্যাসের মধ্যে দুর্বল উপন্যাস। সম্ভবত ছফার উপন্যাসের মধ্যে শক্তিশালী চরিত্র হচ্ছে আলী কেনান। সে হিসাবে দানিয়েল খুবই দুর্বল একটা চরিত্র। তবে বাস্তব ভিত্তিক উপন্যাস লেখা খুবই কঠিন কাজ। তাই এখন আমাদের অধিকাংশ তরুণরাই পৌরাণিক কাহিনির দিকে ধাবিত হয়। যেহেতু সেখানে ছকটা বানানো থাকে।….

হিন্দু বর্ণবাদের অভিশাপ মোচনে জনহিতকর কর্মে রাজচন্দ্র-রাসমণি

মোগল শাসনামলে দেশীয় সামন্ত-জমিদারদের নিয়োগের একচ্ছত্র এখতিয়ার ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অনুগত-আজ্ঞাবহ নবাব, রাজা, মহারাজাদের। জমিদারেরা ছিল কেবল মাত্র খাজনা সংগ্রাহক। ভূমির অধিকার ছিল কৃষকের। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গদেশে শোষণ-লুণ্ঠনের অবাধ ক্ষেত্র গড়ে তোলে। কোম্পানির নানাবিধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশীদার হয়ে স্থানীয় কতিপয় ইংরেজ অনুগত মুৎসুদ্দি-বেনিয়া চক্র রাতারাতি অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলে।….